সোমবার ২৪ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

মরণ নেশা ইয়াবায় ছেয়ে গেছে দেশ

  • মিয়ানমার সীমান্তে ৩৭টি কারখানা
  • পাচারে জড়িতরা প্রভাবশালী-ক্ষমতাধর

নাছির উদ্দিন শোয়েব : ভয়ঙ্কর মরণ নেশা ইয়াবা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসছে স্রোতের মতো। বিজিবি ও গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকার ৩৭টি কারখানায় তৈরির হয় এসব ইয়াবা বড়ি। হাত বাড়ালেই দেশের যে কোনো স্থানে পাওয়া যায় ইয়াবা। সহজলভ্য হওয়ায় এতে বিপথগামী হচ্ছে উচ্চবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তের তরুণ-তরুণী, শিক্ষার্থী ও যুবসমাজ। অভিজাত পরিবারের অনেকেই আসক্ত হয়ে পড়েছে ইয়াবায়। নানা কৌশলে বিভিন্ন পরিবহনে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে দ্রব্যটি। কিছু চালান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আটক করলেও বেশিরভাগই থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। অবাধে এ মরণ নেশার বিস্তার ঘটিয়ে কোটিপতি বনে যাচ্ছেন চোরাকারবারী ও ব্যবসায়ীরা। 

জানা গেছে, বান্দরবানের ২৭২ কিলোমিটার সীমান্ত পথের ২০টি পয়েন্ট দিয়ে দেশে ঢুকছে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা। অল্প পুঁজিতে বেশি লাভের নেশায় এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছেন রাঘব-বোয়ালরা। তবে অজানা কারণে ধরাছোঁয়ার বাইরে তারা। সর্বশেষ গত রোববার ভোরে টেকনাফ থেকে ২১ কোটি টাকার প্রায় সাত লাখ পিস ইয়াবা বড়ি আটক করেছে বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবি। কর্মকর্তারা বলছেন, এটি বিজিবির আটক করা এ পর্যন্ত সবচাইতে বড় ইয়াবার চালান। 

মাদকদ্রব্য অধিদফতর ও পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, কিছু বড় ব্যবসায়ী আছে যারা প্রভাবশালী-ক্ষমতাধর। যাদের নাম রয়েছে ইয়াবা পাচারকারী তালিকায়। কিন্তু কখনো তাদের কাছ থেকে মাদক উদ্ধার করা যায় না। যাদের থেকে মাদক উদ্ধার করা হয় তারা আদালতে স্বীকারোক্তি দিলেও বড় বড় ব্যবসায়ীর নাম থেকে যায় আড়ালে। তাই এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে প্রায় ২৫ লাখ ইয়াবাসেবী রয়েছে। সে হিসাবে দিনে প্রায় ৫০ লাখ ইয়াবার বাজার তৈরি হয়েছে। ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে ৫টি সংস্থা। তবে ইয়াবা পাচারের সঙ্গে জড়িত রাঘব বোয়ালদের ধরতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সহায়তা চায় সাধারণ মানুষ। 

টেকনাফে বিজিবি ব্যাটালিয়ান-২ এর মেজর আবু রাসেল সিদ্দিকি বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, টেকনাফ এলাকাটি ইয়াবা চালানের একটি বড় ট্রানজিট হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, মূলত মিয়ানমার হয়েই বাংলাদেশে ইয়াবার চালান বেশি আসে। তিনি বলছেন, ছোট চালানগুলোই বরং তাদের জন্য ধরা কঠিন হয়ে পড়ে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে বিজিবি প্রায় ১৮০ কোটি টাকা মূল্যের ইয়াবা আটক করেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তথ্যমতে, এ বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলদেশের সকল বাহিনী মিলে দুই কোটির বেশি পিস ইয়াবা বড়ি আটক করেছে। কিন্তু তারপরও দেশের সর্বস্তরে এটি ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানাচ্ছেন অধিদফতরের গোয়েন্দা ও অপারেশনস বিভাগের পরিচালক সৈয়দ তৌফিক উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলছেন, ইয়াবাই এখন বাংলাদেশে সবচাইতে বেশি ব্যবহৃত মাদকদ্রব্য। খুব ছোট আকারের বড়ি হওয়াতে এর বহন সহজ- আর তাই এটি ধরাও কঠিন। মাদকাশক্তি নিরাময় করেন এমন চিকিৎসকরা বলছেন, তাদের কাছে ইয়াবা আসক্তরাই ইদানিং সবচাইতে বেশি সংখ্যায় আসছে।  

জানা গেছে, স্থলপথে শাহপরীর দ্বীপ, নাজিরপাড়া, মৌলভীপাড়া, জালিয়াপাড়া, হেচ্ছারখাল, নাইট্যাংপাড়া, বড়ইতলী, জাদিমোরা হয়ে বাংলাদেশে ঢুকে মিয়ানমারের ইয়াবা। আর সমুদ্রপথে হাড়িয়াখালিভাঙ্গা, কাঁকাবুনিয়া, খুরেরমুখ, আলুর ডেইল, মুড়ার ডেইল, বাহারছড়া ঘাট দিয়ে চালান আসে। সীমান্তপথে আসা এসব ইয়াবা বড় বড় রাঘব বোয়াল ছড়িয়ে দেয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। 

টেকনাফ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মিয়ানমারের ইয়াবা ব্যবসায়ীরা ঢাকা ও চট্টগ্রামের অভিজাত এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকছেন। তারা কক্সবাজার, টেকনাফ, বান্দরবান, টেকনাফের স্থানীয় লোকদের সঙ্গে যোগসাজশে ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন। সাগর ও নদীপথে আসা ইয়াবার একটি অংশ পাচার হয় টেকনাফ, হ্নিলা ও উখিয়ার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে। কড়া নজরদারীর কারণে সড়কপথে ব্যর্থ হয়ে সম্প্রতি সমুদ্র ও নদী পথকেই বেছে নিয়েছে চোরাচালানীরা।

বর্তমানে সেন্টমার্টিন দ্বীপের অদূরে দক্ষিণের সীতাপাহাড়ে মিয়ানমারের ট্রলারের মাধ্যমে আসে ইয়াবার বড় বড় চালান। সাগরপথে মাছ ধরার বড় ট্রলারে করে এসব চালান সেন্টমার্টিন থেকে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম হয়ে নারায়ণগঞ্জে আসে। সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশের খুচরা ব্যবসায়ীদের হাতে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেয়া তথ্যানুযায়ী, কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে রয়েছে তালিকাভুক্ত ৭শ’ ইয়াবা পাচারকারী। তারমধ্যে মহেশখালীর ৭, বান্দরবানের ১৫ জন ছাড়া বাকি পাচারকারী সবাই টেকনাফের বাসিন্দা। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সবাই ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এদিকে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় টেকনাফ থেকে রোববার প্রায় ২১ কোটি টাকা মূল্যের প্রায় সাত লাখ পিস ইয়াবা বড়ি আটক করেছে বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবি।  কর্মকর্তারা বলছেন, এটি বিজিবির আটক করা এ পর্যন্ত সবচাইতে বড় ইয়াবার চালান। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, ইয়াবাই এখন বাংলাদেশের সবচাইতে বেশি ব্যবহৃত মাদকদ্রব্যে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী নাফ নদীতে একটি নৌকা থেকে খুব ভোরে চালানটি আটক করে সীমান্ত রক্ষী বাহিনি বিজিবি।

এরআগে ২৫ অক্টোবর কক্সবাজারের টেকনাফে এক লাখ ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করে বিজিবি। উপজেলার সদর ইউনিয়নের নাজির পাড়ায় এ অভিযান চালানো হয় বলে বিজিবির টেকনাফ ২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ওইসময় আবুজার আল জাহিদ জানান। পাচারকারীরা পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি। আবুজার বলেন, ইয়াবার বড় একটি চালানের জন্য নাজির পাড়ায় কয়েকজন লোক জড়ো হয়েছে খবর পেয়ে বিজিবি অভিযান চালায়। পাচারকারীরা বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে পলিথিনের একটি ব্যাগ ফেলে পালিয়ে যায়। ওই ব্যাগের ভেতর এক লাখ ইয়াবা ট্যাবলেট পাওয়া যায়।

অন্যদিকে ২৮ অক্টোবর কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় পাচারকারীদের ফেলে যাওয়া বস্তা থেকে প্রায় দেড় লাখ ইয়াবা উদ্ধারের কথা জানিয়েছে বিজিবি। বিজিবির টেকনাফ ২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেনেন্ট কর্নেল আবুজার আল জাহিদ জানান, সাবরাং ইউনিয়নের মুন্ডার ডেইলের খুরেরমুখ পয়েন্টে সমুদ্র সৈকত এলাকায় অভিযান চালিয়ে ওই ইয়াবা পাওয়া যায়। তিনি বলেন, গভীর রাতে মিয়ানমার থেকে ইয়াবার বড় একটি চালান আসার খবরে বিজিবির টহল দল অভিযান শুরু করে। বিজিবি সদস্যদের দেখে ৩/৪ জন পাচারকারী দৌঁড় দেয়। এ সময় বিজিবির সদস্যরা ধাওয়া করলে একটি বস্তা ফেলে তারা পালিয়ে যায়। পরে ওই বস্তার ভেতরে পলিথিন মোড়া ১ লাখ ৪০ হাজার ইয়াবা পাওয়া যায়। ২২ অক্টোবর কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলা থেকে ৪০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে বিজিবি সদস্যরা। উপজেলার সাবরাং গুলাপাড়া গ্রাম থেকে এসব ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। তবে এ সময় কাউকে আটক করতে পারেনি বিজিবি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ