শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের সাথে অমানুষিক আচরণ


[পূর্ব প্রকাশিতের পর]

মোঃ আবদুল লতিফ নেজামী : মিয়ানমারে দাঙ্গা : ২০০১ সনের প্রথমার্ধ মুসলিম-বৌদ্ধ জাতিগত দাঙ্গা হিসেবে চিহ্নিত। ২০০১ সনের ৪ জানুয়ারি আরাকানের রাজধানী ছিটউইয়ে (আকিয়াব) মুসলিম বিরোধী দাঙ্গা সংঘটিত হয়। দাঙ্গা চলাকালে নিরীহ মুসলিম যুবক এবং অসহায় মানুষকে গুলী করে হত্যা করা হয়। এই দাঙ্গায় ১৫০০জন গুম এবং ১০০০ লোক আহত হয়। মুসলমানদের মালিকানাধীন ২ হাজার ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয় এবং ৩৭টি মসজিদ ধ্বংস করা হয়। তাছাড়া বহু ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং জনসাধারণের সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। একই বছর ১৬মে বাগা বিভাগে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। এতে ৪জন বিশিষ্ট মুসলিম নেতাসহ কমপক্ষে একশ’ মুসলমান নিহত হয়। ২০টি মসজিদ এবং হাজার হাজার বাড়িঘর এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ঐ বছর মুসলিম বিরোধী দাঙ্গা অন্য আরো ৩টি জেলায় বিস্তৃত হয়ে পড়ে। ঐ দাঙ্গায় ৩শ’ লোক নিহত এবং অপর ১০ হাজার লোক গৃহহীন হয়ে পড়ে। এসব দাঙ্গায় সরকারি সংশ্লিষ্টতার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। তাছাড়া মিয়ানমারের ইউনিয়ন সলিডারিটি এন্ড ডেভেলপমেন্ট এসোসিয়েশন-এর সদস্যরাও সন্ন্যাসী বেশে এসব দাঙ্গায় ইন্ধন যোগায়। দাঙ্গা দমনে বিলম্বে গৃহীত সরকারি পদক্ষেপ ছিল নেহায়েতই লোক দেখানো এবং খুবই নগণ্য। আরাকানের রাজধানী ছিটউইয়ে অগ্নি˜গ্ধ কতিপয় বাড়িঘর স্থানীয় থানার একশ’ মিটারেরও কম দূরত্বের মধ্যে অবস্থিত।
প্রমাণ পাওয়া যায় যে, সামরিক সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ কেবল উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলে। কারেন প্রদেশের হ্যাপ-আ-য়েন জেলা থেকে পালিয়ে যাওয়া মুসলিমরা থাইল্যান্ডস্থ শরণার্র্থী শিবিরে আশ্রয় গ্রহণ করে। তারা জানায়, মিয়ানমার সেনাদের হাতে নির্যাতন, মসজিদ ও মুসলমানদের বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দেয়ার কথা। প্রতিবেশী দেশে মিয়ানমার মুসলমানদের ভ্রমণ সংকুচিত করা হয়। অধিকন্তু জানা যায় যে, সামরিক সরকার মিয়ানমারের ছোট ছোট শহরের মসজিদসমূহ ও ধ্বংস করে দেয়। তাছাড়া নতুন মসজিদ নির্মাণ ও পুরনো মসজিদ মেরামত ও নিষিদ্ধ করা হয়। এছাড়া একই বছরের অক্টোবরে পাই, পাকুকা, বাগু এবং হ্যানথাদা প্রভৃতি শহরে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। এসব দাঙ্গায় কমপেক্ষ একশ’ লোক নিহত এবং ৩ হাজার ঘর-বাড়ি ধ্বংস হয়। ১৯৪২ সনে দাঙ্গা-হাঙ্গামার সময় কয়েক হাজার রোহিঙ্গা নিহত হয় এবং ৮০ হাজার রোহিঙ্গা তৎকালীন বৃটিশ ভারত আজকের বাংলাদেশে চলে আসে।
বিভিন্ন দেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী : ২০ হাজার রোহিঙ্গা শরনার্থী এখনো বাংলাদেশে রয়েছে। ১৫-২০ হাজার রোহিঙ্গা থাইল্যান্ডের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় গ্রহণ করে। মালয়েশিয়ায় ৮ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী আছে বলে জানা যায়। তাছাড়া ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান এবং সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশসমূহে বহু রোহিঙ্গা আছে।
তারা সকলেই মুসলমানদের বিরোধী : কারেন, স্যান, ওয়া, মন, বর্মি, রাখাইন, চীনা, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ প্রভৃতি মিয়ানমারের জনগোষ্ঠী একে অপরের বিরোধী। কিন্তু তারা সবাই মুসলমানদের বিরুদ্ধে।
এর সমাধান কি? : জাতিগত উত্তেজনা মিয়ানমারের সাম্প্রতিক ইতিহাসে বৈশিষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব জাতিগত উত্তেজনা নিরসনের ব্যাপারে যারা সহানুভুতিশীল, তারাও মুসলমানদের ব্যাপারে উদাসীন। মিয়ানমারে মুসলিম-অমুসলিম বিরোধ যথাযথভাবে নিরসন করা না হলে ভবিষ্যতে এই বিরোধ আরও মারাত্মক আকার ধারণ করবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, বর্তমানে মিয়ানমারে যে ফ্যাসিবাদী ও মিয়ানমারীকরণের যে অনুশীলন চলছে, তা বিশ্বে অন্যতম। অনেকেই হয়তো অবগত আছেন যে, ১৯৮৮ইং সনে মিয়ানমারের স্বৈরশাসকরা কয়েক হাজার লোককে হত্যা করে। যা মিয়ানমারের সকল জাতি-গোষ্ঠীকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। সামরিক সরকার পরে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু কি এবং অন্য আরও রাজনীতিবিদদের গ্রেফতার করে, যা সমগ্র বিশ্বের নিন্দা কুড়ায়। মিয়ানমারের জনগণের দৃষ্টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করা এবং আন্তর্জাতিক চাপে সামরিক সরকার কর্তৃক ১৯৯০ সনে একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে অং সান সু কির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এন এল ডি) শতকরা ৮০ ভাগ আসন লাভ করে। কিন্তু সামরিক সরকার জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানায়। এখন মিয়ানমারে মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনীতি ধ্বংস প্রায় এবং স্বাস্থ্য সেবায় ধস নেমেছে। ১৯৯৯ইং সনে এবং চলতি বছর জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন মিয়ানমার সামরিক জান্তার বর্বরতার যথাযথ চিত্র তুলে ধরে। বাংলাদেশে এখনো হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরণার্র্থী রয়েছে। যারা মিয়ানমার সামরিক জান্তার নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে হিজরত করতে বাধ্য হয়েছে। আর যারা এখনো মিয়ানমারে অবস্থান করছে তারাতো অব্যাহতভাবে অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করে চলেছে।
১৯৯১ইং সনে সামরিক সরকার মিয়ানমারে অমুসলিম জনগণের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মুসলিম বিরোধী দাঙ্গার সূত্রপাত ঘটায়। তাছাড়া আরাকানে মুসলমানদের নানাভাবে হয়রানি করতে শুরু করে। এর অংশ হিসেবে মুসলমানদের ঢালাওভাবে গ্রেফতার, পিটুনি, অত্যাচার, হত্যা, সম্পত্তি লুট, মহিলাদের সম্ভ্রমহানি এবং বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োগ করা হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং কূটনীতিকদের সংগৃহিত সামরিক সরকারের মানবাধিকার লংঘনের তথ্যাদি মিয়ানমারের বাইরে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শিত হয়। বিভিন্ন সময় পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে সামরিক সরকারের অব্যাহত মানবাধিকার লংঘন, বিচার বহির্ভুত হত্যা, জোরপূর্বক উধাও, ধর্ষণ, সহায়-সম্পত্তি লুট, জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োগ, অত্যাচার, গ্রেফতার, বিনা বিচারে আটক, জেলে বন্দীদের সাথে অমানবিক আচরণ, জোরপূর্বক গৃহচ্যুৎ করা, প্রভৃতি সকল প্রকার মানবাধিকার লংঘনের কর্মকাণ্ড জাতিগত সংখ্যালঘুদের সাথে করা হয়। সামরিক সরকারের এসব অমানবিক কর্মকাণ্ডের ফলে বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশে মিয়ানমার শরণার্থীদের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। তাছাড়া আরাকানে বসবাসকারী মুসলমানরা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। এমন এক সময় সামরিক সরকার এসব অমানবিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে, যখন মিয়ানমারবাসী ক্ষুধার্ত।
 পৃথিবীর তাবৎ মানবতাবাদী মানুষের মাতমের দীর্ঘশ্বাস, আত্মার আহাজারি ও নৈতিক সমর্থনের কেন্দ্রবিন্দু রোহিঙ্গা জনগণ। রোহিঙ্গাদের এই মাতম বিশে^র প্রতিটি শান্তিকামী মানুষের। সর্বোপরি এ আর্তনাদ ন্যায়ের পথে সমগ্র উম্মাহর আর্তনাদ, মুসলিম মিল্লাত ও বিশে^র শান্তিকামী মানুষের আর্তনাদ। রোহিঙ্গারা ইতিহাসের এক জ্বলন্ত ট্রাজেডি। মানবাধিকার আদায়ের লাগাতার ইতিহাসসমৃদ্ধ এক জাতির নাম রোহিঙ্গা
রোহিঙ্গাদের ওপর হামলার ব্যাপারে মুক্তবিশ্ব ও মানবাধিকারের প্রবক্তাদের নীরবতায় মিয়ানমার আরাকানে বর্বরোচিত অভিযান অব্যাহত রাখতে উৎসাহিত হচ্ছে। কিছু কিছু দেশ ও এর মিত্ররা বৃটেনের অবৈধ সমর্থনে বেআইনীভাবে দখলিকৃত আরাকানের ওপর মিয়ানমারের আগ্রাসী তৎপরতাকে সমর্থন যুগিয়ে যাচ্ছে। ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির লালনভূমি আরাকানে রোহিঙ্গা জনগণ মিয়ানমারের নির্মম অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছে। আরাকানে অব্যাহত হত্যাযজ্ঞ থেকে মুসলিম বিশ্বকে শিক্ষা নেয়া উচিত। আগ্রাসন থেকে কোন মুসলিম দেশই রেহাই পাবে না। সকল ন্যায়-নীতি, জাতিসংঘ সনদ জলাঞ্জলি দিয়ে মিয়ানমার নারকীয় আচরণে লিপ্ত রয়েছে। বাঁচতে হলে ইসলামী উম্মাহকে শিসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া উপায় নেই।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কর্তব্য : আন্তর্জাতিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে যে, সামরিক শাসনের অবসান হলে মিয়ানমারের জাতিগত সমস্যার সমাধান সহজ হবে। ১৯৯৯ সনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারকে বিশেষ উদ্বেগজনক রাষ্ট্র বলে চিহ্নিত করে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিশপ টুটু মিয়ানমারের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে। চেক প্রজাতন্ত্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডেকল্যাপ হাভেল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বার্মা পরিস্থিতি সম্পর্কে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নও অনুরূপ অবস্থান গ্রহণ করেছে বলে জানা যায়। কিন্তু দুঃখজনক এই যে, মার্কিন ও বৃটিশ তামাক ও তেল কোম্পানীসমূহ মিয়ানমার সামরিক জান্তাকে সহায়তা দিচ্ছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের স্বাধীনতাকামী ও শান্তিকামী মানুষকে যথাসম্ভব দ্রুত মিয়ানমারের আরাকানী মুসলমানদের সহায়তায় এগিয়ে আসা উচিত। যাতে মিয়ানমারের বর্তমান সামরিক জান্তার অব্যাহত মানবাধিকার লংঘন, জাতিগত শুদ্ধি অভিযান থেকে আরাকানী মুসলমানরা রেহাই পায় এবং আরাকানী মুসলমানরা সুখে শান্তিতে নিজ দেশ মিয়ানমারে বসবাস করার সুযোগ পায়। আরাকানে মিয়ানমারের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড বন্ধ, আরাকানের ওপর আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহারের জন্যে জাতিসংঘ, ওআইসি, ন্যাম, আরবলীগসহ শান্তিকামী বিশ্ব সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে।
মিয়ানমারের রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে শুধু উদ্বেগ প্রকাশ যথেষ্ট নয়। আদমশুমারিতে রোহিঙ্গাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে তাদের নাগরিকত্ব বহাল, শিক্ষা-সংস্কৃতিসহ মিয়ানমার সরকারের নিপীড়ন থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে রক্ষার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার ও নাগরিকত্ব অর্জনের ক্ষেত্রে বিশ্বের শন্তিপ্রিয় ও স্বাধীনতাকামী দেশ, জনগণ এবং মুসলিম বিশ্বের মধ্যে ইস্পাতকঠিন ঐক্য গড়ে তোলা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এ ব্যাপারে জাতিসংঘ, ওআইসি, ন্যাম, আসিয়ান ও সার্কসহ সকল আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনে রোহিঙ্গাদের ওপর হামলা ও গণহত্যার প্রতিবাদে মিয়ানমারের সাথে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যসহ সকল প্রকার সম্পর্কোচ্ছেদের পদক্ষেপ নিতে হবে। ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের অর্পিত দায়িত্ব, আল্লাহ-রাসুলের (সা.)-এর পক্ষ থেকে প্রদত্ত জিম্মাদারির প্রতি সজাগ থেকে রোহিঙ্গাদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ এবং সর্বাত্মক সাহায্যে এগিয়ে আসা উচিত সকল শান্তিকামী ও মানবতাবাদী জনগোষ্ঠীর। [সমাপ্ত]
-লেখক : চেয়ারম্যান, ইসলামী ঐক্যজোট।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ