বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

চবি ছাত্রলীগ নেতা দিয়াজের শরীরে আঘাতের চিহ্ন মিলেছে -- চিকিৎসক 

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : আমার ছেলে আমাকে চাকরিতে যোগদানের আগেই বাংলাদেশ ব্যাংক দেখিয়ে বলেছিল, মা খুব শিগগিরই এখানে জয়েন করবো। তুমি দোয়া করো। আমিও তো ওকে মন থেকে দোয়া করেছিলাম। কিন্তু রাক্ষুসে রাজনীতির শিকার হয়ে তাকে লাশ হতে হলো। আমার ছেলের খুনিরা কি গ্রেফতার হবে না। এমনতর একাধিক প্রশ্ন তুলে গতকাল রোববার বেলা সোয়া ২টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গের সামনে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর মা জাহিদা আমিন চৌধুরী। এ সময় তার আহাজারীতে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছিল। তিনি উপস্থিত একাধিক গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আমার ছেলের খুনিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পুলিশ জেনে শুনেও তাদের গ্রেফতার করছে না। পুলিশের এহেন নিষ্ক্রিয়তার কারণে আমার পরিবারের অন্য সদস্যরাও খুন হতে পারে। গতকালই তার আদুরে সন্তান দিয়াজের মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করতে দ্বিতীয় দফায় তার লাশের ময়নাতদন্ত হয়েছে ঢামেক মর্গে । এর আগে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে দিয়াজের লাশের প্রথম ময়নাতদন্ত হয় । সেই তদন্ত প্রতিবেদনের উপর নারাজি দেয় দিয়াজের পরিবার ।পরিবারের সদস্যরা শুরু থেকেই দিয়াজকে হত্যার অভিযোগ করে আসছিল । আর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল “আত্মহত্যা ”।

আত্মহত্যা, না হত্যা- এ প্রশ্ন ওঠায় আদালতের নির্দেশে কবর থেকে ছাত্রলীগ নেতা দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর লাশ তুলে আবারও ময়নাতদন্ত করেছেন চিকিৎসকরা। গতকাল রোববার বিকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে ফরেনসিক বিভাগের প্রধান সহকারী অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, তারা ‘আঘাতের চিহ্ন’ পেয়েছেন, তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাবেন ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং ভিসেরা প্রতিবেদন পাওয়ার পর। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি দিয়াজ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সম্পাদক ছিলেন। গত ২০ নবেম্বর রাতে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বাসায় ঝুলন্ত অবস্থায় তার লাশ পাওয়া যায়।

গতকাল বেলা তিনটার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সোহেল মাহমুদকে প্রধান করে গঠিত তিনজনের প্রতিনিধিদল পুনঃ ময়না তদন্ত করেন। বাকি দুই চিকিৎসক হলেন প্রদীপ বিশ্বাস ও কবির সোহেল। 

দিয়াজের মা জাহেদা আমিন চৌধুরী ঢাকা মেডিকেলে সাংবাদিকদের বলেছেন, চট্টগ্রামে প্রথম ময়নাতদন্তে আঘাতের কোনো চিহ্নের কথা ছিল ন। এবার প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে বলে তিনি আশা করছেন। প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে দিয়াজের আত্মহত্যার কথা এলেও তা প্রত্যাখ্যান করে ইতোমধ্যে একটি মামলা করেছেন দিয়াজের মা। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে সেসময় প্রথম দফা ময়নাতদন্ত হয়।

ঢাকা মেডিকেলে দ্বিতীয় দফা ময়নাতদন্তের পর ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, “আমরা তিন সদস্যের মেডিকেল বোর্ড ময়নাতদন্ত শেষে করেছি। যা পেয়েছি তা পর্যালোচনা করব এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করব। যারা প্রথম ময়নাতদন্ত করেছেন এবং ওই ঘটনায় যারা সাক্ষী আছেন, তাদের সাথে কথা বলে আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেব।”তিনি জানান, দিয়াজের ভিসেরা, দাঁত ও গলার টিস্যুর হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষা হবে। ওই প্রতিবেদন আসার আগেই তারা চট্টগ্রামে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাবেন।

প্রথম ময়নাতদন্তে আত্মহত্যার কথা বলা হলেও পরিবারের দাবি এটা হত্যাকান্ড- এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সোহেল মাহমুদ বলেন, “আমরা আঘাতের চিহ্ন পেয়েছি। তবে এখন আমরা কিছুই বলব না। ঘটনাস্থল দেখে আসার পর প্রতিবেদন দেব।” ডা. সোহেল বলেন, দিয়াজের প্রথম ময়নাতদন্ত যারা করেছেন তাদের সঙ্গে কথা বলা হবে , দিয়াজের মৃত্যুর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবেন এবং সাক্ষীদের সঙ্গেও কথা বলবেন । তবে কবে তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবেন জানতে চাইলে সোহেল মাহমুদ দিনক্ষণ নির্দিষ্ট করেননি। দ্রুতই যাবেন বলে জানিয়েছেন। আর দাঁত, নেক টিস্যু এবং ভিসেরা পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পরই তারা এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানাবেন বলেও জানিয়েছেন ডা. সোহেল মাহমুদ।

মর্গের বাইরে উপস্থিত দিয়াজের মা বলেন, “এবার ডাক্তার আঘাতের চিহ্ন পাওয়ার কথা বলেছেন। আমি আশাবাদী, এবার ময়নাতদন্তে সঠিক তথ্য আসবে, প্রমাণিত হবে যে আমার ছেলেক হত্যা করা হয়েছে।” তারা সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, তাদের ধারণার প্রতিফলন আছে এ তথ্যে। দিয়াজের মা জানান, তার ছেলেকে যারা হত্যা করেছে তাদের বিরুদ্ধে তিনি শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবেন। এ সময় দিয়াজের বড় বোন ও ভগ্নিপতিও এ সময় ঢাকা মেডিকেলের মর্গের বাইরে উপস্থিত ছিলেন।

আদালতের নির্দেশে পুনঃ ময়নাতদন্তের জন্য শনিবার কবর থেকে তোলা হয় দিয়াজের লাশ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ-সংলগ্ন কবরস্থান থেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে লাশটি তোলা হয়। পরে লাশ নিয়ে ঢাকায় আসে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একটি দল।

দিয়াজের লাশের প্রথম ময়নাতদন্ত হয় গত ২১ নবেম্বর। ২৩ নবেম্বর পুলিশ জানায়, দিয়াজকে হত্যা করা হয়েছে ,এমন আলামত ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মেলেনি। তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে মত দিয়েছেন চিকিৎসকেরা। ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে দিয়াজের পরিবারসহ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের একটি অংশ। তারা বলে, লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনের সঙ্গে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের কোনো মিল নেই।

দিয়াজের বড় বোন জুবাঈদা ছরওয়ার চৌধুরী বলেন, ‘আমরা শুনেছি দিয়াজের হত্যাকারীরা ঢাকাতেও তদন্ত প্রতিবেদনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। আমরা চাই সুষ্ঠু ও সঠিক তদন্ত হোক। সুরতহাল প্রতিবেদনের সঙ্গে যেন ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের মিল থাকে। আমরা দিয়াজের শরীরে আঘাতগুলোর ব্যাখ্যা চাই।’

৬ ডিসেম্বর সিআইডির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দিয়াজের লাশ তুলে আবারও ময়নাতদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। এ জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধানকে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করার নির্দেশ দেন আদালত।

গত ২০ নবেম্বর রাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ২ নম্বর গেট এলাকার নিজ বাসা থেকে দিয়াজের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর ২২ দিন আগে দিয়াজসহ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের চার নেতার বাসায় তান্ডব চালানো হয়। ৯৫ কোটি টাকার দরপত্রের ভাগ-বাঁটোয়ারাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতির অনুসারী নেতা-কর্মীরা ওই হামলা চালান বলে অভিযোগ ওঠে। কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে যাওয়ার আগে দিয়াজ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের জনপ্রিয় নেতা ছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ