শুক্রবার ১৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

সংকট উত্তরণে আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় ঐকমত্য গঠনই একমাত্র পথ - মির্জা ফখরুল

স্টাফ রিপোর্টার: নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার প্রস্তাব নিয়ে প্রেসিডেন্টের সাথে আলোচনা করতে বঙ্গভবন থেকে সাড়া না পাওয়ায় রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি দিয়েছে বিএনপি। গতকাল বুধবার বিকেলে বঙ্গভবনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত চিঠিটি পৌঁছে দেন দলের সহ-দফতর সম্পাদক মনির হোসেন, বেলাল আহমেদ ও সহপ্রচার সম্পাদক আসাদুল করীম শাহিন।
তার আগে গতকাল দুপুরে নয়া পল্টনে দলীয় কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বলেন, রাষ্ট্রপতির সাক্ষাতের জন্য যোগােেযাগ করেও বঙ্গভবনের সাড়া না পাওয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই চিঠি পাঠাচ্ছেন তারা। খালেদা জিয়ার প্রস্তাবাবলী পেশ করার জন্য তার একান্ত সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার রোববার রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিবের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছিলেন। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বিএনপির তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি প্রতিনিধি দলের সাক্ষাতের সময় চেয়েছিলেন। কিন্তু সামরিক সচিব এই বিষয়ে কিছু জানাননি। আমরা আজকে (গতকাল) লিখিতভাবে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ চেয়ে চিঠি দিচ্ছি। বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমরা আশা করছি, রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে তিনি আমাদের প্রতিনিধিদলকে সাক্ষাতের একটা সময় দেবেন।
মির্জা ফখরুলের সঙ্গে সাংবাদিক সম্মেলনে থাকা সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি দেওয়ার ব্যাখ্যা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমরা মানি বা না মানি, ভালো বা মন্দ, বাস্তবতার নিরিখে আমাদেরকে স্বীকার করতে হবে যে আমাদের একজন রাষ্ট্রপতি আছেন। রাষ্ট্রপতি ইজ এন ইন্সটিটিউশন। কে ওখানে আছে, কীভাবে আছে, সেটা বড় কথা নয়। আমরা মনে করি, তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান। সেখানে তাকে যদি আমরা উৎসাহী করতে পারি, আমার মনে হয়, এই সমস্যা সমাধানে তিনি একটি ভূমিকা রাখতে পারেন।
সাংবাদিক সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আবদুস সালাম, আবুল খায়ের ভুঁইয়া, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক জয়নাল আবেদীন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে মির্জা ফখরুল বলেন, বেগম  খালেদা জিয়ার এই প্রস্তাব উত্থাপনের পরে দেশের রাজনীতিবিদ, সিভিল সোসাইটির অনেকে, জাতীয়  দেনিকগুলো, নির্বাচন নিয়ে কাজ করেন এই ধরনের সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গ তাদের মতামত প্রদান করেছেন, আলোচনা-সমালোচনা করেছেন। আমরা এতে অনুপ্রাণিতবোধ করছি, আমরা এটাই চাচ্ছিলাম। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, সাবেক বিরোধীদলীয় নেত্রী তার জাতির প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেই জাতির এই চলমান রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য দলের পক্ষ থেকে একটি সুচিন্তিত প্রস্তাব পেশ করেছেন এবং পরের দিনই টুইটারে তিনি জানিয়েছেন এই প্রস্তাবলী কোনও শর্ত আরোপ করা নয়। রাষ্ট্রপতি এবং সরকার এই প্রস্তাবের ওপর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে পরবর্তী নির্বাচন কমিশন গঠন করতে পারেন অথবা এর উপর রাজনৈতিক দলগুলোর সংগে আলোচনা করে আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে। কোথাও বলা হয়নি যে, এই প্রস্তাবগুলোই গ্রহণ করতে হবে। তবে এই প্রস্তাবগুলো প্রণয়ন করা হয়েছে বর্তমান পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিপ্রেক্ষিতে। যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হচ্ছে আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় ঐকমত্য। মূলত সকল দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোন বিকল্প নেই।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, বেগম জিয়ার প্রস্তাবগুলোর পক্ষে-বিপক্ষে লেখা-লেখি হচ্ছে এটা আমাদের অনুপ্রাণিত করছে। গণমাধ্যমকে আমরা ধন্যবাদ জানাচ্ছি যেসব প্রশ্ন উঠেছে সেই বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা প্রদান করা আমাদের দায়িত্ব। তিনি বলেন, আমরা সংবিধান সামনে রেখেই প্রস্তাবগুলো উত্থাপন করেছি। সুতরাং সংবিধান কোথাও লঙ্ঘিত হয়েছে বলে আমরা মনে করি না। সকল দলের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে প্রস্তাবনায় সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে সকল দল বলতে আমরা কি বলতে চেয়েছি। এখানে অস্পষ্টতার বা কৌশলের কিছু নেই। বাস্তবতার আলোকেই এই প্রস্তাব প্রদান করা হয়েছে।  নির্বাচন কমিশন গঠন বিষয়ে বিএনপি কোন আইন করতে চায় না কেন এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে “প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চার জন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচিত কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোন আইনের বিধানাবলীর সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।” আমরা সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল তবে বর্তমানে ১৫৪ জন অনির্বাচিত সদস্য নিয়ে যে সংসদ বহাল আছে সে সংসদ যদি কোন আইন বা বিধি প্রণয়ন করে তার  নৈতিক ভিত্তি হবে খুবই দুর্বল এবং এ সংসদ প্রণীত আইন  নৈতিকভাবে দুর্বল অবস্থানে থেকে যেভাবে এবং যে ভাষায় প্রণীত হবে, তা অনেক রাজনৈতিক দলের কাছ এমন কি দেশবাসীর কাছে অগ্রহণযোগ্য হয়ে যেতে পারে তবে সকল নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল সমঝোতা ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই আইনের যে কাঠামো এবং শর্তাবতলী নির্দিষ্ট করে দেবে তার হুবহু অনুসরণ করে আইন প্রণীত হলে তা আমাদের নিকট গ্রহণযোগ্য হবে এবং আমরা তা অভিনন্দিত করব।
 সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দেয়ার মধ্য দিয়ে বিএনপি দেশে সামরিক আইন চায় নাকি ? এমন বক্তব্যে মির্জা ফখরুল বলেন, নির্বাচনকালীন সময়ে প্রতিরক্ষা বাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতাসহ মোতায়েনের যে প্রস্তাব করা হয়েছে তাকে কোনক্রমেই সামরিক আইন বলা যাবে না। কারণ জাতীয় প্রয়োজনে বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় প্রতিরক্ষা বাহিনীকে নিয়োজিত করার সুযোগ আছে । তার অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। এধরনের মোতায়েনকে সামরিক আইন বলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার কোন সুযোগ নেই। প্রতিরক্ষা বাহিনী একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। জাতীয় প্রয়োজনে প্রতিরক্ষা বাহিনীকে দায়িত্ব পালন করতে দেয়া কোনক্রমেই বেসামরিক কর্তৃপক্ষের অবস্থান ও কর্তৃত্ব ক্ষুণœ করে না।
 প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক ক্ষমতা খর্ব করার বিষয়ে ফখরুল বলেন, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাকে খর্ব করার জন্য কোন প্রস্তাবনা করা হয়নি। চেতনাগতভাবে আমাদের প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির কাজকে সহায়তা করবে এবং রাষ্ট্রপতির ভাবমূর্তিকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য কমিশনারদের নিয়োগের ব্যাপারে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাকে এই প্রস্তাবনায় কোনভাবেই সীমাবদ্ধ করা বা এতে কোন প্রকান ব্যত্যয় ঘটানোর চেষ্টা করা হয়নি। আমরা রাষ্ট্রপতিকে  সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করি এবং তার এই অবস্থান আমাদের দৃষ্টিতে অলংঘনীয়। নির্বাচন কমিশন গঠনে বিচার বিভাগকে উপেক্ষা করার বিষয়টি সঠিক নয় মন্তব্য করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, বিচার বিভাগের ওপর আমাদের অবিচল শ্রদ্ধা রয়েছে। তবে হাইকোর্টের এক রায় অনুযায়ী আপীল বিভাগ কিংবা হাইকোর্টের কোন বিচারপতি (কর্মরত কিংবা অবসর গ্রহণের পর) নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ লাভের যোগ্য হবেন না। কেননা নির্বাচন কমিশন আধা-বিচারিক প্রতিষ্ঠান নয়।
নির্বাচনকালীন সময়ে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের (বিশেষ করে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, থানার ওসি) গণহারে প্রত্যাহার করার কারণ ব্যাখ্যা করে মির্জা ফখরুল বলেন, বর্তমান আওয়ামী লীগ বা মহাজোট সরকার কিভাবে প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নিরাপত্তা পর্যন্ত দলীয়করণ করেছে। নির্বাচনের সময় সরকারি দলের সাজোনো মাঠ কর্মকর্তারা নির্বাচন পরিচালনা এবং আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকলে ফলাফল কি হয় তাতো দেশবাসী দেখতেই পাচ্ছে। এটা সত্য যে, বর্তমানে দলীয়করণের মাত্রা এত ব্যাপক যে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার করে নতুন যাদের পদায়ন করা হবে তারাও মোটামুটি সরকারি দলের পছন্দের কর্মকর্তারাই হবেন। তবে যেহেতু সংশ্লিষ্ট জেলায় নির্বাচনপূর্ব পাঁচ বছর কাল ধরে তারা কোন পদমর্যাদায় কর্মরত ছিলেন না, আশা করা যায় নতুন পোস্টিং নিয়ে জেলা/উপজেলা/থানায় গেলে ঐ কর্মস্থলের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত সখ্যতা থাকবে না, বা সখ্যতা নিবিড় হওয়ার আগেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তাতে কিছুটা হলেও তাদের নিরপেক্ষ ভূমিকা আশা করা যায়।
সরকারের প্রতি মির্জা ফখরুল বলেন, অহেতুক কালক্ষেপণ না করে, একগুঁয়েমি পরিত্যাগ করে জাতির মঙ্গলের জন্য একটি গণতান্ত্রিক কাঠামো গঠনের জন্য প্রতিনিধিত্বশীল পার্লামেন্ট গঠনের পরিবেশ নিশ্চিৎ করুন। শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য স্বাধীন, নিরপেক্ষ, সাহসী নির্বাচন কমিশনের কোন বিকল্প নেই।  আসুন আমরা সবাই সেই লক্ষ্যে বেগম জিয়ার এই প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করে একটি জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলি এবং এই রাজনৈতিক সংকট থেকে মুক্ত হয়ে, অর্থনৈতিক মুক্তির পথে একযোগে কাজ করি। আমরা ব্যর্থ হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে, জনগণের কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে। আমরা ব্যর্থ হতে চাই না। সকল বাধা অপসারণ করে বিজয় অর্জন করতে চাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ