শুক্রবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

শৃঙ্খলাবিধি না হওয়ায় বিচার বিভাগ জিম্মি হয়ে আছে -আপীল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ

স্টাফ রিপোর্টার : নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত বিধিমালা ২৪ নবেম্বরের মধ্যে প্রজ্ঞাপন আকারে প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগ। ওই দিন প্রজ্ঞাপনটি আপিল বিভাগে দাখিল করতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে শুনানিতে সর্বোচ্চ আদালত প্রজ্ঞাপন জারিতে সরকারের গড়িমসিতে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, আইন মন্ত্রণালয় আদালতের নির্দেশনাকে অবজ্ঞা করছে, শৃঙ্খলাবিধির কারণে বিচার বিভাগ জিম্মি হয়ে আছে, এভাবে বিচার বিভাগ চলতে পারে না। আদালত বিচারকদের চাকরির বিধিমালা প্রণয়নে সরকারকে ২৪ নবেম্বর পর্যন্ত সময় দিয়ে বলেছেন, এটাই শেষ সময়। আর কোনো সময় দেয়া হবে না।

সরকার পক্ষে সময় চেয়ে করা আবেদনের প্রেক্ষিতে গতকাল সোমবার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের ৯ বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এই আদেশ দেন। বেঞ্চের অপর বিচারপতিরা হলেন- বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার, বিচারপতি মো. নিজামুল হক এবং বিচারপতি মোহাম্মদ বজলুর রহমান।

আগের দিন শুনানি শেষে মামলাটি কার্যতালিকায় আদেশের জন্য ছিল। সে অনুযায়ী আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ কার্যতালিকার শীর্ষেই থাকে আবেদনটি। গতকাল সোমবার সকালে শুনানির শুরুতে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ৮ সপ্তাহের সময় প্রার্থনা করেন আদালতে। চাকরির শৃঙ্খলাবিধি প্রণয়নের কাজ কতদূর এগিয়েছে এফিডিভেট দাখিল করে এটর্নি জেনারেল আদালতকে জানান। তাতে বলা হয়, চাকরির শৃঙ্খলা বিধির খসড়া রাষ্ট্রপতির দফতরে পাঠানো হয়েছে। এরপর এটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ্য করে আদালত বলেন, আপনি না পারলে বলেন, স্যারেন্ডার করেন। আমরা দেখছি। যে পিটিশন দিয়েছেন, এটা ফলস স্টেটমেন্ট। এর কোনো সত্যতা নেই। কবে এ বিধি রাষ্ট্রপতির কাছে পঠিয়েছেন। সাড়ে ১১টার মধ্যে বলেন। জবাবে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, উনি (আইন মন্ত্রী) তো দেশের বাইরে।

তখন আদালত বলেন, সারা বিচার বিভাগ জিম্মি হয়ে আছে, কাজ করতে পারছে না। একটির শব্দের জন্য বছরের পর বছর কেটে গেছে।

জবাবে এটর্নি জেনারেল বলেন, মাসদার হোসেন মামলায় এর আগে অনেকবার দাঁড়িয়েছি। তবে আজ অনেকটা আসামীর মতো দাঁড়িয়ে আছি।

আদালত বলেন, ১৪ বছর পার হয়ে গেছে, মাসদার হোসেন মামলার আসলটাই তো বাস্তবায়ন হয়নি? জবাবে এটর্নি জেনারেল বলেন, হবে এটাও হবে।

আদালত বলেন, এর মধ্যে দুইবার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। মন্ত্রী বলতে পারবেন কবে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠিয়েছেন। অক্টোবরের এ সপ্তাহ বা অমুক তারিখে। এটা পুরোটাই অস্পষ্ট। আড়াই মাস হয়ে গেছে কিছু করতে পারলেন না।

এটর্নি জেনারেল বলেন, কথা বলা, দেখা করা, স্বাক্ষর করার বিষয় আছে। আমি নিজেও হাসপাতালে ছিলাম।

আদালত বলেন, একটি দেশের একটি বিভাগ জিম্মি হয়ে থাকবে, এটা হয় না। আপনাদের সুবিধার জন্য খসড়ায় লাল কালি দিয়ে মার্ক করে দিয়েছিলাম। একজন বিচারককে দুর্নীতির জন্য হাতেনাতে ধরে ফেললে তখন মিনিস্ট্রি বলে রাষ্ট্রপতির কাছে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য পাঠাবে। এভাবে কি চলবে? আর কতদিন অপেক্ষা করবো। তখন এটর্নি জেনারেল বলেন, লেট আস ট্রাই। সময় দেন আট সপ্তাহ।

আদালত বলেন, ২০০৭ সাল থেকে ৪টি বিধিমালা গেজেট আকারে জারি করা হয়েছে। জায়গার অভাবে ১৭০ জন বিচারক বসতে পারছেন না, তাদের কোর্ট রুম নেই। একটা ভবন নির্মাণে তিন বছর সময় নিলেন, পরে বললেন বিদ্যুৎ নেই।

আদালত বলেন, সর্বশেষ আদেশে গেজেট প্রকাশ করতে বলেছি। অথচ রুলস অব বিজনেসের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা মন্ত্রণালয় নিয়ে নিয়েছে। আমরা রুলস করেছি দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলন মাসদার হোসেন মামলার বাইরে যাইনি। আমরা সুপারভিশন দিয়েছি এগুলো হলো না কেন। রুলসে তো প্রেসিডেন্টের কথা নেই। এটর্নি জেনারেল তখন বলেন, প্রেসিডেন্টেরই তো করতে হবে।

জবাবে আদালতে বলেন, কি করতে হবে? সরকারের যেটা আমরা সেটাই তো করে দিয়েছি। কোনো জায়গায় আমরা নিজেরা কিছু করিনি। আপনি কি আইনমন্ত্রীর কাছে গিয়েছেন? দুই মাসেও পারেন নাই পয়েন্টগুলো বের করতে। আপনি দেখাতে পারেননি যে এটা সংবিধান পরিপন্থী।

জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এমন না যে আমরা বসিনি। আপিল বিভাগ বলেন, আপনারা বার বার সময় আবেদন করছেন। আপনারা যদি ভেবে থাকেন সময় চাইলেই তা মঞ্জুর করবো, এটা দুর্ভাগ্যজনক। পরে আদালত ২৪ নবেম্বর দিন ধার্য করে দেন। এ পর্যায়ে এটর্নি জেনারেল আরো চারদিন সময় বাড়ানোর জন্য অনুরোধ জানান। কিন্তু আপিল বিভাগ আবেদনটি নাকচ করে দেন।

আদালত আরো বলেন, শেষবারের মতো সময় দিচ্ছি। এর মধ্যে বিধি চূড়ান্ত করে গেজেট আকারে জারি করবেন। এর আগে বিধি প্রণয়ন সংক্রান্ত এই মামলার শুনানি হয় গত ২৮ আগস্ট। সেদিনই ৬ নবেম্বর পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছিল। গতকাল সোমবার তা আদেশের জন্য কার্যতালিকার শীর্ষে আসে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরি, নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা বিধান এবং চাকরির অন্যান্য শর্তাবলী) বিধিমালা-২০০৭ অনুযায়ী এখন অধস্তনও আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলা পৃথক বিধি তৈরি না হওয়া পর্যন্ত ১৯৮৫ সালের গভর্নমেন্ট সার্ভিস রুল অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হবে। 

১৯৯৯ সালে মাসদার হোসেন মামলার রায়ের ৭ নম্বর নির্দেশনা অনুযায়ী পৃথক শৃঙ্খলা বিধি তৈরি হয়নি। মাসদার হোসেন মামলার রায় ঘোষণার আট বছর পর বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ১ নবেম্বর বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করা হয়। ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর মাসদার হোসেন মামলায় ১২ দফা নির্দেশনা দিয়ে রায় দেয়া হয়। ওই রায়ের আলোকে নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা ছিল। কিন্তু দীর্ঘ দিনেও এ আদেশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় আপিল বিভাগের নির্দেশে গত ৭ মে একটি খসড়া তৈরি করে আইন মন্ত্রণালয়। কিন্তু ওই খসড়াটি এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ না হওয়ায় আপিল বিভাগ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এ নির্দেশ দেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ