মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

জীবন্ত পুড়িয়ে মারলেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই থামাব না -মোদি

১৪ নবেম্বর, ব্লুম বার্গ/এনডিটিভি ও টাইমস অব ইন্ডিয়া : ভারতে গত ৯ নবেম্বর ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট বাতিল করে দেওয়ায় অকল্পনীয় জনদুর্ভোগ ও বিরোধীদের তীব্র সমালোচনার মধ্যে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এমতাবস্থায় তিনি প্রাণসংশয় হতে পারে বলে আশঙ্কাও করেছেন। তবে তিনি পরিষ্কার ভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগণ আমাকে ভোট দিয়েছে। সেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই আমি চালিয়েই যাব, তাতে আমাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারলেও আমি প্রস্তুত।
নরেন্দ্র মোদির রোববার তার এক টুইট বার্তায় আরও বলেন, আমি জানি অনেক শক্তি আমার বিরুদ্ধে ময়দানে নেমে পড়েছে, তারা হয়তো আমাকে বাঁচতে দেবে না, এমনকি তারা আমাকে ধ্বংস করে দেবে। কারণ ৭০ বছর ধরে তারা যে লুটপাট চালাচ্ছিল, তা আমি বন্ধ করে দিয়েছি বলেই।
গত ৯ নবেম্বর দেশের আর্থিক হাল ফেরাতে ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন মোদি। কিন্তু মোদি সরকারকে বারবার জানানো হচ্ছে, জাল টাকা এবং কালো টাকার রমরমা রুখতে ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোট রাতারাতি বাতিল করে দেয়ার যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত জরুরি ছিল। কিন্তু বিরোধী দলগুলো জনসাধারণের হয়রানির কথা তুলে ধরে পথে নেমেছে। সরকার উপযুক্ত প্রস্তুতি না নিয়ে কেন এ পদক্ষেপ করল, বিরোধীদের তরফে সেই প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় সরকারকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে। সেই সমালোচনা নস্যাৎ করতে রোববার অত্যন্ত আক্রমণাত্মক মনোভাব নিয়েই মুখ খুলে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
এদিকে ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ৯ থেকে ১২ নবেম্বর পর্যন্ত ভারতের ব্যাংকগুলোতে ৫০০ ও ১০০০ রুপির প্রায় ২ লাখ কোটি রুপি (২৯৮০ কোটি ডলার) জমা পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মোদি বলেন, কালো টাকার সমস্যা দূর করতে নোট বদলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এমনকি দেশের আর্থিক প্রেক্ষাপটকে উপরের দিকে তুলে আনতে বেনামি সম্পত্তির দিকে কড়া নজর রাখতে চলেছে কেন্দ্র।
কিন্তু বিরোধীদের দাবি, বিজেপির নেতা-মন্ত্রীদের একাংশের পকেটেই রয়েছে কালো টাকা। এমন প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষের স্বার্থে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। কালো টাকায় মহীরুহ হয়ে ওঠা ব্যক্তিদেরও রাখা হবে সরকারের আঁতশ কাঁচের নিচে।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, গত দশ মাস ধরে খুব গোপনে একটি ছোট্ট ‘টিম’ তৈরি করে নোট বদল প্রক্রিয়ার ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করা হয়েছে। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটির গোপনীয়তা ভীষণ জরুরি ছিল। নয়তো রাঘববোয়ালরা আঁচ পেয়েই কালো টাকা সরানোর কাজে লেগে পড়ত। এখনও যদি কেউ সেই চেষ্টা চালায়, তবে তারা মহা মুশকিলে পড়বেন বলে হুঁশিয়ারিও দিলেন মোদি।
জাপান সফরে থাকাকালীন বিরোধী দলের খোঁচায় জেরবার ছিল বিজেপি শিবির। রব উঠেছিল, যে সময় দেশের মানুষ নোট বদল করতে গিয়ে নাকানি-চোবানি খাচ্ছে, অর্থ-সংকটে নাজেহাল দেশের মানুষ, তখন মোদি দেশের বাইরে। ক্ষমতায় আসার আগে বিদেশ থেকে কালো টাকা ফিরিয়ে আনবেন বলে দাবি জানালেও, সবই ছিল মোদির ভাওতা এমন টিপ্পনিও ছিল অনেকের গলায়।
বিদেশ থেকে ফিরেই প্রত্যয়ী মোদি বলেন, দেশে কালো টাকা ফিরবে। আর সেজন্য কয়েকটি দেশের সঙ্গে এরই মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। বিদেশে টাকা পাচার হলে তার খবর তৎক্ষণাৎ চলে আসবে। যাতে দেশে আর্থিক অবস্থা অনেক বেশি চাঙ্গা হবে।
নোট বদল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ৫০ দিন ধার্য করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। তার পরেই সারা দেশের আর্থ-সামাজিক চিত্রটার আমূল পরিবর্তন ঘটবে বলে দাবি নরেন্দ্র মোদির। তিনি বলেন, দেশের হাল ফেরাতে ডোজ বাড়াচ্ছি। তবে সাধারণ মানুষের যে অসুবিধা হচ্ছে, এটা মেনে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অসুবিধা মেনে নিয়েই মানুষ এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাচ্ছে। সবাই বলছেন, এতে দেশের ভালো হবে। এমতাবস্থায় তিনি দেশের সব সৎ নাগরিককে এ অভিযানে তার সরকারের সঙ্গে থাকার আবেদনও জানিয়েছেন।
এদিকে বিজেপির শীর্ষ নেতাদের মতে, এখন মোদিকে একাধারে দুটি কাজ করতে হচ্ছে। এক, দ্রুত আমজনতার ভোগান্তি দূর করে নোটের জোগান স্বাভাবিক করা, তাদের টাকা ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা করা। দুই, যেভাবে সংসদের অধিবেশনের মুখে বিরোধীরা একজোট হচ্ছে, সেটির মোকাবেলা করা। বিজেপির দাবি, যে সব দল মুখে দুর্নীতি দমনের কথা বলে এখন বিরোধিতা করছে, তারা আসলে নিজেদের কালো টাকা নিয়ে চিন্তিত।
ঐশ্বর্যের থেকে কী মেসেজ পেলেন মোদি? : কেউ পুরনো ৫শ, ১ হাজার টাকার পুরনো নোট বদলাতে চাইছেন, কেউ চাইছেন জমা দিতে। কেউ বা এটিএমের লম্বা লাইনে দাঁড়িয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে কেউ মোদির ‘নোট নীতির’ প্রশংসা করছেন, কেউ বা দৈনন্দিন অসুবিধের কারণে সমালোচনায় বিদ্ধ করেছেন। গত পাঁচদিনে গোটা দেশের চালচিত্র অনেকটা এমনই। এই পরিস্থিতিতে এ বার মোদি পাশে পেলেন ঐশ্বর্যা রাই বচ্চনকে।
প্রধানমন্ত্রীর নয়া নীতিকে সমর্থন জানিয়ে ঐশ্বর্যা বললেন, ‘‘একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমি প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাব। দুর্নীতির বিরুদ্ধে এটা একটা বড় পদক্ষেপ। নিশ্চয়ই আপনার আরও বড় কোনও পরিকল্পনা রয়েছে। দেশের মানুষ সেটা বুঝবে। কোনও পরিবর্তনই সহজে হয় না। কিন্তু এখন আমাদের বড় স্বার্থের কথা ভাবতে হবে।’’
তবে মোদির এই সিদ্ধান্তের বিরোধীতায় কোমর বেঁধে নেমেছে অন্যান্য রাজনৈতিক দল। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগকে সামনে রেখে আওয়াজ তুলেছে তৃণমূল কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি এমনকী শিবসেনাও।
ভারতে কালো টাকার পরিমাণ কত? : ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিল ঘোষণার পর গত রোববার পর্যন্ত ৫দিনে ভারতের বিভিন্ন ব্যাংকে জমা পড়েছে দেড় লাখ কোটি টাকা। আদতে ভারতে কালো টাকার পরিমাণ কত? এ নিয়ে আছে বিভিন্ন হিসাব। ভারতের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও সমাজকর্মী রাজিব দিক্ষিত এক সমাবেশে বলেছিলেন, দেশটিতে কালো টাকার পরিমাণ ২৫৮ লাখ কোটি টাকা। তার ভাষায় এ ‘কালোধন’ ফিরিয়ে আনতে পারে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ও সংসদ। কর বহির্ভূত অপ্রদর্শিত আয়কে কালোটাকা ধরে তা আদায়ে মামলা করেছিলেন তিনি। ২০১০ সালের ৩০ নবেম্বর তাকে হত্যা করা হয়।মৃত্যুর আগে রাজিব দিক্ষিত কালোটাকা যে উদ্ধার করা সম্ভব তার উদাহরণ দিয়ে বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাওয়ের শাসনামলে ইউরিয়া ঘোটালিকার কালোটাকার কেলেঙ্কারীর পর সুইস ব্যাংক থেকে ১৩৩ কোটি টাকা ফিরিয়ে আনা হয় এবং এ কাজে নরসীমা রাওয়ের ছেলে জড়িত থাকার দায়ে তাকে জেল দেয়া হয়। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ও সংসদ কালোটাকা বা এ টাকায় অর্জিত সম্পদ রাষ্ট্রীয় সম্পদ ঘোষণা করলে তা বিদেশী ব্যাংকে থাকলেও দেশটির রাষ্ট্রীয় কোষাগারে নিয়ে আসা যায়। ভারতে কালোটাকার পরিমাণ কত তার কোনো সরকারি হিসেব নেই। তবে ২০১১ সালে ভারতের তিনটি প্রতিষ্ঠান এক পরিসংখ্যান দিয়ে কালোটাকার পরিমাণ সম্পর্কে সরকারের কাছে এক প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয় ২০০২ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ভারত কালোটাকা পাচারে পঞ্চম স্থান অধিকার করে আছে। এসময় পাচার হয়েছে ৩৪৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১১ সালেই অন্তত ৮৪ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়। যুক্তরাষ্ট্রের গ্লোবাল ফিনান্সিয়াল ইন্ট্রেগিটি বলছে ১৯৪৮ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ভারত থেকে ৪৬২ বিলিয়ন ডলার বা ২৮ দশমিক ৬ লাখ কোটি টাকা কালোটাকা পাচার হয়েছে। এনডিটিভি বলছে এ টাকা ১ ট্রিলিয়ন ডলারের ভারতীয় অর্থনীতির প্রায় অর্ধেক। সুইস ব্যাংক এক হিসেবে জানায়, প্রতিষ্ঠানটিতেই ভারত থেকে প্রেরিত ১ দশমিক ৪৫৬ বিলিয়ন ডলার কালোটাকা হিসেবে জমা আছে। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে সুইস ব্যাংকে এ টাকার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। এক বছরে এ টাকা বৃদ্ধির হার ছিল ৪২ শতাংশ। এনডিটিভির এক অনুষ্ঠানে ভারতের সেন্ট্রাল ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার সাবেক পরিচালক এপি সিং দাবি করেন, ভারত থেকে ৫০০ বিলিয়ন ডলার বা ৩১ দশমিক ৪ লাখ কোটি কালোটাকা পাচার হয়ে গেছে। ২০১১ সালে বিজেপি’র এক টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতীয়দের অপ্রকাশিত বিদেশী এ্যাকাউন্টে জমা আছে ১১৮ দশমিক ২ লাখ কোটি টাকা। এর আগে ২০০৭ সালে বিশ্বব্যাংক এক পরিসংখ্যানে জানায় ভারতের মোট অর্থনীতির আকারের ২৩ দশমিক ২ ভাগ হচ্ছে কালোটাকা।
২০১৪ সালের ২৭ মে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এমবি সাহার নেতৃত্বে কালোটাকা অনুসন্ধানে একটি কমিটি গঠন করে দেশটির সরকার। এরআগেই জার্মানি, ফ্রান্স সহ বিভিন্ন দেশের বহুজাতিক ব্যাংকগুলো থেকে ভারতীয় নাগরিকদের কালোটাকার হিসেব দেশটির সরকারের কাছে জমা হচ্ছিল। উইকিলিকস’এর প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান এ্যাসাঞ্জ একবার বলেছিলেন, সুইসব্যাংকে অধিকাংশ কালোটাকা আসে ভারত থেকে। ভারত থেকে কালোটাকা বিদেশে পাচার হওয়া ছাড়াও দেশটির অভ্যন্তরে সোনা ও মূল্যবান পাথর শিল্প, নির্মাণ শিল্প, চলচ্চিত্র শিল্প ও নির্বাচনে ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়। দিল্লির সেন্টার ফর মিডিয়া স্টাডিজ বলছে সর্বশেষ লোকসভা ও রাজ্যসভা নির্বাচনী প্রচারণায় ৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার বা ৩০ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ব্যয় ছিল ৬ বিলিয়ন ডলার এবং সে হিসেবে ভারতের এ নির্বাচনী ব্যয় দ্বিতীয় বৃহত্তম।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ