রবিবার ২৬ জুন ২০২২
Online Edition

অনন্য ব্যক্তিত্বে নারী

॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
ইসলামে ছোট অপরাধে ২ জন সাক্ষী এবং বড় অপরাধে ৪ জন সাক্ষী প্রয়োজন। কোন নারীর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেয়া ইসলামে বড় অপরাধ হিসেবে গণ্য। অতএব তার জন্য ৪ জন সাক্ষীর প্রয়োজন হবে। ইসলাম নারীদের সতীত্ব রক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে।
ইসলামে নারীর রাজনৈতিক অধিকার: অন্যান্য অধিকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক ভাবেও ইসলাম নারীকে অধিকার দিয়েছে। সূরা তাওবার ৭১ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন- “আর ঈমানদার পুরুষ ঈমানদার নারী একে অপরের সহায়ক।” ‘আল-কুরআন, ৯:৭১’ তারা সামাজিক সহায়কই নয় রাজনৈতিকভাবেও নারী পুরুষ পরস্পরের সহযোগী। ইসলামে নারীদের ভোট প্রদানের অধিকার দেয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ বলেন- ‘হে নবী! মুুমিন নারীরা যখন আপনার নিকট আনুগত্যের শপথ নিতে আসবে’। এখানে আরবী শব্দ ‘বাই’য়ানা’- এর অর্থ আধুনিক ও বর্তমান ভোটের চেয়েও অধিক ক্ষমতা। কারণ নবী মোহাম্মদ সাঃ শুধু আল্লাহর রাসূলই ছিলেন না, তিনি রাষ্ট্রপ্রধানও ছিলেন এবং নারীরা নবী করিম সাঃ এর নিকট আসতেন এবং তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে মেনে নিয়ে সম্মতি দিতেন। সুতরাং ইসলাম নারীদের ভোটাধিকার প্রদান করেছে। এমনকি নারীরা আইন প্রণয়নেও ভূমিকা রাখতে পারে। উমর রাঃ সাহাবীদের সংগে দেনমোহরের সর্বোচ্চ পরিমাণ নির্ধারণের ব্যাপারে আলোচনা করছিলেন, যাতে যুবকেরা বিয়েতে উৎসাহিত হতে পারে। পিছনের সারি থেকে একজন মহিলা প্রতিবাদ করে বললেন, যখন কুরআন বলে- “তুমি বিপুল পরিমাণ সম্পদও দিতে পার মোহর হিসেবে” যেখানে কুরআন কোন সীমা নির্ধারণ করেনি সেখানে সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে উমরকে? তৎক্ষণাৎ উমর রাঃ বলে উঠলেন, উমর ভুল করেছে, মহিলাই সঠিক।” ভেবে দেখুন, তিনি ছিলেন একজন সাধারণ মহিলা। একজন সাধারণ মহিলা যিনি রাষ্ট্রপ্রধানকে তার কজে প্রতিবাদ করলেন। আইনের ভাষায় বলা যায়, তিনি সংবিধান চ্যুতি বিষয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন। বস্তুত একজন মহিলা আইন প্রণয়নে অংশ নিতে পারেন। নারীরা যুদ্ধক্ষেত্রে অংশ নিয়েছে। বুখারী শরীফে পূর্ণ একটি অধ্যায়ই রয়েছে “যুদ্ধক্ষেত্রে নারী”। নারীরা পানি সরবরাহ করেছে, সৈনিকদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছে। এখানে ‘নাসিবা’ নামের একজন মহিরার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য; উহুদ যুুুদ্ধে নবী করিম সাঃ কে প্রতিরক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের অন্যতম একজন ছিলেন নারী। যেহেতু কুরআন বলে, পুরুষ নারীদের সংরক্ষক, এ কারণে স্বাভাবিক অবস্থায় নারীদের যুদ্ধে যাওয়া উচিত নয়, এটা পুরুষের দায়িত্ব। শুধু প্রয়োজনেই নারীদের অনুমতি প্রদান করা হবে। অর্থাৎ তারা কেবল প্রয়োজনেই যুদ্ধে যাবে অন্যথায় নয়।
নারী-পুরুষের জন্য পর্দা: সাধারণত নারীদের জন্যই পর্দা পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়। অথচ পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ নারীর পর্দার আগে পুরুষের পর্দার কথা উল্লেখ করেছেন। কুরআন মাজিদে সূরা নূরে রয়েছে- “মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনঙ্গের হেফাজত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তার যা করে আল্লাহ তা অবগত আছেন।” ‘আল-কুরআন, ২৪:৩১’ নারীর জন্য পর্দা ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে সূরা আন-নূরে পরবর্তী ৩১নং আয়াতে বলা হয়েছে- “ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে, এবং তাদে যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। তারা যেন সাধারণ প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে এবং তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র...।” ‘নায়েক, ডা: জাকির আব্দুল করিম, ঢাকা: ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিমদের আপত্তিসমূহের জবাব, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮, ১৯ ও ২০।’ এছাড়াও পর্দার ৬টি বৈশিষ্ট রয়েছে। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে পর্দার ৬টি বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ:
(১) প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো শরীরের নির্দিষ্ট অংশ আবৃত করা। পুরুস ও নারীর ক্ষেত্রে তা ভিন্ন ভিন্ন। পুরুষের নাভী থেকে হাঁটু পর্যন্ত ঢেকে রাখা ফরজ। মেয়েদের জন্য মুখ এবং হাতের কজ্বি ছাড়া পুরো শরীর ঢেকে রাখা ফরজ। যদি ইচ্ছা করে, তাহলে তারা এই অংশগুলো ঢেকে রাখতে পারে। কিছু সংখ্যক আলিম জোর দিয়ে বলেছেন, মুখ এবং হাতও পর্দার ফরজের মধ্যে পরে। বাকী পাঁচটি বৈশিষ্ট্য, পুরুষ ও মহিলার ক্ষেত্রে সমান ভাবে প্রযোজ্য। (২) পরিধান এর কাপড় ঢিলা-ঢালা হবে যাতে দেহের আকৃতি বুঝা না যায়।  (৩) কাপড় পাতলা হবে না যাতে অপর কেউ তার সতর দেখতে না পারে।  (৪) কাপড় এমন চাকচিক্যময় হবে না, যা কোন পুরুষকে আকর্ষণ করতে পারে।  (৫) পুরুষের পোশাকের সাথে যেন সাদৃশ্য না থাকে। (৬) অবিশ্বাসীদের পোশাকের সাথে কোন মিল থাকবে না। যেমন এমন কোন পোশাক পরা যাবে না যেটা অশ্বিাসীদের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পোশাকের হিজাবের সাথে সাথে তার চোখের হিজাব, হৃদয়ের হিজাব, চিন্তার হিজাব ও ইচ্ছার হিজাবকেও বোঝায় এটা কোন মানুষের চলাফেরা, কথাবার্তা ও আচরণ ইত্যাদিকেও বোঝায়। ‘হিজাব’ নিপীড়ন প্রতিরোধ করে। কেন মেয়েলোকের জন্য হিজাব ফরজ করা হয়েছে পবিত্র কুরআনে সূরা আল-আহযাবে তা বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন- “হে নবী! আপনি আপনার পত্নী কন্যাগণ এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন বাইরে গেলে তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবে। ফলে তাদেরকে উত্ত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” ‘আল-কুরআন ৩৩:৫৯’ ধরা যাক, সমসুন্দরী যময দুই বোন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। তাদের একজন ইসলামী হিজাবধারিণী, হাতের কজ্বি ও মুখ ব্যতীত সমস্ত দেহ আবৃত। অপরজন পাশ্চাত্যের পোশাক মিনি স্কার্ট ও শর্টস পরিহিতা। মোড়ে গুণ্ডা বা দুবৃত্তরা দাঁড়িয়ে আছে উপহাস করার জন্য। তারা কাকে উপহাস করবে? যে মেয়ে ইসলামী হিজাবে আবৃত, তাকে না যে মিনি স্কার্ট পরা তাকে? সম্ভবতই তারা মিনি স্কার্ট পরা মেয়েটিকেই উপহাস করবে। এসব পোশাক পরোক্ষভাবে উপহাস ও উৎপীড়নের প্রতীক যা বিপরীত লিংগের আর্কষণ বাড়ায়। কাজেই মার্জিত পোশাক নারীর ইজ্জত রক্ষার ক্ষেত্রে একান্তভাবে সহায়ক। ‘প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪-১৫।’
পুরুষকে একাধিক বিয়ের অনুমতি প্রদান ও নারীকে নিষেধের কারণ : কেউ কেউ প্রশ্ন করেন, একজন পুরুষ একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করতে পারলে মেয়েদেরকে কেন একাধিক পুরুষ বিয়ে করার অধিকার দেয়া হয় না? ইসলামী সমাজের ভিত্তি হচ্ছে ইনসাফ ও সমতা। আল্লাহ্ পুরুষ ও মহিলাকে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষমতা ও দায়িত্ব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। পুরুষ ও নারীর শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে ভিন্ন। তাদের ভূমিকা ও দায়িত্ব ভিন্ন। মহিলাদের বহু বিবাহ নিষিদ্ধ হওয়ার কারণগুলো নিম্নে বর্ণনা করা হলো: যদি একজন পুরুষ একাধিক বিবাহ করে, তাহলেও তার ঔরসজাত সন্তানকে সহজে চিহ্নিত করা যায়। একজন মহিলার যদি একাধিক স্বামী থাকে, তাহলে সে ক্ষেত্রে শুধু সন্তানের মাকেই শনাক্ত করা যায় বাবাকে নয়। ইসলাম মা ও বাবা উভয়ের শনাক্তকরণের উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, যে শিশু তাদের পিতা-মাতাকে চিনে না বিশেষত বাবাকে, তারা বিভিন্ন মানসিক রোগে ভোগে। প্রায়শ: তাদের বাল্যকাল খুব ভাল কাটে না। এ কারণে পতিতাদের ছেলে-মেয়েরা সুস্থ বাল্যকাল কাটায় না। যদি এ রকম কোন বাচ্চা স্কুলে ভর্তি হয় এবং তার মাকে সন্তানের বাবার নাম জিজ্ঞেস করা হয়, তখন বিব্রতবোধ করে। পুরুষেরা প্রকৃতগতভাবে মেয়েদের তুলনায় বেশি বিবাহের প্রয়োজন অনুভব করে। জীবতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে একজন পুরুষের পক্ষে একাধিক স্ত্রীর প্রতি দায়িত্ব পালন করা সম্ভব। একজন মহিলার পক্ষে একাধিক স্বামীর প্রতি অনুরূপ দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। মাসিক চক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে একজন নারীর মানসিক আচরণে পরিবর্তন দেখা দেয়। একাধিক স্বামী বিশিষ্ট মহিলার একই সময়ে একাদিক যৌন সহযোগী থাকে। যার ফলে যৌনব্যধি সংক্রামণের সম্ভাবনা থাকে। সেটা তার স্বামীর মধ্যে অন্য কারো সাথে যৌন সম্পর্ক না থাকলেও সংক্রমিত হতে পারে। এটা বহু বিবাহকারী এবং একাধিক স্ত্রীর পুরুষ স্বামীর ক্ষেত্রে ঘটে না। উপরোক্ত কারণগুলো যে কারো বুঝার জন্য যথেষ্ট। হয়ত আরো অনেক কারণ আছে। যার ফলে অসীম জ্ঞানের অধিকারী আল্লাহ্ স্ত্রীদেরকে একই সময়ে বহু স্বামী গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন।”
উপসংহার : উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে এ কথা প্রতীয়মান হয় যে, জাহেলী যুদে নারীকে মানুষই মনে করা হতো না। তাদেরকে ভোগের সামগ্রী, দাসী, বাদী ইত্যাদি মনে করা হতো। এমনকি কি কন্যা সন্তানকে বংশের কলংক তথা দুর্ভোগ্যের প্রতীক বিবেচনা করা হতো। কিন্তু ইসলাম ঐ সব কুসংস্কার ও মনগড়া মনোভাব দুর করে নারীকে এমন মর্যাদার আসনে আসীন করেছে যা পৃথিবীর ইতিহাসের বিরল। ইসলাম নারীকে সামাজিক, ব্যক্তি স্বাধীনতা, সুন্দর আচার-আচরণ প্রাপ্তির অধিকার, সম্পত্তি অর্জনের বিভিন্ন মাধ্যমে ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা এবং ব্যয় ও কর্তৃত্বের পূর্ণ অধিকার প্রদান করেছে। বর্তমানে নারী স্বাধীনতার নামে পাশ্চাত্য সভ্যতা নারীকে ঘর থেকে বের করে যে বেহায়াপনা, বেলেল্লাপনা ও উচ্ছৃঙ্খল পথে এনেছে তাতে শুধু তাঁদের মার্যাদাই ক্ষুণ্ন হয়নি বরং এ দর্শন তাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক এমনকি মানবিক সমস্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। ইসলামে নারীর মর্যাদা ও অধিকারের যে নীতির কথা বলা হয়েছে তা যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে নারী তার সকল ক্ষেত্রে মর্যাদা ও অধিকার ফিরে পাবে এবং পৃথিবীতে মানুষ সৃষ্টির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সফল হবে। [সমাপ্ত]
-মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ