শুক্রবার ২৩ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

এগিয়ে যাওয়ার দেশে একদলীয় নির্বাচন প্রকল্প

এম. কে. দোলন বিশ্বাস : আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। উন্নয়নে বিশ্বাসী। জনগণের ভোটাধিকারে বিশ্বাসী। দেশ আজ এগিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং আমরাই একমাত্র বলতে পারি, জনগণের সাথে আছি, সাথে থাকি। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন লীগবাদী মহাজোটের নেতানেত্রীদের ওইসব বাহারি-রকমারির রসালো স্লোগান আজ অনেকটাই ফিঁকে হতে বসেছে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফাঁকা মাঠে নির্বাচনী গোল দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা মোক্ষম করে একের পর এক নির্বাচনের নামে নিজেদের দলীয় জনপ্রতিনিধির পাল্লা ভারি করার পর এখন সর্বশেষ জেলা পরিষদে  (জেপি) একদলীয় নির্বাচন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে লীগবাদী সরকার।
রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তি ও প্রতিবাদ উপেক্ষা করে আওয়ামী সরকার একান্ত মদদে নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রথমবারের মতো জেপি নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী ২৮ ডিসেম্বর সারা দেশে ওই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে একমাত্র আওয়ামী লীগ ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো রাজনৈতিক দলের নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে আগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এমনকি শাসকদলের অনুসারি জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল নামে পরিচিত সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টিও ওই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। মহাজোটের শরীক দলগুলোও নির্বাচনে অংশ নেবে না। সংসদের বাইরে মাঠের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিরও ইতিবাচক অবস্থান নেয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। অর্থাৎ জেপি’র যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে ওই নির্বাচনে শুধু আওয়ামী লীগই অংশ নেবে। ফলে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আরো একটি একদলীয় ও একতরফা নির্বাচনের রেকর্ড স্থাপিত করে কলঙ্কিত নয়া ইতিহাস জন্ম দেবে আওয়ামী লীগ।
প্রসঙ্গক্রমে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কথাও স্মরণ করা দরকার। কয়েক ধাপে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সহিংসতার মাধ্যমে শুধু নয়, বরং নানাবিধ পন্থায়ও ইউপি নির্বাচনের সমগ্র প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীনরা নিজেদের দখল প্রতিষ্ঠা করেছে। দেশের সব এলাকাতেই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী দলের প্রার্থীদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা দেয়া এবং মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এমন এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল, যার ফলে প্রায় কোনো ইউনিয়নেই বিরোধী দলের প্রার্থীরা দাঁড়াতে পারেননি। অন্যদিকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং কোথাও কোথাও নামমাত্র বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত বলে ঘোষিত হয়েছেন কেবল আওয়ামী লীগের লোকজন। ফলে আলোচ্য আইনটির ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হলে জেপি’র সকল পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত ব্যক্তিরাই শুধু নির্বাচিত হবেন।
অমন সম্ভাবনার কারণেই দেশের কোনো রাজনৈতিক দলই জেপি নির্বাচনের জন্য পাস করা আইনটিকে যেমন সমর্থন করেনি তেমনি জেপি নির্বাচনের ব্যাপারেও আগ্রহ দেখাচ্ছে না। আমরাও মনে করি, সরকারের উচিত জনগণের আন্দোলনে প্রত্যাখ্যাত ও বাতিল হয়ে যাওয়া কোনো ব্যবস্থা প্রবর্তনের চেষ্টা থেকে সরে আসা এবং জনগণের সরাসরি ভোটে জেপি নির্বাচন অনুষ্ঠানের পদক্ষেপ নেয়া। এজন্য সংশোধিত আইনটি বাতিল করতে হবে অনতিবিলম্বে। জেপি’র ডিসেম্বরে পরিকল্পিত নির্বাচনও অনুষ্ঠান করা চলবে না।
রাজনৈতিক দলগুলোর অংশ না নেয়ার প্রধান কারণ হিসেবে ইলেক্টোরাল কলেজ-এর কথা চারিদিকে জোরেসোরে উচ্চারিত হচ্ছে। উল্লেখ্য, গত ২৯ আগস্ট মন্ত্রিসভার নিয়মিত সাপ্তাহিক বৈঠকে অনুমোদিত এ সংক্রান্ত আইনটিতে বলা হয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনসহ জেলার চার স্তরের স্থানীয় সরকার কাঠামোর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি ‘ইলেক্টোরাল কলেজ’ গঠন করা হবে এবং এর সদস্যরাই জেপি নির্বাচনে ভোট দেবেন। তাদের ভোটেই ২১ সদস্যের জেপি গঠন করা হবে। জেপি নির্বাচনের জন্য সংশোধিত আইনটি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে নিন্দিত ও সমালোচিত হয়েছে।
বিশেষ দূতের মন্তব্য : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূত জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ গণমাধ্যমে জানান, জেপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের জয় নিশ্চিত। তারা জোর করে হলেও জয় ছিনিয়ে নেবে। অতীত অভিজ্ঞতাও তাই বলে। তাই এ নির্বাচনে অংশ নিয়ে লাভ নেই। তিনি বলেন, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে- এই আশ্বাস মিললে জাতীয় পার্টি এতে অংশ নেবে। কিন্তু এরই মধ্যে প্রমাণিত হয়েছে, বর্তমানের ইসি’র অধীনে আদৌ ভোট সুষ্ঠু হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
শরীক দলের মন্তব্য : আওয়ামী লীগের শরীক দল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পাটির্র (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম গণমাধ্যমে জানান, জেপি নির্বাচনের নামে আরেকটি প্রহসন। সিপিবি এ ধরনের প্রহসনের নির্বাচনে অংশ নেবে না। তিনি আরও জানান, জনপ্রতিনিধিদের ভোটে জেপি’র নির্বাচন হবে। দেশবাসী জানে এই জনপ্রতিনিধিরা কীভাবে বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। তারা কী করবেন তাও বোঝা যাচ্ছে। দল যেভাবে নির্দেশ দেবে, সেভাবে তারা নির্দেশ বাস্তবায়ন করবে। তাই এই নির্বাচনের অর্থ নেই। 
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞের মন্তব্য : স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার গণমাধ্যমে জানান, জেপি নির্বাচন কার্যত একদলীয় নির্বাচনে পরিণত হতে যাচ্ছে। যেহেতু বেশিরভাগ জনপ্রতিনিধি আওয়ামী লীগের, তাই তাদের প্রার্থীরই জয় নিশ্চিত। তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে হয়তো সংঘাত সহিংসতা দেখা যাবে না। তবে টাকার খেলা হবে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা টাকা দিয়ে ভোট কেনার চেষ্টা করবেন।
যারা ভোটার হচ্ছেন জেপি নির্বাচনে : গত ১০ আগস্ট জেপি’র সদস্য ও সংরক্ষিত মহিলা সদস্য নির্বাচনের জন্য ওয়ার্ডের সীমানা নির্ধারণে বিধিমালা জারি করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী প্রতিটি জেলায় ১৫ জন সাধারণ এবং ৫ জন সংরক্ষিত মহিলা সদস্য নির্বাচিত হবেন। এ হিসেবে সাধারণ সদস্য নির্বাচনের জন্য প্রত্যেকটি জেলাকে ১৫টি ওয়ার্ডে বিভক্ত করা হবে এবং সংরক্ষিত মহিলা সদস্যের জন্য হবে ৫টি ওয়ার্ডে বিভক্ত।
জেপি নির্বাচনে কেবল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। এ হিসেবে স্থানীয় সরকারের ৪টি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৬৭ হাজার নির্বাচিত প্রতিনিধি এই নির্বাচনে ভোট দেবেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোটার হচ্ছে ইউপিতে। দেশে বর্তমানে ইউপি’র সংখ্যা ৪ হাজার ৫৭১টি। প্রতিটি ইউপি’র গড়ে ১৩ জন করে প্রায় ৬০ হাজারের মতো নির্বাচিত প্রতিনিধি রয়েছে। এভাবে ৪৮৮টি উপজেলা পরিষদে প্রায় দেড় হাজার, ৩২০টি পৌরসভায় সাড়ে ৫ হাজার এবং ১১টি সিটি কর্পোরেশনে প্রায় সাড়ে ৫০০ নির্বাচিত প্রতিনিধি রয়েছেন।
প্রার্থীরা ভোট দিতে পারবে না : জেপি নির্বাচনে প্রার্থী হলেও তারা কোনো ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন না। আইনে বলা হয়েছে, নির্বাচকম-লীর সদস্য না হলে কোনো ব্যক্তি ভোটার তালিকাভুক্ত হওয়ার যোগ্য হবেন না। আর আইনের অন্য একটি ধারায় বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদের সদস্য বা অন্য কোনো স্থানীয় কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বা সদস্য হলে তিনি প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা হারাবেন। অর্থাৎ অন্য কোনো সংস্থার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না হলে যেমন ভোটার হওয়া যাবে না তেমনই কোনো সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি হলে জেপি’র প্রার্থী হওয়া যাবে না।
জেপি’র ইতিবৃত্ত : ব্রিটিশ আমলে ১৮৯৫ সাল থেকে বিভিন্ন পদ্ধতিতে জেপি থাকলেও ১৯৫৯ সালে মৌলিক গণতন্ত্র আদেশের অধীন ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডকে নতুন আঙ্গিকে পরিণত করে ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল নামকরণ করা হয়। এ ব্যবস্থায় ১৯৬৩ সালে জেপি’র প্রথম নির্বাচন হয়। ওই নির্বাচনটিও হয়েছিল স্থানীয় সরকারের নিম্নপর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের ভোটের মাধ্যমে। এরপর ১৯৬৬ সালে দ্বিতীয় ও শেষবারের মতো এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে ১৯৭২ সালে নির্বাচিত পরিষদ ভেঙে দিয়ে অন্তবর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে জেলা প্রশাসককে এর প্রশাসক করে ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের যাবতীয় কাজ পরিচালনা ও তত্ত্বাবধানের ক্ষমতা দেয়া হয় এবং ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের স্থলে জেলা বোর্ড নামকরণ করা হয়।
১৯৭৬ সালে স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশ জারি করা হয় এবং জেলা বোর্ডের নামকরণ করা হয়। পরে এরশাদ সরকারের সময় স্থানীয় সরকার (জেলা পরিষদ) আইন-১৯৮৮ পাস হয়। ওই আইনেও পাকিস্তান আমলের মতো পরোক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে পরিষদের চেয়ারম্যান ও অন্যান্য সদস্য নির্বাচনের বিধান করা হয়। কিন্তু তৎকালীন সরকার নির্বাচন না করে দলীয় সংসদ সদস্যদের জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়। ১৯৮৯ সালে তিন পার্বত্য জেলায় একবারই সরাসরি নির্বাচন হয়েছিল। আর কোনো জেপি নির্বাচন হয়নি।
১৯৯১ সালে বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এলে ওই আইনটি বাতিল করে জেপি বিলুপ্ত করে দেয়। ২০০০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আবারও জেলা পরিষদ আইন পাস করে। তবে নির্বাচন দেয়ার আগে ২০০১ সালে আবারও বিএনপি সরকার গঠন করলে আইনটি আর বাস্তবায়িত হয়নি। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে জেপি সক্রিয় করার উদ্যোগ নেয়। এরই অংশ হিসেবে ২০১১ সালে দেশের ৬১টি জেলায় অন্তবর্তীকালীন দায়িত্ব পালনের জন্য দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়। প্রশাসক নিয়োগের ৫ বছরের মাথায় ক্ষমতাসীন এ দলটি পরিষদের নির্বাচনের উদ্যোগ শুরু করেছে।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি : ‘ইলেক্টোরাল কলেজ’-এর মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটাধিকারকেই অস্বীকার করে আওয়ামী ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করতে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, পাকিস্তানের স্বৈরশাসক জেনারেল আইয়ুব খান তার প্রবর্তিত মৌলিক গণতন্ত্রের জন্য এ ধরনের ‘ইলেক্টোরাল কলেজ’ তৈরি করেছিলেন। আইয়ুব খান ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ নামে এমন এক ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন, যে ব্যবস্থায় জনগণ তথা সাধারণ ভোটাররা শুধু ইউপি নির্বাচনে ভোট দেয়ার সুযোগ পেতো। এভাবে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে ৪০ হাজার করে ৮০ হাজার মৌলিক গণতন্ত্রী বা বিডি মেম্বার নির্বাচিত হতেন। এরাই পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের দুই প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করতেন। ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ নামের উদ্ভট এ ব্যবস্থায় ভোটার তথা ৮০ হাজার মৌলিক গণতন্ত্রীকে সহজেই টাকার বিনিময়ে কেনা যেতো। কেনা হয়েছেও। ফলে গণতন্ত্রের সর্বনাশ তো হয়েছিলই, জনগণও হারিয়েছিল ভোটাধিকার। এ জন্যই আইয়ুব খানের শাসনামলে প্রাপ্ত বয়ষ্কদের প্রত্যক্ষ ভোটাধিকার দেয়ার দাবি সব সময় ছিল প্রধান একটি দাবি। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটাধিকারের দাবিটি ১৯৬৯ সালের ছাত্র-গণঅভ্যূত্থানের মাধ্যমে আদায় করা হয়েছিল।
আমরা মনে করি, ইলেক্টোরাল কলেজ-এর পাশাপাশি অন্য একটি বিশেষ কারণেও জেপি নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না। সে কারণটি হলো, দেশের বিভিন্ন এলাকায় জনগণের ভোটে নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের অনেক জনপ্রতিনিধিকেই বরখাস্ত করেছে সরকার। মূলত তাদের ভিন্ন রাজনৈতিক মত পোষণ করার দায়েই বরখাস্ত করা হয়। এই তালিকায় রয়েছেন সিটি করপোরেশনের চারজন মেয়র, ১০৫ জন উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান, ২১ জন পৌর মেয়র, ৪৪ জন সিটি ও পৌর কাউন্সিলর এবং ১৪০ জন ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বার। বরখাস্ত হওয়া ৩১৪ জনের মধ্যে অনেককেই মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে কারাগারে ঢোকানো হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, আদালতে জামিন পাওয়া সত্ত্বেও তাদের বেশিরভাগ মুক্তি পাননি। অনেককে আবার নতুন নতুন মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। (তথ্যসূত্র : যুগান্তর- ১৫.১১.২০১৬) মূলত সে কারণেও আসন্ন জেপি নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে বিরোধী কোনো দলই আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
বলাবাহুল্য যে, বর্তমান ইসি’র অধীনে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু হয়নি। তারপরও আসন্ন জেপি নির্বাচন যে পদ্ধতিতে হতে যাচ্ছে, তাতে সংবিধানের যে মৌলিক বিষয়টি রয়েছে, তার পরিপন্থী। অর্থাৎ এখানে একটি ‘ইলেক্টোরাল কলেজ’ তৈরি করা হয়েছে, যারা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচিত হয়েছেন, তারাই শুধু এই নির্বাচনে ভোটার হবে। অতীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে ক্ষমতাসীনরা কারচুপির মাধ্যমে জয়ী হয়েছেন।
অনেক জায়গায় বিনাভোটেই তারা জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন। তাই সবমিলিয়ে নির্বাচনটা মূলত একদলীয় নির্বাচনে রূপ নিয়েছে। অন্যদিকে সরকারি দলের মনোনয়ন পাওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর জেপি নির্বাচনে জয় নিশ্চিত। তাই দল থেকে মনোনয়ন পাওয়াটাই হচ্ছে মূল কথা। এক্ষেত্রে বিরোধীপক্ষ তাদের কাছে ফ্যাক্টর নয়। বরং ভোটার ম্যানেজ করতে টাকার খেলাই বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে প্রার্থীদের কাছে।
দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত করতে পারলে মাঠপর্যায়ে নিজস্ব অবস্থা আরও মজবুত এবং শক্ত হবে- এমন হিসাব মাথায় রেখে শাসকদল আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা আগেভাগেই দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। জেপি চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়া অনেকটা সহজ হবে- এমন ভাবনাও মাথায় রেখে পা ফেলছেন সরকারি দলের অনেক নেতা।
পরিশেষে ইতিহাসের আলোকে বলা যায়, জেপি নির্বাচনের জন্য ‘ইলেক্টোরাল কলেজ’ প্রবর্তনের মাধ্যমে বর্তমান সরকারও আইয়ুব খানকে অনুসরণ করে জনগণকে তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার যুতসই পদক্ষেপ নেয়ার নীল নকশা তৈরি করে বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে।
লেখক : সাবেক সহ-সম্পাদক, দৈনিক সংবাদ
[email protected]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ