সোমবার ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

টেস্ট ক্রিকেটে ১৬ বছরে কতটা এগিয়েছে বাংলাদেশ

নাজমুল ইসলাম জুয়েল : টেস্ট ক্রিকেটে এখনো নবীন বাংলাদেশ। হাঁটি হাঁটি পা পা করে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট এখন ১৬ পেরিয়ে ১৭ বছরে পদার্পণ করেছে। ক্রিকেটের বনেদি আসরে লাল-সবুজ প্রতিনিধিদের এ সময়টা অম্লমধুর অভিজ্ঞতায় কেটেছে। শুরুর সময়টাতে তিনদিন আর ইনিংস ব্যবধানে পরাজয় যেন নিত্যকার ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ দিন বদলে ইংল্যান্ডের মতো দলকেও পরাজিত করতে পারে বাংলাদেশ। এমন অর্জন ধীরে ধীরে মাঝারি মানের দলে পরিণত করেছে টাইগারদের। ২০০০ সালের ১০ নভেম্বরে যে সাদা পোশাকে ক্রিকেট খেলা শুরু করেছিল বাংলাদেশ। টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেকের এই দিনটি উদযাপনের সঙ্গে ইতিহাস রচনাও সঙ্গী হয়ে থাকছে। ইংল্যান্ডকে দ্বিতীয় টেস্টে হারানোর পর সবার কণ্ঠে একই সুর, বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা অর্জন এটি। কেন? এর আগে যে কখনই এত শক্তিশালী দলকে টেস্টে হারান যায়নি। তাও আবার এমন দাপট দেখিয়ে। প্রতিপক্ষ দলটি আবার ইংল্যান্ড। যারা কিনা বরাবরই বাংলাদেশের টেস্ট খেলা নিয়ে ব্যঙ্গ করতেও ছাড়েনি। ইংলিশ মিডিয়ার মাধ্যমেতো আবার কখনও কখনও বাংলাদেশের টেস্ট খেলা উচিত নয়! এমন কথাও ভেসে বেড়িয়েছে। সেই ইংল্যান্ডকেই তিনদিনে টেস্টে হারিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। সেই টেস্ট জেতা স্বাভাবিকভাবেই ইতিহাসের সেরা অর্জন। এ অর্জন অবশ্য বিশেষভাবে পালিত হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ একটাই। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল টোয়েন্টি-২০) যে এখন চলমান। সবাই নিজ নিজ দলের খেলা নিয়ে ব্যস্ত। মাঠের লড়াইয়ে নামতে হচ্ছে। নয়তো পরের দিনের খেলার জন্য প্রস্তুতি পর্ব সারতে হচ্ছে। তা না হলে হয়তো ইতিহাস রচনার বছরটি বিশেষভাবে পালন করা হতো। সেই সুযোগটি আপাতত মিলছে না। তবে ২০১৫ সালের মতো ২০১৬ সালটিও টেস্টে রাঙিয়ে তুলল বাংলাদেশ। এবারতো যে কোন বছরের চেয়েও সেরা সাফল্য মিলেছে। এ পর্যন্ত ২০০০ সাল থেকে ৯৫টি টেস্ট খেলেছে বাংলাদেশ। ৮টিতে জিতেছে। ৭২টিতে হেরেছে। ১৫টিতে ড্র করেছে। এর মধ্যে জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে সবচেয়ে বেশি ৫ বার টেস্ট জিতেছে বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে জিতেছে দুইবার। আর সর্বশেষ ৩০ অক্টোবর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একমাত্র জয়টি তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ। যে জয়টি ইতিহাস রচনা করেছে। কারণ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে যে ২০০৫, ২০১৩, ২০১৪ সালে তিনবার জিতেছে বাংলাদেশ, শুধু ২০০৫ সাল ছাড়া সবসময়ই বাংলাদেশই ফেভারিট ছিল। ২০০৯ সালে যে ওয়েস্ট ইন্ডিজে গিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ ২-০ ব্যবধানে জিতেছে বাংলাদেশ, সেই সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ছিল দুর্বল দল। ক্রিকেটার ও বোর্ডের মধ্যে দ্বন্দ্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলটিই হয়ে পড়ে ‘বি’ ক্যাটাগরির দল। সেই দলের বিপক্ষে সিরিজ জিতে বাংলাদেশ। তবুও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে যে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারানো গেছে, সেটি অনেক বড় কীর্তিই হয়ে আছে। কিন্তু ইংল্যান্ডকে হারানোটা সব টেস্ট জয় থেকে বেশি মাহাত্ম্য পাচ্ছে। কারণ একটাই, এ দলটি যে টেস্টে অনেক শক্তিশালী দল। এর বাইরে আবার বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস নিয়ে কিংবা বাংলাদেশের টেস্ট নিয়ে সবচেয়ে বেশি কটূক্তি করেছে ইংলিশরাই। সেই ইংলিশদেরই যে একটা শিক্ষা দেয়া গেল, সেটিই বড় অর্জন হয়ে রয়েছে। তাইতো টেস্ট অধিনায়ক মুশফিকুর রহীম বলেছেন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট জয় বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা অর্জন। সঙ্গে যোগ করেন, ম্যাচটি আমরা যেভাবে খেলেছি। যে ব্যবধানে জিতেছি (১০৮ রানে), তাতে এটাই আমাদের ক্রিকেটের ইতিহাসে এ যাবতকালের সেরা অর্জন বলে আমি মনে করি। আসলেই তাই। এমন অর্জন আগের কোন বছরেই চোখে পড়েনি।
সময়ের স্রোতে ক্রিকেটে এত বেশি জয় পাচ্ছে বাংলাদেশ, শুধু আনন্দই মিলছে। আর তাই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট জয়ের পরও আনন্দের স্রোত দেখা যায়নি। তবে ঐতিহাসিক জয়টিতো মিলে গেছে ঠিকই। ২০০০ সালে প্রথম বছরেই বাংলাদেশ একটি মাত্র টেস্ট খেলে। সেটি ভারতের বিপক্ষে এবং বাংলাদেশেরই প্রথম টেস্ট সেটি। ম্যাচটিতে ৯ উইকেটে হারে বাংলাদেশ। শুরু হয়ে যায় বাংলাদেশের টেস্টে পথচলা। এরপর ২০০১ সালে ৮টি টেস্ট খেলে ৭টিতেই হারে। একটি ম্যাচে ড্র করে। তাও আবার বৃষ্টির সুবাদে। ২০০২ সালেও ৮টি টেস্ট খেলে। এবার সবক’টিতে হার হয়। ২০০৩ সালে ৯টি টেস্ট খেলেও সবক’টিতে হারে। ২০০৪ সালে ৮ টেস্ট খেলে ৬টিতে হারে। ২টি ম্যাচ ড্র করে। তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সেন্ট লুসিয়ার ম্যাচটিতে দাপট দেখিয়েই ড্র করে বাংলাদেশ। তখন এই ড্রটিই বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের সেরা অর্জন হয়ে যায়। সময় বদলায়। বাংলাদেশ দলেরও দিন বদলায়। ২০০৫ সালেই সেই বদলের সুর মিলে যায়। এ বছর ৬ টেস্ট খেলে বাংলাদেশ। প্রথমবারের মতো জিম্বাবুয়েকে হারিয়ে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের প্রথম জয়ের দেখাও মিলে। সঙ্গে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে ড্র করে সিরিজও জিতে নেয় বাংলাদেশ। প্রথমবারের মতো টেস্ট সিরিজ জয়ও হয়। হার হয় চার টেস্টে। তবে বছরটি বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটেরই তখন সেরা বছর হিসেবে বিবেচিত হয়। টেস্ট জয় যে মিলে। এরপর ২০০৮ সাল পর্যন্ত শুধু হার হয়। ২০০৬ সালে চার টেস্টের চারটিতে, ২০০৭ সালে ৫ টেস্টের চারটিতে হার ও ১টিতে ড্র, ২০০৮ সালে ৯ টেস্টের ৮টিতে হারে। ১টিতে ড্র করে। ২০০৯ সালে গিয়ে বাংলাদেশ আবারও জয়ের দেখা পায়। এবারতো বিদেশের মাটিতে টেস্ট জিতে বাংলাদেশ। এ বছরটিতে ৩টি টেস্ট খেলে বাংলাদেশ। ১টি ম্যাচে হারার বিপরীতে ২টি ম্যাচেই জিতে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারায় বাংলাদেশ। সিরিজ ২-০ ব্যবধানে জিতে নেয়। যদিও ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলটি দুর্বল ছিল। এরপরও দেশের বাইরে টেস্ট জয়টা ঐতিহাসিকই হয়ে থাকে। এরপর ২০১০ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত আবারও হার হয়। ২০১০ সালে ৭ ম্যাচের ৭টিতে হার হয়। ২০১১ সালে ৫ ম্যাচের ৪টিতে হার ও ১টি ম্যাচে ড্র করে। ২০১২ সালে ২ ম্যাচে ২টিতেই হারে বাংলাদেশ। ২০১৩ সালে গিয়ে আবার ভাল বছর মিলে বাংলাদেশের। ৬ ম্যাচ খেলে ২টিতে হার হয়, ৩টি ম্যাচে ড্র করে। জিতে আবার জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১টি ম্যাচে। শ্রীলঙ্কায় গিয়ে গলে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুর্দান্ত খেলে বাংলাদেশ ড্র করে। আর চট্টগ্রামে নিউজিল্যান্ডকে টেস্ট জিততে দেয়নি। শুরু হয়ে যায় বাংলাদেশ টেস্টেও ওড়াওড়ি। ২০১৪ সালে ৭ ম্যাচের মধ্যে তিন ম্যাচে হারের সঙ্গে তিন ম্যাচে জিতেও। আরেকটি ম্যাচ যে ড্র হয়, সেটিতেও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুর্দান্ত খেলে বাংলাদেশ। ২০১৫ সালে ৫ ম্যাচ খেলে ১টিতে শুধু হারে। ড্র করে ৪টি ম্যাচে। দ্বিতীয় ইনিংসে তামিম-ইমরুলের ৩১২ রানের উদ্বোধনী জুটিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে ড্র করা ম্যাচটিতো স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকবে। ২০১৬ সালেতো বাংলাদেশ মাত্র দু’টি টেস্ট খেলে। প্রায় ১৫ মাস বিরতির পর টেস্ট খেলতে নেমেও কি দুর্দান্ত খেলে বাংলাদেশ। ইংল্যান্ডকে প্রথম টেস্টে হারানোর দ্বারপ্রান্তে গিয়েও পারেনি। কিন্তু দ্বিতীয় টেস্টে হারিয়ে দিয়ে ইতিহাস গড়ে। এবারের বর্ষপূর্তিটা ইংল্যান্ডকে হারানোর কারণে বিশেষভাবে গুরুত্ব রয়েছে।
বাংলাদেশের যত প্রাপ্তি
২০০০ সালের ১০ নভেম্বর শীতের এক সকালে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে প্রায় ৩৫ হাজার দর্শকের সামনে টস করেন নাঈমুর রহমান দুর্জয় ও সৌরভ গাঙ্গুলি। সেই সোনালি সকালটি বাংলাদেশে ক্রিকেট ইতিহাসকেই বদলে দিয়েছে আমূলে। সেই যে শুরু। এরপর ঘর ও ঘরের বাইরে ভারত, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট খেলেছে ৯৫টি। সর্বাধিক ১৬টির প্রতিপক্ষ ‘দ্বীপরাষ্ট্র’ শ্রীলঙ্কা এবং সবচেয়ে কম ৪টি টেস্ট খেলেছে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। জয় সাকুল্যে ৮টি এবং ৫টিরই প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে। দু’টি ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং একটি ইংল্যান্ড। ড্র ১৫টি এবং হার ৭২টি। ২০০০ সালে অভিষেক এবং প্রথম জয় ২০০৫ সালে চট্টগ্রামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। প্রথম জয়টি এসেছিল বাঁ হাতি স্পিনার এনামুল জুনিয়রের ঘূর্ণিতে। এরপর দ্বিতীয় জয় ২০০৯ সালে ক্যারিবীয় সফরে। দেশের বাইরে সেটাই প্রথম জয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজটি জিতেছিল টাইগাররা ২-০ ব্যবধানে। ওই সফরের প্রথম টেস্টের প্রথম দিনেই ইনজুরিতে পড়েছিলেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম জয়ের পর ২০১৪ সালের প্রথমবারের মতো ৩-০ ব্যবধানে আফ্রিকান প্রতিনিধিদের হোয়াইটওয়াশ করে বাংলাদেশ। দলগত সাফল্য হাতেগোনা কয়েকটি। ৮ জয়। তবে ব্যক্তিগত সাফল্য কিন্তু নজরকাড়া। দেশের অভিষেক টেস্টে ৬ উইকেট নিয়েছিলেন দুর্জয়। তবে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল। অভিষেক টেস্টে ১৪৫ রানের ইনিংস খেলে ইতিহাসের পাতায় স্থায়ীভাবে নিজের নাম লিখে নিয়েছেন মেলবোর্নে স্থায়ীভাবে বসবাস করা বুলবুল। অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরি করেছেন আবুল হাসান রাজুও। তার রেকর্ডটি আবার ১০ নম্বরে ব্যাট করতে নেমে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে খেলেছিলেন ১১৩ রানের ইনিংস। টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসে যা রেকর্ড।
সোহাগ গাজীর রেকর্ডটি বিরল। ১৩৯ বছরের টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসে সোহাগ একমাত্র ক্রিকেটার যিনি একই টেস্টে সেঞ্চুরি ও হ্যাটট্রিক করেন। তবে সবাইকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসকে অনন্য কাতারে ঠাঁই দেন মোহাম্মদ আশরাফুল। টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ ক্রিকেটার হিসেবে সেঞ্চুরি করেন আশরাফুল। ডবল সেঞ্চুরি দু’টি। পাকিস্তানের বিপক্ষে খুলনায় ২০৬ রান তামিম ইকবালের এবং গলে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২০০ রান মুশফিকের। বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ রান তামিম ইকবালের। ৪৪ টেস্টে তামিমের রান ৩৩৪৯। এরপরই রয়েছেন সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার। ৫০ টেস্টে তার রান ৩০২৬। তিন হাজারি ক্লাবের সদস্য এই দুই ক্রিকেটার। দেশের পক্ষে সর্বোচ্চ ৬১ টেস্ট খেলেছেন আশরাফুল। সবচেয়ে বেশি উইকেট বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের। ৪৪ টেস্টে সাকিবের উইকেট ১৫৯। মোহাম্মদ রফিকের উইকেট ১০০। ব্যক্তিগত সেরা বোলিং সাকিবের, ৩৭ রানে ৭ উইকেট। ম্যাচসেরা বোলিং তরুণ মেহেদী মিরাজের ১৫৯ রানে ১২ উইকেট। হ্যাটট্রিক দু’টি। ২০০৩ সালে পেশোয়ারে অলক কাপালি হ্যাটট্রিক করেছিলেন পাকিস্তানের বিপক্ষে এবং ২০১৩ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেন সোহাগ গাজী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ