শুক্রবার ২২ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

কবি আলাওলের রোসাঙ্গ এখন জ্বলছে

সাজজাদ হোসাইন খান : কবি আলাওলের রোসাঙ্গ এখন দগ্ধ হচ্ছে হিংসার অনলে। কেবল হিংসাই নয় পেট্রোল আর গোলাবারুদের আগুনে ছারখার  সহায়-সম্পদ। রোসাঙ্গের অধিবাসীগণ বর্তমানে নিজ দেশে পরবাসী। আরাকান রাজ্যের রাজধানী ছিল রোসাঙ্গ। রোসাঙ্গ থেকেই রোহিঙ্গা শব্দের জন্ম। বর্তমানে এলাকাটি মিয়ানমারের অংশ। আরাকান রাজা থদোমিন্তার সময়কালেই রোহিঙ্গাদের পূর্ব-পুরুষরা সে এলাকায় বসতি গেড়েছিল। সেটি ছিল ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সময়। শত শত বছর হয়ে গেলেও মিয়ানমার সরকার  বলছে ওরা এ দেশের নাগরিক নয়। আসলে রোহিঙ্গাদের অপরাধ তারা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। এই অপরাধে রোহিঙ্গারা এখন নির্যাতনের শিকার। তাদের সহায়-সম্পদ জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে, হত্যা করা হচ্ছে নির্বিচারে। তা করছে সে দেশের সরকার এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়। এমন কি এই অমানবিক ও অযৌক্তিক কর্মটির সাথে বৌদ্ধ ভিক্ষুগণও নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করে রোহিঙ্গা তথা মুসলিম নিধনে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে। আফসোসের খবর হলো ‘অহিংসা পরম ধর্ম’ বৌদ্ধের সে অমর বাণীতে বিদ্বেষের আগুন জ্বলছে দাউ দাউ। মিয়ানমার সরকার যেন সে বার্তাটি পৌঁছে দিতে চাচ্ছে বিশ্ববাসীর কাছে। হিংসা আর অসভ্যতাকে ওরা এখন পরম আত্মীয় বলে গ্রহণ করেছে। গত দেড়-দুই যুগ থেকে তাদের আচার-আচরণে তেমনটাই উঠে আসছে। মিয়ানমার সামরিক বাহিনী এবং বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী এখন মারমুখী। আরাকান রাজ্যে চালাচ্ছে তাদের জিঘাংসার উল্লাস। মানুষ নিধন আর অসভ্যতাই যেন তাদের ‘ধর্মকর্ম’। ওরা যে আদতেই মগ-হার্মাদদের উত্তরসূরী সে সত্যটিই প্রকাশ করতে চাচ্ছে আচারে-বিচারে। এক সময় মগ জলদস্যুদের উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল ভাটি অঞ্চলের মানুষ। আরাকান রাজ্যে সেই পুরানো মগদেরই যেন আবির্ভাব ঘটেছে আবার। ইতিহাসে যে মগের মুল্লুকের উল্লেখ পাওয়া যায় ইদানীংকার মিয়ানমারের রোহিঙ্গা রাজ্যের দৃশ্য যেন তারই নবসংস্করণ। আচারহীন বিচারহীন অভব্য জনগোষ্ঠীর এক বিদ্বেষময় তল্লাট ছিল মগের মুল্লুক। একসময়ের বার্মার অধিবাসীগণ মগ নামে পরিচিত ছিল। এই  মগদের পেশা ছিল দস্যুতা, লুটপাট খুনাখুনি। বর্তমানের মিয়ানমারই অতীতের বার্মা। কথায় আছে, স্বভাব যায় না মরলে।
রোহিঙ্গারা পালিয়ে আসছে বাংলাদেশে। অত্যাচারে অসহ্য হয়ে তারা এমনটা করছে। সহায়-সম্পদ তো পুড়ে ছারখার। এখন জীবনটাই তাদের সম্বল। জীবন বাঁচানোর তাগিদেই এরা আসছে। এরই মধ্যে জীবনও গেছে শত শত লোকের। গত একাত্তরে বাংলাদেশের মুমূর্ষু মানুষ ভারতে পালিয়ে গিয়েছিল জীবনের প্রয়োজনে। রোহিঙ্গাদের অবস্থাও সে রকমেরই। সীমান্তরক্ষীদের সতর্ক দৃষ্টির পরও এরইমধ্যে প্রায় দশ হাজার রোহিঙ্গা নাকি আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। রাখাইন রাজ্যে (আসলে আরাকান) ওদের জীবন সংশয়, রমনীদের সম্ভ্রমহানীর ভয়। অবশ্য এরইমধ্যে জীবন গেছে বেশুমার, ইজ্জত গেছে শত রমনীর। মগ সেনাদের এবং মগ জনগোষ্ঠীর যৌথ আক্রমণে রাখাইন অঞ্চলে এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। মূলত রাখাইন মুসলিমদের নির্মূলের উদ্দেশ্যেই এ রকম জান্তব উল্লাস মিয়ানমার শাসকদের, বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর।  রাখাইনরা সেখানকার ভূমিপুত্র হওয়া সত্ত্বেও তাদের নাগরিকত্ব হরণ করা হয়েছে অন্যায়-অযৌক্তিকভাবে। অত্যাচার-অবিচারে রোহিঙ্গাদের প্রাণ এখন ওষ্ঠাগত। দীর্ঘদিন থেকেই রোহিঙ্গাদের দাবিকে উপেক্ষা করে আসছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। কেবল উপেক্ষাই নয় তাদেরকে দেশছাড়া করতে হেন পন্থা নাই যা তারা অবলম্বন করছে না। রোহিঙ্গাদের এই অসহায়ত্ব বিশ্ববিবেককে নাড়া দিচ্ছে না সে রকমভাবে। যে কারণে রোহিঙ্গাদের জীবন নিয়ে, সম্পদ নিয়ে এমন নষ্টামী করতে সাহস যোগাচ্ছে। নব্বইয়ের দশক থেকেই রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিচ্ছে বাংলাদেশে। এ পর্যন্ত কোনো মীমাংসায় আসছে না মিয়ানমার সরকার। উপরন্তু আরো হাজার হাজার রোহিঙ্গা এসে গেছে। মানবিক বোধ থেকেই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিচ্ছে বাংলাদেশ। আসলে ওরাতো মিয়ানমারের নাগরিক। এই বিষয়ে বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর নীরবতা সত্যিই দুঃখজনক। জাতিসংঘ বার বার বাংলাদেশকে অনুরোধ পাঠাচ্ছে সীমান্ত খুলতে। মিয়ানমার সরকারকে চাপে না রেখে বাংলাদেশের সীমান্ত নিয়ে কথা বলা কতটা যৌক্তিক, ন্যায়ানুগ? জাতিসংঘের উচিত মিয়ানমারকে বলা এই মুহূর্তে অত্যাচার বন্ধ কর। এ বিষয়ে জাতিসংঘের জরুরি বৈঠক ডাকা। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের ব্যাপারটি ফয়সালা করা। প্রয়োজনে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে বহুজাতিক বাহিনী আরাকান রাজ্যে মোতায়েন করা। বিশ্বের বহু অঞ্চলেই তো জাতিসংঘ এমনটা করে আসছে। রাখাইন অর্থাৎ মিয়ানমারে নয় কেন? একটি জাতিগোষ্ঠীকেই যেখানে নির্মূলের আয়োজন চলছে। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের ভার বহন করা বাংলাদেশের পক্ষে অসম্ভব। এরপরও বলতে হয়, মানবিক কারণে সীমান্ত শিথিল করা প্রয়োজন। প্রয়োজন কারণ সেখানে চলছে মানবিক বিপর্যয়। বিপর্যয় থেকে উদ্ধার করা, বিপদ থেকে রক্ষার জন্য এগিয়ে আসা মহত্বেরই লক্ষণ। মানুষ মানুষের জন্য। সীমান্ত পাড় হতে না দেয়ার অর্থ সে মানুষগুলোকে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া। এই যখন অবস্থা তখন মানবিক দিকটির প্রতি বিশেষভাবে নজর ফেলা উচিতের মধ্যেই পড়ে। মগের মুল্লুকে অশান্তির আগুন। এটি তাদের চিরকালীন স্বভাব। সেই চিরকালীন স্বভাবেরই কর্মযজ্ঞ চলছে আরাকানে। অশান্তিই সে দেশের পুষ্প হয়তো। মিয়ানমার নেত্রী সু চি শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন। সেটি কোন শান্তি! তা কি কবরের শান্তি? সু চির যা হাবভাব তাতে তো এর বাইরে অন্যকিছু চিন্তায় আনা যাচ্ছে না। তার দেশে এমন ধ্বংস, অশান্তি জীবন বিনাশের মতো কাণ্ড ঘটার পরও শান্তির বাহক বলে প্রচারিত নেত্রী নির্বিকার। তার এই বিড়াল তপস্বি ভাব দেখে বিশ্ববিবেক হতভম্ব। তাই ইতিমধ্যে সু চির পুরস্কার ফেরত নেয়ার আওয়াজ উঠছে বিশ্বব্যাপী। নোবেল কমিটি বিষয়টি বিবেচনায় আনলে আনতেও পারেন। অশান্তিকে যে বা যারা উৎসাহিত করেন তাদের হাতে শান্তির পতাকা বড়ই বেমানান।
কবি আলাওল, মাগন ঠাকুরের আরাকান রোসাঙ্গ বর্তমানে রাখাইন এবং রোহিঙ্গা শব্দের তলায় চাপা পড়ে গেছে। এমন কি রোসাঙ্গের আদি বাসিন্দাগণ বলতে গেলে এতিম, দেশহীন, পরিচয়হীন। তারা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী বিধায় দেশজ পরিচয় কেড়ে নেয়া হয়েছে। তাদের আরো একটি অপরাধ তারা বাংলায় কথা বলে। যে জন্যে মিয়ানমার সরকার এদেরকে বাংলাদেশে ঠেলে দেবার পাঁয়তারা করছে। লাগোয়া এলাকা বিধায় ভাষা কতকটা কাছাকাছি হতেই পারে। এছাড়াও এই রোহিঙ্গাদের পিতামহ প্রৌপিতামহগণ আরাকানে বসতী স্থাপন করেছিল। শত শত বছর থেকেই তারা আরাকানে বসবাস করে আসছে। এমতাবস্থায় তারা সে দেশের নাগরিক নয় এমন উদ্ভট কথা কি করে প্রচার করা যায়! আরাকান রাজ্যে তারা ছিল আরাকানের বার্মার সময় বার্মার নাগরিক, (বৃটিশ বার্মা) বার্মা কিছু সময়ের জন্য জাপানের অধিকারেও ছিল। দেশ পাল্টালে নাগরিকত্বও পাল্টে যায়। সেই রীতিতে রোহিঙ্গাদেরও নাগরিকত্ব বদলেছে। এটি দেশজ নাগরিকতার বেলায়। মিয়ানমারের সময় মিয়ানমারের নাগরিক হওয়াটাই স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিকতাকেই অস্বীকার করতে চাচ্ছে সে দেশের সরকার। এ এক অদ্ভুত আচরণ। এক সময় ইহুদীগণ ভূমিহীন ছিল। তাদের জন্য ভূমির ব্যবস্থা করলো পশ্চিমারা। তারা মালিক হলো ইসরাইল নামক দেশের। ইহুদীগণ বর্তমানে ইসরাইলের নাগরিক। যদি রোহিঙ্গারা ভূমিহীন বলেই চিহ্নিত হয়, মিয়ানমার সরকারের ভাষ্য মতে তাহলে তো তাদের জন্যেও একটি ইসরাইল দরকার। বিশ্বের তাবত এলাকা থেকে ইহুদী জনগোষ্ঠীকে ইসরাইলে এনে জড়ো করা হয়েছিল। রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে তেমন কোন দিগদারি প্রয়োজন পড়ে না। কারণ ওরা একটি নির্দিষ্ট এলাকারই বাসিন্দা। জাতিসংঘ যদি বিষয়টি নিয়ে ভাবে তাহলে হয়তো খুনাখুনির অবসান হতে পারে। তাতে করে রোহিঙ্গারা যেমন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার অবকাশ পাবে, মিয়ানমারের প্রতিবেশী বিশেষ করে বাংলাদেশ একটা অনাহুত অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকেও উদ্ধার পাবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ