বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

সংকট উত্তরণে প্রধানমন্ত্রীর সাথে খালেদা জিয়ার সংলাপ হতে হবে -বি চৌধুরী

স্টাফ রিপোর্টার : সংকট উত্তরণে প্রধানমন্ত্রীর সাথে খালেদা জিয়ার সংলাপ হতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারা সভাপতি অধ্যাপক  ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতির সাথে বিএনপির সাক্ষাৎ চাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে বি চৌধুরী বলেন, প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়ে কী করবেন? আমি নিজে ছিলাম, জানি। সংবিধান বলে প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী চলিবেন। তিনি (প্রধানমন্ত্রী) যা বলবেন, তাকে তা শুনতে হবে। তিনি বলেন, আজকের সরকারের মধ্যে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, প্রাইম মিস্টার হেজ ম্যাক্সিমাম পাওয়ার। একমাত্র শক্তিশালী ব্যক্তি সরকারের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপ করতে হবে। যে ডায়লগ খালেদা জিয়া মিস করেছেন, সঙ্গে সঙ্গে বাতিল করে দিয়েছেন, আজকে উনার বক্তব্য সঙ্গে সঙ্গে বাতিল করে দেয়। বক্তব্য শেষ হওয়ার আগেই বাতিল হয়ে যায়। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ৪০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার ভাসানী অনুসারী পরিষদ আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
একই অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তার বক্তব্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন,  আজ গণতন্ত্রকে হরণ করা হয়েছে, মানুষের ভোটের অধিকার নেই। নির্বাচন কমিশনের আমরা একটা ধারণা দিয়েছি, প্রস্তাব দিয়েছি- এই নির্বাচন কমিশন এই ধরনের হলে একটা সম্ভাবনা আছে ভবিষ্যতে যদি নির্বাচনে সহায়ক সরকার করা যায়, তাহলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। কিন্তু প্রস্তাব উপস্থাপনের সাথে সাথে আওয়ামী লীগ তা নাকচ করে দেয় - বললো হবে না। আজকে আইনমন্ত্রী সাহেব বলেছেন এটার মধ্যে কিছূ নাই। উদ্দেশ্য কী? উদ্দেশ্য হচ্ছে- যেভাবে নির্বাচিত হয়েছিলাম সেই বিনাভোটে, আবার আমরা সেইভাবে নির্বাচিত হতে চাই। কারণ আমরা নির্বাচন দিতে চাই না। আমরা জানি নির্বাচন দিলে আমাদের বিজয়ের কোনো সম্ভাবনা নাই। দেশের মানুষ তাদের ভোট দেবে না। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগে ভয় তারা জনগণের সঙ্গে নেই। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে গেছে। তারা জনগণের ওপর আস্থা না রেখে অস্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে জনগণকে বন্দী করে রাখার চেষ্টা করছে। রাষ্ট্রের সব যন্ত্রগুলো ব্যবহার করে পুরোপুরি জনগণকে দমন করে যে শাসন, তা করছে।”
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ভাসানী অনুসারী পরিষদের সভাপতি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় অন্যান্যের মধ্যে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য হায়দার আকবর খান রনো, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক জসীম উদ্দিন আহমেদ, সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহ, অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী,  জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) প্রেসিডিয়াম সদস্য আলী আব্বাস খান, খালেকুজ্জামান চৌধুরী, অ্যাডভোকেট মজিবুর রহমান, ভাসানী অনুসারী পরিষদের মহাসচিব শেখ রফিকুল ইসলাম বাবুল প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাতের বিষয়টি নেতিবাচক হিসেবে না দেখে সাবেক এই রাষ্ট্রপতি বলেন,  প্রেসিডেন্টের কাছে যান ভালো। তিনি দেশের এক নম্বর গণ্যমান্য ব্যক্তি-এটা ঠিক আছে। কিন্তু করার ক্ষমতা তার তো কিছু নাই। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সম্পর্কে বি চৌধুরী বলেন, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নাই। শুধু একটাই আছে, আমি যখন প্রেসিডেন্ট ছিলাম- দুই মিনিট রাস্তা ব্লক করতাম যাতে সরাসরি গাড়ি যেতে পারে। আজকে ১৪ মিনিট আমাকে বসিয়ে রাখা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট যাবেন। উন্নতি এটাই হইছে। আসলে প্রেসিডেন্টের কোনো ক্ষমতা নেই। প্রেসিডেন্টের দোষ দিইয়া কোনো লাভ নাই। তাকে নির্বাচন কমিশনের যা কিছু ধরাইয়া দেন না কেনো, শেষ পর্যন্ত তিনি কিছু করতে পারবেন না। আপনাদের প্রস্তাব সুন্দর-অসুন্দর পরে কথা কথা। এখন যেখানে গিয়ে ধণা দেবেন, তার তো কোনো ক্ষমতা নাই, বেচারা তিনি কী করবেন?
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশে সাবেক রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশে যখন প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রীর মতো বড় বড় পদে থাকে এবং পরে চলে যায়, তখন লোকে বিচার করে কি কি করেছেন তা দিয়ে নয়। কি কি করতে পারেন নাই সেটাই মানুষের কাছে বিবেচ্য বিষয় হয়। এটাই মানুষের প্রকৃতি। আমি বলব, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেগুলো কাজ করেন নাই, সেগুলো হিসাব করেন, সেটাই জরুরী। দেশের মানুষকে যা দিতে পারেন নাই, সেটাই মানুষ আলোচনা করবে। আজকে দেশে যে বিশৃঙ্খলা হয়েছে, বিনা বিচারে কত মানুষকে গ্রেপ্তার করেছেন, কত মানুষ জেলে রয়েছে বছরের পর বছর- হিসাব-নিকাশ করবে লোকেরা। কত মানুষ গায়েব হয়ে গেছে, হিসাব করবে লোকে, যার সন্তান গায়েব হয়ে গেছে, সে ভুলবে না।
বি চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী দেশটাকে রক্ষা করুন, দেশটাকে বাঁচান, দেশের মানুষকে বিশ্বাস করুন এবং সবার সাথে কথা বলুন। মানুষের কথা আপনাকে শুনতে হবে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিলে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীকে স্মরণ করায় ধন্যবাদ জানান তিনি। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মমতায় খালেদা জিয়া বিবৃতি না দেয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিকল্পধারার সভাপতি। তিনি বলেন, আজকে রোহিঙ্গারা মজলুম। আজ মওলানা ভাসানী যদি বেঁচে থাকতেন, যে জুলুম ও অত্যাচার রোহিঙ্গাদের প্রতি করা হয়েছে, যেভাবে তাদের বাড়ি-ঘর পুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে, তাদের চাকু দিয়ে শরীরে অত্যাচার করা হয়েছে- এর চেয়ে বড় মজলুম কোথায় আছে? এর প্রতিবাদ তো সব গণতান্ত্রিক শক্তির করা উচিত। সেই কন্ঠস্বর কোথায়? সেই সিংহ হৃদয় কোথায়। আজকে মওলানা থাকলে সেই প্রতিবাদ করতেন। আজকে মনে হয় না, যে আমাদের দেশে স্বাধীন সরকার। কোথায় সেই প্রতিবাদ? বিএনপি চেয়ারপার্সনের প্রতিবাদ তো আমরা দেখতে পাইনি। এটা লজ্জার কথা, দুঃখের কথা।
এ সময়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, আমি প্রতিবাদ করেছি, বিবৃতি দিয়েছি। তখন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব বি চৌধুরী বলেন, ‘নো, ইউ আর নাম্বর টু। আমি চাকরি করি নাই। ফখরুলকে আমি স্নেহ করি। ফখরুলের ভাষা বেগম খালেদা জিয়ার কন্ঠে শুনতে চায় মানুষ। নিশ্চয়ই মজলুমকে আশ্রয় দিতে হবে, তাদের পক্ষে কথা বলতে হবে।
এদিকে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বর্তমান কর্মকা- নিয়ে সমালোচনা করেছেন। খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে অবস্থান ও জোট থেকে জামায়াতকে ত্যাগ না করার বিষয় নিয়ে নানা সমালোচনা করেন। তবে একই অনুষ্ঠানে পরবর্তী বক্তার বক্তব্য দেয়ার সময় এসব সমালোচনার কড়া জবাব দিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
আলোচকবৃন্দের বক্তব্যে কাদের সিদ্দিকী সমালোচনার সুরে খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনি গুলশান কার্যালয় থেকে বের হতে চান না। আপনি সেখান থেকে বের হন। যান না একটু ড. কামালের বাসায়, যান না একটু আসম আবদুর রবের বাসায়, যান না একটু বি চৌধুরীর বাসায়, যান না একটু জাফরুল্লার বাসায়। কিন্তু তিনি যাবেন না। বঙ্গবীর আরো বলেন, জিয়াউর রহমান আমার বাসায় এসেছিলেন ১০ বার। আমি না হয় আপনার বাসায় গেলাম ৫ বার। কতবার যাওয়া যায়। লজ্জা সরম বলতে তো একটা বিষয় আছে।
খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ড. এমাজউদ্দিন প্রবীণ শিক্ষাবিদ। তিনি আপনাকে জামায়াত ছাড়ার কথা বললেন। অথচ আপনারা বললেন এমাজউদ্দিন বিএনপির কেউ না, আবার বলেন, জাফরুল্লাহ বিএনপির কেউ না। এভাবে বলতে পারেন না। তারা বিএনপি না হলেও বিএনপির হিতৈশী। তাদের অসম্মান করা ঠিক না। জামায়াতকে এখনো না ছাড়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, কেয়ামত হয়ে গেলেও জামায়াতকে নিয়ে বিএনপি কিছু করতে পারবে না। কাদের সিদ্দিকী বলেন, জিয়াউর রহমানকে বঙ্গবন্ধুর খুনি বলা হয়। কিন্তু তিনি তো ভালো লোক ছিলেন। শফিউল্লাহকে (সাবেক সেনা প্রধান) যদি খুনি বলা হতো তাহলে গর্ব করতাম। এ সময় বঙ্গবীর নিজেকে এখনো বঙ্গবন্ধুর  সৈনিক দাবি করে বঙ্গবন্ধু ও মওলানা ভাসানীর স্মৃতিচারণ করে নানা বক্তব্য দেন।
পরবর্তীতে প্রধান বক্তার বক্তব্যের শুরুতেই বিএনপি মহাসচিব বলেন, যখন ভাসানী পরিষদের অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম, ভেবেছিলাম ভাসানীর জীবনের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করা হবে। বক্তব্য শুরুর কিছুক্ষণ পরই তিনি বলেন, অনেকে বলছেন খালেদা জিয়া ঘর থেকে বের হন না। যারা একথা বলছেন, তাদের তথ্য সঠিক নয়। ফখরুল বলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার অবদান কেউ অস্বীকার করলে ধরে নিতে হবে তিনি সত্যকে স্বীকার করছেন ।  ১৯৮২ সাল থেকে ৯০ সাল পর্যন্ত আজকের আলোচনার প্রধান অতিথিকে নিয়ে তিনি দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছুটে চলেছিলেন। সে কথা তো অস্বীকার করা যাবে না। একজন গৃহবধূ স্বাধীনতার পতাকা তুলে ধরে ঘর থেকে ঘরে ছুটে গিয়েছেন, মানুষকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। তিনি সেই নেত্রী ১/১১ পর্যন্ত গৃহবন্দী ছিলেন। তার দৃঢ়তার কারণে, আপোসহীনতার কারণে তৎকালীন সরকার জরুরি অবস্থা তুলে নিতে বাধ্য হয় এবং নির্বাচন দিতেও বাধ্য হয়।
মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপি চেয়ারপার্সন ঘরে বসে নেই। একজন গৃহবধূ সারা দেশ চষে বেড়িয়েছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তিনি অন্যতম প্রধান নেতা। আজকে জীবনের শেষ সায়াহ্নে এসে মওলানা ভাসানীকে অনুসরণ করে তিনি বলেছেন আমার জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত আমি গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করে যাবো। এতে যদি আমার মৃত্যু হয়, হবে।  সেভাবেই তিনি নেমেছেন।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমাদের এক হাজারের বেশি তরুণ নেতাকর্মী গুলী করে হত্যা করা হয়েছে।  পাঁচশ নেতাকর্মী গুম করে ফেলা হয়েছে। হাজার হাজার নেতাকর্মী পঙ্গু হয়েছে। প্রায় সাড়ে তিন লাখ নেতাকর্মী মামলায় জর্জরিত হয়ে গেছে। আমরা লড়াই করছি। সংগ্রাম করছি। সবসময় অবস্থা একরকম যায় না। আমরা বিশ্বাস করি বিএনপি চেয়ারপার্সন গণতন্ত্রের পক্ষের নেত্রী। মওলানা ভাসানীর পথ অনুসরণ করতে পারলে বিজয় আমাদের সুনিশ্চিত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ