শুক্রবার ২২ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

নির্বাচন কমিশনের ক্ষমা প্রার্থনা

প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দিন আহমদসহ পাঁচ নির্বাচন কমিশনার হাই কোর্টে গিয়ে ‘নিঃশর্ত’ ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। মঙ্গলবার একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের ২২ মার্চ থেকে ছয় ধাপে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ব্যাপক সহিংসতা, চরম অনিয়ম ও জালিয়াতি এবং ফলাফল পাল্টে ফেলাসহ বিভিন্ন অভিযোগে সংক্ষুব্ধ ও ক্ষতিগ্রস্ত প্রার্থীদের পক্ষ থেকে কয়েক হাজার আবেদন জমা দেয়া হলেও কোনো একটি বিষয়েই নির্বাচন কমিশন বিচার বা নিষ্পত্তি করার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। নিজের আইনত করণীয়র প্রতি উপেক্ষা দেখিয়ে কমিশন বরং সকল সংক্ষুব্ধ প্রার্থীকে আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। ফলে প্রায় সকল আসনেই ‘নির্বাচিত’ হয়েছে সরকার দলীয় প্রার্থীরা। কমিশনের এই পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকায় ক্ষুব্ধ হয়ে চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার চরভৈরবী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী জাহিদুল ইসলাম হাই কোর্টে রিট করেছিলেন। রিটটির পরিপ্রেক্ষিতে হাই কোর্ট জাহিদুল ইসলামের অভিযোগ নিষ্পত্তি করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু কমিশন নির্দেশ অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়নি। সে কারণে ১৪ নভেম্বর এক শুনানিতে হাই কোর্ট বলেছেন, নির্দেশ অমান্য করার মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন আদালত অবমাননা করেছে। আদালত অবমাননা করায় হাই কোর্ট পুরো কমিশনকে সশরীরে হাজির হয়ে ক্ষমা চাওয়ার আদেশ দিয়েছিলেন। এই আদেশ অনুযায়ী ক্ষমা চাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্য চার কমিশনার হাই কোর্টে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। কিন্তু তারা গিয়েছিলেন গত শনিবার, ছুটির দিনে। শুধু তা-ই নয়, তারা হাই কোর্টের রেজিস্ট্রারের অফিসে চুপি চুপি গিয়ে ক্ষমার জন্য দরখাস্ত রেখে এসেছেন। বলেছেন, উচ্চ আদালতের কাছে তারা নাকি ‘নিঃশর্ত’ ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন!
কথা উঠেছে অনেক কারণেই। প্রথমত, কোনো বেঞ্চের সামনে হাজির হওয়ার পরিবর্তে রেজিস্ট্রারের অফিসে দরখাস্ত জমা দিয়ে আসাটা আদৌ যথেষ্ট এবং আইনসম্মত হতে পারে না। বিষয়টি গ্রহণযোগ্য হতো নির্বাচন কমিশনাররা যদি হাই কোর্টের কোনো বেঞ্চের সামনে প্রকাশ্যে দাঁড়িয়ে ভুল ও দোষ স্বীকার করে করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। কিন্তু সেটা তারা করেননি বরং ছুটির দিনে গিয়ে নামকা ওয়াস্তে একটি দরখাস্ত ফেলে রেখে এসেছেন। এভাবে চাতুরিপূর্ণ কৌশলে তারা ক্ষমা পেতে পারেন কি না- সেটাও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বটে। আমরা জানি না, সর্বোচ্চ আদালতের কোনো পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের সামনে তাদের হাজির হওয়ার আদেশ দেয়া হবে কি না। পুরো কমিশনের গিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করার এ ঘটনায় একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে। সেটা হলো, নির্বাচন কমিশন আসলেও গুরুতর অপরাধ করেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ প্রত্যেক নির্বাচন কমিশনারই সংবিধান এবং কমিশন ও নির্বাচন সংক্রান্ত আইন লঙ্ঘন করেছেন। তারও আগে-পরে নিজেদের সুবিধামতো আইনের ব্যাখ্যাও হাজির করেছেন তারা।
যেমন প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, নির্বাচনী আইনের ২২ ও ২৩ ধারার সঙ্গে বিধির ৫৩ ও ৯০ ধারা মিলিয়ে পড়া হলে যে কোনো অভিযোগ আমলে নিয়ে তার নিষ্পত্তি করার দায়িত্ব কমিশনের ওপর এসে যায়। সে ক্ষমতাও কমিশনকে আইনেই দেয়া আছে। কিন্তু কমিশনাররা আইনের ধারে-কাছে যাওয়ার পরিবর্তে অভিযোগকারী সকলকে ঢালাওভাবে আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, যে সংক্ষুব্ধ প্রার্থী জাহিদুল ইসলামের রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাই কোর্ট অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য আদেশ দিয়েছিলেন, তার ব্যাপারেও কমিশন যথারীতি মৌনতা অবলম্বন করেছে। এজন্যই কমিশনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ উঠেছে। একই কারণে পাঁচ কমিশনারকে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হয়েছে। হাস্যকরভাবে তারা বলেছেন, এটা নাকি তাদের ‘অনিচ্ছাকৃত’ ভুল!
আমরা মনে করি, ছুটির দিনে উচ্চ আদালতের রেজিস্ট্রারের অফিসে চুপি চুপি গিয়ে ক্ষমা প্রার্থনার দরখাস্ত ফেলে আসাটাই যথেষ্ট হতে পারে না। নির্বাচন কমিশনারদের অবশ্যই সকল সংক্ষুব্ধ, বঞ্চিত ও নির্যাতিত প্রার্থীসহ জনগণের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে। ভুল ও দোষ তো স্বীকার করতেই হবে। মনে রাখা দরকার, তৃণমূল পর্যায়ের তথা ইউপি নির্বাচনের বিষয়টি কোনোভাবেই সাধারণ বা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার মতো বিষয় হতে পারে না। অথচ ছয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনের ব্যাপারেই কমিশনাররা অমার্জনীয় উপেক্ষা দেখিয়েছেন। ক্ষমতাসীন দলের বাইরে আর কোনো দলের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে দেয়া হয়নি। অনেকের মনোননয়নপত্র ছিড়ে ফেলা হয়েছে। অনেককে ভয়-ভীতি দেখিয়ে এলাকা থেকে তাড়িয়েছে ক্ষমতাসীন দলের গুণ্ডা-সন্ত্রাসীরা। তারা ভোটকেন্দ্র দখল করেছে, ব্যালট পেপারে সিল মেরেছে ইচ্ছামতো। গুণ্ডা-সন্ত্রাসীদের হামলায় প্রাণ হারিয়েছে দেড়শ’র বেশি নিরীহ মানুষ, আহত হয়েছে কয়েক হাজার।
সবকিছুই ঘটেছে নির্বাচন কমিশন তথা কমিশনারদের চোখের সামনে। অভিযোগও এসেছে তাৎক্ষণিকভাবে। কিন্তু কোনো একটি বিষয়েই কমিশন বা কমিশনারদের তৎপর হতে দেখা যায়নি। তারা নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালেও বিচারের পদক্ষেপ নেননি। কমিশনাররা বরং আদালতে যাওয়ার উপদেশ খয়রাত করেছেন। তারা লক্ষ্যই করেননি যে, নির্বাচনকেন্দ্রিক অন্যায়, অনিয়ম ও অপরাধের বিচার এবং অভিযোগের নিষ্পত্তি করার জন্যই নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের বিধান করা হয়েছে। একই কারণে আদালতে যাওয়ার উপদেশ দেয়ার কোনো অধিকার তাদের থাকতে পারে না। অন্যদিকে আদালতে যাওয়ার উপদেশ দেয়ার মাধ্যমে নিজেদের কর্তব্যের বিষয়ে অবহেলা তো করেছেনই, কমিশনাররা এমনকি সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশকেও পাত্তা দেননি। এতটাই ক্ষমতাধর ও বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন তারা!
আমরা মনে করি, সবদিক থেকেই বর্তমান নির্বাচন কমিশন অমার্জনীয় অপরাধ করেছে। তাদের কারণে গণতন্ত্র এসে গেছে ধ্বংসের মুখোমুখি। সব জেনে বুঝেও কমিশনাররা গণতন্ত্রবিরোধী ভূমিকা পালন করেছেন। সে কারণে কমিশনারদের বিরুদ্ধে কঠোর এবং দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া দরকার, যাতে ভবিষ্যতের কোনো কমিশন তথা নির্বাচন কমিশনাররা এ ধরনের অপরাধ করার চিন্তাও না করতে পারেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ