বৃহস্পতিবার ১৬ জুলাই ২০২০
Online Edition

অপরাধে জড়িত বিদেশীদের দমনে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ

নাছির উদ্দিন শোয়েব : অবৈধভাবে বসবাসরত বিদেশী নাগরিকদের নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ক্রেডিটকার্ড জালিয়াতি, মোবাইলে এসএমএস পাঠিয়ে লটারি জেতার প্রতারণা, জালটাকা তৈরিসহ বাংলাদেশে অবৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশীরা নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। খুন, মাদক ব্যবসা, স্বর্ণ ও মুদ্রা পাচার ও অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসাসহ নানা ধরনের গুরুতর অপরাধে জড়িত রয়েছে বলে গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য রয়েছে।

বিভিন্ন সময় র‌্যাব-পুলিশের অভিযানে বিদেশীরা আটক হলেও বহু অপরাধী থেকে যাচ্ছে অধরা। সর্বশেষ রোববার রাতে রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে চার নাইজেরীয় নাগরিককে আটক করেছে র‌্যাব। তারা মোবাইল ফোনে এসএমএস এর মাধ্যমে লটারি জেতার নামে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা চালিয়ে আসছিল। 

অবৈধ বিদেশী নাগরিকদের কোন পরিসংখ্যানই নেই গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে। ধারণা করে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, অবৈধ নাগরিকের সংখ্যা বৈধের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। যেসব বিদেশী ধরা পড়েছে তাদের তথ্যমতে গোয়েন্দা সংস্থা বলেছে, ১০ থেকে ১২ হাজার অবৈধ বিদেশী বাংলাদেশে অবস্থান করেছে। তারা নানাধরনের অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন সীমান্ত পথ দিয়ে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

অন্য একটি সংস্থা বলছে, বাংলাদেশে বিদেশী রয়েছে ৭০ হাজার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় বলছে ২০ হাজার, আবার সংশ্লিষ্ট অন্য একটি সংস্থার তথ্যমতে, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও রোহিঙ্গাসহ বাংলাদেশে বসবাসরত বৈধ-অবৈধ কয়েক লাখ বিদেশী রয়েছে। তার মধ্যে ৪ লাখ ৯০ হাজার ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া অবৈধভাবে কাজ করছে। ফলে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকা। অবৈধ বিদেশীদের নিয়ে কোন মনিটরিংও নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন অপরাধে কারাগারে বন্দী আছে ৭ শতাধিক বিদেশী। শুধু চলতি বছরেই খুন ও জঙ্গি তৎপরতাসহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৮০ বিদেশী নাগরিককে গ্রেফতার করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশ সদর দফতরের একটি সূত্র জানায়, বর্তমানে ২০ দেশের বিদেশী নাগরিকদের বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে প্রায় ১৫ হাজার অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি দেশের নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগের সংখ্যাই বেশি। 

সূত্রমতে, প্রতিদিন পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে বহু অনুপ্রবেশকারী সীমান্ত দিয়ে ঢুকে পড়ছে বাংলাদেশে। অনেকে নামে-বেনামে অবৈধভাবে থেকে এদেশের নাগরিকও দাবি করেছে। জাল পাসপোর্ট তৈরি করে বছরের পর এদেশে অবস্থান করছে। পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হলেও তা যাচাই বাছাই করা হচ্ছে না। ভুয়া ভোটার আইডিকার্ড তৈরি করে অনেকে চাকরির সুযোগ করেও নিয়েছে। এদের সঠিক পরিসংখ্যান করা হচ্ছে না। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশে কোনো বাংলাদেশী অবৈধভাবে প্রবশে করলেই তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের নিষ্ক্রীয়তার সুযোগে বিদেশী নাগরিকরা অবস্থান করে অপরাধ করার সুযোগ পাচ্ছে।

এ তালিকার প্রথমেই আছে আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়া, ঘানা, কঙ্গো, লিবিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, ফিলিপাইন, আলজেরিয়া, সুদান, তানজানিয়া, উগান্ডা, শ্রীলঙ্কা, ভারত ও পাকিস্তান। এসব দেশের নাগরিকদের কে কোথায় কী পেশায় আছেন, তার বেশিরভাগই অজানা পুলিশের। দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দী রয়েছে ৭ শতাধিক বিদেশী। তাদের মধ্যে ৭৯ জন বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত। র‌্যাব জানায়, বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকায় গত ৫ বছরে ২৮৬ বিদেশী নাগরিককে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। এদের অধিকাংশই মাদক, চোরাচালান, জাল মুদ্রা তৈরি, প্রতারণা, অস্ত্র ব্যবসা ও মুদ্রা পাচারে জড়িত। আবার কেউ কেউ জঙ্গি কর্মকাণ্ডেও জড়িত। এছাড়া পাকিস্তানের লস্কর ই-তৈয়বা, মিয়ানমারে আরএসও এবং ভারতের জঙ্গি সংগঠনের সাথে জড়িত কিছু নাগরিক অবৈধভাবে এদেশে অবস্থান করছে। সাধারাণত খেলোয়াড়, টুরিস্ট ভিসা নিয়ে কিংবা ব্যবসার কথা বলে বাংলাদেশে এসে বিদেশীরা অপরাধ কার্যক্রম চালাচ্ছে। ভিসা দেয়ার সময় ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করলে এ ধরনের অপরাধীর তৎপরতা অনেক কমে আসবে। বায়িং হাউস, এনজিওসহ বিভিন্ন ধরনের চাকরি ও ব্যবসা করছে তারা। 

এদিকে লটারির নামে প্রতারণার অভিযোগে চার নাইজেরীয় নাগরিককে আটক করে র‌্যাব-১। রোববার রাতে রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা হলেন, ইব্রাহিম (২৯), ক্লেসি প্রিন্স জন (৪০), কেম স্যামুয়েল আজুবেইক (৩৫), ডেনিস অকুর্দি চেফ (৪০)। অভিযুক্তরা মোবাইলে লটারি জেতার এসএমএস পাঠিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করতো এবং প্রতারণা করে মানুষের কাছ থেকে বিকাশের মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নিত। সাম্প্রতিক সময়ে এ ব্যাপারে বেশ কিছু অভিযোগ পায় র‌্যাব। বেশ কিছু ভুক্তভোগী এ ব্যাপারে র‌্যাবের কাছে অভিযোগ করে। এসব অভিযোগে জানা যায়, মোবাইল ফোনে লটারি জেতার ক্ষুদে বার্তা (এসএমএস) পেয়ে তারা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদের বিকাশে টাকা পাঠাতে বলে। তবে টাকা নিয়ে তারা আর কোনও যোগাযোগ করেনি। এই অভিযোগের ভিত্তিতে বিকাশে টাকা জমা দেওয়ার সূত্র ধরে তদন্তের ভিত্তিতে এই চার নাইজেরীয়কে আটক করা হয়।

র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক (সিও) তুহিন মোহাম্মদ মাসুদ বলেন, আসামীরা উত্তরার ৬ নম্বর সেক্টরের একটি হোটেল থেকে র‌্যান্ডমলি নম্বরে কোটি টাকার লটারি জেতার ভুয়া ক্ষুদেবার্তা পাঠাতেন। যারা লটারির পুরস্কার পাওয়ার আগ্রহ দেখিয়ে এসএমএস-মেইলে নিজেদের তথ্য পাঠাতো তাদের সঙ্গে ফোন দিয়ে যোগাযোগ করা হত। যোগাযোগের একপর্যায়ে তারা ফোন দিয়ে বলে, ‘আপনার পুরস্কারটি শাহজালাল বিমানবন্দরে এসে পৌঁছেছে। সঙ্গে একটি ফ্রি এলইডি টিভি রয়েছে। টিভিটিসহ পুরস্কারের অঙ্ক খালাস করতে টাকা প্রয়োজন। টাকা বিকাশ করলেই আপনার বাড়িতে পৌঁছে যাবে পুরস্কার। এ ধরনের ফোন দিয়ে একজন থেকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা নেয়ার প্রমাণও পাওয়া গেছে। র‌্যাব গোপন সংবাদ পায় যে, ১৪ নম্বর সেক্টরের একটি বিকাশ এজেন্টের মাধ্যমে টাকা লেনদেন হচ্ছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে র‌্যাবের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ধরা পড়েন ইব্রাহীম। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর বাকি তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের সময় তাদের কাছ থেকে প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত ১৪টি মোবাইল, ২৪টি দেশী-বিদেশী সিম, ৩টি ল্যাপটপ, ৫টি মডেম, ৫টি ক্রেডিট কার্ড, ১টি ডেবিট কার্ড, বাংলাদেশী সত্তর হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়।

৪ নবেম্বর অবৈধভাবে বসবাসসহ বিভিন্ন অভিযোগে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ৩১ জন বিদেশী নাগরিককে আটক করেছে পুলিশ। বনশ্রী, গুলশান ও উত্তরায় অভিযান চালিয়ে এই বিদেশীদের আটক করা হয়। আটককৃতরা হলেন, নাইজেরিয়ার ২১ জন, শ্রীলঙ্কার চারজন, উগান্ডার তিনজন এবং অন্যান্য দেশের আরো তিন নাগরিক রয়েছেন । আটকের পর পুলিশ জানায়, গোয়েন্দা পুলিশ তাদের অভিজ্ঞতায় দেখেছে, কিছু বিদেশী ছাত্র বা ভ্রমণ ভিসায় এদেশে আসে। রাজধানীর উত্তরা গুলশানসহ বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় তারা বাড়ি ভাড়া নেয়। এক সময় ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও তারা এদেশে অবৈধভাবে থাকতে শুরু করে, যা বড় ধরনের অপরাধ। এসব বিদেশী নাগরিক অনেক সময় মাদক ও জাল টাকা তৈরিসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতারণার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে ।

৯ ফেব্রয়ারি রাজধানীর উত্তরায় ৫ জন বিদেশী নাগরিক গ্রেফতার করে পুলিশ। এরা হলেন, ডুমানটিয়ার (৩২), মেরিটনী (৩৫), জেরিনালিপেন (৩৭),বমারছো (৩২) ও মো: ইউসুফ (৪০)। উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ জানায়, গ্রেফতারকৃতরা সকলে নাইজেরিয়ার নাগরিক। তাদের কাছে কোন বৈধ পাসপোর্ট ছিল না। এর আগে এটিএম বুথে বিশেষ যন্ত্র বসিয়ে কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় জড়িত থাকার মূল হোতা টমাস পিটারকে আটক করে পুলিশ। এছাড়াও আরেক এক বিদেশী নাগরিককে আটক করে পুলিশ। তিনি পূর্ব ইউরোপের একটি দেশের নাগরিক । বনানীতে অবস্থিত একটি এটিএম বুথের সিসি ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ দেখে তাকে শনাক্ত করা হয় এবং তাকে আটক করা হয়। আটককৃত ওই ব্যক্তির কাছে একাধিক দেশের পাসপোর্ট পাওয়া যায়। 

গত ৮ আগস্ট, রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে জাল টাকা তৈরি চক্রের জড়িত থাকায় ৯ জন বিদেশীকে আটক করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। এ সময় তাদের কাছ থেকে দেশী এবং বিদেশী বিপুল পরিমাণ জাল মুদ্রাসহ টাকা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। র‌্যাবের মিডিয়া এন্ড লিগ্যাল উইংয়ের সিনিয়র সহকারী পরিচালক এএসপি মিজানুর রহমান জানান, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করে তাদেরকে আটক করে র‌্যাব-২। 

এছাড়া ৪ মার্চ একটি আন্তর্জাতিক সাইবার প্রতারক চক্র হিসেবে কাজ করা এবং ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে মানুষের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে ১২ জন বিদেশীকে আটক করা হয়। ঢাকার উত্তরাসহ বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে র‌্যাব। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, আটক হওয়া বিদেশীদের মধ্যে আটজন নাইজেরিয়ার নাগরিক, ক্যামেরুনের ৩ জন ও কঙ্গোর একজন নাগরিক রয়েছেন। 

এছাড়া ২০১৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্র জুবায়ের আহমেদকে (১৭) হত্যার অভিযোগ করা হয় এক বিদেশীর বিরুদ্ধে। পরে উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের খেলার মাঠসংলগ্ন পুকুর থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত জুবায়েরের মা দিলারা বেগম বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এ ঘটনায় আলজেরিয়ান নাগরিক আবু ওবায়েদ কাদেরকে গ্রেফতার করা হয়। আলজেরিয়ান নাগরিক আবু ওবায়েদ কাদেরকে (৪৬) রিমান্ডে নেয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদের সূত্রে গোয়েন্দা পুলিশ বলছে, কাদের অবৈধভাবে বসবাসের পাশাপাশি আরো নানা অপরাধে যুক্ত ছিল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ