বুধবার ২১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

বিপিএল-এ মুশফিক ও সাব্বিরের রেকর্ড

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : জমে উঠেছে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ বিপিএল। এখন পর্যন্ত সবার পেছনে রয়েছে গতবারের চ্যাম্পিয়ন মাশরাফির কুমিল্লা। প্রায় প্রতিদিনই বাংলাদেশী খেলোয়াড়রাই আলো ছড়াচ্ছেন এবারের বিপিএল-এ। বিশেষ করে তামিম ইকবাল, ইমরুল কায়েস, সাব্বির রহমান, মুশফিকুর রহীম, শাহরিয়ার নাফিস, মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের উল্লেখ যোগ্য। এবারের আসরে এখন পর্যন্ত ঝড়ো ব্যাটিংয়ের জন্য আলোচিত হয়ে আছেন সাব্বির রহমান ও মুশফিকুর রহিম। এর পাশাপাশি এই দুইজনই এবকারের বিপিএল-এ ইতহাস গড়েছেন। বিপিএল’র ইতিহাসে রেকর্ড সেরা সেঞ্চুরী করেছেন সাব্বির। এর পাশাপাশি মুশফিকুর পাড়ি দিয়েছেন এক হাজারি ক্লাব।
দিনটি ছিল ১৩ নবেম্বর। প্রথমে মুশফিকুর রহীমের ঝড়ো ব্যাটিং। এরপর তাকেও ছাড়িয়ে গেলেন সাব্বির রহমান। মুশফিক ৫২ বলে ৮১ রানের অপরাজিত একটি ইনিংস খেলেন বরিশাল বুলসের হয়ে। তার মোক্ষম জবাব আরও বিধ্বংসী হয়েই দিলেন রাজশাহী কিংসের সাব্বির। চলতি বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ (বিপিএল টি২০) আসরের প্রথম সেঞ্চুরিটা আসল তার ব্যাট থেকে। মাত্র ৫৩ বলেই সেঞ্চুরি হাঁকানোর পর ১২২ রান করে ফিরে গেছেন সাজঘরে। এটি ছিল বিপিএল ইতিহাসের নবম শতক। তবে বিপিএল’র চতুর্থ দ্রুততম শতক এটি। এর আগে বাংলাদেশী ক্রিকেটারদের মধ্যে শুধু শাহরিয়ার নাফিস ও মোহাম্মদ আশরাফুলই হাঁকিয়েছেন সেঞ্চুরি। তবে সাব্বিরের ১২২ বিপিএল’র রেকর্ডে সেরা। কারণ এটিই এখন পর্যন্ত বিপিএল ইতিহাসে কোন ক্রিকেটারের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস। আর নাফিস ও আশরাফুলের চেয়ে দ্রুতগতির সেঞ্চুরি।
এবার বিপিএলের চতুর্থ আসরের শুরু থেকেই লো স্কোরিং ম্যাচ হয়েছে। টি-২০ ক্রিকেটের সঙ্গে মানানসই কোন বিধ্বংসী ইনিংস দেখা যায়নি। তাই যেন চার-ছক্কা দেখার জন্য দর্শকদের মাঝে যে উন্মাদনা, সেটাই যেন কমে যাচ্ছিল। দর্শক উপস্থিতিও হ্রাস পাচ্ছিল ক্রমেই। তবে ক্রিকেটাররা বারবার দাবি করছিলেন উইকেটের কোন সমস্যা নেই। স্পোর্টিং উইকেট গড়া হয়েছে বিপিএলের জন্য, যেখান থেকে ব্যাটসম্যান এবং বোলার উভয়ে সমান সুযোগ তুলে নিতে পারে। তবে সেটার বাস্তব কোন দৃষ্টান্ত দেখা যায়নি। ব্যাটসম্যানরাই ব্যর্থ হয়েছেন এবং উইকেটের আচরণে মনে হয়েছে রান করা অনেক কঠিন এখানে। তবে বিপিএল’র ৬ষ্ঠ দিনে সেটার ব্যতিক্রম দেখা গেল। প্রথম ব্যাট করে রাজশাহী তুললো ৪ উইকেটে ১৯২ রানের বিশাল সংগ্রহ। সেটা বড় হলো মূলত মুশফিকুর রহীমের দুর্ধর্ষ একটি ইনিংসের কল্যাণেই। বিপিএল শুরুর আগেই তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন টি২০ ক্রিকেটে যে মেজাজে খেলেন তিনি সেই স্বরূপে ফিরতে চান। প্রথম থেকেই কথার সঙ্গে কাজের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছিল। প্রথম ম্যাচে অর্ধশতক (৩৬ বলে ৫০*), পরের ম্যাচে ২৩ বলে ৩৩ রান করার পর এবার আরও তাণ্ডব চালালেন। ৪০ বলে ফিফটি হাঁকানোর পর বিধ্বংসী হয়ে গেলেন। বাকি ১২ বলে আরও ৩১ রান করেন। সবমিলিয়ে ৫২ বলে ৫ চার ও ৪ ছক্কায় অপরাজিত ৮১ রান মুশফিকের। চলতি আসরের সেরা ব্যক্তিগত ইনিংসটার সুবাদে সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ ৪ উইকেটে ১৯২ রানও ওঠে বরিশাল বুলসের। তবে রাজশাহী ব্যাটিংয়ে নামার পর ম্লান হয়ে গেলেন মুশফিক। রাজশাহীর শুরুটা প্রথম ওভারেই রকিবুল হাসানকে হারিয়ে শুরু হয়েছিল।
তবে সেদিকে তেমন গুরুত্বই দিলেন না স্বভাবজাত হিসেবে বিধ্বংসী ব্যাটসম্যান সাব্বির। আগের দুই ম্যাচে নিজের খেলা ইনিংস নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। এদিন সেটা পুষিয়ে দিলেন। যদিও ব্যক্তিগত ১৪ রানেই সহজ একটি ক্যাচ দিয়েছিলেন, সেটা হাতছাড়া করেন আল আমিন হোসেন। এরপর আরও চড়াও হয়ে ওঠেন সাব্বির। একের পর এক চার-ছক্কার ফুলঝুরি ছুটিয়ে চলতি বিপিএল’র সবচেয়ে জমজমাট ম্যাচ করে তোলেন এটিকে। ক্যাচ মিস মানেই ম্যাচ মিস। সাব্বিরকে প্রাণ দেয়ার খেসারত দিতে হয়েছে। কারণ বলা হয়ে থাকে সাব্বির টি-২০ স্পেশালিস্ট। সেটার স্বাক্ষর তিনি ইতোমধ্যেই দেখিয়েছেন আন্তর্জাতিক টি২০ ম্যাচে। শেষ পর্যন্ত মাত্র ২৬ বলেই ফিফটি পেয়ে যান তিনি। এরপর হয়ে ওঠেন আরও দুরন্ত। সেঞ্চুরি হাঁকাতে সবমিলিয়ে ৫৩ বল লেগেছে তার। এটি বিপিএল’র হওয়া নবম সেঞ্চুরি। তবে দ্রুতগতির দিক থেকে চার নম্বরে। আহমেদ শেহজাদ ৪০ বলে, ক্রিস গেইল ৪৪, ৪৬ ও ৫৩ বলে সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিলেন। তবে কোন বাংলাদেশীর পক্ষে টি-২০ ক্রিকেটে দ্রুতগতির সেঞ্চুরিটা সাব্বিরেরই। নাফীস ৬৭ ও আশরাফুল ৫৬ বল খেলে শতক হাঁকিয়েছিলেন। সাব্বিরের ব্যাটিংয়ে নিশ্চিত জয়ের পথেই এগিয়ে যাচ্ছিল রাজশাহী। কিন্তু তিনি ৬১ বলে ৯ চার ও ৯ ছক্কায় ১২২ রানে ফিরে যান। এরপর আর জিততে পারেনি রাজশাহী। কিন্তু বিপিএল ইতিহাসের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস খেলেছেন সাব্বির। ২০১২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রথম আসরে ক্রিস গেইল বরিশাল বুলসের হয়ে খেলেছিলেন ১১৬ রানের ইনিংস। সেটাই ছিল বিপিএল’র সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ড। নতুন রেকর্ড গড়লেন এবার সাব্বির।
এদিকে এবারের নিজের জাত চিনিয়ে যাচ্ছেন দেশের সফল টেস্ট অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম। যদিও বিপিএল’র গত আসরে অনুজ্জ্বল ছিলেন মুশফিকুর রহিম। তবে বাংলাদেশের ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক এই টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান তিনিই। সবার আগে বিপিএল-এ নিজের রান চার অঙ্কে নিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন এই ডানহাতি উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান। গত ১৪ নবেম্বর সোমবার মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে মুশফিক যখন ক্রিজে আসেন তখন বরিশাল বুলসের দরকার ৬ বলে ৭ রান। চিটাগং ভাইকিংসের শুভাশীষ রায়ের প্রথম চার বলে ১০ রান তুলে নেন অধিনায়ক। প্রথম চারটি হাঁকিয়ে দুই দলের স্কোর সমান করার সঙ্গে প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে বিপিএল-এ পৌঁছান ১ হাজার রানে। সব মিলিয়ে ৩৫ ইনিংসে সাতটি অর্ধশতকসহ তার রান ১ হাজার ৫। ৪১.৮৭ গড়ে রান করেন তিনি। বিপিএল’র প্রথম আসরে দুরন্ত রাজশাহীর হয়ে ৯ ইনিংসে ৩৪ গড়ে ২৩৪ রান করেন মুশফিক। সেই আসরে একবার পৌঁছান অর্ধশতকে। সিলেট রয়্যালসের হয়ে দ্বিতীয় আসরটি দারুণ কাটে মুশফিকের। সেবার ১৩ ইনিংসে ৪০ গড়ে ৪৪০ রান করেন এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান। ওই আসরে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলেন তিনি। ব্যক্তিগত সেরা ৮৬ রানের ইনিংসটি তখনই খেলেন তিনি। সিলেট সুপারস্টার্সের হয়ে পরের আসরটি ভালো কাটেনি। ২৬.১৬ গড়ে করেন ১৫৭ রান।
গতবারের ব্যর্থতা ভুলে এবার নিজেকে মেলে ধরতে উন্মুখ ছিলেন মুশফিক। বরিশাল বুলসের টপ অর্ডারের ব্যর্থতায় আগেভাগেই ক্রিজে আসা এই উইকেটরক্ষক-ব্যাটসস্যান সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন দুই হাতে। ঢাকা ডায়নামাইটসের বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই করেন অপরাজিত অর্ধশতক। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের বিপক্ষে করেন ৩৩ রান।
তৃতীয় ম্যাচে রাজশাহী কিংসের বিপক্ষে দলকে ১৯৩ রানের বিশাল সংগ্রহ এনে দিতে খেলেন ৫২ বলে অপরাজিত ৮১ রানের অসাধারণ এক ইনিংস। চারটি ছক্কার সঙ্গে হাঁকান পাঁচটি চার। সাব্বির সেঞ্চুরীর দিনেও ৮১ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলেন মুশফিক। আট শতাধিক রান নিয়ে এক হাজারের পথে রয়েছেন দেশের আরেক অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। পরের দুটি স্থানে আছেন এনামুল হক (৭৬২) ও ব্র্যাড হজ (৭৫৬)। পাঁচ নম্বরে থাকা মাহমুদউল্লাহর রান ও আটশ’ রানের বেশি। এর পর আছে নাসির হোসেন, শাহরিয়ার নাফীস ও জহুরুল ইসলামের নাম।
শুধু বিপিএল নয়, টেস্টেও এগিয়ে মুশফিকুর। দেশের হয়ে ৫০টি টেস্ট খেলে ফেলেছেন তিনি। আমাদের আর কজন খেলেছেন পঞ্চাশ টেস্ট? উত্তরটা, মোহাম্মদ আশরাফুল ৬১ টেস্ট আর হাবিবুল বাশার ৫০ টেস্ট। মুশফিকুর তৃতীয়। নিজের এমন রেকর্ড শুনে ক্ষণিকের জন্য হঠাৎ আনমনা হয়ে গেলেন অধিনায়ক। হয়তো ফিরে গেলেন অভিষেকের সময়টায়, এক লহমায় হয়তো ভেবে নিলেন গোটা ক্যারিয়ার! মুহূর্তেই আবার ফিরলেন বর্তমানে। মাইলফলকের সামনে দাঁড়িয়ে রোমাঞ্চের কথা জানালেন গণমাধ্যমকে। ‘৫০ টেস্ট মানে অনেক বড় ব্যাপার।
অবশ্যই খুব ভালো লাগছে। বিশেষ করে আমরা তো খুব বেশি টেস্ট খেলার সুযোগই পাই না। সেদিক থেকে ৫০ টেস্ট খেলা মানে অনেক বড় মাইলস্টোন। ভালো লাগবে এই টেস্টে যদি ভালো কিছু করতে পারি, আরও ভালো লাগবে দল ভালো কিছু করলে।’ এখনকার অধিনায়কের শুরুটা ছিল বিস্ময় জাগানিয়া। ২০০৫ সালে বাংলাদেশের ইংল্যান্ড সফরে জায়গা হলো ১৮ ছুঁই ছুঁই তরুণের। সফরের প্রথম প্রস্তুতি ম্যাচে খেলার সুযোগ পাননি। দ্বিতীয় ম্যাচে সাসেক্সের বিপক্ষে হোভে খেললেন ১৮ ও ৬৩ রানের ইনিংস। পরের ম্যাচে নর্দাম্পটনশায়ারের বিপক্ষে অপরাজিত ১১৫। সদ্য কৈশোর পেরুনো উইকেটকিপার ব্যাটসম্যানকে নিয়ে পড়ে গেল হইচই। তখনকার বাংলাদেশ দলের বাস্তবতায় টেস্ট অভিষেকটা এরপর অবধারিতই ছিল। ক্রিকেট তীর্থ লর্ডসে যেদিন টেস্ট ক্যাপ পেলেন মুশফিক, বয়স ১৭ বছর ৩৫১ দিন! অনেক ইতিহাসের সাক্ষী এই মাঠে এত কম বয়সে অভিষেক হয়নি আর কোনো ক্রিকেটারের, রেকর্ডটি টিকে আছে এখনও।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ