মঙ্গলবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

হেলিকপ্টার গানশিপ থেকে গুলী ৩০ রোহিঙ্গা মুসলমানকে হত্যা

সংগ্রাম ডেস্ক : সহিংসতাপ্রবণ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাদের হাতে অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছে। গতকাল সোমবার দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নিহত ব্যক্তিদের ‘রোহিঙ্গা মুসলিম জঙ্গি গোষ্ঠী’র সদস্য বলে দাবি করেছে। রয়টার্সের খবরে এ কথা জানানো হয়।

গত ৯ অক্টোবর মংডু শহরের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী চৌকিতে হামলার ঘটনায় নয় পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি আবার জটিল আকার ধারণ করে। পুরো মংডু শহর ও বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রচুর সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।

পর্যবেক্ষক ও কূটনীতিকরা মনে করছেন, গত রোববারের এই হামলার ঘটনায় অশান্ত এই রাজ্যটিতে দ্রুত শান্তি ফিরিয়ে আনা ও ধীরে ধীরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি পুনরুদ্ধারের সব আশা শেষ হয়ে গেছে।

রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গ্লোবাল নিউ লাইট অব মিয়ানমারের রিপোর্টে বলা হয়, একদল অস্ত্রধারী রামদা ও কাঠের বল্লম নিয়ে হামলা চালালে সেনাবাহিনী পাল্টা হামলা চালায়। এতে অন্তত ১৯ জন নিহত হয়। পত্রিকাটি আরও জানায় গত শনিবার সেনাসদস্যদের হাতে ছয়জন নিহত হয় এবং সেখানে হেলিকপ্টার তলব করা হয়।

রাখাইন রাজ্যে ১১ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম নাগরিকের বাস। কিন্তু মিয়ানমার তাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশের থেকে যাওয়া অবৈধ নাগরিক মনে করে।

হামলার পর নিরাপত্তা বাহিনী পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছে। সেখানেই বেশির ভাগ রোহিঙ্গা মুসলমানের বাস। ওই এলাকায় কোনো ত্রাণকর্মী ও পর্যবেক্ষকদের যেতে দেয়া হচ্ছে না।

গত অক্টোবর থেকে শুরু হওয়ায় এ সংঘর্ষে ৬০ জনের বেশি রোহিঙ্গা মুসলিম আহত ও নিরাপত্তা বাহিনীর ১৭ জন আহত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার বরাত দিয়ে রয়টার্স এ তথ্য জানায়। ২০১২ সালে সাম্প্রদায়িক হামলায় শত শত মানুষ নিহত হয়।

জাতিগত নিপীড়ন

মিয়ানমারে নতুন করে শুরু হওয়া কথিত সেনা-রোহিঙ্গা সংঘর্ষে ২৮ জন নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছে সে দেশের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।

এর একদিন আগে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিপীড়নের স্যাটেলাইট ইমেজ প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

২০১২ সালে ওই রাজ্যের জাতিগত দাঙ্গায় শতাধিক রোহিঙ্গা মুসলিম নিহত হওয়ার পর সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সেখানে চরম উত্তেজনা দেখা গেছে। অক্টোবর মাসের ৯ তারিখে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ এলাকায় সন্ত্রাসীদের সমন্বিত হামলায় নয় পুলিশ সদস্য নিহত হয়। দুই দিনের মাথায় ১১ অক্টোবর মঙ্গলবার মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আরও ১২ জনের মৃত্যুর কথা জানায়। তারা দাবি করে, প্রায় ৩০০ মানুষ পিস্তল এবং ধারালো অস্ত্র নিয়ে সৈন্যদের উপর আক্রমণ করলে সেনাবাহিনী পাল্টা আক্রমণ করে।

মিযানমার সরকার কথিত এসব সংঘর্ষকে হামলাকারীদের খোঁজে ক্লিয়ারেন্স অপারেশন হিসেবে অভিহিত করছে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী রাখাইন রাজ্যে জাতিগত দমনপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। সেখানে ঘরবাড়িতে আগুন দেয়া, নারীদের ধর্ষণসহ নানান ধারার শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন চলছে।

গত শনিবার হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২২ অক্টোবর থেকে ১০ নবেম্বরের মধ্যে উত্তরাঞ্চলীয় মংগদাউ জেলার তিনটি গ্রামের ৪৩০টি ভবন পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়াবিষয়ক পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস এক বিবৃতিতে বলেন, ‘নতুন স্যাটেলাইট ইমেজ রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে ব্যাপক ধ্বংস যজ্ঞের নিদর্শনই কেবল প্রকাশ করেনি বরং এটাও নিশ্চিত করেছে যে আমরা আগে যা ভেবেছিলাম পরিস্থিতি তার চেয়েও ভয়াবহ’।

প্রসঙ্গত রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলমানদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না মিয়ানমার সরকার। সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধরা মনে করে রোহিঙ্গা মুসলমানরা বাংলাদেশ থেকে সেখানে গেছে। গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সুচির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসবার পরও এই বাস্তবতার বদল ঘটেনি বরং নির্বাচনের আগে-পরে ফাঁস হয়েছে কোদ সু চির মুসলিমবিদ্বেষের নানাদিক। নির্বাচনে তিনি মুসলমানদের প্রার্থী করেননি। ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয়টিও অস্বীকার করেন সুচি।

এদিকে রাখাইন রাজ্যে এ সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। সবগুলো পক্ষকে সংযম দেখানোর আহবান করেছে সংস্থাটি।

হেলিকপ্টার গানশিপ থেকে গুলী চালানোর কথা স্বীকার

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা গ্রামে হেলিকপ্টার গানশিপ থেকে সেনাবাহিনীর গুলী চালানোর কথা স্বীকার করেছে দেশটির সরকার।

দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, সেনাদের ওপর চালানো এক চোরাগোপ্তা হামলায় দুই সেনা ও ছয় হামলাকারী নিহত হন। এর জের ধরে হেলিকপ্টার গানশিপ তলব করা হয় বলে জানিয়েছে বিবিসি।

রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলীয় এলাকাগুলোতে গ্রামগুলো পুড়ছে বলেও খবর পাওয়া গেছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রকাশ করা ছবিতে পুড়ে যাওয়া গ্রামের ঘরবাড়ি দেখা গেছে। ওইসব এলাকার ৪৩০টি পাকা ভবন পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাটি।

লড়াই চলছে ও বেসামরিক লোকজন পালিয়ে যাচ্ছে, গত মাসে এমন খবরের ভিত্তিতে ২২ অক্টোবর থেকে ১০ নবেম্বর পর্যন্ত স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ছবিগুলো তোলা হয়।

রোহিঙ্গা অধিকার নিয়ে আন্দোলনরতরা জানিয়েছেন, মিয়ানমার সরকার পরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘু মুসলিমদের তাদের গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে।

রোহিঙ্গাদের ওপর সামরিক বাহিনীর আক্রমণ একটি জনপ্রিয় পদক্ষেপ বলে মিয়ানমারের বৃহত্তম শহর ইয়াঙ্গুন থেকে জানিয়েছেন বিবিসি প্রতিনিধি। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে থেকে যাওয়া অবৈধ অভিবাসী বলে মনে করে অনেক মিয়ানমারবাসী এবং তাদের অপছন্দ করে, তবে সবাই তা করে না বলে জানিয়েছেন তিনি।

এক মাস আগে বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন তিনটি পুলিশী তল্লাশি চৌকিতে হামলা চালানোর পর সর্বশেষ এ সংঘর্ষ শুরু হয়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, এশিয়ার পরিচালক ব্রাড অ্যাডামস বলেছেন, “নতুন ছবিগুলো দেখিয়েছে প্রথমে আমরা যা ভেবেছিলাম তার চেয়েও অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক ঘটনা ঘটেছে।”

ঘটনার শিকারদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে মিয়ানমার সরকারের উচিত দ্রুত জাতিসংঘ-নির্দেশিত একটি তদন্ত শুরু করা বলে জানিয়েছেন অ্যাডামস।

অং সান সুচির নেতৃত্বাধীন মিয়ানমার সরকার জানিয়েছে, হামলাকারীদের ধরতে তল্লাশি অভিযানের অংশ হিসেবে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ চালানো হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ