মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

‘ইসলাম’ জনগণ নিপীড়ন নয়, নিরাপদ ও শান্তির ধর্ম

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : ॥ পূর্ব প্রকাশিতের পর ॥
আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা বড় পাপ।
সূরা বাকারার ২১৫ নং আয়াতে পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন ও মুসাফিরদেরকে অর্থ সম্পদ প্রদানের জন্য বলা হয়েছে।
বুখারী শরীফে উল্লেখিত হয়েছে যে, যে ব্যক্তি তার জীবিকার প্রাচুর্য ও দীর্ঘায়ূ কামনা করে সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখে।
গ) পানাহার ও খাদ্য দ্রব্যের ক্ষেত্রে পাপ : পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ২১৯ নং আয়াতে মদ পান ও জুয়াকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। অনুরূপ সূরা আনয়ামের ১৭৩ নং আয়াতে মৃত জন্তর রক্ত, শুকরের মাংস, যা যবাই করার সময় আল্লাহর নাম নেয়া হয়নি এমন জন্তুর মাংস হারাম করা হয়েছে। এ বিষয়টিও জনগণেকে রাষ্ট্রের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে জ্ঞান দিতে হবে। এটি যেমন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি নৈতিক চরিত্রের ক্ষেত্রে। এদ্বারা মানুষ নিজে যেমন নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে, তেমনি অন্যকে নিরাপত্তাহীন করে তোলে।
ঘ) সামাজিক জীবনে কতিপয় মারাত্মক পাপ : ইসলাম মানব সমাজে জননিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নিশ্চিত ও সুদৃঢ়করণে মানুষের সামাজিক জীবনের এমন কতিপয় বিষয়কে পাপ ও অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছে, যার অনিবার্য ফলশ্রুতি জননিরাপত্তাহীনতা। কোন সামজে এ বিষয় বিদ্যমান থাকলে সে সমাজে কখনো জননিরাপত্তা থাকতে পারে না। এগুলো সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বিষয়গুলো হলো:
১. জুলম।
২. মন্দ কাজে পরস্পর বাধা না দেয়া।
৩. শত্রুর সাথে প্রতিরোধ বিমুখ থাকা।
৪. মিথ্যাচার
৫. মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া
৬. চোগলখুরী করা
৭. কৃপণতা
৮. অন্যকে উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন না করা।
উপরোক্ত বিষয়গুলো সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো :
১. যুলুম, অত্যচার : যুলুম অর্থ অত্যাচার বা সীমা লংঘন করা অর্থাৎ কোন বস্তু তার প্রকৃত স্থানে প্রয়োগ না করে অন্যত্র প্রয়োগ করা। ইসলামী পরিভাষায় ন্যায়ের বা সত্যের সীমা লংঘন বা অন্যায় কাজের প্রতি আগ্রহকে যুলুম বুঝায়। ইসলামে যে যুলুম করে তাকে যালেম বলে। আল্লাহ্ কখনো কোন যালেমকে পছন্দ করেন না। অন্যের অধিকারে যে অন্যায় হস্তক্ষেপ করে সেই যালেম।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে যে, ‘যারা সীমা লংঘন করেছে, তাদের প্রতি ঝুকে পড়ো না, পড়লে অগ্নি তোমাদেরকে স্পর্শ করবে।’ সূরা হুদ: ১১৩।
আল্লাহ্র রাসূল সাঃ বলেছেন- ‘অত্যাচারিত ব্যক্তির দুয়াকে ভয় কর, কেননা ঐ দু’আ এবং আল্লাহর মধ্যে কোন পার্থক্য থাকে না।’ বুখারী ও মুসলিম শরীফ।
যুলুম থেকে রক্ষার জন্য সমাজে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যারা আল্লাহর দেয়া ন্যায় বিচারের বিধান আঁকড়ে না ধরবে তাদের জীবন যুলুমে পর্যবসিত হবে।
আল্লাহ্ বলেন- আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুযায়ী যারা ফয়সালা না করে তারাই যালিম।” সূরা: মায়েদা-৪৫।
ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় জালিমের কোন স্থান নেই। এজন্য ইসলামী বিধানই সর্বাধিক জননিরাপত্তা বিধানে কার্যকর।
২. মন্দ কাজে পরস্পর বাধ না দেয়া : পৃথিবীতে সেই সমাজের জনগণের নিরাপত্তা তথা কল্যাণ নিশ্চিত নয়, যে সমাজে পরকালের জবাবাদিহিতার ব্যাপারে একে অন্যকে সাবধান না করে। এজন্য ইসলামের বিধান হলো সৎকাজের আদেম করা এবং অসৎ কাজে বাধা দান করা।”
যে সমাজ সৎকাজে আদেশ ও মন্দ কাজে নিষেধ না করে, ইসলাম সে সমাজকে অভিসম্পাতের উপযুক্ত পাপী সমাজ বলে আখ্যায়িত করেছে। ইসলামী সমাজ সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন- “বিশ্বাসী নর-নারী একে অপরের বন্ধু। এরা সৎকার্যের নির্দেশ করে এবং অসৎকার্যে নিষেদ করে।” সূরা তওবা: ৭১।
মুসলমানরা এ দায়িত্ব পালন করে থাকে বলে, মহান আল্লাহ্ বলেন- ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ দল, মানব জাতির জন্য তোমাদের অভ্যুদয় হয়েছে, তোমরা সৎকার্যের নির্দেশ দান কর, অসৎ কার্যে নিষেধ কর এবং আল্লাহ্কে বিশ্বাস কর।’ আল ইমরান: ১১০।
ইসলামী আইনে কোন মন্দ কাজ যা জননিরাপত্তার জন্য হুমকি স্বরূপ দেখেও চুপ থাকা এবং তার প্রতিবাদ না করা কবীরা গুনাহ্ বা মহা অপরাধ।
রাসূলুল্লাহ সাঃ এর হাতে সাহাবীগণ যে সব কাজে অঙ্গীকার করেন তার একটি হলো: ‘আমরা যেখানেই থাকি না কেন সত্য বলবো আর আল্লাহ্র ব্যাপারে কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কাররের পরোয়া করবো না। বুখারী শরীফ। রাসূলুল্লাহ সাঃ আরো বলেন, “জালিম শাসকের সম্মুখে সত প্রকাশ করাই উত্তম জিহাদ।” আবু দাউদ।
৩. শত্রুর সাথে প্রতিরোধ বিমুখ থাকা : শত্রুর সম্মুখে যুদ্ধে লিপ্ত না থেকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন বা পলায়ন করা কবীরা গুনাহ। এরূপ গুনাহকারী নিজেকে দুইটি অনিবার্য শাস্তির দিকে নিয়ে যায়: (ক) এই পৃথিবীতে আল্লাহ্র গজব এবং পরকালে দোযখের শাস্তি। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন- “হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা যখন সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের সম্মুখীন হবে তখন তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে না। যেদিন যুদ্ধ কৌশল অবলম্বন কিংবা স্বীয় দলে স্থান নেয়া ব্যতীত কেউ তাদেরকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে সে তো আল্লাহ্র বিরাগভাজন হবে এবং তার আশ্রয় জাহান্নাম। সে কত নিকৃষ্ট স্থান।” সূরা আনফাল: ১৫-১৬।
একে ইসলাম জিহাদ বলেছে। জিহাদ হলো, অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম ইত্যাদির বিরুদ্ধে অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে তা মিটিয়ে দেয়া। এ কারণে ইসলামী আইনে জিহাদ বিমুখতা অত্যন্ত ঘৃণিত। তারা আল্লাহ্র অভিশপ্ত ও শাস্তির উপযুক্ত।
ইসলাম জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও তা সংরক্ষণে জিহাদকে আবশ্যিক শতৃ হিসেবে ঘোষণা করেছে।
৪. মিথ্যাচার : সব সমাজে সব সময়ই মিথ্যা একটি মারাত্মক ব্যাধি হিসেবে অভিহিত হয়ে আসছে। এটা প্রভূত মন্দ স্বভাব তথা মন্দ কাজের উদ্ভাবক। যে সমাজের মানুষের মধ্যে ব্যাপক মিথ্যার প্রচলন রয়েছে, সে সমাজের মানুষের কোন কিছুরই নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। কেননা মিথ্যা সমাজের মানুষের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে, এতে তাদের মধ্যে কোন বিশ্বাসই সৃষ্টি হয় না। এর ফলে মানব সমাজে বিশ্বস্ততা, ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্ব লোপ পায়। সমাজ তখন এক নিরাপত্তাহীন অবস্থার শিকার হয়। এ সমাজকে মোনাফিকী সমাজ বলে। রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেন- “মুনাফিকের চিহ্ন তিনটি: (১) যখন সে কথা বলে মিথ্যা বলে। (২) যখন কোন অঙ্গীকার করে তার খেলাফ করে, (৩) কিছু আমানত রাখলে তা খেয়ানত করে।” আবু দাউদ শরীফ।
আল্লাহ্ পাক এরশাদ করেন- “আল্লাহ সীমা লংঘনকারী ও মিথ্যাবাদীদেরকে সত্য পথে পরিচালিত করেন না।”
ইসলাম সত্যবাদিতার উৎসাহ দেয় এবং মিথ্যাবাদীদের পরিণাম সম্পর্কে ভয় দেখায়। মিথ্যা ও অন্যায় পাপের পথ আর পাপ দোজখের দিকে নিয়ে যায়। বুখারী শরীফ।
সমাজের মানুষের নিরাপত্তা মিথ্যাচারের অপরাধ কার্যকর ভাবে উচ্ছেদে নিহিত।
৫. মিথ্যা সাক্ষ্য : ইসলাম মিথ্য সাক্ষ্যকে মহাপাপ বলে অভিহিত করেছে। রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেন- ‘মিথ্যা সাক্ষ্য আল্লাহ্র সাথে শরীক করার সমতুল্য। তিনি এটাকে তিন বার বলেন।” আবু দাউদ শরীফ।
মিথ্যা সাক্ষ্য দ্বারা অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করা হয়। তার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। মিথ্যা শপথ দ্বারা অন্যায় ভাবে অপরের মাল আত্মসাৎ বা মিথ্যা সাক্ষ্য দান কবীরা গুনাহ্। কোন সমাজে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করণে মিথ্যা সাক্ষ্যকে প্রতিহত করা আবশ্যিক। ইসলাম একে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করেছে।
৬. চোগলখুরী করা : চোগলখুরী হলো একের কোন কথা অন্য লোকের কাছে তাদের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টির জন্য বর্ণনা করা বা একজনের এমন কোন গোপন কথা অন্যের কাছে প্রকাশ করা যাতে সেই লোকটি অপমানবোধ করে। বলতে কি, কোন ব্যক্তির ক্ষতি সাধনের প্রবল ইচ্ছায় যে কথা অন্যের কাছে বর্ণনা করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে তাই চোগলখুরী। ইসলাম চোগলখুরী কার্যকে নিষিদ্ধ করেছে, কেননা তা মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ববোধ ও বন্ধুত্বকে বিনষ্ট করে, যা কিনা কোন মানব সমাজের ভিতকে ধ্বংস করে দেয়। এ প্রসঙ্গে মাহন আল্লাহ্ বলেন- ‘দুর্ভোগ প্রত্যেকের যে পশ্চাতে ও সম্মুখে লোকদের নিন্দা করে। সূরা হুমাযা: ১।
রাসূলুল্লাহ সা: চোগলখোরদের সম্পর্কে বলেন- “চোখলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”
 কেননা তাদের দ্বারা সমাজে বিশৃংখলা নিরাপত্তাহীন কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়ে থাকে।
৭. কৃপণতা : ইসলাম কৃপণতাকে কবীরা গুনাহ্ বলে উল্লেখ করেছে। কৃপণ ব্যক্তিরা সমাজের ধন সম্পদ কুক্ষিগত রেখে অন্যের অধিকার আদায় করে না। এতে সমাজের অসহায় মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা লংঘিত হয়। কৃপণ ব্যক্তিদের কারণে অতীতে মানব জাতির ধ্বংস সাধিত হয়েছে। কৃপণ ব্যক্তিরা তাদের ধন সম্পদ বিলাসিতা ও ভোগের কাজে খরচ করে।
কৃপণদের সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন, ‘এবং আল্লাহ্ নিজ অনুগ্রহে যা তোমাদেরকে দিয়েছেন তাতে তারা কৃপণতা করে তাদের জন্য সেটা মঙ্গল। তা যেন তারা কিছুতেই মনে না করে। না, তা তাদের জন্য অমঙ্গল। যাতে তারা কৃপণতা করে কিয়ামতের দিন তাই তাদের গলার বেড়ী হবে।” সূরা আলে ইমরান: ১৮০।
এদের সম্পর্কে রসূলুল্লাহ স. বলেন, “কৃপণ আল্লাহ্ হতে দূরে, বেহেশত হতে দূরে, এবং জনসমাজ হতে দূরে।” তিরমিযি শরীফ।
রাসূলুল্লাহ সাঃ আরো বলেন- দু’টি বদ অভ্যাস মুমিনদের মধ্যে থাকতে পারে না, (১) কৃপণতা ও (২) অসদচরিত্রতা।”- তিরমিযি শরীফ।
তোমাদের কেউই পূর্ণ মুমিন হবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাই এর জন্য তা পছন্দ করবে যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে থাকে।”-বুখারী শরীফ।
ইসলামী আইনে কৃপণতাকে জঘন্য অপরাধ হিসেবে অভিহিত করে এর বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ পূর্বক জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।
৮. অন্যের প্রতি উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন না করা : একমাত্র ইসলামী জীবন বিধান সমাজের অন্যের প্রতি যথোপযুক্ত সম্মান প্রদর্শনকে রক্ষণাবেক্ষণ করে- মানুষের মর্যাদা তথা সম্মানের বিধান করেছে। এদ্বারা সমাজের মানুষের সম্মানের নিরাপত্তা সাধিত হয়। মানুষের একে অন্যের প্রতি সম্মান দেখানো এবং তাদের পরস্পর মর্যাদাবোধ এমন সব আবশ্যকীয় বস্তুর অন্তর্গত যা দ্বারা সমাজে সম্প্রীতি ও ভালবাসা জন্মে। অন্যদিকে অন্যের প্রতি অনাস্থা ও সম্মানহানিকর হিংসা-বিদ্বেষ, বিচ্ছিন্নতা ও কার্যাবলী পরস্পরের মাঝে অসহযোগিতা সৃষ্টি করে। এ কারণে একজন মুমিন ব্যক্তি অন্যের প্রতি বিরূপ আচরণ করা, কাউকে তিরস্কার করা, মন্দ উপাধিতে ডাকা, কারা সম্পকে মন্দ ধারণা পোষণ করা, অন্যের ছিদ্রন্বেষণ করা, পরনিন্দা করা সর্বদা পরিহার করে চলবে। এদ্বারা সমাজ জীবনে পরস্পরের মান-মর্যাদা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পবিত্র কুরআনের সূরা হুজরাতের ১০-১২ আয়াতে আল্লাহ্ তাআলা, মুমিন গণ পরস্পর ভাই ভাই আখ্যায়িত করে তাদের উপহাস, একে অপরের প্রতি দোষঅরোপ, মন্দ নামে ডাকা, পশ্চাতে নিন্দা, অহেতুক কল্পনা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন।
ঙ) সামাজিক জীবনে পরস্পর লেনদেনের ক্ষেত্রে পাপ বা অপরাধ :
রাষ্ট্রীয় সমাজে বসবাসকারী মানুষের জননিরাপত্তা কার্যকরভাবে সংরক্ষণের জন্য যে সব কাজ দ্বারা সমাজের কারো কষ্ট হয়, দুঃখ হয়, বেদনা সৃষ্টি করে, সে সব কাজ পরিহার করে প্রত্যেককে তার ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দেয়ার দ্বারাই পারস্পরিক লেনদেন স্থির হয়। আর এর মাধ্যমেই মূলত মানুষের অর্র্থনৈতিক কর্মকা- সম্পাদিত হয়ে থাকে।
সামাজিক জীবনে এহেন পরস্পর লেনদেনের ক্ষেত্রে যে সব পাপ বা অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে, তা থেকে জনগণকে বিরত রাখার মধ্যে জননিরাপত্তা বিষয়টি নিহিত। ইসলাম পারস্পরিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় প্রত্যয় বিধায় এ পথে যে সব আচরণ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তা রোধের কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে। যা দ্বারা সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব, যা পৃথিবীর অন্য কোন ব্যবস্থায় নেই। পারস্পরিক লেনদেনে যে সব পাপ বা অপরাধ সংঘটিত হতে পারে তা হলো: ১। ধোঁকা দেয়া  ২। অন্যায় ভাবে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করা ৩। ইয়াতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা  ৪। উৎকোচ গ্রহণ ৫। সুদ খাওয়া ৬। মূল্যবৃদ্ধির মানসে জরুরী পণ্য সামগ্রী গুদামজাত করণ। ৭। মিথ্যা শপথ
ধোঁকা : সামাজিক জীবনে একে অপরকে ধোঁকা দেয়া মারাত্মক অপরাধ। অতএব প্রত্যেকে বিশ্বস্ততার সাথে লোকদের সাথে আদান-প্রদান করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনরূপ ধোঁকা দিলে বিশ্বস্ততা লোপ পায় এবং তদস্থলে সন্দেহ, হিংসা স্থান দখল করে। এ অবস্থা সমাজের মানুষের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নিরূপ প্রভাব ফেলে। “এক মুসলামান অন্য মুসলমানের ভাই, আর কোন মুসলমানের জন্যই তার অন্য ভাইয়ের কাছে কোন দোষযুক্ত বস্তু বিক্রি করা পাপ, দোষ সম্পর্কে অবহিত না করে তা বিক্রি করা অবৈধ।” “তোমাদের কেউই পূর্ণ মুমিন হবে না যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করবে যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।” নাসাঈ।
উপরোক্ত হাদীস থেকে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, মুসলিম সমাজের কোন মুসলমান অপর মুসালমানকে কখনই ধোঁকা দিবে না। তাই তারা পরস্পর পরস্পরের কাছে নিরাপদ।
অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করা : ইসলামী আইনে অন্যের মাল অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করা অপরাধ। আল্লাহ্ বলেন- “হে বিশ্বাসীগণ তোমরা একে-অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। কিন্তু তোমাদের পরস্পর রাজী হয়ে ব্যবসায় করা বৈধ। নিজেদেরকে হত্যা করো না। আল্লাহ্ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু। এবং যে কেউ অন্যায়ভাবে সীমা লংঘন করে তা তাকে অগ্নিতে দগ্ধ করবে। এটা আল্লাহ্র পক্ষে সহজ সাধ্য।” সূরা নিসা: ২৯-৩০। রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেন- যে ব্যক্তি বিনা অধিকারে অন্যের জমির কিয়দংশ আত্মসাৎ করবে কিয়ামতের দিন তাকে সপ্ত জমির বেড়ি তার গলায় পরিয়ে দেয়া হবে। বুখারী শরীফ। ইসলামী আইন এ বিধান দ্বারা জনগণের একটি মৌলিক অধিকারের বিষয় সম্পদের নিরাপত্তা বিধান করেছে।
ইয়াতিমের মাল আত্মসাৎ করা : ইসলামী আইন ইয়াতিমের মালের নিরাপত্তা বিধানের কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। ইয়াতিমের মাল আত্মসাৎ করা অপরাধ। আল্লাহ বলেন- যারা পিতৃহীনদের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করে তারা তাদের উদরে অগ্নি ভক্ষণ করে। এ অপরাধ এই পৃথিবীতে যেমন শাস্তিযোগ্য, তেমনি পরকালে দোজখের আগুনেও জ্বলতে হবে। ইসলামী আইন ইয়াতিম প্রতিপালনকে মহা সওয়াবের কাজ বলে ঘোষণা করেছে। আল্লাহ বলেন- “তারা যেন ভয় করে যে, অসহায় সন্তান পেছনে ছেড়ে গেলে তাদের সম্বন্ধে তারা উদ্বিগ্ন হতো। সুতরাং তারা যেন আল্লাহ্কে ভয় করে এবং সংযত কথা বলে।” সূরা নিসা: ৯।
এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন- “আমি এবং ইয়াতিমের প্রতিপালনকারী ব্যক্তি বেহেশতে এরূপ অর্থাৎ পাশাপাশি অবস্থান করবো।”
উৎকোচ গ্রহণ : ইসলামী আইনে উৎকোচ বা ঘুষ সম্পূর্ণ হারাম। ঘুষ মানুষের সামাজিক নিরাপত্তাকে দারুণভাবে বিঘ্নিত করে এবং বিভিন্ন অপরাধ মূলক কর্মকাণ্ড সম্পাদনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করে।
আল্লাহ বলেন- “তোমরা নিজেদের মধ্যে একে-অন্যের অর্থসম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং মানুষের সম্পত্তি কিয়দংশ জেনে শুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে বিচারকগণকে ঘুষ দিও না। সূরা বাকারা: ১৮৮।
ইসলামী আইনে ঘুষ গ্রহণ ও ঘুষ প্রদান উভয়ই সমান অপরাধ। রাসূলুল্লাহ সাঃ উৎকোচ দাতা-গ্রহীতা উ.ভয়কেই অভিসম্পাত করেছেন। তিরমিযী ও আবু দাউদ। “রাসূলুল্লাহ সাঃ বিচারের ব্যাপারে উৎকোচ দাতা-গ্রহীতা উভয়কেই লানত করেছেন তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ। রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেন- যাকে আমরা কোন কাজে নিযুক্ত করবো, তাকে আমরা পারিশ্রমিক দেব। এরপর যে যা নেবে তা হবে ধোঁকা।” আবু দাউদ। ইসলামী আইন উৎকোচ গ্রহণও প্রদানকে মহাপাপ হিসেবে নিষিদ্ধ করে সমাজের মানুষের নিরাপত্তা বিধান করেছে।
সুদ খাওয়া : মানুষের পাওনা ন্যায্যভাবে পাবার নিরাপত্তা বিধান করেছে ইসলাম। সামাজিক জীবনে জনগণের অর্থনৈতিক নিরপত্তা ধ্বংস করে। তাই সুদ একটি জঘন্য অপরাধ। ইসলামী আইন সুদকে সম্পূর্ণ হারাম ঘোষণা করেছে। আল্লাহ্ বলেন- “হে বিশ্বাসীগণ। তোমরা আল্লাহ্কে ভয় কর এবং সুদের যা বকেয়া আছে তা ছেড়ে দাও। যদি তোমরা বিশ্বাসী হও। যদি তোমরা না ছাড় তবে জেনে রাখ যে, এটা আল্লাহ্ ও রাসূলের সাথে যুদ্ধ, কিন্তু যদি তোমরা তওবা কর তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই। এতে তোমরা অত্যাচার করবে না অথবা অত্যাচিরত হবে না।” সূরা বাকারা: ১৭৮, ১৭৯। রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেন- যে সুদ খায়, যে সুদ দেয় আর যারা সাক্ষী হয় এবং যারা দলিলপত্র লেখে তাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাঃ লানত করেছেন। বুখারী শরীফ।
মূল্যবৃদ্ধির মানসে জরুরী পণ্যসামগ্রী গুদামজাতকরণ : সমাজ জীবনে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যসামগ্রী মূল্যবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে গুদামজাতকরণ একটি অনৈতিক, জনস্বার্থ পরিপন্থী কাজ। এতে উক্ত পণ্য জনগণের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। এজন্য ইসলাম একে-অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করে তাযিরের আওতায় শস্তির বিধান করেছে। আল্লাহ্র রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেন- “যে ব্যক্তি মুসলমানদের খাদ্য আটকিয়ে রাকে আল্লাহ্ তাকে অভাব অনটন ও জুযাম (কুষ্ঠ) ব্যাধি দ্বারা শাস্তি দেবেন।” ইমাম আহমদ। “যে ব্যক্তি মূল্য বৃদ্ধি কল্পে খাদ্য বস্তু জমা রাখে সে পাপী।” মুসলিম ও আবু দাউদ। যে ব্যক্তি চল্লিশ দিন খাদ্য দ্রব্য আটকিয়ে রাখে সে আল্লাহ্ হতে সম্পর্কহীন। আল্লাহ্ ও তার সাথে সম্পর্ক রাখেন না।” ইমাম আহমদ। ‘যে ব্যক্তি লোকের প্রতি রহম করে না তার প্রতি আল্লাহ্ দয়া দেখান না।” বুখারী শরীফ। ইসলামী আইন অবৈধ ভাবে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য-সামগ্রী গুদামজাত করণকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে তা রোধের মাধ্যমে রাষ্ট্রের জনগণের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধান করেছে।
মিথ্যা শপথ: মিথ্যা শপথ জননিরাপত্তার অন্তরায়। কেননা এটি সমাজের মানুষের অন্যের সম্পদ আত্মসাতের একটা পন্থা বা উপায়। রাসূলুল্লাহ সাঃ এ সম্পর্কে সর্তক করে বলেছেন, এতে উপার্জনের বরকত বিলুপ্ত হয়ে যায় আর মিথ্যা শপথকারী আল্লাহ্র অভিসম্পাতের উপযুক্ত হয়। তিনি বলেন- “শপথ দ্বারা মালের কাটতি বাড়ে, কিন্তু উপার্জনের জন্য ধ্বংস ডেকে আনে।” বুখারী শরীফ। রাসূলুল্লাহ সাঃ আরো বলেন, যে ব্যক্তি অন্যের মাল আত্মসাতের জন্য মিথ্যা শপতের আশ্রয় গ্রহণ করবে, সে যখন আল্লাহ্র সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন আল্লাহ্ তাআলা তার উপর রাগান্বিত থাকবেন।” বুখারী শরীফ। এই মিথ্যা শপথের মাধ্যমে সমাজের সরলপ্রাণ লোকদের ধোঁকা দেয়া হয়, এতে তাদের সম্পদের ও অন্যান্য বিষয়ের নিরাপত্তা দারুনভাবে বিঘ্নিত হয়। সমাজ জীবনে নেমে আসে অশান্তি। একারণে ইসলামী আইন মিথ্যা শপথের অপরাধে তাযিরের শাস্তির বিধান করে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।
আত্মম্ভরিতা: ইসলামী আইন তথা শরীয়ত জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে তার সার্বিক দিক ও বিভাগ বিবেচনা করেই যথা প্রযোজ্য বিধান প্রবর্তন করেছে। রাষ্ট্রীয় সমাজে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার একটি উপাদান আত্মম্ভরিতা। একটি মারাত্মক পাপ বা অপরাধ। এ অপরাধের বিরুদ্ধে ইসলামের অবস্থান কঠোর। সহজ অর্থে আত্মম্ভরিতা হলো আল্লাহর দেয়া নেয়ামতের উপর গর্বভরে উচ্ছৃংখল হওয়া। তার শোকর আদায় না করে সীমালংঘন করা। আল্লাহ তাআলা আত্মম্ভরিতার ব্যাপারে ভয় দেখিয়ে তার ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে মানুষ জাতিকে সর্তক করে দিয়েছেন। আল্লাহ্ বলেন- “কত জনপদকে আমি ধ্বংস করেছি যার বাসিন্দারা নিজেদের ভোগ সম্পদের জন্য মদমত্ত ছিল। এগুলো তাদের ঘরবাড়ি। তাদের পর এগুলোতে লোকজন সামান্যই বসবাস করেছে। আমি চূড়ান্ত মালিকানার অধিকারী।” সূরা কাসাস: ৫৮। আত্মম্ভরিতার পাপ যে সব আচরণ থেকে হতে পারে, তা হলো: ১। নিয়ামতের নাশোকরী ২। ধনমত্ততা ৩। অপব্যয় ও অপচয় ৪। অহংকার ৫। ফাসাদ বা বিপর্যয় সৃষ্টি করা।
নিয়ামতের নাশোকরী: নিয়ামতের নাশোকরী একটি অপরাধ। যে ব্যক্তি আল্লাহর দেয়া নেয়ামতের শোকর আদায় করে না বরং আল্লাহ্র দানকে অস্বীকার করে সে নাশোকরকারী বান্দা। আর যে ব্যক্তি নিজের উপর আল্লাহর নিয়ামতের বাহুল্য খরচ করে ব্যক্তিগত সুখ লুটতে থাকে, তা হতে পড়শী, দেশবাসীকে বঞ্চিত করে সেও নিয়ামতের না শোকর বান্দা। আর যে ব্যক্তি অতি মুনাফার আশায় খাদ্যদ্রব্য জমা করে অন্যদেরকে বঞ্চিত করে সেও না-শোকর বান্দা। আর যে ব্যক্তি কোন ফাসাদ সৃষ্টি করে বা ফাসাদ দমনে অগ্রসর হয় না, সেও না-শোকর বান্দা। এই না-শোকর বান্দাগণ অন্যান্য মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে বিনষ্ট করে। আল্লাহ্ বলেন- “আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের যা কিছু নিরাপদ ও নিশ্চিত, সেথায় আসতো সব দিক থেকে প্রচুর জীবন উপকরণ, অতঃপর তারা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করলো; ফলে তারা যা করতো তজ্জন্য আল্লাহ্ তাদেরকে আস্বাদ গ্রহণ করালেন ক্ষুধা ও ভীতির।” সূরা নহল: ১১২।
উপরোক্ত আয়াত হতে একথা বললে কোনই অত্যুক্তি হবে না যে, বর্তমান ধনী দেশগুলোর অর্থনৈতিক মন্দা আল্লাহর নিয়ামতের নাশোকরীর ফল। ইসলাম জননিরাপত্তার জন্য আল্লাহ্র নিয়ামতের শোকরগুজারী করার জন্য নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ্ বলেন- “তোমরা এমন ফিতনাকে ভয় কর যা বিশেষ করে তোমাদের মধ্যে যারা জালিম কেবল তাদেরকে ক্লিষ্ট করবে না এবং জেনে রেখো যে, আল্লাহ্র শাস্তি দারুণ কাঠোর।” সূরা আনফাল: ২৫। আল্লাহ্র দেয়া সম্পদের শোকরিয়া আদায় না করলে, তদ্বারা সামজের মানুসের জীবনে চরম নিরাপত্তাহীন অবস্থার সৃষ্টি হয়।
ধনমত্ততা: ধনৈশ্বর্য মত্ততায় মানুষকে প্রলুব্ধ করে যার ফলে ঐ ব্যক্তির উপর কুফল ফলতে আরম্ব করে। এ অবস্থায় সমাজের লোকদের ধন সম্পদ গুটি কতক লোকের হাতে একত্রিত হওয়ায় সমাজের অন্যান্যরা উক্ত ধন সম্পদ থেকে বঞ্চিত হয়। এর ফলশ্রুতিতে সমাজে শ্রেণি বৈষম্য বা শ্রেণি সংগ্রাম সৃষ্টি হয় যার ফলে অনেক ক্ষেত্রে গৃহযুদ্ধ বেধে যায়। একারণে ইসলাম ধনমত্ততাকে অপরাধ বলে অভিহিত করেছে। ধনমত্ততায় মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা দারুন ভাবে বিঘ্নিত হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন: “আমি যখন কোন জনপদ ধ্বংস করতে করতে চাই তখন এর সমৃদ্ধশালী ব্যক্তিদেরকে সৎকর্ম করতে আদেশ করি কিন্তু ওরা সেখানে অসৎকর্ম করে। অতঃপর তাদের প্রতি ধ্বংসের নির্দেশ ন্যায় সঙ্গত হয়ে যায় এবং আমি তা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করি।” সূরা বনী ইসরাঈল: ১৬। সমাজের ধনী লোকেরা তাদের ধনাঢ্যতা দ্বারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। অতঃপর তারা এমন সব আইন প্রণয়ন করে যাতে তাদের ধন সম্পদ চিরস্থায়ী হতে পারে। এজন্যই তারা সমাজের কোন কল্যানমূলক সংস্কারের আহবানকে বিরোধিতা করে। কেননা এতে তাদের সম্পদহানীর আশংকা থাকে। কিন্তু ইসলামী আইনে এর কোন অবকাশ নেই। ইসলামী আইনে ধনমত্ততার প্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সংকট সৃষ্টি হয় না; যেমনটি পুঁজিবাদী সমাজে হয়ে থাকে।
অপব্যয় ও অপচয়: সম্পদের অপব্যয় ও অপচয় সম্পদের সংকট সৃষ্টি করে। এতে সমাজের মানুষের দুর্ভোগ ও কষ্ট বৃদ্ধি পায়। এটা জননিরাপত্তার প্রতিকূল। এজন্য আল্লাহ্ বলেন- “আহার করবে ও পান করবে কিন্তু অমিতাচার করবে না। আল্লাহ্ অমিতাচারী কে পছন্দ করে না।” সূরা আরাফ: ৩১। “যারা অপব্যয় করবে তারা শয়তানের ভাই। এবং শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ। সূরা- বনী ইসরাঈল: ২৭। “তোমাদের যে সম্পদে আল্লাহ্ তোমাদের উপজীবিকা করেছেন তা বিরোধীদের হাতে অর্পণ করো না।” সূরা-নিসা: ৫।
আল্লাহর রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, “আল্লাহ্ তোমাদের জন্য তিনটি বস্তু পছন্দ করেন না। (১) অনর্থক ও বাজে কথা বলা; (২) নি®প্রয়োজনে সময় নষ্ট করা; (৩) অত্যধিক প্রশ্ন করা।” বুখারী শরীফ। যে সমাজে ধনীরা সম্পদের অপব্যয় ও অপচয় করে, সে সমাজের গরীবেরা অর্থনৈতিক দুর্ভোগের শিকার হয়। এ কারণে ইসলামী আইনে এটি নিষিদ্ধ। ইসলামী আইন একে নিষিদ্ধ করে জননিরাপত্তাকে সুদৃঢ় করতে প্রয়াস পেয়েছে, এমনটি মানব রচিত কোন আইনে নেই।
অহংকার : অহংকার কবীরা গুনাহ্র অন্তর্ভুক্ত। অহংকার মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায় এবং ধ্বংসকে অনিবার্য করে তোলে। এজন্যই ইসলাম অহংকারকে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছে। আল্লাহ্ বলেন- “যারা অহংকার করে তিনি তাদেরকে ভালবাসেন না।” সূরা- নাহল: ২৩। “পৃথিবীতে যারা অন্যায়ভাবে গর্ব করে বেড়ায় তাদের দৃষ্টি আমার নিদর্শন হতে ফিরিয়ে দেবো।” সূরা-আরাফ: ১৪৬। “পৃথিবীতে উদ্ধত ভাবে বিচরণ করো না। কারণ আল্লাহ কোন উদ্ধত অহংকারীকে ভালবাসেন না।” সূরা লুকমান: ১৮। অহংকারের বাহ্যিক নির্দশন অনেক। তন্মধ্যে নিজেকে বড় মনে করা, অন্যকে নিচ মনে করা, সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা, সত্যের অনুগামী না হওয়া।
সমাজের সংযত অবস্থানপূর্বক জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে অহংকার বড় অন্তরায়। একারণে ইসলাম অহংকারকে বড় অপরাধের পর্যায়ভুক্ত করে জনগণকে তা পরিহার করতে উপদেশ ও শিক্ষা দিয়েছে। যাতে সমাজের মানুষের নিরাপত্তার কোনরূপ অন্তরায় সৃষ্টি করতে না পারে।
ফাদাস বা বিপর্যয় সৃষ্টি করা : সমাজের মানুষের নিরাপত্তার আর একটি বড় অন্তরায় ফাসাদ। ফাসাদ সমাজে সুবিচার প্রতিষ্ঠার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ফাসাদ ও ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ইসলাম কঠোর শাস্তির বিধান করেছে। আল্লাহ্ পৃথিবীতে ফাসাদকারীদের কঠোর শাস্তি দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন- “এবং তথায় তারা অশান্তি বৃদ্ধি করেছিল। অতঃপর তোমার প্রতিপালক তাদের উপর শাস্তির কষাঘাত হানলেন।” সূরা ফরজ: ১২-১৩। “আমি মাদইয়ানবাসীর প্রতি তাদের ভ্রাতা শোয়ইবেকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, তোমরা আল্লাহ্র ইবাদত কর, শেষ দিবসকে ভয় কর এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় ঘটাইও না। কিন্তু তারা তার প্রতি মিথ্যারোপ করলো অতঃপর তারা ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হলো। এতে তারা নিজ গৃহে নতজানু অবস্থায় শেষ হয়ে গেল।” সূরা আনকাবুত: ৩৬-৩৭।
রাষ্ট্রশক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষের বাহ্যিক অপরাধ নির্মূলের ব্যবস্থা : ইসলামী জীবন ব্যবস্থা শরীয়ত মানুষের জীবনে অপরিহার্য বিষয়াবলি যা কিনা মানুষের সত্তার সাথে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত তার যথাযথ নিরাপত্তা বিধানের মাধ্যমে তা সংরক্ষণে দৃঢ় প্রত্যয়ী এবং সে লক্ষ্যে যথাযথ কার্যকর ব্যবস্থা অবলম্বনের বিধান প্রবর্তন করেছে। এ বিধান ব্যক্তিগত ও জাতীয় পর্যায়ে কার্যকরী করার মধ্যেই সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিহিত। মানুষের জীবনের অপরিহার্য মৌল স্বার্থ এবং অস্তিত্ব ও সুষ্ঠু বিকাশধারা যেগুলোর নির্ভরশীল সেগুলো হলো: ১. মানুষের জীবন ও মন ২. পবিত্র জন্মধারা ও বংশক্রম ৩. সম্পদ ৪. সম্মান ৫. ধর্ম ও বিশ্বাস।
সমাজের কোন মানুষ যাতে এসব ক্ষেত্রে কোন রকম অবৈধ হস্তক্ষেপপূর্বক জননিরাপত্তাকে হুমকির সম্মুখীন করতে না পারে; তজ্জন্য ইসলামী আইন তথা শরীয়ত ঐ সব অবৈধ হস্তক্ষেপ বা সীমালংঘনকে মহাপাপ বা মারাত্মক অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে তার প্রতিকার স্বরূপ প্রকৃত ও যথাযথ শাস্তি বিধান প্রবর্তন করেছে। প্রতিটি রাষ্ট্রের আবশ্যিক দায়িত্ব ঐ সব ক্ষেত্রে সংঘটিত অপরাধের শাস্তি স্বরূপ ইসলামে বর্ণিত দণ্ডের বিধান কার্যকর করা। যাতে সমাজের কোন মানুষের পক্ষে মানুষের ঐ সব ক্ষেত্রে কোন রকম হস্তক্ষেপ করার সাহস না থাকে। ইসলাম মানুষের বাহ্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলে তিন প্রকার দণ্ডের বিধান করেছ: ১. হদ্দ ২. কিসাস ৩. তাযির
হদ্দ : হদ্দ হলো নির্ধারিত শাস্তি। আল্লাহ্ পাক এ শাস্তি পবিত্র কুরআনে নির্ধারিত করে দিয়েছেন। তা কার্যকার করা বাধ্যতমূলক। “হদ্দ” শব্দের অর্থ বাধা দান বা প্রতিরোধ। এর দ্বারা অপরাধীকে মানুষের অপরিহার্য মৌল ক্ষেত্রে অবৈধ হস্তক্ষেপপূর্বক অপরাধ সংঘটনে বাধা দান করে। হদ্দকে আল্লাহ্র অধিকার হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ শব্দের অর্থ এর আওতাভুক্ত শাস্তির প্রকৃতি ও পরিধি সত্যিই সমাজের মানুষের মানকে অপরাধমুক্ত করতে বা অপরাধের দিকে ঝুঁকে না পড়তে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে কাজ করে। যে সব অপরাধ হদ্দ এর শাস্তির আওতায় পড়ে তা হলো:
চুরি : চুরির শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন- “পুরুষ কিংবা নারী চুরি করলে তাদের হাত কেটে দাও। এটাই তাদের কৃতকর্মের ফল এবং আল্লাহর নির্ধারিত আর্দশ দণ্ড, আল্লাহ্ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। সূরা মায়েদা: ৩৮।
চুরি কি? চুরি হলো কোন নিসাব পরিমাণ অস্থাবর সম্পত্তি মালিকের সম্মতি ব্যতীত অসাধু ভাবে নিজের দখলে নেয়ার অভিপ্রায়ে উক্ত সম্পত্তি স্থানান্তর করা। এখানে নিসাব পরিমাণ অর্থ দশ দিরহাম (বর্তমানে প্রায় পাঁচ হাজার টাকার সমান)।
চুরিরর শাস্তি কি? চুরির অপরাধ প্রমাণিত হলে প্রথমত: অপরাধীর ডান হাতের কব্জি থেকে কেটে দিতে হবে।
চুরির শর্তাবলী: কোন কাজের মধ্যে নিম্নোক্ত শর্তাবলী বিদ্যমান হলে তবেই তাকে চুরি বলা যাবে-১. গোপনে করা; ২. হস্তগত বস্তুর মূল্যমান থাকা; ৩. তা অপরের দখলভুক্ত থাকা; ৪. তা নিরাপদ সংরক্ষিত স্থান হতে হস্তগত করা; ৫. তা চোর কর্তৃক পুরোপুরি নিজ দখলে নেয়া; ৬. তার মূল্য নিসাব পরিমাণ হওয়া; ৭. তা স্থানান্তর যোগ্য হওয়া ৮. অসৎ উদ্দেশ্যে হস্তগত করা
চুরির প্রমাণ : তিনটি উপায়ে চুরি প্রমাণিত হবে; ক. সাক্ষীদের সাক্ষ্য দ্বারা, খ. অভিযুক্ত ব্যক্তির স্বীকারোক্তি দ্বারা; এবং  গ. বাদীর শপথ দ্বারা।
সাধারণত ধারণা করা হয় যে, মানুষ চুরি করে দারিদ্র্যের কারণে, ক্ষুধা নিবারণে ব্যবস্থা নেই বলে। কিন্তু ইসলাম তো এ বিষয়ে পূর্ণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। ফলে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি নাগরিকই তার জীবিকা পাবে, তার মৌলিক প্রয়োজন পূরণ হবে। কোন লোকই না খেয়ে থাকতে বা অভাব অনটনে ছটফট করতে বাধ্য হবে না। আর এ কারণেই ইসলামী রাষ্ট্রে, যেখানে ইসলামী শরীয়ত কার্যকর, কারুরই চুরি করার কোন আবশ্যকতা থাকতে পারে না। এরূপ ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও চুরির কাজে অগ্রসর হতে পারে কেবল মাত্র লোক যারা ধন সম্পদের লোভী, যারা অধিক সম্পদ করায়ত্ত করার অভিলাসী, কিংবা যারা অন্যায় অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা অথবা পাপ পথে বেহিসেব অর্থ ব্যয় করার সুযোগের জন্য লালায়িত। অতএব তা সুস্থ সমাজ ব্যবস্থার পক্ষে খুবই ক্ষতিকর ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারী। এ কারণে ইসলামে চুরি সমর্থনীয় নয়। ইসলামী সমাজে চুরির কোন সুযোগ থাকতে পারে না। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ