শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

রাজধানী এখন ধূলার নগরী

মশা ও আবর্জনার দুর্নাম ঘুচানোর কোনো উদ্যোগ পর্যন্ত নেয়ার অনেক আগেই রাজধানী মহানগরী ঢাকা নতুন একটি পরিচিতি পেয়ে গেছে। সে পরিচিতি ধূলার নগরীর। এ শুধু কথার কথা নয়, এ বিষয়ে জানার জন্য সংবাদপত্রের সচিত্র রিপোর্টের জন্যও অপেক্ষা করতে হবে না। ঢাকায় যারা বসবাস করেন তারা তো বটেই, যাদের এমনকি কয়েক ঘণ্টার জন্য ঢাকায় কাজে আসতে হয় তারাও জানেন, রাজধানী ঢাকা আসলেও ধূলার নগরীতে পরিণত হয়েছে। বস্তুত উত্তরা ও মিরপুর-পল্লবী থেকে সদরঘাট, কমলাপুর ও মুগদাপাড়া পর্যন্ত এমন কোনো এলাকার নাম বলা যাবে না, যেখানে প্রখর রোদে ও ঝলমলে আলোর মধ্যেও ধূলায় অন্ধকার না হয়ে থাকছে। গুলশান বনানী কিংবা অতি অভিজাত কূটনৈতিক এলাকা বারিধারার কথা বলবেন? এসব এলাকাতেও ধূলার কবল থেকে নিস্তার পাওয়ার উপায় নেই।
তারও আগে বাংলামোটর থেকে মৌচাক-মালিবাগ ও শান্তিনগর এবং তেজগাঁও সাতরাস্তার মোড়ের কথা তো বলতেই হবে। রাজধানীবাসী ভুলেই গেছে, ঠিক কত বছর আগে এসব এলাকায় ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল। নির্মাণ কাজ চলছে তো চলছেই। শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। মাঝখানে মাস কয়েক আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তেজগাঁও সাতরাস্তা থেকে মগবাজার চৌরাস্তা হয়ে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল পর্যন্ত মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের একটি অংশের উদ্বোধন করেছেন। কিন্তু সে পর্যন্তই। এরও পর ডিজাইনের ত্রুটি ধরা পড়েছে। সরকারের লোকজনকে বাংলামোটর থেকে মৌচাক পর্যন্ত ফ্লাইওভারের নির্মাণ কাজে নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা গেছে। তাদের কাজ এখনো চলছে জোর কদমে!  
তাই বলে একথা মনে করা কিন্তু ঠিক নয় যে, কেবলই ফ্লাইওভার নির্মাণের কারণে রাজধানী ধূলার নগরীতে পরিণত হয়েছে। এমন অবস্থাও কয়েক মাসে কিংবা ফ্লাইওভার নির্মাণের মতো বিশেষ দু’একটি কারণে সৃষ্টি হয়নি। জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টে জানা গেছে, বৃহত্তর রাজধানী মহানগরীর প্রতিটি এলাকাতেই ধূলার কবল থেকে বাঁচার জন্য মানুষকে নাকে কাপড়ের মাস্ক পরে কিংবা অন্য কোনোভাবে নাক ঢেকে চলাচল করতে হচ্ছে। উদাহরণ দেয়ার জন্য রিপোর্টে সোয়ারিঘাট থেকে বাবুবাজার পর্যন্ত দীর্ঘ সড়কের দুরবস্থার উল্লেখ করা হয়েছে। সড়কটি বহুদিন ধরেই ভাঙাচোরা অবস্থায় রয়েছে। তার ওপর আবার এই সড়কের দু’পাশে সিটি করপোরেশেনের ট্রাকগুলো এসে টনকে টন আবর্জনা ফেলে যাচ্ছে প্রতিদিন। সড়কটি দিয়ে গাড়িও চলাচল করছে শত শত। ফলে নোংরা আবর্জনামিশ্রিত ধূলায় ছেয়ে যাচ্ছে চারদিক। এরই পাশাপাশি মিরপুর ৬, ১০, ১১, ১২, ১৩ ও ১৪ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় চলছে উত্তর সিটি করপোরেশেনের উন্নয়ন কার্যক্রম। খোঁড়াখুঁড়ির একই কার্যক্রম চালানো হচ্ছে মিরপুর ১০ নম্বর থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত দীর্ঘ সড়কেও। এখানে আবার উপলক্ষ মেট্রোরেলের জন্য সড়ক নির্মাণ। আর খোঁড়াখুঁড়ির অর্থই যেহেতু ধূলার বিস্তার ঘটানো সেহেতু শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসছে মানুষের। দৈনিকটির রিপোর্টে রাজধানী মহানগরীর আরো অনেক এলাকার নাম রয়েছে, যেসব এলাকায় একদিকে দুই সিটি করপোরেশন পাল্লা দিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রম চালাচ্ছে, অন্যদিকে অসংখ্য সড়ক ও অলি-গলি পড়ে রয়েছে ভাঙাচোরা অবস্থায়। ফলে সব মিলিয়েই বিস্তৃত হচ্ছে ধূলার সা¤্রাজ্য।
পরিস্থিতির ক্ষতিকর বিভিন্ন দিক সম্পর্কেও উল্লেখ রয়েছে রিপোর্টটিতে। এসবের মধ্যে প্রাধান্যে আছে মারাত্মক অনেক রোগের বিস্তার। সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি, হাঁপানি এবং চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের কষ্টের কোনো সীমা থাকছে না। পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে জড়িত একাধিক সংগঠনের অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব অসুখের চিকিৎসার জন্য মধ্য ও নিম্নবিত্তদের প্রতি মাসে পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। অর্থাৎ ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে মানুষের। তবুও সম্পূর্ণ মুক্তি মিলছে না অসুখের কবল থেকে। 
বলা দরকার, রাজধানী মহানগরীর এমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কারণ, সরকার এবং তার বিভিন্ন বিভাগ ও দফতার-অধিদফতর তো রয়েছেই, পাশাপাশি আছে দু’দুটি সিটি করপোরেশন। ’অতি সন্ন্যাসীতে গাঁজন নষ্ট’ প্রবাদ বাক্যটিকেই তারা সত্য প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লেগেছেন কি না, সে জিজ্ঞাসায় যাওয়ার পরিবর্তে আমরা সংশ্লিষ্ট সকলের কর্তব্য ও দায়িত্বের কথাটা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। অপরিকল্পিত কিংবা কেবলই টাকার ‘শ্রাদ্ধ’ করার উদ্দেশ্যে হলেও ফ্লাইওভার নির্মাণসহ উন্নয়ন কার্যক্রমের ব্যাপারে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। আমরাও আপত্তি জানাচ্ছি না। আমাদের আপত্তি ও প্রতিবাদের আসল কারণ দায়িত্বের বিষয়টি ভুলে যাওয়া কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে দায়িত্ব পালনে অবহেলা করা। লক্ষ্য করলে এই অভিযোগ অনস্বীকার্য হয়ে উঠবে যে, ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করা থেকে ধূলা প্রতিরোধ করার বা ধূলার বিস্তার কমানোর জন্য সড়কে সড়কে পানি ছেটানোর সামান্য কাজটুকু পর্যন্ত করছে না কোনো কর্তৃপক্ষ। আমরা মনে করি, সরকারের উচিত ফ্লাইওভার বা মেট্রোরেল ধরনের বিরাট কোনো প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু করার আগে ধূলা প্রতিরোধের ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া। পরিবেশ রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বিভিন্ন দফতর-অধিদফতরের পাশাপাশি দুই সিটি করপোরেশনের উচিত নাগরিকদের স্বাস্থ্যের প্রশ্নে অনেক বেশি সচেতন হওয়া। এ উদ্দেশ্যে ধূলার বিস্তার তো প্রতিরোধ করতেই হবে, একই সঙ্গে পরিচ্ছনতার অভিযানও চালাতে হবে নিয়মিতভাবে। সব মিলিয়ে আমরা চাই, রাজধানী মহানগরীকে যেন ধূলার নগরী নামে চিহ্নিত হতে না হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ