শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

দীর্ঘস্থায়ী বাতের ব্যথা: রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস

রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ, যেখানে অস্থিসন্ধি বা জোড়াগুলোতে প্রদাহ হয়। এটা অস্থিসন্ধি ছাড়াও শরীরের অন্যান্য অংশ, যেমন- কানেক্টিভ টিস্যু ও যেসব টিস্যু বিভিন্ন অঙ্গ, যেমন- হৃৎপিণ্ড ও কিডনিকে ঘিরে রাখে; সেগুলোকে আক্রান্ত করতে পারে। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস পুরুষদের চেয়ে মহিলাদের দু-তিনগুণ বেশি হয়। এ রোগ যেকোনো বয়সে হতে পারে। তবে সাধারণত ৩৫ থেকে ৫০ বছর বয়সের মধ্যে বেশি পরিলক্ষিত হয়।
রোগের কারণ: রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের সঠিক কারণ এখনো পুরোপুরি নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করা যায়নি। তবে ধারণা করা হয়, শরীরের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এর জন্য দায়ী। একটি প্রতিষ্ঠিত মত হলো, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস একটি অটো-ইমিউন ডিজিজ। এ ক্ষেত্রে শরীর নিজের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং নিজের কোষ ও টিস্যুকে ধ্বংস করতে শুরু করে। মূলত দেহে অ্যান্টিজেন-অ্যান্টিবডি প্রক্রিয়ার জন্য এ ধরনের উপসর্গের সঞ্চার হয়। একটি বিশেষ জাতের আমিষ উপাদান বা ম্যাক্রোগ্লোবিন শরীরে প্রবেশ করে বিশেষ ধরনের প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে এবং এর ফলে রক্তে রিউমাটয়েড ফ্যাক্টর পজিটিভ হয়। সত্যি বলতে কি, এ মতের পক্ষে ভালো প্রমাণ রয়েছে। রক্ত পরীক্ষায় দেখা গেছে, ইমিউন সিস্টেমের অস্বাভাবিকতা রয়েছে, এমন লোকদের রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস রয়েছে। আরেকটি প্রমাণ হলো কিছু ওষুধ শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে দমিয়ে রাখে। যার ফলে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের উপসর্গের উন্নতি হয়। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বংশগত কারণে হতে পারে। এর প্রমাণ হলো রোগীদের শরীরে হিউম্যান লিউকোসাইট অ্যান্টিজেন (HLA) DR4 এবং তাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের শরীরেও HLA-DR4 পাওয়া যায়। এসব ছাড়াও শরীরে বারবার আঘাত লাগলে এবং ইনফেকশন হলেও এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস শরীরের নরম তন্তুকে বেশি আক্রমণ করে।
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে শরীরে কী হয়: শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থা যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে প্রয়োজনাতিরিক্তভাবে কাজ করা শুরু করে তখনই রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস রোগের সূত্রপাত হয়। কেন এমন হয় তা আজো সঠিকভাবে জানা যায়নি। এ রোগে ইমিউন সিস্টেম বা প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিজের শরীরের অঙ্গ তথা অস্থিসন্ধি বা জোড়া এবং জোড়ার আশপাশের কোষ বা কলাকে আক্রমণ করে। আক্রমণের ফলে অস্থিসন্ধি এবং সাইনোভিয়াল মেমব্রেন বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রদাহ অস্থিসন্ধিতে অতিরিক্ত রস নিঃসরণ করে। ফলে অস্থিসন্ধি ফুলে যায়। ফোলা ও প্রদাহ দু’টোই ব্যথার জন্য দায়ী এবং চলমান প্রদাহ এক সময় অস্থি বা তরুণাস্থি ধবংস করে। যার ফলে অস্থিসন্ধির বিকলাঙ্গতা ঘটতে পারে।
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস রোগের উপসর্গ:
* সাধারণত হাত ও পায়ের ছোট জোড়াগুলোতে ব্যথা হয়, জোড়াগুলো ফুলে যায় ও শক্ত হয়ে যায়। প্রায় সমানভাবে দুই পাশের অর্থাৎ শরীরের ডান ও বাম দিকের জোড়াগুলো সমভাবে আক্রান্ত হয়, যা এ রোগের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
* বড় বড় জোড়া যেমন কনুই, কাঁধ, হাঁটু ও গোড়ালিও আক্রান্ত হতে পারে। অনেক সময় ঘাড়েও ব্যথা হয়। এ রোগের ব্যথা কাজ করলে কমে, কিন্তু বিশ্রাম নিলে বেড়ে যায়। সকালে ঘুম থেকে ওঠার সময় ব্যথা বেশি অনুভূত হয়। বেলা বাড়ার সাথে সাথে ব্যথা ধীরে ধীরে কমে আসে। আক্রান্ত জোড়া ফুলে যায়।
* সকালে ঘুম থেকে জাগলে আক্রান্ত জোড়াগুলো শক্ত মনে হয়। আঙুল নাড়তে কষ্ট হয়। এই শক্তভাব এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে থাকে। নড়াচড়া করার পর এটা কিছুটা কমে যায়।
* রোগীর ওজন কমে যায়। সব সময় ক্লান্তি বা অবসাদ ভাব থাকে।
* আক্রান্ত জোড়ার কাছাকাছি মাংস শুকিয়ে যেতে পারে। মাংসপেশি দুর্বল হয়ে পড়ে। শারীরিক কার্যক্ষমতার অবনতি ঘটে। এ রোগে শেষের স্তরে অস্থিসন্ধিতে বিভিন্ন ধরনের বিকলাঙ্গতা দেখা দেয়, যেমন- হাতের আঙুল বেঁকে হাঁসের গ্রিবার মতো দেখায়। পিঠে বাঁক ধরে। হিপ জয়েন্ট শক্ত হয়ে যায় ও বেঁকে যায়। হাঁটুতে ব্যথা, ফোলা ও শক্ত ভাব দেখা দেয়। হাঁটু বেঁকে যায়। অস্থিসন্ধির সঞ্চালন ক্ষমতা হ্রাস পায়। হাঁটতে ও কাজ করতে সমস্যা হয়।
* রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে শরীরে রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে, ক্ষুধামন্দা দেখা দেয় এবং কিছুটা জ্বরভাব হতে পারে। রোগী অনেক দিন ভুগলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারে।
* রোগ তীব্র হলে জোড়ার বাইরে কিছু উপসর্গ দেখা দেয় যেমন- ত্বকের নিচে নডিউল বা গোটা দেখা দেয়। সাধারণত এই গোটা কনুই, স্যাকরাম ও অকসিপুটের ওপর দেখা দেয়। ফুসফুস, চোখ ও হৃৎপিণ্ডেও গোটা দেখা দিতে পারে। এটা টেন্ডনেও হতে পারে। এগুলো বেশ ব্যথার উদ্রেক করে।
রোগ নির্ণয় : প্রতিষ্ঠিত রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয় করা সহজ। কারণ এসব রোগীর শরীরের দুই পাশের অস্থিসন্ধিগুলোতে প্রায় সমানভাবে ব্যথা করে ও ফুলে যায়।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ করে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের প্রাথমিক স্তরে নিশ্চিত রোগ নির্ণয় অতটা সহজ নয়। কারণ তখন মাত্র অল্প কয়েকটি অস্থিসন্ধিতে খুব সামান্য উপসর্গ দেখা দিতে পারে। বেশ কিছু প্রদাহ উৎপন্নকারী রোগ রয়েছে, যেগুলোর উপসর্গ প্রায় একই ধরনের; তখন এগুলোর সাথে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের পার্থক্য করা কিছুটা কঠিন হয়ে পড়ে। যেমন ধরুন অস্টিও-আর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রে আপনার চিকিৎসক আপনার উপসর্গগুলোর ব্যাপারে কিছু প্রশ্ন করবেন, যেমন- উপসর্গগুলো কবে শুরু হয়, কোন কোন অস্থিসন্ধিতে দেখা দিয়েছে; আর রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রে আপনার অন্যান্য উপসর্গ থাকবে। যেমন- অবসাদগ্রস্ততা কিংবা জ্বর এবং আপনার সাম্প্রতিক কোনো সংক্রমণও থাকতে পারে। এরপর চিকিৎসক আপনার অস্থিসন্ধিগুলো ভালো করে পরীক্ষা করবেন। অস্থিসন্ধির ফোলা, লাল হওয়া, শক্ত হওয়া ও ব্যথা পরীক্ষা করে দেখবেন। তিনি কিছু রক্ত পরীক্ষা ও সম্ভবত এক্স-রে করতে পারেন। মনে রাখবেন, আপনার চিকিৎসককে অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে যে, এটা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস নাকি অন্য কোনো বাত রোগ? কারণ অন্য বাত রোগ হলে তার চিকিৎসা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ ইনফেকশাস বা সংক্রামক আর্থ্রাইটিসের কথাই ধরুন। এটা ঘটে অস্থিসন্ধিতে ব্যাক্টেরিয়াজনিত সংক্রমণের কারণে। এ ক্ষেত্রে দ্রুত অ্যান্টিবায়োটিক সহকারে চিকিৎসা করতে হয়, প্রদাহবিরোধী ওষুধ দিয়ে নয়। এ রকম আরেকটি আর্থ্রাইটিসজনিত অবস্থার নাম লাইম রোগ। এটা ঘটে এক ধরনের ক্ষুদ্র কীটের দংশনে। অথচ সম্পূর্ণ অন্য একটি অবস্থা মাংসপেশির ব্যথা কেউ কেউ লাইম রোগ বলে ভুল করতে পারেন। সুতরাং সঠিক চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রোগ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে।
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসা
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসার উদ্দেশ্য হলো  প্রদাহ বন্ধ করা, উপসর্গ দূর করা, অস্থিসন্ধি ও অঙ্গের ক্ষতি রোধ করা, শারীরিক ক্রিয়ার উন্নতি সাধন এবং দীর্ঘস্থায়ী জটিলতা কমিয়ে আনা। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ব্যবহর করা হয়। কিছু ওষুধ রোগের উপসর্গ কমিয়ে দেয়। কিছু ওষুধ রোগের গতি রোধ করে, আবার কিছু ওষুধ অঙ্গের ক্ষতি প্রতিহত করে।
ব্যথা কমানোর জন্য ব্যথানাশক ওষুধ, যেমন- ইন্ডোমেথাসিন ও ন্যাপ্রোক্সেন সোডিয়াম ব্যবহার করা হয়। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে রোগীকে ডিএমআরডি-জাতীয় ওষুধ দিতে হয়, যাতে রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করতে না পারে। ব্যথা ও প্রদাহ কমাতে এই অস্থিসন্ধি যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য কর্টিকোস্টেরয়েড ওষুধ যেমন- প্রেডনিসলোন দেয়া হয়। ওষুধের পাশাপাশি নিয়মিত নির্দিষ্ট ব্যায়াম করতে হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে।
-ডা. মিজানুর রহমান কল্লোল
সহকারী অধ্যাপক, অর্থোপেডিকস ও ট্রমাটোলজি বিভাগ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। চেম্বার: পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লি., ২ ইংলিশ রোড, ঢাকা। ফোন : ০১৯৩০-০২১৯৪৩, ০১৯৫৪-২৪৯৭৫৭

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ