বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

বিশ্বের সবচেয়ে সফল মুসলিম সংখ্যালঘু হুই

২ নবেম্বর, ইকোনমিস্ট : চীনের পশ্চিমের প্রত্যন্ত প্রদেশ নিঙজিয়ার টঙজিন শহরের জামে মসজিদ। হজ্ব করে মক্কা থেকে ফিরেছেন লি ইয়ুচুয়ান। তিনি তার হজ্বযাত্রাকে উল্লেখ করলেন মুক্তি হিসেবে : ‘আমাদের ইবাদত স্রেফ এরই হোমওয়ার্ক। ’ তার ৮৪ বছর বয়স্ক বন্ধুটি লাফিয়ে এসে পা দু’টি ভাঁজ করে বসে পড়লেন। তার ভাষায়, ‘আমরা দিনে পাঁচবার নামাজ পড়ি। আমরা একই সাথে নমনীয় ও কঠোর। ’ চীনা মুসলমানদের এমনটিই হওয়া দরকার। ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার বিপুল উদাহরণ রয়েছে চীনে। তিব্বতে বৌদ্ধরা, দূর পশ্চিম অঞ্চলের জিনজিয়াং প্রদেশে মুসলমানেরা, উপকূলে ঝেজিয়াং প্রদেশে খ্রিস্টানরা নির্যাতনের শিকার হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। তাদের হয়রানি করা হয়েছে, কখনো গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের প্রার্থনার জায়গাগুলো ধ্বংসও করা হয়েছে। জিনজিয়াংয়ে সরকার ইসলাম আর সন্ত্রাসবাদ এক হিসেবে দেখে। সেখানকার নারীদের মুখঢাকা নেকাব পরতে দেয়া হয় না। সরকারি অফিসে মুসলমানদের রোজা রাখতে দেয়া হয় না। কিন্তু এই ছবির সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থা হুইদের বেলায়। চীনে দু’টি বড় মুসলিম গ্রুপ রয়েছে। একটি হলো জিনজিয়াংয়ে উইঘুর এবং আরো অপরিচিত হুই। চীনা জনসংখ্যার বিশাল সাগরে তারা ¯্রফে কয়েক ফোঁটা পানি। এক কোটি করে লোকসংখ্যা উভয় গোষ্ঠীর। আকারে তাইওয়ানের সমান। কিন্তু উইঘুররা যখন নির্যাতিত হচ্ছে, তখন হুইরা সমৃদ্ধ হচ্ছে। নিঙজিয়ায় (হুইদের মূল আবাসস্থল, এখানেই তাদের সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় দেখা যায়) মসজিদের সংখ্যা ১৯৫৮ সাল থেকে দ্বিগুণ হয়ে ১৯০০ থেকে ৪০০০ হয়েছে। নর্থার্ন ন্যাশনালিটিজ ইউনিভার্সিটির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মা পিংয়ের মতে, প্রদেশটিজুড়ে নতুন নতুন মসজিদ নির্মিত হচ্ছে। হুইরা অর্থনৈতিকভাবে সফল। তারা ইসলামফোবিয়ায় বলতে গেলে আক্রান্তই হয় না। বিশ্বের অন্য কোনো স্থানের মুসলমানেরা এ ধরনের কথা খুব কমই বলতে পারে। হুইদের ধর্মীয় অনুশীলনে চীনজুড়ে বিস্তৃত ইসলামি ধারা প্রতিফলিত হচ্ছে। হুই স্কলার মা তংয়ের মতে, তাদের মাত্র অর্ধেকের বেশি সুন্নি ইসলামের হানাফি মাজহাব অনুসরণ করে। নিংজিয়র রাজধানী ইয়িচুয়ানের দক্ষিণে নাজিয়াহু মসজিদের প্রবেশপথে থাকা ব্যানারগুলোতে যেসব বক্তব্য শোভা পাচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে, ‘প্রাচীন ও নির্ভুল ধর্ম’ এবং ‘আসল ঠিকানার পথ’। হুইদের এক পঞ্চমাংশের বেশি ১৯ শতকে চীনে আসা ওয়াহাবি মতবাদের কঠোর অনুশাসন অনুসরণ করে। অনেকে আরো কঠোর সালাফি অনুশাসনও মেনে চলে। আর এক-পঞ্চমাংশ ইসলামের তিনটি সুফি তরিকা মেনে চলে। হুইদের ধর্মীয় বৈচিত্র্যের কারণে পার্টির পক্ষে তাদের মেনে নেয়া সহজ্ব হয়। বিভক্ত করে শাসন করার ব্যবস্থাতবে হুইদের সফলতার গোপন রহস্য লুকিয়ে আছে উইঘুরদের কর্মপন্থা থেকে তাদের ভিন্নতা। তুর্কি বংশোদ্ভূত উইঘুররা জাতিগতভাবেই ভিন্ন। তারা তুর্কি ও উজবেক-সংশ্লিষ্ট নিজস্ব ভাষায় কথা বলে। তাদের একটি আবাসভূমি রয়েছে। তারা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বাস করে জিনজিয়াংয়ে। বৈষম্যের একটি দেয়াল তাদের হ্যান চীনাদের থেকে আলাদা করে রেখেছে। তারা যদি কালেভদ্রে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ পায়ও, তবে সেটা হয় কায়িক শ্রমের। অন্যদিকে, হুইদের জাতিগত সংখ্যালঘু বিবেচনা করার একমাত্র কারণ তাদের ‘হুকোউ’ (বাড়ি বাড়ি নিবন্ধন) নথি এবং সেইসাথে কয়েক শতক আগে তাদের পূর্বপুরুষদের মিশনারি ও বণিক হিসেবে পারস্য থেকে আগমন। তখন তারা মঙ্গোল রাজদরবারে সমাদৃত ছিল। কয়েক প্রজন্ম ধরে হ্যানদের সাথে আন্তঃবিবাহের মধ্য দিয়ে তারা চীনা ভাষাকেই গ্রহণ করে নিয়েছে। তারা চীনজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তাদের মাত্র এক-পঞ্চমাংশ বাস করে নিংজিয়ায়। উইঘুর ও তিব্বতিদের বিপরীতে তারা মিলেমিশে বাস করার পথ বেছে নিয়েছে। তঙজিনে নতুন কিয়াও ন্যান মসজিদের মুসল্লিরা মসজিদের ইতিহাসের সাথে জড়িত এক স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির জীবন ও কর্ম নিয়ে বিশেষ আয়োজনের বিষয়টি উল্লেখ করা যায়। অনুষ্ঠানটি শুরু হয়েছে ইমাম সাহেবের (আহং) খুতবার মধ্য দিয়ে। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ