বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

পুলিশের বাড়ছে অপরাধ ॥ বাড়ছে শাস্তিও

# ‘রাজনৈতিক ব্যবহার ও নৈতিক অবক্ষয়ই কারণ’
# ‘ব্যক্তির দায় বাহিনী নেবে না’
তোফাজ্জল হোসেন কামাল : পুলিশের কতিপয় সদস্য একের পর এক অপরাধী হয়ে উঠছে। নানা অভিযোগে দুষ্ট  কতিপয় অপরাধী সদস্যের কারণে গোটা পুলিশ বাহিনীর সাফল্যে কখনও কখনও কলঙ্ক তিলক পড়ছে। এ অবস্থায় বাহিনীটির হর্তাকর্তারাও বসে নেই। “ব্যক্তির দায় বাহিনী নেবে না” এমন নীতি নিয়ে অপরাধী সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নজিরও রয়েছে ভুরি ভুরি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুলিশ সদস্যদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা যে হারে বেড়েছে, সে হারে সাজা শাস্তির পরিমানও বেড়েছে। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক ব্যবহার ও নৈতিক অবক্ষয়ের কারণেই কতিপয় পুলিশ সদস্যের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবনতা।
খোঁজ খবর নিয়ে দেখা গেছে, প্রতিনিয়তই নানামুখি অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে পুলিশ। শাস্তির খড়গও চাপছে ওই সকল অভিযুক্তদের ওপর। গত ৬ বছরের পুলিশ বাহিনীর ৭৬ হাজার ৪ শ’২৬ জন সদস্যকে শাস্তি দেয়া হয়েছে। ব্যক্তির দায় পুলিশ নেয় না- পুলিশের এই নীতির ধারাবাহিকতায়ই অভিযোগের প্রেক্ষিতে অভিযুক্ত সদস্যদের বিভিন্ন দণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। গুরুদণ্ড, লঘুদণ্ড, চাকরিচ্যুতি ও বাধ্যতামূলক অবসর এই চার ধরনের শাস্তি রয়েছে পুলিশ বাহিনীতে। ২০১১ সাল থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত এই ৬ বছরের মধ্যে উল্লেখিত পুলিশ সদস্যদের শাস্তি দেয়া হয় নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার কারনে।
পুলিশ সদর দফতরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেছেন, পুলিশের কোনো সদস্যের অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। যখন কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তখন তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে পুলিশের বিরুদ্ধে যতগুলো লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে তার বেশির ভাগের প্রয়োজনীয় প্রমাণ দেখাতে পারেন না অভিযোগকারীরা। পুলিশের হয়রানির শিকার হবেন ভেবে অনেকে অভিযোগও করেন না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে ঘটনা সত্য হলেও পার পেয়ে যান অভিযুক্তরা।
কমছে না পুলিশের অপরাধ
নানা অপরাধে জড়িয়ে পুলিশের একশ্রেণির সদস্য চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, শ্লীলতাহানি, জমি ও ফ্ল্যাট দখল, গ্রেফতার বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণসহ সব ধরনের অপরাধে তারা বিচরণ করছেন। কনস্টেবল থেকে শুরু করে উচচ পর্যায়ের কর্মকর্তাও এসব অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। চাকরিচ্যুত, তিরস্কার, সতর্ক, গুরুদণ্ড, লঘুদণ্ডসহ নানা ব্যবস্থা নেয়া হলেও পুলিশের অপরাধপ্রবণতা কমছে না। বরং দিন দিন বাড়ছেই।
পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ থেকে ২০১৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ছয় বছরে নানা অপরাধে জড়িত থাকায় ৭৬ হাজার ৪২৬ জন পুলিশকে অর্থদন্ড, তিরস্কার, বদলি, বরখাস্ত, বাধ্যতামূলক অবসর ও চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। শাস্তি পাওয়াদের মধ্যে ৭৬ হাজার ৯৯ জনই কনস্টেবল থেকে উপপরিদর্শক (এসআই) পদমর্যাদার। আর পরিদর্শক থেকে তদূর্ধ্ব পর্যায়ের কর্মকর্তা রয়েছেন ৩২৭ জন। সর্বশেষ গত শুক্রবার রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁও মোড়ে ছিনতাই করতে গিয়ে পুলিশের দুই সদস্য ধরা পড়লে তাদের তৎক্ষণাৎ বরখাস্ত ও গ্রেফতার করা হয়।
এছাড়াও, ডা. ইকবাল নামের এক ব্যক্তিকে কয়েকজন অপরাধী মাইক্রোবাসে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় ঠিক তার পেছনেই ছিল পুলিশের টহল ভ্যান। এই ঘটনার মাসাধিককাল পরও তার কোন খোঁজ দিতে পারছে না পুলিশ।এখন এই বিষয়টি উচ্চ আদালতের এখতিয়ারে।
জানা যায়, ১৮ নবেম্বর ভোরে রাজধানীর সোনারগাঁও ট্রাফিক সিগন্যালের সামনে আবদুল বাছির মনা নামে এক ডিম ব্যবসায়ীর পথরোধ করেন মোটরসাইকেলে আসা পুলিশের দুই কনস্টেবল। তারা মনাকে বলেন, ‘তোর কাছে গাঁজা আছে, তুই গাঁজা সেবন করিস।’ এরপর তারা মনার দেহ তল্লাশি করে, ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে সঙ্গে থাকা ৪৪ হাজার টাকা নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় লতিফুজ্জামান নামে এক কনস্টেবলকে মনা ধরে ফেললেও অন্য কনস্টেবল পালিয়ে যান। পুলিশ বলছে, মনা বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় দ্রুত বিচার আইনে একটি মামলা করেন। ওই মামলায় লতিফুজ্জামানকে গ্রেফতার দেখানো হয়। ওইদিনই পালিয়ে থাকা অন্য কনস্টেবল রাজিকুল খন্দকারকে গ্রেফতার করা হয়। তারা দুজনই ডিএমপির ট্রাফিক উত্তর বিভাগের গুলশান জোনে কর্মরত ছিলেন। ঘটনার পরই তাদের বরখাস্ত করা হয়।
১৩ নভেম্বর পুলিশ হেফাজত থেকে ধর্ষণ মামলার আসামী রুবেলকে পালাতে সহায়তা করেন বাড্ডা থানার এসআই এমরানুল হাসান ও কনস্টেবল দীপকচন্দ্র পোদ্দার। এ ঘটনায় তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি আদালত থেকে রিমান্ডের দুই আসামিকে লোকাল বাসে থানায় নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানার এএসআই মশিউর রহমান, কনস্টেবল মোতালেব ও আবদুল লতিফকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ৯ জানুয়ারি মোহাম্মদপুরে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা গোলাম রাব্বীকে নির্যাতনের ঘটনায় এসআই মাসুদ শিকদারকে প্রত্যাহার করা হয়। ৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর শাহআলীতে বাবুল মাতুব্বরকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় শাহআলী থানার তৎকালীন এসআই মমিনুর রহমান খান, নিয়াজ উদ্দিন মোল্লা, এএসআই দেবেন্দ্রনাথ ও কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত এবং ওসি শাহীন মন্ডলকে প্রত্যাহার করা হয়। বিভাগীয় তদন্তে ওসি এ কে এম শাহীন মন্ডল ও কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে অব্যাহতি দিলেও অন্য তিনজনকে গুরুদণ্ড দেয়া হয়। কিন্তু পুলিশের এ পাঁচ সদস্যই পুনরায় চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। চলতি বছরে যাত্রাবাড়ী থানার ওসি থাকা অবস্থায় অবনি শংকর করের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করেন এক ভুক্তভোগী নারী। এ ঘটনার পর ওসিকে ডিবিতে বদলি করা হয়। ওই মামলা খারিজ করে দেওয়া হলেও বিভাগীয় মামলা থাকা অবস্থায় তাকে রংপুরের একটি থানায় ওসি হিসেবে বদলি করা হয়। একইভাবে উত্তরা পশ্চিম থানার ওসির দায়িত্ব পালনকালে রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে বাসার ছাদ থেকে ফেলে এক সাংবাদিককে হত্যার অভিযোগ ওঠে। পরে তাকেও বদলি করে ঢাকার বাইরের একটি থানার ওসির দায়িত্ব দেওয়া হয়। ৬ অক্টোবর চট্টগ্রামের নিউমার্কেট এলাকায় অস্ত্র বিক্রির সময় গোয়েন্দা পুলিশের এসআই উজ্জ্বলকান্তি দাস ও এএসআই আনিসুর রহমানকে আটক করে র‌্যাব। পরে দুজনকেই বরখাস্ত করা হয়। ২৭ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানার ওসি বেলাল জাহাঙ্গীরসহ দুই এসআইর বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে সজল আচার্য্য নামে এক ব্যবসায়ী আদালতে মামলা করেন। ১৮ জানুয়ারি সিএমপির পাহাড়তলী থানার ওসি রুজিৎ বড়ুয়ার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ তুলে মামলা করেন এক নারী। সিএমপি সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সাত বছরে সিএমপিতে ৩ হাজার ৮৩৬ সদস্যকে শাস্তি দেয়া হয়েছে।
৭৬ সহস্রাধিক পুলিশের সাজা
পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে ২০১১ সালে  ১২ হাজার ৯৭২ কনস্টেবল ও সাব-ইন্সপেক্টরকে লঘুদণ্ড, ৬শ’১২ জনকে গুরুদণ্ড, ৯০ জনকে চাকরিচ্যুত ও ৩৭ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর, একই বছর ২ ৬ পুলিশ পরিদর্শককে লঘুদণ্ড, ২ জনকে গুরুদণ্ড, ১ জনকে চাকরিচ্যুত এবং এএসপি থেকে পুলিশ সুপার পদ মর্যাদার ৯ জনকে লঘুদণ্ড, একজনকে গুরুদণ্ড ও একজনকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত সময়ে কনস্টেবল থেকে পুলিশ সুপার পদমর্যাদার ৭১ হাজার ১শ’৭০ জনকে লঘুদণ্ড, ৪ হাজার ৩৩ জনকে গুরুদণ্ড ৫শ’৫১ জনকে চাকরিচ্যুত, ৭২ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়। গুরুদণ্ডের ক্ষেত্রে পুলিশের সিকিউরিটি সেল জমা পড়া অভিযোগ তদন্ত করে অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে তার অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী চাকরিচ্যুত, বাধ্যতামূলক অবসর ও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। লঘুদণ্ডের ক্ষেত্রে পোশাক পরিচ্ছদ অপরিচ্ছন্ন থাকলে বডি ল্যাংগুয়েজ প্রবলেমসহ নানা কারণে এ দণ্ড হয়ে থাকে। এ দণ্ডটির শাস্তি হচ্ছে সাধারণত তিরস্কার করা।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিমাসে গড়ে প্রায় ২ হাজারেরও বেশি অভিযোগ জমা পড়ে। এই জন্য ২০১৪ সালে চাকুরি যায় ৮১ জনের আর বিভিন্ন ধরনের শাস্তি হয় ১৫ হাজার ২শ’ ৮৭ জনের। ২০১৫ সালে এই সকল অপরাধের কারণে চাকুরি গেছে ৭৯ জন এবং গুরু ও লঘুদ- হয় ১১ হাজর ১শ’৬৭ জনের। এবছরের আগষ্ট পর্যন্ত চাকুরি যায় ৬৩ জনের এবং বিভিন্ন মাত্রায় শাস্তি হয় আর ২ হাজার ২শ’ ২৩ জনের।
মতামত
জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) এ কে এম শহীদুল হক বলেন, ‘কোনো অপরাধের দায়ভার একান্তই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির। পুলিশ বিভাগ কোনো অপরাধীকে প্রশ্রয় দেয় না। এ ক্ষেত্রে আমরা সব সময়ই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরু করি।’
আইজিপি বলেন, ভাল কাজের পুরস্কার এবং মন্দকাজের তিরস্কার না থাকলে সেখানে কাজে কোনোদিন গতি আসবে না। এ বিষয়টা নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে পুলিশ বাহিনীতে গতি এসেছে। তার প্রমাণ জঙ্গিবাদসহ যে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করে না।
পুলিশের অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাওয়া দেশের জন্য অশুভ সংকেত হিসেবে দেখছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, আইনের রক্ষক যখন আইন ভঙ্গ করেন তখন সাধারণ মানুষের আশ্রয়ের কোনো জায়গা থাকে না। প্রয়োজনীয় পুলিশী সেবা নিশ্চিত করতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরই উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য পুলিশের অপরাধ-প্রবণতা কমাতে কঠোর আইন প্রণয়ন ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। তাদের মতে, অপরাধে জড়িত পুলিশ সদস্যদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হয় না বলেই অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বাড়ছে। এসব পুলিশ সদস্যের শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য আইন যুগোপযোগী করা জরুরি।
জানতে চাইলে সাবেক আইজিপি হাদিস উদ্দিন বলেন, ‘কতিপয় পুলিশ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, এমন ঘটনা আগেও ছিল। টাকা দিয়ে পুলিশ বিভাগে আসছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। যদি এমনই ঘটে, তাহলে তো সেবার কথা ভুলে পুলিশের টার্গেট থাকবে টাকা কামানো। আর এ টাকা কামাতে গিয়েই পুলিশ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, যা অনৈতিক।
জনগণের জান-মালে নিরাপত্তা দেওয়াই তাদের মূল কাজ সেই বাহিনীর ওপর এতোসব অভিযোগের কিছু কারণ তুলে ধরলেন সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, পুলিশ অপরাধ করার পর কোন শাস্তি হয় না। যার  ফলে দেখা যায় যে, তারা কিছুটা উৎসাহিত হয়। তাই আমি বলতে চাই যে, পুলিশ বাহিনীকে রাজনীতি থেকে মুক্ত রাখতে হবে। নয়তো এমন অপকর্ম বন্ধ হওয়ার কোন সম্ভাবনাই নেই।
অপরাধ বিশ্লেষক শেখ হাফিজুর রহামান কার্জান বলেন, যারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে কাজ করে তাদের দুর্নীতিতে জড়ানোর সুযোগ অনেক বেশি। কারণ, যেই ক্ষমতায় থাকুন না কেন পুলিশকে দলীয় স্বার্থে যেভাবে ব্যবহার করে, তার ফলে দেখা যায় যে, আস্তে আস্তে পুলিশও অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ