মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

বদলে যাওয়া অন্য এক ব্রাজিলের দেখা

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল যেন নিজেদের পুরনো সময়ে ফিরে এসেছে। আর বাছাইপর্বে এবার নিজেদেরকে ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে গেলো ব্রাজিল। কোচ লিওনার্দো বাচ্চির তিতের অধীনে টানা পাঁচ জয়ে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে তারা। ১২ ম্যাচে ৮ জয়, ৩ ড্র ও ১ হারে ২৭ পয়েন্ট তাদের। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে সময়টা দুর্দান্ত যাচ্ছে সেলেসাওদের। আগের ম্যাচেই মিনেইরোতে আর্জেন্টিনাকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল তারা। এরপর লিমায় পেরুর বিপক্ষে ২-০ গোলের জয় বাছাইপর্বে টানা ছয় ম্যাচে সাফল্যের হাসি হাসল তিতের দল। ১৯৬৯ সালে পেলে-কার্লোস আলবার্তোর ব্রাজিলের পর এই প্রথমবারের মতো বাছাইপর্বে টানা ছয় ম্যাচ জয়ের কীর্তি গড়ল নেইমার-জেসুস-আগুস্তোদের ব্রাজিল। পেরুর বিপক্ষে জয় বাছাইপর্বে লাতিন অঞ্চলে ৪ পয়েন্টের পরিষ্কার ব্যবধানে শীর্ষস্থানটা বজায় রাখল পেলে, রোনাল্ডিনহো, রোনাল্ডোদের উত্তরসূরীরা। লিমায় আক্রমণ-প্রতি আক্রমণের এই ম্যাচটা দারুণ জমেছিল। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে গ্যাব্রিয়েল জেসুস আর রেনাতো আগুস্তো নিশ্চিত করেন ব্রাজিলের জয়। জেসুসের গোলটি ম্যাচের ৫৮ মিনিটে। দলকে এগিয়ে দেয়ার পাশাপাশি ৭৮ মিনিটে রোনাতো আগুস্তোর দ্বিতীয় গোলেও দারুণ অবদান তাঁর। আগের ১০ ম্যাচে ব্রাজিলের সঙ্গে একবারও জিততে না পারা পেরু নিজেদের মাঠে দাঁতে দাঁত চেপেই লড়াই করে গেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের হার দুটি দারুণ ফিনিশিংয়ের কাছে। ভালো খেলেও খালি হাতে মাঠ ছাড়ার বেদনাটা ভালোই টের পাচ্ছেন পেরুর আর্জেন্টাইন কোচ রিকার্ডো গারেসা। ম্যাচের সাত মিনিট না গড়াতেই ব্রাজিলকে পেছনে ফেলার ওই সুযোগটা যদি ক্রসবারে লেগে ফেরত না আসত, তাহলে হয়তো গল্পটা একটু অন্যভাবেই বলতে হতো। ম্যাচের সপ্তম মিনিটে কুয়েভার সঙ্গে ওয়ান-টু খেলে ব্রাজিলের রক্ষণে ঢুকে পড়েন পেরুর আন্দ্রে কারিলো। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাঁর। বলটি ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। ম্যাচের ৫৮ মিনিটে নিখুঁত লক্ষ্যভেদে ব্রাজিলকে এগিয়ে দেন জেসুস। ডি-বক্সের মধ্যে কুতিনহো বল নিয়ে ঢুকে পড়ে গেলেও পেরুর এক রক্ষণভাগের খেলোয়াড়ের পায়ে লেগে বল ফাঁকায় দাঁড়ানো জেসুসের কাছে চলে এলে তিনি গোল করেন। ৭২ মিনিটে ক্রিস্টিয়ান রামোস গোলটি শোধ করে দিতে পারতেন। কিন্তু তাঁর হেড অল্পের জন্য পোস্টের বাইরে দিয়ে চলে যায়। ৭৬ মিনিটে কুতিনহোর পাস থেকে বল পেয়ে নেইমারের নেওয়া তীব্র শটটি ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। ৭৮ মিনিটে জেসুসের পাস থেকে গোল করে ব্রাজিলকে ২-০ গোলে এগিয়ে নেন আগুস্তো। পেরুর ডি-বক্সের মধ্যে ঢুকে ফাঁকায় আগুস্তোর দিকে বাড়িয়েছিলেন তিনি। আগুস্তো বল জালে পাঠাতে একেবারেই ভুল করেননি। দলের জয়ে অবদান রাখতে পেরে দারুণ খুশি জেসুস। ম্যাচ শেষে তিনি টিভি গ্লোবোর সঙ্গে আলাপচারিতায় বলেছেন, ‘আমি চুপচাপ পরিশ্রম করে যাচ্ছি। পরিশ্রমটা করি মাঠে দলকে, দলের খেলোয়াড়দের সাহায্য করতে।’ পরিবর্তনের হাওয়াটা টের পাওয়া যাচ্ছিল রিও অলিম্পিক থেকেই। দুঙ্গার ‘মিলিটারি’ ফুটবল নয় বরং ব্রাজিলের ‘জোগো বনিতো’ই খেলছিল নেইমার-গ্যাব্রিয়েল জেসুসদের পায়ে। তবে বিশ্বকাপ বাছাই তো আর অলিম্পিক নয়! এখানে বয়সভিত্তিক দলও খেলে না, আর খেলাটাও চড়–ইভাতির মেজাজের নয়। তাই তিতে যখন দায়িত্ব নিচ্ছেন, তখনো বিশ্বকাপ বাছাই যোগ্যতার বাইরে থাকা ব্রাজিলকে নিয়ে দুশ্চিন্তা। জুনে দায়িত্ব নিলেন তিতে আর নভেম্বরের মাঝামাঝিতে এসেই ব্রাজিলের রাশিয়ার টিকিট প্রায় নিশ্চিত, এখন তারা লাতিন অঞ্চলের পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে। কোন যাদুছড়িতে এমন ১৮০ ডিগ্রি পরিবর্তন? ফুটবল বিশ্লেষকরা বলছেন, তিতে আসলে পরিবর্তন ঘটিয়েছেন খেলোয়াড়দের মনোজগতে। সঙ্গে যোগ হয়েছে নেইমার ম্যাজিক। একটা সময় ব্রাজিলের দলটাকে ঠাট্টা করে সমর্থকরাই বলত, ‘বিখ্যাত অজ্ঞাতজনরা’। দুঙ্গা অচেনা অনেকের গায়েই তুলে দিয়েছিলেন ব্রাজিলের জার্সি। কিন্তু তিতে এসে আস্থা রেখেছেন ইউরোপের ক্লাব ফুটবলে নিয়মিত খেলা ফুটবলারদের ওপরই। মিরান্ডা, মারকুইনহোস, ফের্নান্দিনিয়ো, কৌতিনিয়োদের ওপরই। তিতে নতুন করে চাকা আবিষ্কার করার চেয়ে হাতে যেসব খেলোয়াড় আছেন (৭-১ গোলে হারের পর যাদের বলা হয় অভিশপ্ত প্রজন্ম), তাদেরই নতুন ছকে ও কৌশলে কার্যকর একটি দলে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাদের দিয়ে নতুন করে কিছু না করাতে চেয়ে, ক্লাব ফুটবলে দিনের পর দিন যে কাজটা করে তারা অভ্যস্ত, সেটাই করাতে চেয়েছেন। অর্থাৎ দলের কৌশলে খেলোয়াড়দের অভ্যস্ত না করিয়ে খেলোয়াড়দের অভ্যস্ত কৌশলেই পরিকল্পনা করে ছক কষেছেন। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে কৌতিনিয়োর গোলের কথাই ধরা যাক। কৌতিনিয়োর চলন দেখে আর্জেন্টিনার রেডিও ধারাভাষ্যকার বুঝে গিয়েছিলেন, গোল হতে যাচ্ছে! কারণ লিভারপুলে এমন গোল তো বেশ করছেন এই ব্রাজিলিয়ান। দুঙ্গার বিদায়ে উধাও হয়েছে ড্রেসিংরুমের গুমোট ভাবও। নেইমারই একবার বলেছিলেন, ড্রেসিংরুমের পরিবেশ এত ভারী যে কাটতে চাকু লাগবে। গুরুগম্ভীর দুঙ্গার বদলে স্নেহশীল তিতে অনেকটাই সহজ করে তুলেছেন ড্রেসিংরুমের পরিবেশ, এখন সেখানে সংঘাতের বদলে সান্তুতনার সুর। দলে নতুন ও পুরনোর ভারসাম্যটাও ঠিকঠাক রাখতে পেরেছেন তিতে। ইকুয়েডরের বিপক্ষে ম্যাচে সুযোগ দিলেন গ্যাব্রিয়েল জেসাসকে। অভিষেকেই গোল করে ব্রাজিলের জয়ে দারুণ ভূমিকা রেখেছেন বছর উনিশের এই তরুণ। আবার সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসেবে থিয়াগো সিলভাকে ফিরিয়ে না এনে মারকুইনহোসেই রেখেছেন আস্থা। মোদ্দা কথা, ব্রাজিলের ‘ফুটবল ইঞ্জিন’টার একেবারে খোল নলচে বদলে ফেলে নতুন কিছু করে দেখানোর উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার পথে হাঁটেননি তিতে। বরং প্রথাগত ইঞ্জিনের কিছু ‘যন্ত্রাংশ’ পাল্টেছেন, কিছু এদিক-ওদিক করেছেন, কোথাও গ্রিজ লাগিয়েছেন। এর ফলেই চাকা ঘুরছে বন বন করে! তবে সেই যন্ত্রের নিউক্লিয়াস নিঃসন্দেহে নেইমার। তিতের কাজটা যে নেইমার অনেকটাই সহজ করে দিয়েছেন সেটা স্পষ্ট পরিসংখ্যানেই। তিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর বাছাইপর্বে নেইমার এখন পর্যন্ত করেছেন ৪ গোল আর অ্যাসিস্ট করেছেন ৫ গোলে। এই সময়ে ব্রাজিল করেছে ১৭ গোল, যার ৯টিতেই প্রত্যক্ষ অবদান নেইমারের। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে করলেন ম্যাচের দ্বিতীয় গোলটি, ঠিক বিরতিতে যাওয়ার আগে। তাতে মুহূর্তেই পাল্টে গেল ম্যাচের রং। তাই তো ম্যাচশেষে মেসিও বললেন, ‘প্রথম গোলটায় আমরা পিছিয়েছি, কিন্তু দ্বিতীয় গোলটা আমাদের ধ্বংস করে দেয়।’ বিশ্ববিখ্যাত একটি বীমা প্রতিষ্ঠান মেটলাইফ। আমেরিকান ফুটবলের জনপ্রিয় দু’টি দল; নিউ ইয়র্ক জায়ান্টস ও নিউ ইয়র্ক জেটস খেলে এই মাঠে। বছরছয়েক আগে এই মাঠেই গোলের খাতায় প্রথম ‘প্রিমিয়াম’ জমা দিয়েছিলেন নেইমার। চব্বিশের এই তরুণ তখন আঠারোর সদ্য যুবক। মাত্র ৬ বছরেই, গোলের খাতায় হাফসেঞ্চুরি এই ব্রাজিলিয়ানের। পঞ্চাশতম গোলের মাইলফলকে পা দিয়েছেন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে। যে ম্যাচে জিতে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ সংক্রান্ত চিন্তাভাবনাকে আপাতত শীতঘুম পাড়িয়েছে ব্রাজিল। অভিষেকের পরের বছর, অর্থাৎ ২০১১ সালে নেইমারের গোলসংখ্যা ৭। এরপর যতই পরিণত হয়েছেন, ততই ধার বেড়েছে তাঁর। ২০১২ সালে করেছেন ৯ গোল, ২০১৩ সালে এসে করেছেন ১০ গোল। ২০১৩ সালে জীবনটা বদলে গেল, এলেন বার্সেলোনায়। তারপর কাতালান বৃহস্পতি লিওনেল মেসির পাশে নেইমারও নিজ যোগ্যতায় করে নিলেন নিজস্ব জায়গা। একসময় এলেন লুই সুয়ারেসও। এই ত্রয়ীর রসায়নে ফুটবল পেল নতুন বিনোদন আর নেইমারও হয়ে উঠলেন আরো ধারালো। ২০১৪ সালটা হয়তো বিশ্বকাপ দুঃস্বপ্নের বছর হিসেবেই মনে রাখবেন নেইমার, কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে ব্যক্তিগত হিসেবে সেটাই ব্রাজিলের হয়ে তাঁর সফলতম বছর; কারণ সে বছর তিনি করেছেন ১৫ গোল। ২০১৫ সালে ৪ গোল আর চলতি বছর এখন পর্যন্ত করেছেন ৪ গোল। এই হচ্ছে গোলের হাফসেঞ্চুরির বছরভিত্তিক খতিয়ান। নীল-হলুদে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় পেলে, রোনালদো ও রোমারিওর মতো তিন কিংবদন্তি। যাদের পায়ের ছাপে পা মিলিয়ে এগোচ্ছেন নেইমার, সেই পথ ধরে শেষটুকু যদি যাওয়া যায় তা হলে কিংবদন্তির মর্যাদা যে তাঁর জন্যও অপেক্ষা করছে সেটা বোধ হয় এখনি বলে দেওয়া যায়। সবচেয়ে বেশি ৭৭ গোল পেলের, করেছেন ৯২ ম্যাচে।
রোনালদোর ৯৮ ম্যাচে ৬২ গোল, রোমারিওর ৭০ ম্যাচে ৫৫ আর নেইমারের হলো ৭৪ ম্যাচে ৫০ গোল। অর্থাৎ ম্যাচপ্রতি গড়ে ০.৬৭ গোল যেটা, রোনালদোর চেয়ে বেশি। রোনালদো তো ছিলেন পুরোদস্তুর স্ট্রাইকার, নেইমারকে কিন্তু গোলের বল জোগানোর কাজটাও করে যেতে হয়! তাই বলা যায়, নেইমার গোল করে ও করিয়ে দু’ভাবেই অবদান রাখছেন ব্রাজিলের ‘জোগো বনিতো’য় ফেরার গল্পে! ২০০৯ সালে, অনূর্ধ্ব ১৭ বিশ্বকাপে জাপানের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচে নেইমারের গোলটা দেখে অভিভূত পেলে ও রোমারিও সেসময়কার কোচ দুঙ্গাকে অনুরোধ করেছিলেন ২০১০ বিশ্বকাপের দলে তাঁকে নিতে। দেমাগি দুঙ্গা নেননি, ১৪ হাজার স্বাক্ষরের ‘পিটিশন’ও পারেনি তাঁর মন গলাতে। এখন ১৪ লাখ স্বাক্ষরের পিটিশন পাঠিয়েও দুঙ্গা তৃতীয়বারের মতো কোচ হতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও নেইমার যে আরো অনেক দিন নীল-হলুদের ফুল ফোটাবেন তা নিয়ে সন্দেহ নেই। আর বল নেইমারের পায়ে থাকলে তাতে ছড়াবে সাম্বার ছন্দই, সামরিক কুচকাওয়াজ নয়। এখন আগামী বিশ্বকাপ জয়ের দাবীদার হিসেবে ব্রাজিলের নামটি থাকবে সবার উপরে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ