বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

রাজাকারদের তথ্য সংগ্রহ ও কয়েকটি বাস্তবতা

গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ : দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় গত ৪ঠা ডিসেম্বর রোববার প্রকাশিত একটি সংবাদ পাঠক মহলে বিরাট কৌতূহল সৃষ্টি করেছে বলে জানা গেছে। সংবাদটির শিরোনাম ছিল ‘পাক সেনা ও রাজাকারদের তথ্য, দশ মাসেও সাড়া দেননি ৪৪ ডিসি’। সংবাদটির বিস্তারিত বিবরণে জানা যায় যে, গত ২৫ জানুয়ারি ২০১৬ তারিখে পাক সেনা ও তাদের দোসরদের মানবতা বিরোধী কর্মকাণ্ডের তথ্য চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সকল জেলা প্রশাসক এবং কারা মহাপরিদর্শককে একটি চিঠি দিয়েছিল কিন্তু চিঠিটির জবাব এখনও পুরোপুরি পাওয়া যায়নি। এ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট পত্রিকার তরফ থেকে জানতে চাইলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সমন্বয়ক জনাব আবদুল হান্নান খান বলেছেন যে, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী দখলদার সেনাবাহিনী এবং তাদের সহযোগীদের দ্বারা সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, ধর্ষণ, ধর্মান্তরিতকরণ, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন ও অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধের তথ্যউপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। আত্মসমর্পণ করা ১৯৫ জন পাক সেনা সদস্যসহ এসব অপরাধীকে শাস্তির আওতায় আনার জন্যই মূলত এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেছেন যে, পাক সেনা এবং রাজাকারদের বিস্তারিত তথ্য চেয়ে ২৫ জানুয়ারি সকল জেলা প্রশাসককে পত্র দেয়া হলেও কিছু জেলা কিছু তথ্য দিলেও অধিকাংশ জেলা থেকে তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৪৪টি জেলাই এই তথ্য প্রেরণ করতে পারেনি। আইসিটির চিঠি পেয়েছেন স্বীকার করে জামালপুরের ওসি জনাব শাহাবুদ্দিন খান বলেছেন যে, ইতোমধ্যে বিভিন্ন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডারদের কাছে এ সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সব তথ্য না পাওয়ায় তা পাঠানো যাচ্ছে না। প্রায় একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন ফেনীর ডিসি আমিন উল আহসান এবং পিরোজপুরের ডিসি খায়রুল আলম শেখ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরো জানিয়েছে যে, মানবতা বিরোধী যুদ্ধাপরাধে জড়িত চিহ্নিত পাকিস্তানী সেনা ও তাদের দোসরদের বিচার করার লক্ষ্যেই আইসিটি তাদের তালিকা প্রণয়ন ও অপরাধ চিহ্নিতকরণের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার পর আগে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের তালিকায় নতুন অপরাধীর নামও যুক্ত হতে পারে।
বিলম্বিত হলেও এটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ বলে মনে হয়। তবে উদ্যোগটি যদি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার কোন নীলনকশার অংশ হয়ে থাকে তাহলে তা ব্যর্থ হতে বাধ্য। ৬৪টি জেলার মধ্যে ১০ মাসে বাঞ্ছিত তথ্য প্রদানে ৪৪টি জেলার ব্যর্থতা এটাই প্রমাণ করে যে, হয় সংশ্লিষ্ট দফতরসমূহে প্রয়োজনীয় তথ্য নেই নতুবা তারা ফরমাশ অনুযায়ী তথ্য তৈরিতে ব্যর্থ হচ্ছেন। অবস্থা যাই হোক না কেন এই ব্যর্থতাকে আমাদের জাতীয় ব্যর্থতা হিসেবেই গণ্য করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন একটি দেশ হিসেবে যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান বাংলাদেশের জন্য সংরক্ষিত থাকা উচিত ছিল তার মধ্যে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা, মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা এবং রাজাকারদের সংখ্যা। বাংলাদেশের এই তিনটি সংখ্যার কোনটিই বিতর্কমুক্ত নয়। ৩০ লাখ শহীদ ও ২ লাখ ধর্ষিতার তালিকা আমাদের কাছে নেই। তেমনি নেই মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকাও। যখন যে সরকার আসেন তখন তারা নতুন নতুন মুক্তিযোদ্ধা সৃষ্টি করে তালিকাভুক্ত করেন। একইভাবে রাজাকারের সংখ্যাও পরিবর্তন হয়। রাজনৈতিক মতাদর্শের সাথে মিল না হলে মুক্তিযোদ্ধা এমনকি সেক্টর কমান্ডারও রাজাকার হয়ে যান। এ প্রেক্ষিতে প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ, যাচাই বাছাই প্রভৃতির জন্য সর্বদলীয় একটি কমিটি গঠন অথবা একটি বিচার বিভাগীয় কমিটির অধীনে নিরপেক্ষ সমীক্ষার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি ছিল। কিন্তু এই জরুরি কাজটি কেউ করেননি। ফলে মুক্তিযুদ্ধকে রাজনীতির বিষয়বস্তুতে পরিণত করে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আগেই বলেছি, রাজাকারদের তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় এবং যাদের কাছে এই তথ্য চাওয়া হয়েছে তাদের কাছে তা পাওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি আছে বলে মনে হয় না অথবা তাদের তা পাওয়া কঠিনও হতে পারে।
রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয়েছিল আনসার বাহিনী ভেঙ্গে দিয়ে রাজার অধ্যাদেশে বর্ণিত প্রক্রিয়া অবলম্বন করে। কেন্দ্রীয়ভাবে রাজাকার নিয়োগ দেয়া হয়নি; রাজাকার নিয়োগ দেয়া হয়েছিল স্থানীয়ভাবে, তৎকালীন থানার সার্কেল অফিসার (উন্নয়ন) ও থানার ওসির মাধ্যমে। অবলুপ্ত আনসার বাহিনীর মহকুমা প্রধানত (রাজাকার বাহিনীতে আত্মীকরণকৃত) এর সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। সার্কেল অফিসার (উন্নয়ন) ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে ঢোল সহরত করে এই বাহিনীতে যোগ দেয়ার জন্য লোক সংগ্রহ করেছিলেন। যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত দেশবাসীর মধ্যে অপেক্ষাকৃত গরিব ছেলেরাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রাজাকারের চাকরি নিয়েছিল। তাদের বেতন ছিল মাসিক ৯৩ টাকা। তখনকার দিনের সর্বোচ্চ ৩০ টাকা মণের চাল, ২ টাকা সের তেল, ১২ আনার গরুর গোশত, ১ টাকা চার আনা সেরের খাসির গোশত এবং ১০ আনা সের মূল্যে চিনির বাজারে এই বেতন তাদের জন্য একটা শোভনীয় বিষয় ছিল। গ্রামগঞ্জের দলমত নির্বিশেষে বহু লোক এই চাকরিতে যোগ দিয়েছিল এবং অনেক অস্ত্র ও সরকারি আনুকূল্য পেয়ে অপকর্মেও জড়িয়ে পড়েছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর লক্ষাধিক রাজাকার ধরা পড়েছিল এবং এদের মধ্য থেকে প্রায় ৩২ হাজার লোকের বিরুদ্ধে মামলাও শুরু হয়েছিল। যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে সাক্ষ্য প্রমাণের অভাবে অনেকে সাধারণ ক্ষমতার অধীনে খালাসও পেয়েছিলেন। কিন্তু ৪টি অপরাধ তথা হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে যারা অভিযুক্ত হয়ে জেলে গিয়েছিলেন তাদের বিরুদ্ধেও উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় তাদের মামলাও প্রত্যাহার হয়। এরপর ১৯৭৩-৭৪ সালে প্রতিটি থানায় রাজাকারদের অপকর্মের তালিকা তৈরি এবং তাদের অপরাধের মাত্রা চিহ্নিতকরণের জন্য সার্কেল অফিসারের নেতৃত্বে প্রতি থানায় একটি করে Fact Finding Committee গঠন করা হয়েছিল। কমিটিতে থানার ওসিও ছিলেন। সেই রিপোর্টের অনুলিপি চার জায়গায় থাকার কথা। সার্কেল অফিসারের দফতর (যা বর্তমানে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দফতর), মহকুমা প্রশাসকের দফতর (যা বর্তমানে জেলা প্রশাসকের দফতর), থানার ওসির দফতর এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। যেহেতু ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারদের নির্দিষ্ট কোন অফিস ছিল না সেহেতু তাদের কাছে রেকর্ড সংরক্ষণের ব্যবস্থাও ছিল না। আবার ৪৫ বছর পর রাজাকারদের তালিকা অথবা তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোনও তথ্য প্রদান করা তাদের জন্য কঠিন হবে। আরেকটি বিষয়ও পরিষ্কার হওয়া দরকার। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কোন সদস্য যুদ্ধাপরাধী হিসেবে জেলা কারাগারে আটক থাকার বিষয়টির বাস্তবতা পরীক্ষা করাও দরকার। আত্মসমর্পণের পর প্রায় ৯৪ হাজার যুদ্ধবন্দী ভারতীয় বাহিনীর নিয়ন্ত্রণেই ছিল এবং তাদের মধ্য থেকেই প্রথমত সহস্রাধিক ও পরে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী চিহ্নিত করা হয়েছিল, যাদের সকলেই ছিল পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর লোক। তাদের প্রত্যেকেরই অপরাধমালার ফিরিস্তি তৈরি করা হয়েছিল। এই ফিরিস্তি ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছেও থাকতে পারে।
আরেকটি বিষয় এখানে লক্ষ্য রাখা দরকার যে, স্বাধীনতার আগে এই ভূখণ্ডে মোট জেলার সংখ্যা ছিল ১৭টি; স্বাধীনতার পর এর সংখ্যা প্রথমত ১৯-এ উন্নীত করা হয় এবং পরবর্তীকালে সত্তরের দশকের শেষের দিকে কয়েকটি নতুন মহকুমা সৃষ্টি ও সকল মহকুমাকে জেলায় রূপান্তর করা হয়। বর্তমানে জেলার সংখ্যা ৬৪টি। আবার থানাকেও উপজেলায় উন্নীত করা হয়। এর ফলে প্রশাসনিক দফতরসমূহের কাঠামোগত পরিবর্তনের সাথে সাথে রেকর্ডপত্র সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন ঘটেছে তাও বিবেচনা করে দেখতে হবে। মোদ্দা কথা, এর সবগুলো বিষয় বিবেচনায় রেখে রাজাকারদের তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করলে সরকারের এই বিলম্বিত প্রচেষ্টাটি সফল হলেও হতে পারে। তবে বিষয়টি যাতে রাজনীতির অংশ না হয় তা দেখা সকলেরই কর্তব্য বলে আমর মনে করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ