বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমেই গণতন্ত্রহীনতার অবসান ঘটবে

# একদলীয় শাসনের নতুন সংস্করণ দেখছি -ব্যরিস্টার মওদুদ আহমেদ
# সেনাবাহিনী ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় -আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী
স্টাফ রিপোর্টার : নয় বছর ধরে দেশ গণতন্ত্রহীনতার মধ্যে রয়েছে। এভাবে বেশি দিন চলতে পারে না। বিএনপি ও পেশাজীবীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমেই চলমান গণতন্ত্রহীনতার অবসান ঘটবে। নির্বাচন কমিশন নিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার প্রস্তাবকে মেনে নিয়ে দ্রুত আলোচনায় বসতে হবে। তা না হলে মানুষের ক্ষোভের যে বিস্ফোরণ ঘটবে তা কেউ ঠেকাতে পারবে না। তাই ক্ষমতাসীনদের মঙ্গলের জন্যই এই প্রস্তাবনা মেনে নেয়া উচিত।
বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের (বিএসপিপি) উদ্যোগে ‘নিরপেক্ষ সরকার ও নিরপেক্ষ শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন- গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পূর্বশর্ত’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এই গোলটেবিল বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বিএসপিপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সাবেক সভাপতি রুহুল আমিন গাজীর সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যরিস্টার মওদুদ আহমেদ এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বক্তব্য রাখেন বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, সাংবাদিক ও কলামিস্ট মাহফুজ উল্লাহ, প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান, আ ফ ম ইউসুফ হায়দার, আনহ আক্তার হোসেন, বিএনপির গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক অধ্যক্ষ সেলিম ভূইয়া, ইঞ্জিনিয়ার রিয়াজুল ইসলাম রিজু, শিক্ষক নেতা জাকির হোসেন, সাংবাদিক কাদের গণি চৌধুরী প্রমুখ। 
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেন, সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। সেই ২০০৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৯ বছর গণতন্ত্রহীনতার মধ্যে রয়েছি। কেউ যদি মনে করেন এটার কোন সমাপ্তি হবে না, চলতে থাকবে, এটা ভুল। এই পরিস্থিতির সমাপ্তি হবেই। বিএনপির নেতৃত্বেই চলমান গণতন্ত্রহীনতার সমাপ্তি ঘটবে।
মওদুদ আহমেদ বলেন, বিএনপি চেয়ারপার্সন দেশে গণতন্ত্র ফেরাতে চান। এজন্য তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন। এটা কোন আইন নয়। আলাপ আলোচনার মাধ্যমে শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন করে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে। সরকার উদ্যোগ নিলে বিএনপি সহযোগিতা করবে। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার প্রস্তাব পর্যালোচনা না করেই প্রত্যাখ্যান করা আওয়ামী লীগের ভুল। আওয়ামী লীগ একটি অরিজিনাল ফ্যাসিবাদী দল। একদলীয় শাসন মনোভাবাপন্ন দল বলেই তারা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের উচিত ছিল খালেদা জিয়ার প্রস্তাবকে স্বাগত জানানোর। সত্যিকার গণতান্ত্রিক দল হলে তারা আলোচনার উদ্যোগ নিতো।
প্রবীণ এই আইনজীবী বলেন, ১৯৭২ থেকে ৭৫ পর্যন্ত তারা একই ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা নিয়ে সরকার পরিচালনা করেছে। ক্ষমতায় থাকার জন্য যা যা প্রয়োজন তাই করছে। রাজনীতি মানে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। আমরা এখনো আহ্বান জানাই আলোচনায় বসার। তিনি বলেন, রাজনীতি হতে হবে সমঝোতার মাধ্যমে। একদলীয় শাসনের নতুন সংস্করণ এখন দেখতে পাচ্ছি। রাজনীতির চরম অবক্ষয় ঘটেছে। মাটির নিচে চলে গেছে। ফ্লাইওভার নট স্টেট ভ্যেলু। রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধ ফ্লাইওভার থেকে পাওয়া যায় না। একজন শাসক চাইলে অনেক বছর ক্ষমতায় থাকতে পারেন। তবে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার পর কেউ আর তাকে মনে রাখে না। একদিনের জন্যও স্মরণ করে না।
সভাপতির বক্তব্যে রুহুল আমিন গাজী বলেন, নির্বাচনের দিন দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী মোতায়েন থাকলে সমস্যা কোথায়। ভোটকেন্দ্রে সেনাবাহিনী উপস্থিত থাকলে ভোটারদের মনে আস্থা বাড়ে, নির্বাচন সুষ্ঠু হয় ও আগের দিন ব্যালটবাক্স ভর্তি করা যায় না। আর এ কারণেই বেগম খালেদা জিয়া তার প্রস্তাবনার মাঝে সেনাবাহিনী মোতায়েনের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, দুর্যোগে মানুষকে সহয়তা প্রদান, পাসপোর্ট তৈরী, হাতিরঝিল সড়ক নির্মাণ, ব্রিজ নির্মাণ ও দেশের বাইরেও সেনাবাহিনীর প্রশংসনীয় ভূমিকা রয়েছে। অতীতেও বিভিন্ন সময় এই বাহিনী দায়িত্ব পালন করছেন। এখন সমস্যা কোথায়? তিনি বলেন, যারা সুষ্ঠু নির্বাচন চায় না তাদের মনেই শুধু আতঙ্ক।
রুহুল আমিন গাজী বলেন, খালেদা জিয়ার ১৩ দফা প্রস্তাবনার মধ্য কোনটি সমস্যা তা ক্ষমতাসীন দলের কোনো নেতা বলছেন না। শুধু অন্তঃসারশূন্য বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আগামী নির্বাচনে সুষ্ঠু ও নিরপক্ষে পরিবেশ সৃষ্টির জন্য  বিএনপি চেয়ারপার্সনের প্রস্তাবনা মেনে নেয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, না হলে মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ সৃষ্টি হবে তা সামাল দিতে পারবেন না। 
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন,  নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে সেনাবাহিনী না চেয়ে আওয়ামী লীগ মনোনিত প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী পরিষ্কার করেছেন সেনাবাহিনী থাকলে সুষ্ঠু নির্বাচন আর না থাকলে সিলেকশন হয়। তিনি বলেন, গত সিটি নির্বাচনে আইভী সুষ্ঠু নির্বাচন চেয়েছিলেন যার কারণে সেনাবাহিনীর প্রয়োজনের কথা বলেছিলেন। এবার তিনি নির্বাচন নয়, সিলেকশান করবেন এ কারণে তিনি সেনাবাহিনী চাচ্ছেন না। সেনাবাহিনী মোতায়েন ছাড়া বাংলাদেশে কোন সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।
নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন নিয়ে খালেদা জিয়ার রূপরেখার কথা তুলে ধরে আমির খসরু মাহমুদ বলেন, খালেদা জিয়ার গতিশীল তথ্যনির্ভর এই প্রস্তাব সরকারের মধ্যে নার্ভাসের দেখা দিয়েছে। তারা ভাবছে এই প্রস্তাব না মেনে  নিলে জনগণের সাথে আরেকবার প্রতারণা করা হবে। যার কারণে খালেদা জিয়ার প্রস্তাব না পড়েই অন্তঃসারশূন্য বলেছে। তিনি আরও বলেন, জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়ার কারণেই দেশের চলমান সংকট চলছে। যার ফলে তারা একের পর এক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য খালেদা জিয়ার এই প্রস্তাব। সরকারি দলের অনেকেই কথায় কথায়  সংবিধানের কথা বলে উল্লেখ করে এই বিএনপি নেতা বলেন, সংবিধান ধর্মগ্রন্থ নয় যে এর পরিবর্তন সম্ভব নয়। খালেদা জিয়ার প্রস্তাব সংবিধানের বাইরে কিছু নয়। তিনি বলেন, মার্শালল বন্ধের জন্যই নির্বাচনের দিন সেনাবাহিনী মোতায়েন করা প্রয়োজন।
প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, খালেদা জিয়ার প্রস্তাব অবশ্যই আলোচনার দরকার। বর্তমানে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নেই, মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো ভোগ করতে পারছে না। অবস্থা এমনই হয়েছে যে বিএনপির সভাসমাবেশ সরকারের অনুমতি ছাড়াও করতে পারছে না। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার এই প্রস্তাবনায় কি আছে  সারা দেশের মানুষের মাঝে পৌঁছে দেয়া দরকার। আর মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে আওয়ামী লীগ সরকারকে হঠাতে হবে।
আ ন হ আক্তার হোসেন বলেন, বর্তমান সংবিধানই গণতন্ত্রের জন্য বাধা, যা আমাদের যুবক সমাজ ও সাধারণ নাগরীকরা জানে না। তাই সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি। আক্তার হোসেন বলেন, কোনো স্বৈরাচারী সরকারেরই স্বেচ্ছায় পতন ঘটেনি কারণ তারা জানে যে ক্ষমতা ছাড়ার পর তাদের পরিণতি কী হবে। তিনি বলেন, নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সংবিধান পরিবর্তনের বিষয়ে আলোচনা দরকার।
মাহফুজুল্লাহ বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান সরকার একটি সংখ্যালঘু সরকারে পরিণত হয়েছে। কেননা সেই নির্বাচনে প্রকৃত ভোটাররা ভোট প্রয়োগ করেনি। কিছু ভোট নিয়ে তারা ক্ষমতা দখল করে নিজেদেরকে সরকার দাবি করছে। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু নিরপেক্ষ হলে এই সরকারের অস্তিত্বই থাকবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ