বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

আর্জেন্টিনা বিহীন বিশ্বকাপ ফুটবল!

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা। দুই দেশের পতাকায় ছেয়ে যাবে বাসার ছাদ থেকে শুরু করে অলি-গলির রাস্তাও। বিশ্বকাপ ফুটবলে এত দেশ অংশ নেয়ার পরও পৃথিবীর ফুটবল ভক্তরা যেন ভাগ হয়ে যান দুই শিবিরে। মিডিয়াতেও এই দুই দল নিয়ে থাকে বাড়তি উত্তেজনা। যে দুই দল নিয়ে এত উত্তেজনা তাদের থেকে যদি একটি দেশ না থাকে তাহলে কি হবে? খেলার আগ্রহই থাকবে না। এমনটিই স্বাভাবিক। আসন্ন বিশ্বকাপে এমনটিই হয়ত ঘটতে যাচ্ছে। বাছাই পর্ব থেকেই ছিটকে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা। রাশিয়ায় যাওয়া হচ্ছে না তাদের এমন শঙ্কাই সর্বত্র। তবে বাছাইপর্ব পেরিয়ে আর্জেন্টিনার ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে খেলা নিয়ে অনেকের মনে সংশয় জন্ম নিলেও কোচ এদগার্দো বাউসা ওসব নিয়ে ভাবছেন না। তার বিশ্বাস, সামথ্যের সেরাটা নিংড়ে দিয়ে বাছাইপর্ব পেরুবে আর্জেন্টিনা। বাছাইয়ে সর্বশেষ ম্যাচে বেলো হরিজন্তেতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের কাছে ৩-০ গোলে হারে আর্জেন্টিনা। ১১ ম্যাচে ১৬ পয়েন্ট নিয়ে ষষ্ঠ স্থানে আছে দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চল থেকে শীর্ষ চারটি দল সরাসরি খেলবে রাশিয়া বিশ্বকাপে। পঞ্চম দলটিকে  প্লে-অফ খেলতে হবে ওশেনিয়া অঞ্চলের সেরা দলের সঙ্গে। কোচ জানান, ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে (আর্জেন্টিনার) খেলার যোগ্যতা অর্জনের বিষয়টি নিয়ে আমি কখনই সন্দেহ পোষণ করি না। যে পয়েন্ট আমরা হারিয়েছি, সেটা পীড়া দেয় কিন্তু আমরা এখনও নিজেদের ওপর নির্ভর করছি। দল শক্তিশালী এবং এটা আমাদেরকে আত্মবিশ্বাসী করছে। বাছাইয়ে টানা চার ম্যাচ জয়হীন থাকায় সমালোচনা শুরু হওয়াটা স্বাভাবিক বলেও মেনে নিচ্ছেন বাউসা। তবে দুঃসময়ে সমর্থকদের পাশে পেতে চান তিনি। ‘যে পয়েন্ট হারিয়েছি, আমরা মনে করি না সেটা হারানো ঠিক হয়েছে। এটা স্বাভাবিক যে সমালোচনা হচ্ছে। আশা করি, সান হুয়ানে লোকে আর্জেন্টিনার জার্সির গুরুত্বটা আরও বেশি বুঝতে পারবে। আমাদের সেই সমর্থনটা দরকার।’ সমর্থকদের পাশে পেতে যেটা করণীয় সেটাও মেসি-আগুয়েরোদের মনে করিয়ে দিয়েছেন আর্জেন্টিনা কোচ। ‘আমাদের খেলায় ধারাবাহিতা থাকছে না। খেলোয়াড়দের যে সামর্থ্য আছে, সেটা তাদের বের করতে হবে। খেলোয়াড়রা তাদের অবস্থা এবং তারা যেটা করতে পারে, সেটা জানে। আমি সেটা বিশ্বাস করি।’ ১১ ম্যাচে ১৮ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থানে থাকা কলম্বিয়ার বিপক্ষে জয়ের ছক কষার কথাও জানিয়েছেন বাউসা।
বাজে সময় যাচ্ছে আর্জেন্টিনার। সর্বশেষ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে ব্রাজিলের কাছে ৩-০ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে বিশ্বকাপের টিকেট নিশ্চিত নিয়েই এখন সংশয়ের মধ্যে পড়ে গেছে দিয়েগো ম্যারাডোনার উত্তরসূরিরা। ক্ষুদ্ধ-হতাশায় ভুগছেন সমর্থকরাও। তবে ধৈর্য না হারিয়ে বরং আর্জেন্টাইনদের মানসিকতার পরিবর্তনের কথা বললেন দলের সেরা তারকা লিওনেল মেসি। তার মতে, ‘আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। কারণ আমাদের দলে অসাধারণ সব খেলোয়াড় রয়েছে। তাই সবার আগে মানসিকতার পরিবর্তন করাটাই খুব জরুরী।’ দুই বছর আগে ব্রাজিল বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। এর আগে-পরে কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে হারটাও এখন তাদের জন্য অভিশাপ। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই এখন বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের বাধা পেরুনোটাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। তারপরও ইতিবাচক মেসি। এ প্রসঙ্গে বার্সিলোনার আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার বলেন, ‘যখন একজনের মাথা কাজ না করে তখন তার পা’কে কাজে লাগাতে হবে। তাও যদি না হয় তাহলে এই পরিস্থিতিকে পরিবর্তন করার জন্য আমাদের ইতিবাচক চিন্তা করতে হবে।’
কঠিন সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়ে আর্জেন্টিনা। বিশ্বের অন্যতম সমর্থকপুষ্ট দলটি আগামী ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপ ফুটবল খেলতে পারবে কিনা সেটা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো ১৮টি করে ম্যাচ খেলার সুযোগ পায়। ইতোমধ্যে আর্জেন্টিনাসহ সব দেশ খেলে ফেলেছে ১০টি করে ম্যাচ। বর্তমানে আর্জেন্টিনা পয়েন্ট তালিকার ষষ্ঠ স্থানে। বর্তমানে দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের বাছাইপর্বে সবার ওপরে রেকর্ড সর্বোচ্চ পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। দুইয়ে উরুগুয়ে, তিনে ইকুয়েডর ও চারে কলম্বিয়া।
বাছাইপর্বের ম্যাচগুলোর মধ্যে লিওনেল মেসি খেলেছেন মাত্র তিনটি ম্যাচে। তিনটিতেই জয় পেয়েছে আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে মেসিকে ছাড়া বাকি সাতটি ম্যাচে খেলতে নেমে আর্জেন্টিনা জিতেছে মাত্র একটিতে। ড্র করেছে চারটিতে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা খেলতে পারবে কিনা তা নিয়ে সংশয় আছে। মেসিকে ছাড়া বাছাইপবের্র বাধা পেরুনোও যে, আর্জেন্টিনার জন্য অনেক কঠিন হয়ে যাবে, তা ভালমতোই টের পাওয়া যাচ্ছে। শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্বনন্দিত ও সর্বকালের অন্যতম সেরা তারকা দিয়েগো ম্যারাডোনাও। তিনিও ঠিক নিশ্চিত নন, মেসিরা বিশ্বকাপে খেলতে পারবেন কিনা। এমনিতেই বেহাল অবস্থা তার ওপর বলিভিয়ার ৪ পয়েন্ট ফিফা কেটে নেয়ায় আরও বিপাকে পড়েছে আর্জেন্টিনা। বলিভিয়ার পয়েন্ট হারানোয় আর্জেন্টিনাকে গোল ব্যবধানে টপকে তালিকার পাঁচ নম্বরে উঠে এসেছে কোপা আমেরিকা বিজয়ী চিলি। অবৈধ খেলোয়াড় খেলানোর শাস্তি হিসেবে বলিভিয়ার পয়েন্ট কাটায় আর্জেন্টিনা পড়ে গেছে ঝামেলায়।
এ প্রসঙ্গে দিয়াগো ম্যারাডোনা বলছেন, আর্জেন্টাইন ফুটবল এসোসিয়েশনের (এএফএ) অযোগ্যতা, অদক্ষতা ও দুর্নীতির কথা। ম্যারাডোনা বলেন, ফিফায় আমাদের পক্ষে দাঁড়াবার কেউ নেই। আর্জেন্টাইন ফুটবল এসোসিয়েশনে যা যা ঘটছে, তাতে চিন্তিত না হয়ে থাকা যায় না। সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার বলেন, যা তা লোকজন নিয়ে এএফএ গঠিত। এদের কারণে আমরা কেবল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতাই আমরা প্রায় হারাতে বসিনি, হারাতে বসেছি বয়সভিত্তিক সব স্তরে খেলার যোগ্যতা। ম্যারাডোনার দুশ্চিন্তা ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্টিনোকে নিয়েও। তিনি বলেন, ফুটবল থেকে যারা টাকা চুরি করেছে তাদের সবাইকে দূরে ঠেলতে ইনফান্টিনো এতটুকু দ্বিধা করবে না। আমি এই ব্যাপারটি নিয়ে ভীষণ ভয় পাই। এই দুরবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আর্জেন্টিনার মূল ভরসাই এখন মেসি। এই মেসির বিশ্বকাপ ফুটবলের রঙ্গমঞ্চে রঙিন অভিষেক হয়েছিল। সেটা ২০০৬ জার্মান বিশ্বকাপের কথা। বিশ্বকাপ অভিষেকে মাঠে নেমেই নিজের মুন্সিয়ানা দেখিয়েছিলেন সে সময়ের ১৮ বছর বয়সী তরুণ। গ্রুপ পর্বে সার্বিয়া-মন্টিনেগ্রোর বিরুদ্ধে ৭৪ মিনিটে ম্যাক্সি রড্রিগুয়েজের বদলি হিসেবে নেমে ১৪ মিনিট পরই প্রথম গোল পেয়েছিলেন মেসি। ৮৮ মিনিটে করা সেই গোলটির মধ্য দিয়েই ফুটবল বিশ্বে নিজের আগমনী বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন এ যুগের বিস্ময় বালক। কিন্তু বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে মেসির এর পরের অধ্যায়ে যোগ হয় শুধুই হতাশা, ব্যর্থতা, আপসোস আর হাহাকার। অভিষেকে আলো ছড়ানোর পর আর নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি। ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে ব্যর্থ হন। তবে ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে পৌঁছে গিয়েছিলেন স্বপ্নপূরণের কাছাকাছি। কিন্তু ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয় মেসির। এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ টানা দুই বছর দু’টি কোপা আসরের ফাইনালেও পরাজিত দলের সদস্য হন পাঁচবারের ফিফা সেরা তারকা। এরপর রাগে-ক্ষোভে অবসর নিয়ে নিয়েছিলেন ক্ষুদে এই জাদুকর। তবে দেশের টানে আবারও ফিরেছেন। চারবার দেশের জার্সিতে ফাইনালে হারলেও অনেক মনে করেন, এখনও মেসির সুযোগ আছে বিশ্বকাপ জিতে অবসর নেয়ার। এমন জানিয়েছেন আর্জেন্টাইন কোচ এডগার্ডো বাউজা।
আর্জেন্টাইন কোচ মনেপ্রাণে চাচ্ছেন, দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে বিশ্বকাপে খেলুক তার দল। তার চাওয়া, ১৯৮৬ সালে সর্বশেষ পাওয়া সাফল্যের পুনরাবৃত্তিও হোক মেসিদের হাত ধরে। এ প্রসঙ্গে বাউজা বলেন, আরেকটি বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলতে চাই আমরা। এটা সহজ হবে না। কিন্তু আমাদের জীবনটাই সংগ্রামে ভরা। মনেপ্রাণে চাইলেও কাজটা সহজ হবে না তা ভালমতোই জানেন আর্জেন্টিনা কোচ। নিজের শঙ্কার কথা জানাতেও ভুল করেননি। এ প্রসঙ্গে বাউজা বলেন, আমি উদ্বিগ্ন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ