সোমবার ১২ এপ্রিল ২০২১
Online Edition

সেই লাল দালানে ঢুকছেন সবাই হাসি মুখে ॥ বের হচ্ছেন বিষণ্নতা নিয়ে

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : রাজধানীর পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের লাল প্রাচীর ঘেরা লাল দালানের বেশ ক’টি ছোট বড় একাধিক তল বিশিষ্ট “ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার” আজ শুধুই স্মৃতির। কারাগারের কারণে নির্দিষ্ট নাম থাকার পরও নাজিম উদ্দিন রোডটির পরিচয় জেল রোড নামেও। আজ যেন এর নাম বদলে যাচ্ছে। যে রোড শত বছরের দুঃখ-বেদনা, কান্না আর আবেগের সাক্ষী, তাতে আজ আনন্দ ছড়াচ্ছে। পুরো রাস্তাজুড়ে উৎসুক্য জনতার ভীড়, গোটা এলাকা যেন উৎসবের আমেজে। কয়েদিভরা পুলিশের প্রিজনভ্যান নেই, নেই নিরাপত্তার বাড়াবাড়িও। আইশৃংখলাবাহিনীর সরব উপস্থিতির সাথে কারারক্ষীদের বাঁশি আর সাইরেনের শব্দ কোথায় যেন মিলিয়ে গিয়ে এখন ত্রিচক্র যানের টুংটাং আগের সরবতা ভাঙছে। যার কারণে আশপাশের জীবন যাত্রাও যেন স্বস্তির রেশে।

এখন সেখানে দীর্ঘ লাইন। উদ্দেশ্য স্মৃতিময় হয়ে ওঠা কারাগারের ভেতর দেখা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে দাঁড়িয়ে থাকার লাইন। যে কারাগারের নাম শুনলে পিলে চমকে ওঠে, কান্না আর আহাজারির ছবি ভেসে উঠে- সেই কারাগারে প্রবেশে মানুষের উপচেপড়া ভিড় গতকাল বুধবার থেকে শুরু। সম্প্রতি পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগার সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। গতকাল থেকেই ১০০ টাকায় টিকিট কেটে যেকেউ ভিতরে প্রবেশ করার সুযোগ পাচ্ছেন।

উৎসুক্য জনতা প্রচণ্ড আগ্রহ আর হাসি নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছেন। তাদের এই হাসিমুখ বের হওয়ার সময় চোখে পড়েনি। সবাই যেন বের হচ্ছেন স্মৃতিকাতর হয়ে, বিষণœ মনে।

২২৮ বছরের পুরনো এ কেন্দ্রীয় কারাগারে হাসিমুখে ভেতরে প্রবেশের কোনো নজির নেই। গত ২৯ জুলাই কেরানীগঞ্জে স্থানান্তরের আগ পর্যন্ত ভেতরে প্রবেশের সময় আসামী ও তাদের স্বজনদের এখানে শুধু কাঁদতে দেখা গেছে। কিন্তু গতকাল যারাই প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকছিলেন তাদের সবার চোখে-মুখে হাসি দেখা যায়। কারো মুখে এতটুকু মলিনতা নেই, নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে পরিপাটি পোশাক পরিধান ও সেজেগুজে জেলখানার ভেতরে যেতে দেখা যায়। এককালের মোগল দুর্গ, কোতোয়ালি পুলিশ স্টেশন ও পরবর্তীতে জেলখানায় রূপান্তরিত ১১ একর আয়তনের এ কারাগারটির সাথে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও রাজনীতির স্মৃতি জড়িত।

এ কেন্দ্রীয় কারাগারটি গতকাল থেকে পরবর্তী চারদিন জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে কারা অধিদফতর। মাত্র ১০০ টাকায় টিকিট কিনে তারা দুই ঘণ্টা কারাগার পরিদর্শনের সুযোগ পাবেন। মঙ্গলবার থেকে সংগ্রামী জীবন গাঁথা শিরোনামে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার দুর্লভ আলোকচিত্র নিয়ে কারাগারের ভেতর প্রথম প্রদর্শনী উপলক্ষে তারা এ সুযোগ পাচ্ছেন। 

সরেজমিন দেখা যায়, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রধান ফটকের সামনে দুটি স্থানে টিকিট বিক্রি চলছে। আগের অনুসন্ধান কক্ষের সামনে টেবিল পেতে নারী ও সিনিয়র সিটিজেন এবং প্রধান ফটকের দক্ষিণ দিকের এক কোণায় সাধারণ মানুষের কাছে টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে।

জেল ও জার্নি শিরোনামে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রথম বারের মতো আলোকচিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার সংগ্রামী জীবনের দুর্লভ ছবি নিয়ে চার দিনব্যাপী আলোকচিত্রের আয়োজন করে জার্নি নামের একটি সংগঠন। সহযোগিতা করছে জেল কর্তৃপক্ষ। বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার মোট ১৪৫টি ছবি ৭৫ ফ্রেমে প্রদর্শিত হচ্ছে। 

কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন বলেন, পৃথিবীর উন্নত দেশে কারাগার পরিদর্শনের বিধান আছে। বিশেষ করে পরিত্যক্ত কারাগারগুলোকে চিত্তবিনোদনের কেন্দ্র করা হয়। এ কারাগার নিয়েও সরকারের বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর এবং জাতীয় চার নেতা স্মৃতি জাদুঘর করা হয়েছে। পুরো কারাগারটি বিনোদন কেন্দ্রসহ নানা প্রকেল্পের আওতায় আনা হবে। এরই ধারাবাহিকতায় চার দিনব্যাপী এই আলোকচিত্র প্রদর্শনী।

টিকেট কেটে যা দেখবেন : জেল হত্যা দিবস উপলক্ষে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতার দুর্লভ ১৪৫টি আলোকচিত্র প্রদর্শিত হবে এতে। এছাড়া কারাগারের বেশ কিছু স্থাপনা ও বন্দিদের সেল দেখার সুযোগ পাবেন আগত দর্শনার্থীরা।

কারাগারের প্রধান ফটকে প্রবেশের পরই হাতের ডান পাশে রয়েছে আমতলা। এর টিনশেড ঘরগুলোতে প্রদর্শিত হচ্ছে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার ১৪৫টি দুর্লভ আলোকচিত্র। এরপর কিছুদূর এগিয়ে রাস্তার শেষ মাথায় গিয়ে হাতের বামে গেলে দেখা মিলবে বিদেশী বন্দীদের ওয়ার্ড ‘নীল নদ’। এই ওয়ার্ডে বাংলাদেশে গ্রেফতারকৃত বিদেশি কারাবন্দীদের রাখা হতো।

নীল নদ দেখে আরও সামনে দিকে গেলেই দেখা মিলবে জাতীয় চার নেতা কারা স্মৃতি জাদুঘরের ফটক। প্রবেশের আগে হাতের ডানপাশে রয়েছে একটা স্তম্ভ। জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করার পর লাশ হস্তান্তরের আগ পর্যন্ত এই স্থানে চারজনের লাশ রাখা হয়েছিল।

চার নেতার জাদুঘরে প্রবেশের পর চোখে পড়বে একটি বাগান। এর ডানপাশে সারিবদ্ধভাবে বসানো হয়েছে জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামানের ম্যুরাল। এরপর সোজা সামনে গেলেই রয়েছে মৃত্যুঞ্জয়ী শহীদ স্মৃতিকক্ষ নামে চার নেতার স্মৃতি বিজড়িত সেল। এতে তাদের ব্যবহার করা বিভিন্ন উপকরণ সংরক্ষণ করা হয়েছে।

কারা অভ্যন্তরে জাতীয় চার নেতার কারা স্মৃতি জাদুঘর দর্শন শেষে বেরিয়ে আসার পর একটি রাস্তা গেছে তিনটি ওয়ার্ড সম্পন্ন ‘যমুনা ভবন’ নামে একটি সেলের দিকে। এটার প্রথম দুটি ওয়ার্ড হলো আমদানি ওয়ার্ড। অর্থাৎ নতুন যেসব আসামীকে কারাগারে আনা হতো, তাদের এই দুই ওয়ার্ডে রাখা হতো। তৃতীয় ওয়ার্ডে রাখা হতো জেনারেল আসামীদের।

যমুনা ভবনের ঠিক বিপরীত পাশে রয়েছে মেঘনা ভবন। যা দূর থেকে দেখতে হবে। মেঘনা ভবনটি ব্রিটিশ আমলে নির্মাণ করা স্থাপনগুলোর একটি। যমুনা ভবনের পাশেই রয়েছে ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কারা স্মৃতি জাদুঘর’। বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের সামনে রয়েছে সুসজ্জিত বাগান। বাগানে রয়েছে ৬০ দশকে কারাবন্দী থাকা অবস্থায় তার স্বহস্তে লাগানো কামিনী গাছ। আরও রয়েছে বঙ্গবন্ধুর একটি বিশাল ম্যুরাল। এছাড়া তাকে যে সেলে রাখা হয়েছিল, সেটাও সযত্নে সংরক্ষণ করা হয়েছে। সেলের ভেতরে রাখা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত চেয়ার-টেবিল, খাবার প্লেট, বিছানাপত্র, হাঁড়ি-পাতিলসহ নানা জিনিস।

অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল ইকবাল হাসান জানান, ‘প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত পুরনো কারাগার সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। তিনটি সেশনে এ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১২টা প্রথম, দুপুর ১টা থেকে ৩টা দ্বিতীয় ও সাড়ে ৩টা থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত তৃতীয় সেশনে দর্শনার্থীরা প্রবেশ করতে পারবে। প্রতিজন হিসেবে টিকেটমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০০ টাকা। প্রদর্শনীর কিউরেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সাবেক রাষ্ট্রদূত, জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে সাবেক প্রতিনিধি ইমিরেটাস প্রফেসর ড. এ কে আব্দুল মোমেন। টিকিট বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থ নতুন কারাগারে মহিলা বন্দীদের সন্তানদের জন্য খেলাধুলার সামগ্রী ক্রয়ে ব্যয় করা হবে।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ