শুক্রবার ২১ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

মোবাইল ফোনের কলড্রপ আর এসএমএসে ভোগান্তি অতিষ্ঠ গ্রাহক॥ প্রতিকার-ক্ষতিপূরণ মিলছে না 

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : রাজধানীর সবুজবাগের বাসাবো বৌদ্ধমন্দির এলাকার জনৈক গণমাধ্যমকর্মী তার এক নিকটাত্মীয়ের কাছে জরুরী প্রয়োজনে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন । উভয়ের মধ্যে কথোপকথন হয় বেসরকারি মোবাইল অপারেটর কোম্পানী ‘রবি’র মাধ্যমে । দ’ু প্রান্তের মধ্যে কথা হয় ৬ মিনিট ১৮ সেকেন্ড । এই সময়টাতে তাদেরকে গুণে গুণে চারবার কলড্রপের শিকার হতে হয়েছে । এ অবস্থায় তারা ভোগান্তি ও বিড়ম্বনায় পড়েন । কোন কারণ ছাড়াই এ কলড্রপের শিকার ওই গ্রাহককে ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়নি । যদিও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন ( বিটিআরসি ) এর দেয়া গাইডলাইনে বলা আছে, শতকরা ৩ ভাগের বেশি কল ড্রপ হলে গ্রাহককে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এই কলড্রপের ঘটনা রোববারের সকাল ১১ টা ১৮ মিনিট থেকে ২৬ মিনিটের মধ্যে ঘটে । উক্ত গণমাধ্যমকর্মীর মত প্রতিদিন হাজারো গ্রাহককে কলড্রপের শিকার হতে হচ্ছে অথচ তারা না পান প্রতিকার ,না পান ক্ষতিপূরণ ।

কলড্রপের ঘটনাগুলো শুধু বিড়ম্বনা আর ভোগান্তিই সৃষ্টি করছে না । তার সাথে মোবাইল ফোনের গ্রাহকদেরকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে নানা ধরনের অফার সম্বলিত ‘কল’ আর ‘শর্ট ম্যাসেজ সার্ভিস ’( এসএমএস ) । এতে চরম প্রতারণা আর ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন মোবাইল ফোনের গ্রাহকরা। এসব উৎপাত আর উপদ্রবের কারণে দিনের পর দিন কমে চলেছে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী গ্রাহকের সংখ্যা । বিটিআরসির সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যে ( ২৩ অক্টোবর ’১৬) দেখা গেছে , দেশে সক্রিয় মোবাইল সংযোগসংখ্যা এক মাসের ব্যবধানে ৯২ লাখ কমে গেছে। একই সময়ে দেশে ইন্টারনেট সংযোগসংখ্যাও ১৭ লাখ কমেছে। এসব ইন্টারনেট সংযোগের বেশির ভাগই আবার মোবাইল ফোনভিত্তিক।

 মোবাইলফোনে কল ড্রপের কারণে প্রতিবছর গ্রাহকদের ৩শ’ ৪৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা ক্ষতি হয় বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ মোবাইলফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে নিবন্ধিত গ্রাহকের সংখ্যা ১১ কোটি ৭০ লাখ। এরমধ্যে প্রতিদিন কল ড্রপ হয় ১ কোটি ৬০ লাখ মিনিট। সর্বনিম্ন কল রেটের মূল্য ৬০ পয়সা ধরলে প্রতিদিন কল ড্রপের কারণে গ্রাহকের ক্ষতি হয় ৯৬ লাখ টাকা। যা মাসিক আকারে দাঁড়ায় ২৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

বেসরকারি মোবাইল ফোন অপারেটরদের গ্রাহক ভোগান্তি ও প্রতারণা, কল ড্রপ, ভয়েস কল ও ইন্টারনেটের বিভিন্ন বান্ডেল প্যাকেজ ও মূল্য সম্পর্কে জনগণের মতামত জানতে প্রথমবারের মতো গণশুনানির আয়োজন করেছে বিটিআরসি। আজ মঙ্গলবার এ গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে।

অভিযোগে জানা গেছে ,কল ড্রপ যেমন বেড়েছে, পাশাপাশি মোবাইল ফোনের কিছু সার্ভিসে বিরক্ত হচ্ছেন গ্রাহক। সময়ে-অসময়ে পাঠানো মোবাইল ফোন অপারেটরদের প্রচারণামূলক এসএমএসে অতিষ্ট মানুষ। এমনকি গভীর রাতেও এসব এসএমএস আসছে। যদিও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) থেকে পাঠানো এক নির্দেশনায় বলা আছে, ‘রাত ১২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত কোন প্রচারণামূলক ফোন করা বা এসএমএস পাঠানো যাবে না।’ এই নির্দেশনার তোয়াক্কাই করছে না অপারেটরগুলো। এর জন্য বিটিআরসিকে আরো কঠোর হওয়ার দাবি সাধারণ গ্রাহকদের। গত চার বছর ধরে চেষ্টা করেও ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ নামে একটি গাইডলাইন  তৈরির কাজ শেষ করতে পারেনি বিটিআরসি। যদিও কলড্রপের ব্যাপারে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। সেগুলো এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

গ্রাহকদের অভিযোগ , বেশ কিছুদিন ধরে মোবাইল ফোন অপারেটরদের সেবার মান অনেক নেমে গেছে। কল ড্রপ হচ্ছে, অভিযোগ করেও প্রতিকার মিলছে না। বিটিআরসি থেকে অপারেটরদের এ ব্যাপারে নির্দেশনা দেয়া হলেও কোন কাজ হচ্ছে না। আইটিইউ ও বিটিআরসির দেয়া গাইডলাইনে বলা আছে, শতকরা ৩ ভাগের বেশি কল ড্রপ হলে গ্রাহককে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। মোবাইল ফোন অপারেটরদের ভাষ্য, শতকরা তিন ভাগের বেশি কল ড্রপ তো হচ্ছে না। তাহলে ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন আসছে কেন?

জানা গেছে, কল ড্রপের পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট অপারেটর। ফলে তারা সত্য বলছেন না মিথ্যা বলছেন সেটা প্রমাণ করার সুযোগ নেই বিটিআরসির। তাই তাদের কথা মেনে নিয়েই চলতে হচ্ছে বিটিআরসিকে।

সম্প্রতি বিটিআরসি কিছু যন্ত্রপাতি কিনেছে। সেই যন্ত্র নিয়ে কোন এলাকায় বসিয়ে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া যাবে সেখানে কল ড্রপের পরিমাণ কেমন? তখন অপারেটরদের এ ব্যাপারে জবাবদিহিতার আওতায় আনা যাবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বিটিআরসি চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ গতকাল সোমবার বলেন, ‘গ্রাহক সেবা নিশ্চিত করতে বিটিআরসি কঠোরভাবে মনিটরিং করে। নতুন কিছু যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। এগুলোর ব্যবহার শুরু হলে গ্রাহক সেবা পুরোপুরি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে যে এসএমএস যাচ্ছে সেটাও মনিটরিং করা হবে।’

গ্রাহক সেবা নিয়ে অপারেটরদের বক্তব্য, তারা সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে থাকেন। বাংলাদেশে কল ড্রপের পরিমাণ এক শতাংশেরও কম। সেবাও অনেক ভালো। গ্রামীণফোনের হেড অব কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স মাহমুদ হোসাইন বলেন, ‘আমাদের দেশে যে নেটওয়ার্ক আছে সেটা বিশ্বমানের। বহু উন্নত দেশেও এই ধরনের নেটওয়ার্ক নেই। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশেও নেই। পাশাপাশি প্রতিনিয়তই গ্রাহক সেবা উন্নত করা হচ্ছে। এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। আর গ্রামীণফোনের ১২১ নম্বরে ফোন করলে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই সেটি কেউ রিসিভ করে সমাধান দিচ্ছেন। গত ৭-৮ মাস আগে এটার পরিমাণ ৭০-৭৫ ভাগ ছিল। বর্তমানে যেটা ৯৫ ভাগ।’

রবির ভাইস প্রেসিডেন্ট একরাম কবীরও একই ধরনের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, বিটিআরসি যে নির্দেশনা দিয়েছে আমরা সেই নির্দেশনা মেনেই সব ধরনের সেবা দিয়ে থাকি। পাশাপাশি কল ড্রপ তো শুধু অপারেটরের উপর নির্ভর করে না। এখানে আবহাওয়া বা সংশ্লিষ্ট অন্যদেরও ভূমিকা আছে। 

নতুন করে ভোগান্তিতে যোগ হয়েছে সময়ে-অসময়ে এসএমএস। মধ্যরাতেও অনেক এসএমএস আসছে। বিটিআরসির ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ গাইডলাইন চূড়ান্ত হলে গ্রাহকরা উপকৃত হতেন। এখনও সেটা হয়নি।

বাংলালিংকের হেড অব গভমেন্ট অ্যাফেয়ার্স এ এইচ এম হাসিনুল কুদ্দুস গতকাল দাবি করেন, ‘বাংলালিংকের কোন এসএমএস নির্দিষ্ট সময়ের পরে পাঠানো হয় না।’ তাহলে কিভাবে গ্রাহকের মোবাইলে এসব এসএমএস যাচ্ছে? জবাবে তিনি বলেন, ‘নেটওয়ার্কের সমস্যার কারণে অনেক সময় এসএমএস ডেলিভারি হতে দেরি হতে পারে। হয়ত সে কারণেই বিলম্বে এসএমএস যাচ্ছে।’

বিটিআরসিতে গ্রাহকদের অভিযোগ থেকে জানা যায়, কল ড্রপ বা বিরক্তিকর এসএমএসের বাইরেও ইন্টারনেট নিয়েও তাদের রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। প্যাকেজ থাকার পরও সরাসরি টাকা কেটে নেওয়া, ঠিকমতো সংযোগ না পাওয়াসহ অনেক অভিযোগ তাদের। এসব ব্যাপারেও গ্রাহকদের অভিযোগের সুরাহা হচ্ছে না।

আজ গণশুনানি বিটিআরসির

কল ড্রপ, ভয়েস কল ও ইন্টারনেটের বিভিন্ন বান্ডেল প্যাকেজ ও মূল্য সম্পর্কে জনগণের মতামত জানতে প্রথমবারের মতো গণশুনানির আয়োজন করেছে বাংলাদেশ টেলি যোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি)। আজ ২২ নবেম্বর (মঙ্গলবার) এ গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে।

গণশুনানিতে মোবাইল অপারেটরদের কল ড্রপ ও বিভিন্ন প্যাকেজের (ভয়েস ডাটা, বান্ডেল) মূল্য সম্পর্কে অভিযোগ ছাড়াও বায়োমেট্রিক সিম, সাইবার অপরাধ, মোবাইল ফোনে হুমকি, ফেইসবুক ব্যবহার নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়ে বিটিআরসি কর্মকর্তাদের সরাসরি প্রশ্ন করা যাবে। অভিযোগ শুনে তাৎক্ষণিক উত্তর দেবেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

কল ড্রপে গ্রাহকদের ক্ষতি বছরে সাড়ে ৩ শ’ কোটি টাকা

মুঠোফোনে কল ড্রপের কারণে প্রতিবছর গ্রাহকদের ৩ শ’ ৪৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা ক্ষতি হয় বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে নিবন্ধিত গ্রাহকের সংখ্যা ১১ কোটি ৭০ লাখ। এরমধ্যে প্রতিদিন কল ড্রপ হয় ১ কোটি ৬০ লাখ মিনিট। সর্বনিম্ন কল রেটের মূল্য ৬০ পয়সা ধরলে প্রতিদিন কল ড্রপের কারণে গ্রাহকের ক্ষতি হয় ৯৬ লাখ টাকা। যা মাসিক আকারে দাঁড়ায় ২৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

গতকাল সংগঠনের সভাপতি মহিউদ্দীন আহমেদ জানান , কল ড্রপ একটি অনিয়ম হলেও সংশ্লিষ্ট অপারেটররা এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় এ খাতে গ্রাহকদের বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ হচ্ছে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী বার বার কল ড্রপ বন্ধ ও গ্রাহকদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিলেও আজ অবধি কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি গ্রাহকরা। তিনি বলেন , বিটিআরসি থেকে এক নির্দেশনায় বলা হয়েছিল মার্চ মাস থেকে মুঠোফোন অপারেটরা ক্ষতিপূরণ প্রদান করবে। কিন্তু সেই নির্দেশনাও উপেক্ষিত রয়েছে। আমাদের প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতেও কল ড্রপের ক্ষতিপূরণ তাৎক্ষণাত পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এর কোন বালাই নেই। আবার অনেক ক্ষেত্রে ফোনে কথা বলার সময় কথা ভেঙ্গে ভেঙ্গে আসে। ফলে গ্রাহকগণ বার বার কল কেটে নতুন করে কল দিতে বাধ্য হয়। এতেও গ্রাহকদের ব্যয় বৃদ্ধি পায়।

একটি কলড্রপের চিত্র

 রোববার সকাল ১১ টা ১৮ মিনিটে রবির মাধ্যমে অপর একটি রবির মোবাইল ফোনে কল করা হয় । ৩৪ সেকেন্ডের মধ্যে অপরপ্রান্তের সংযোগটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় । এরপর ১১ টা ১৯ মিনিটে ফোন করা হলে সেই কলটি ১ মিনিট ৩৫ সেকেন্ডের মধ্যে কেটে যায় । তৃতীয় দফায় ১১ টা ২২ মিনিটে কল করা হলে সেই কলটি ২ মিনিট ২২ সেকেন্ডের মধ্যে কেটে যায় । চতুর্থ দফায় ১১ টা ২৬ মিনিটে কল করা হলে সেটিও ২ মিনিট ৩১ সেকেন্ডে কেটে যায় । সব মিলিয়ে চার দফায় চারবার কলড্রপের শিকার ওই গ্রাহক অপরপ্রান্তের সাথে কথা বলেন , ৬ মিনিট ১৮ সেকেন্ড । গতকাল রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ওই গ্রাহকের কাছে কোন কারণ দর্শানো হয়নি ,ক্ষতিপূরণ দূরে থাক ,একটি এসএমএস পাঠিয়েও দু:খ প্রকাশ করা হয়নি ।

কলড্রপের ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে না মোবাইল অপারেটরগুলো

নির্দেশনা অগ্রাহ্য করে এখনও কলড্রপের ক্ষতিপূরণ গ্রাহকদের দেয়া শুরু করেনি দেশের টেলিকম অপারেটরগুলো। অথচ টেলিকম রেগুলেটরের নির্দেশনা অনুযায়ী ১ জুলাই থেকে এ ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা ছিল।

 মোবাইলফোন অপারেটরগুলোর কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, কলড্রপজনিত ক্ষতিপূরণের ব্যাপারে ৩০ জুন বিটিআরসি (বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন) থেকে লিখিত নির্দেশ পেলেও এ ব্যাপারে তারা সম্মত হননি।

বিটিআরসি’র নির্দেশ অনুযায়ী, টেলিকম মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত মোতাবেক দিনের দ্বিতীয় কলড্রপ থেকে মোবাইল অপারেটরদের গ্রাহককে ১ মিনিট ফ্রি টক-টাইম দিতে হবে এবং গ্রাহককে মেসেজের মাধ্যমে তা জানাতে হবে। 

বাংলাদেশ মোবাইল টেলিফোন অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন ৩০ জুন বিটিআরসিকে একটি চিঠির মাধ্যমে কল-ড্রপজনিত সিদ্ধান্তটি অপারেটরদের সাথে আলোচনা না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত রাখার জন্য অনুরোধ করে। এর আগে বিটিআরসি ১৯ জানুয়ারি সকল মোবাইল অপারেটরের জন্য ১ মিনিট কলড্রপজনিত ক্ষতিপূরণ দেয়া বাধ্যতামূলক করে কিন্তু অপারেটরগুলো এ নির্দেশে সম্মত হয়নি। 

তবে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো তাদের প্রচারণার উদ্দেশ্যে কলড্রপজনিত ক্ষতিপূরণ প্রদানে ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে থাকে। মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো ২১ জুন বিটিআরসির সাথে এক  বৈঠকে দাবি করেছিল যে, কারিগরিভাবে কলড্রপ ধরার কোন সরঞ্জাম নেই। তারা বলেন, কাস্টমাররা বিটিআরসি’র কলড্রপজনিত ক্ষতিপূরণের নির্দেশনাটি কাজে লাগিয়ে নিজেরা কল কেটে দিয়ে অপারেটরদের কাছে ফ্রি কল মিনিট চেয়ে বসতে পারে। অপারেটরা বিটিআরসিকে প্রত্যেক ইউজারের জন্য সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ সীমা বেঁধে দেয়ার দাবি করে। অফ-নেট কল ড্রপের সময় কোথায় ঘটনাটি ঘটছে তা খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়ে বলেও জানান তারা।

এ ব্যাপারে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশের প্রথিতযশা মোবাইল ফোন অপারেটরের এক  জ্যৈষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘কলড্রপজনিত ক্ষতিপূরণের সাথে সম্পর্কিত সমস্যাগুলো সমাধান না করেই বিটিআরসি নির্দেশনাটি প্রদান করেছে। পরবর্তী আলোচনা না হওয়া পর্যন্ত বিটিআরসিকে ব্যাপারটি স্থগিত রাখার অনুরোধ করেছি আমরা। 

অন্য এক মোবাইল ফোন অপারেটরের  জ্যৈষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, বিটিআরসি কলড্রপজনিত ক্ষতিপূরণের ব্যাপারে বল প্রয়োগ করতে পারে না কেন না অপারেটরগুলোর কলড্রপের হার বিটিআরসির মঞ্জুরিযোগ্য পরিসীমার ভেতরে অবস্থান করছে।

 ব্রেকিং নিউজ বিড়ম্বনা

গ্রামীণ ফোনের ৩২১ সার্ভিসের মাধ্যমে নির্দিষ্ট গ্রাহকরা দেশবিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের শিরোনাম তাৎক্ষণিকভাবে জানতে পারেন । এই সংবাদ জানাতে ওই অপারেটর অনলাইন নিউজ পোর্টাল “বাংলা নিউজ ২৪ ডট কম’ সার্ভিসের সহযোগিতা নিচ্ছে । এ জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রতিদিন সার্ভিস চার্জ কেটে নিচ্ছে ওই মোবাইল ফোন অপারেটর । অথচ যে সার্ভিসটির কাছ থেকে তাৎক্ষণিক সংবাদ নিয়ে গ্রামীণ ফোন তার গ্রাহকদের কাছে হাজির হচ্ছে , সেটি সঠিক কিনা তা যাচাই পর্যন্ত করা হচ্ছে না । কখনও কখনও ভূল সংবাদও পরিবেশন করা হচ্ছে । আবার কোন কোন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদও চেপে যাচ্ছে ।

গত ১৮ অক্টোবর সকাল ১০ টা ৫ মিনিটে  একজন গণমাধ্যমকর্মীর মোবাইল ফোনে গ্রামীণ ফোনের ৩২১ সার্ভিসের মাধ্যমে একটি ব্রেকিং নিউজ আসে । সেখানে বলা হয় ,রাজধানীর তেঁজগাও এলাকা থেকে ৭ জেএমবি সদস্যকে ধরেছে র‌্যাব । ওই দিনই দুপুর ১ টা ৪৪ মিনিটে ফের ব্রেকিং দিয়ে বলা হয় ,ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিট সদস্যরা ওই ৭ জেএমবি সদস্যকে ধরেছে । পরদিন ১৯ অক্টোবর সকাল ৮ টা ১৩ মিনিটে দেয়া ব্রেকিং নিউজে বলা হয় ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ স্বাধীন মনিরকে কুপিয়েছে সন্ত্রাসীরা । চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেলে তার মৃত্যু হয় । অথচ শেখ স্বাধীন মুনির ছিলেন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকলীগের সাথে জড়িত । এ সব নিয়ে গ্রামীণ ফোনের ১২১ এ গত ১৮ অক্টোবর ১১ টা ১০ মিনিটে ফোন করে জানানো হলে সংশ্লিষ্ট অপারেটর জানান ,বিষয়গুলো অভিযোগ আকারে গ্রহণ করা হয়েছে । রেকর্ডকৃত ( তিন মিনিটের বক্তব্য ) অভিযোগগুলোর ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন ।

সক্রিয় মোবাইল সংযোগ সংখ্যা কমেছে ৯২ লাখ

 দেশে সক্রিয় মোবাইল সংযোগ সংখ্যা এক মাসের ব্যবধানে ৯২ লাখ কমে গেছে। একই সময়ে দেশে ইন্টারনেট সংযোগ সংখ্যাও ১৭ লাখ কমেছে। এসব ইন্টারনেট সংযোগের বেশির ভাগই আবার মোবাইল ফোনভিত্তিক। বিটিআরসি সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যে মুঠোফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের এ চিত্র উঠে এসেছে।

বিটিআরসির আগস্ট মাসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সক্রিয় মোবাইল ফোন সংযোগের সংখ্যা ১১ কোটি ৯৭ লাখ; যা চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ছিল ১২ কোটি ৮৯ লাখ। দেশে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চসংখ্যক সক্রিয় সিম ছিল ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে। ওই সময় সক্রিয় সিম ছিল ১৩ কোটি ৩৭ লাখ। এরপর আঙুলের ছাপ পদ্ধতিতে (বায়োমেট্রিক) সিম পুনর্নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর কমতে শুরু করে সিমের সংখ্যা।

গত ৩১ মে আঙুলের ছাপ পদ্ধতিতে (বায়োমেট্রিক) সিম পুনর্নিবন্ধন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর এক কোটির বেশি অনিবন্ধিত সিম বন্ধ করা হয়েছে। বিটিআরসির নিয়ম অনুযায়ী, একটি সিম বন্ধ হলেও ৯০ দিন বা তিন মাস পর্যন্ত সেটিকে সক্রিয় হিসেবে ধরা হয়। এ কারণে জুন, জুলাইয়ের পরিসংখ্যানে সিমের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রভাব সেভাবে পড়েনি। আগস্টের ৩১ তারিখে ৯০ দিন সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় এ মাসের হিসাবে সিম বন্ধের প্রভাবটি পড়েছে।

 দেশের সবচেয়ে বড় মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোনের সংযোগসংখ্যা আগস্টে ১৮ লাখ কমেছে। জুলাইয়ে অপারেটরটির সংযোগসংখ্যা ছিল ৫ কোটি ৬৩ লাখ, সেটি এখন কমে ৫ কোটি ৪৫ লাখ হয়েছে। একই সময়ে বাংলালিংকের সংযোগসংখ্যাও কমে তিন কোটির নিচে চলে এসেছে। জুলাইয়ে বাংলালিংকের সংযোগ ছিল ৩ কোটি ২১ লাখ, যা আগস্টে কমে হয়েছে ২ কোটি ৮৯ লাখ। একীভূত হওয়ার অনুমোদন পাওয়া দুই অপারেটর রবি ও এয়ারটেলের সংযোগসংখ্যাও আগস্টে কমেছে। রবির সংযোগসংখ্যা এ সময়ে ২ কোটি ৬৮ লাখ থেকে কমে ২ কোটি ৩২ লাখ হয়েছে। আর এয়ারটেলের সংযোগসংখ্যা ৯৩ লাখ থেকে কমে ৭৯ লাখে দাঁড়িয়েছে। দেশের প্রথম মুঠোফোন অপারেটর সিটিসেলের সংযোগসংখ্যা দেখানো হয়েছে ৬ লাখ ৬৮ হাজার।

সব বেসরকারি অপারেটরের সংযোগ কমলেও অপরিবর্তিত আছে সরকারি অপারেটর টেলিটকের সিমের সংখ্যা। আগস্টে অপারেটরটির সিমের সংখ্যা জুলাইয়ের মতোই ৪৪ লাখ ৩৭ হাজারে অপরিবর্তিত আছে। অথচ বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধন না হওয়া প্রায় ২২ লাখ সিম বন্ধ করা হয়েছে জানিয়ে বিটিআরসিকে চিঠি দিয়েছে টেলিটক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ