সোমবার ১২ এপ্রিল ২০২১
Online Edition

ক্ষমতাসীন জোটের জন্য ‘রাজপথ’ আর বিরোধীদের জন্য ‘কানাগলি’ বরাদ্দ!

সরদার আবদুর রহমান : এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে কোন ঘোষণা দেয়া না হলেও দেশে একটি আগাম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের মৃদু হাওয়া বইতে শুরু করেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে বিদ্যমান ‘গণতন্ত্রবিহীন’ অবস্থা ও নির্বাচন প্রক্রিয়া ধ্বংসের অবসানের কথাবার্তাও জোরালো হতে শুরু করেছে। তবে পর্যবেক্ষদের আশঙ্কা, ক্ষমতাসীন সরকার বিরোধীজোটকে কানাগলিতে আর মহাজোটকে রাজপথে রেখেই নির্বাচন সেরে নিতে চাচ্ছে। এমতাবস্থায়, সার্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রস্তুতির জন্য সরকারকে একচোখা নীতি বদলাতে হবে বলেও তারা মনে করেন। 

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের দলীয় কাউন্সিলে প্রধানমন্ত্রী আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার জন্য দলের নেতাদের নির্দেশ দেন। যদিও নির্বাচনের সম্ভাব্য কোন সময়ের কথা এযাবত উল্লেখ করা হয়নি তবু ইশারা ইঙ্গিতে অচিরেই একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনার কথা জানা যায়। প্রধান বিরোধী দল বিএনপিও ইতোমধ্যে নির্বাচনে নিজেদের প্রস্তুত হবার কথা উল্লেখ করেছে। নির্বাচন কোন সময় নাগাদ অনুষ্ঠিত হবে সে বিষয়ে কোন নিশ্চয়তা না মিললেও বর্তমানে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিদ্যমান তা একটি অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে মোটেও ইতিবাচক নয় বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। এক নজরে দেখা যায়, বিরোধীদেরকে কোনভাবেই স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে না দেয়া, প্রতিপক্ষকে কোনঠাঁসা রাখতে বাহিনীগুলোকে কাজে লাগানো, নির্বাচন কমিশনকে অনুগত রেখে সম্পূর্ণ দলের অনুকূলে ব্যবহার, মামলার পর মামলা দিয়ে বিরোধী নেতা-কর্মীদের হয়রানী করা, মামলায় হাজিরা দিতে আদালতে দৌড়ঝাঁপের মধ্যে রাখা, বিভিন্ন মামলার রায় দিয়ে নির্বাচনে প্রার্থী হতে অযোগ্য করে ফেলা, নির্বাচনী তফসিলের পূর্ব পর্যন্ত আত্মগোপন ও দৌড়ের মধ্যে রাখা, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্যেও একই ধারা অব্যাহত রাখা, নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে ৫ জানুয়ারির গ-ির মধ্যে আবদ্ধ রাখা প্রভৃতি পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অন্যদিকে এই অবস্থার মধ্যে বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে জনগণের কাছে তাদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করার কৌশল নেয়া হয়েছে। বিপরীতে সরকারি ছত্রছায়ায় শুধু মহাজোটের জন্য মুক্ত রাজনীতির অবাধ সুযোগ রাখা হয়েছে। এর মধ্য দিয়েই সরকারি পক্ষ নির্বাচনী প্রস্তুতি চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বলা হচ্ছে, নির্বাচনের প্রকৃত আবহ সৃষ্টি করতে হলে বিরোধীদেরও চিপা গলি থেকে রাজপথে আসার সুযোগ দিতে হবে।

মামলার পর মামলা : গত কয়েক বছরের চিত্রে দেখা যায়, বিরোধী জোটের প্রধান দুই দল বিএনপি ও জামায়াতের কেন্দ্রীয়, জেলা ও তৃণমূল পর্যায়ের এমন নেতা খুঁজে পাওয়া যাবে না যাদের নামে মামলা নেই। প্রতিদিনই কোন না নেতা গ্রেফতার হয়ে চলেছেন। দৌড়ের উপর আর আত্মগোপনের মধ্যে থাকতে হচ্ছে তাদের। আর এটাই সরকারের কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, দেশের অন্যতম জনপ্রিয় দল দু’টিকে ধ্বংস করার জন্য নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ হয়ে দায়েরকৃত মামলাগুলো এখন যেনতেন বিচারকার্য সমাধা করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। বিএনপি নেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ নেতৃবৃন্দকে দোষী সাব্যস্ত করে তাদের নির্বাচনের অযোগ্য করানোর আয়োজন চলছে। আদালতে লড়াইরত আইনজীবী, ভুক্তভোগী বিএনপি-জামায়াত নেতৃবৃন্দ প্রমুখদের ধারণা, আওয়ামী লীগ সরকার চাচ্ছে মামলার খড়গ ও শাস্তি দিয়ে সর্বোচ্চ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেতাকে আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখতে। তারা জানান, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা থাকার কারণে নেতা-কর্মীরা প্রতিনিয়ত পুলিশ ও সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের হয়রানির শিকার হচ্ছেন। মামলায় জামিন নিতে গিয়ে তারা গলদঘর্ম হচ্ছেন। কোনো কোনো নেতাকে সপ্তাহে অন্তত চার দিন আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। নেতাকর্মীরা বাড়িঘরে থাকতে পারছেন না। কার্যত তারা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ঈদ-বিবাহ-উৎসব-জানাযাসহ সামাজিক অনুষ্ঠানে তারা অংশ নিতে পারছেন না। মামলা ছাড়াও পুলিশ ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হুমকি-ধমকিতে তারা দিশেহারা। জানা গেছে, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অন্তত অর্ধলক্ষ মামলা আছে এবং দিন দিন এ মামলার সংখ্যা বাড়ছে। এসব মামলায় লাখ লাখ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, রাষ্ট্রদ্রোহ, নাশকতা ও মানহানির অভিযোগে প্রায় ৩৪টি মামলা রয়েছে। দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাসহ শতাধিক মামলা রয়েছে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে নাশকতা ও মানহানির অভিযোগে ৮৮টি মামলা, মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে ৭৮টি, বিএনপি নেতা ও বিশিষ্ট সাংবাদিক শওকত মাহমুদের বিরুদ্ধে ২২টি, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের বিরুদ্ধে ৭০ থেকে ৭৫টি, হাবিব উন নবী খান সোহেলের বিরুদ্ধে ১১০টি, যুবদল নেতা সাইফুল ইসলাম নিরবের বিরুদ্ধে সর্বাধিক ১৪৩টি মামলা রয়েছে। অনেক জামায়াত নেতা-কর্মীর একেকজনের বিরুদ্ধেও বহুসংখ্যক মামলা বিদ্যমান। এদিকে গ্রেফতারের পর জামিন পাওয়া মাত্রই জেলগেট থেকে পুনরায় গ্রেফতার যেন রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। এর ফলে আদালতের আদেশ-নির্দেশ গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে। একজন বিশিষ্ট নাগরিক জানান, আদালতের নির্দেশে যারা মুক্তি পায় তাদের আবার নতুন করে কোনো মামলায় গ্রেফতার দেখানো বা পুনরায় গ্রেফতার করা আদালতের প্রতি অসম্মান দেখানো। এটা আইনের শাসনের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ- যা মানুষের অধিকার ক্ষুণœ করে। অপর একজন শিক্ষাবিদ বলেন, ঢালাওভাবে প্রতিপক্ষের রাজনীতিকদের এই প্রক্রিয়ায় হয়রানি গণতন্ত্রকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক চর্চাই কেবল দেশকে স্থিতিশীল করতে পারে।

ক্রসফায়ার-বন্দুকযুদ্ধের ভীতি : দেশে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ আর ‘ক্রসফায়ার’-এ নিহতের সংখ্যা বেড়েই চলছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানেও ঘটছে নিহতের ঘটনা। এর মাধ্যমে রাজনীতি ও সমাজে ভীতি সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। গত ১০ মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘ক্রসফায়ার’, ‘বন্দুকযুদ্ধ’ ও অভিযানে নিহত হয়েছে প্রায় পৌনে ২০০। এর মধ্যে ৩১ জন উগ্রপন্থীও রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিসকেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে ও ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে ১২৯ জন। এরমধ্যে গ্রেফতারের আগে ক্রসফায়ারে ৮৭ জন, গ্রেফতারের পর ক্রসফায়ারে ২০ জন, গ্রেফতারের আগে শারীরিক নির্যাতনে ৪ জন, গ্রেফতারের পর শারীরিক নির্যাতনে ৫ জন, পুলিশ ও বিজিবির গুলীতে ৭ জন, গ্রেফতারের পর অসুস্থ হয়ে ৪ জন এবং ২ জন রহস্যজনকভাবে নিহত হয়। এরমধ্যে র‌্যাবের হাতে ৩৪ জন, পুলিশের হাতে ৮০ জন, ডিবি পুলিশের হাতে ১২ জন, রেলপুলিশের হাতে একজন এবং বিজিবি-পুলিশের হাতে দুইজন নিহত হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে তিন মাসে নিহত হয় ৩১ উগ্রবাদী এবং এক সন্দেহভাজন। এ দিকে পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীর অভিযোগের ভিত্তিতে আসকের প্রতিবেদনে বলা হয়, সাদা পোশাকে আসা ব্যক্তিরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে ৭৫ জনকে আটক করে। এরমধ্যে পরবর্তী সময়ে ৮ জনের লাশ পাওয়া যায়। তিনজন ফেরত এলেও বাকি ১৮ জনকে বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার দেখানো হয়। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো বিভিন্ন সময়ে আটকের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। 

চিপা গলিতে রাজনীতি : কোন রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ না করেও তাদের সঙ্গে সেরকম আচরণই করা হচ্ছে সরকারি মহল থেকে। তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা প্রদান করা নিয়মিত ও সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। গোপন বৈঠক, নাশকতার পরিকল্পনা, বিনা অনুমতিতে মিছিল-সমাবেশ, বিস্ফোরক দ্রব্য-জিহাদি বই থাকা প্রভৃতির অভিযোগ তুলে যেকোন শান্তিপূর্ণ ও ঘরোয়া কার্যক্রমে আইন-শৃঙ্খলার দোহাই দিয়ে কর্মসূচী ভ-ুল করে দেয়া হয়। এমনকি মানববন্ধনের মতো নীরিহ কর্মসূচিতেও বাধা দেয়া হয়, ব্যানার কেড়ে নেয়া হয়, ঘটনাস্থল থেকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়। সরকারের সাধারণ নির্দেশনা ও স্থানীয় দলীয় নেতাদের ইঙ্গিতে সাধারণ কর্মসূচিতে বাধা প্রদানের ঘটনাগুলো ঘটে বলে অভিযোগে প্রকাশ। এভাবে বিরোধীদলীয় রাজনীতিকে একপ্রকার চিপাগলি বা কানাগলিতে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে বলে ভাষ্যকারদের অভিমত। 

নির্বাচনী প্রক্রিয়া ধ্বংস : দেশের নির্বাচনসমূহ স্বাভাবিক চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে বলেও মনে করেন বিশ্লেষকরা। নির্বাচন যেন বহুল আলোচিত, বিতর্কিত ও নিন্দিত ‘এইচ টি ইমাম ফরমূলা’ প্রয়োগের লীলাক্ষেত্র হয়ে পড়েছে। এই ফরমূলায় নির্বাচনে ফলাফল থাকে পূর্বনির্ধারিত। যা মহাজোট সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে তলানিতে পৌঁছে দিয়েছে। ক্ষমতাসীনদের নানা অপকৌশলে তছনছ হয়ে যাচ্ছে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা। যেকোন প্রকারে জয় ‘নিশ্চিত’ করার আগাম ও প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে ভোটের মর্যাদাকে ধুলায় মিশিয়ে দেয়া হচ্ছে। ৮০-৯০-এর দশকে স্বৈরাচারী এরশাদ নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ‘দশটা হোন্ডা বিশটা গুণ্ডা, ইলেকশন ঠাণ্ডা’ করার যে ফরমূলা চালু করেছিলেন তা আবারো বাস্তবায়ন হয়ে চলেছে বলে ভাষ্যকারদের অভিমত। উল্লেখ্য, সেই ‘স্বৈরাচারী এরশাদ’ এখন মহাজোটের গুরুত্বপূর্ণ শরীকের মর্যাদা পেয়ে ক্ষমতার সঙ্গী হয়েছে। এর সঙ্গে সাম্প্রতিককালে যুক্ত হয়েছে ‘এইচ টি ইমাম ফরমূলা’। এর মধ্য দিয়ে দেশ ‘ম্যানেজড’ নির্বাচনের যুগে প্রবেশ করছে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এবং আওয়ামী লীগের নির্বাচন সংক্রান্ত কুট-কৌশল নির্ধারক এইচ টি ইমাম ছাত্রলীগের এক অনুষ্ঠানে ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের ‘ভেতরের কথা’ প্রকাশ করে দেন। তিনি পাবলিক সার্ভিস কমিশনের উপর নিজেদের দলীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করার কথাও প্রকাশ করেন। বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে নির্বাচন সম্পর্কে বিরোধীদলীয় অভিযোগকে সরকারি মহল উড়িয়ে দিয়ে আসলেও উপদেষ্টা ইমামের বক্তব্যে তা সরকারি স্বীকৃতি লাভ করে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের সময় বাংলাদেশ পুলিশের, প্রশাসনের যে ভূমিকা; নির্বাচনের সময় আমি তো প্রত্যেকটি উপজেলায় কথা বলেছি। সব জায়গায় আমাদের যারা রিক্রুটেড তাদের সঙ্গে কথা বলে, তাদের দিয়ে মোবাইল কোর্ট করিয়ে আমরা নির্বাচন করেছি। তারা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, তারা বুক পেতে দিয়েছে। আমাদের যে ১৯ জন পুলিশ ভাই প্রাণ দিয়েছে, তোমাদের মনে আছে এরা কারা? সব আমাদের মানুষ।’ 

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ‘কলঙ্কজনক’ হবার ক্ষেত্রে ‘মাইলফলক’ হয়ে আছে। ভোটের আগেই অর্ধেক আসনে একটি দলের প্রার্থীদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় বিজয়ী হবার বিশ^রেকর্ড সৃষ্টি হয়। বাকি আসনগুলোতে ভোটকেন্দ্রে অগ্নিসংযোগ, সর্বনি¤œ ভোটার উপস্থিতি, জাল ভোটের মহোৎসব ও ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে সেগুলো পূরণ করা, একেকজন শত শত ভোট দিয়ে উল্লাস প্রকাশ, সর্বাধিক সংখ্যক কেন্দ্রে ভোট স্থগিত হওয়া, বহু সংখ্যক প্রার্থীর ভোট বয়কটের ঘোষণা দেয়া প্রভৃতি ঘটনা দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে চরমভাবে কলঙ্কিত করে। অন্তত ৪১টি কেন্দ্রে আদৌ কোন ভোট পড়েনি- এমন ঘটনাও ঘটে। আবার বেলা ১টার মধ্যে মাত্র ৩ শতাংশ ভোট কাস্টিং হলেও বিকেল ৪টায় তা হয়ে যায় ৭০ ভাগের ওপরে। দলের একেকজন কর্মী ১শ’ থেকে সাড়ে ৪শ’ পর্যন্ত ভোট দেবার ‘গৌরব’ অর্জনে সক্ষম হয়। অনেক স্থানে পুরো একটি পরিবারের ভোট অন্যরা দিয়ে দেয়। বিভিন্ন কারণে সারা দেশে প্রায় সাড়ে ৫শ’ কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত করতে হয়। তিনশ’ আসনের মধ্যে অর্ধেকেরও কম আসনে ভোট করতে গিয়েও এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এছাড়া বিভিন্ন অভিযোগ এনে ভোট গ্রহণের দিনে অন্তত ২০ জন প্রার্থী নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। তাঁদের মধ্যে মহাজোটের শরীক জাতীয় পার্টি, জাসদ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ছিলেন। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রাণহানীর ঘটনাও একটি রেকর্ড। শুধু নির্বাচনের দিনই ২১ জনের মতো লোক নিহত হবার খবর পাওয়া যায়। বিশ্লেষকদের মতে, এ নির্বাচনকে ঘিরে যে সহিংসতা হয়েছে তা অতীতের কোনো নির্বাচনে দেখেননি দেশবাসী। এদিকে গতবছর প্রথম দিকে কয়েক দফায় অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে অনিয়ম, কারচুপি ও সহিংসতা ঘটে ব্যাপক হারে। প্রথম দু’দফার নির্বাচনে বিরোধী জোটের প্রার্থীরা ব্যাপক বিজয় অর্জন করতে থাকায় নড়েচড়ে বসে সরকারি মহল। পরের উপজেলা নির্বাচনগুলোতে কেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই, জাল ভোট, পুলিশের গুলী, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ব্যাপক ঘটনা সংঘটিত হতে থাকে। এসময় বিভিন্ন মহল থেকে নির্বাচন কমিশনকে বারবার সতর্ক করার পরও তারা আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি নির্বাচনে আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং নির্বাচন কমিশন নির্লিপ্ত ভূমিকা পালন করে বলে অভিযোগ উঠে। ফলস্বরূপ বিরোধীজোটের প্রার্থীদের বিজয়ী হবার সংখ্যা কমতে থাকে।

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনকে অপব্যবহারের ক্ষেত্রে এবার এক নয়া রেকর্ডও স্থাপিত হয়। নির্বাচন কমিশন কার্যত সরকারের আজ্ঞাবহ একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। অভিযোগে প্রকাশ, সেই বিরোধী দলবিহীন নির্বাচনে সরকারের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে গিয়ে নির্বাচন কমিশন অনেক ক্ষেত্রেই অনিয়মকে নিয়ম হিসেবে চালিয়ে দেয়। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের ‘লাঙ্গল’ প্রতীক বরাদ্দ দেয়া, আ’লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান এইচ টি ইমামের ‘বেআইনি’ চিঠিকেও গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন বেশ কিছু আসনের প্রার্থীর তালিকা বারবার রদবদল করা প্রভৃতি। আ’লীগের সঙ্গে শরিকদের সমঝোতা রক্ষা করতে গিয়ে তারা এই অনিয়ম করে। বিভিন্ন জেলার রিটার্নিং কর্মকর্তারা ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৩ ডিসেম্বরের তারিখ দিয়ে অবৈধভাবে প্রার্থীদের কারো মনোনয়নপত্র বাতিল, আবার কারো মনোনয়নপত্র বৈধ দেখায়। যে কারণে জাপার বেশ কয়েকজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আবেদন জমা দেয়ার পরও তাঁরা বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় জয়ী হন। আ’লীগের নির্বাচনী জোটের অনুকূলে ‘নৌকা’ প্রতীক বরাদ্দের ক্ষেত্রেও কমিশন আইন মানেনি। জাতীয় পার্টি সরে পড়ায় অনেক আসনে প্রার্থীসংকট দেখা দিলে কমিশনের পরামর্শে রিটার্নিং কর্মকর্তারা অনেক প্রার্থীকে বাড়ি থেকে ডেকে এনে মনোনয়নপত্র শুদ্ধ করে দেন। এছাড়াও, নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে সরকারি দল কোন নিয়মেরই তোয়াক্কা করেনি। কিন্তু সেদিকে নির্বাচন কমিশন ঘুরেও দেখেনি। নবগঠিত বিএনএফকে নিবন্ধন দিতে চরম কুটচালের আশ্রয় নিতে দেখা যায়। যা ছিল একেবারে নগ্ন আচরণ।

একনজরে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংসের পেছনে যে সব প্রক্রিয়া-অপকৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে, বিরোধীদের প্রচার-প্রচারণায় অব্যাহত বাধা প্রদান, হামলা ও গ্রেফতার আতঙ্ক বজায় রাখা, পাড়া-মহল্লায় গিয়ে বিরোধী ভোটারদের হুমকি দেয়া, আগের রাতেই দলীয় প্রতীকে ব্যালট বাক্স ভরে রাখা, কেন্দ্র দখল করে প্রতিপক্ষকে ভিড়তে না দেয়া, আইনপ্রয়োগকারীদের নগ্নভাবে দলের পক্ষে ব্যবহার, নির্বাচন কমিশনকে কেবল হুকুমের দাস করে রাখা, বিরোধী নির্বাচনী এজেন্টদের অনুপস্থিতি নিশ্চিত করা, সাংবাদিক-পর্যবেক্ষকদের দায়িত্ব পালনে বাধা দেয়া, অনিয়ম-অভিযোগ আদৌ আমলে না নেয়া, নির্বাচনী কর্মকর্তা ও কর্মীদের সর্বদা ভীতি ও চাপে রাখা, ব্যালট ছিনতাই করে গণহারে সিল মারা, সাধারণ ভোটারদের ভোট প্রদানে বাধা দেয়া, ভোটের অংকে ইচ্ছেমত হেরফের ঘটানো প্রভৃতিসহ রয়েছে সবধরনের অপকৌশল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন পর্যন্ত প্রায় দেড়শ’ লোকের প্রাণহানী ঘটে। এছাড়াও সেই নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিশ্ব রেকর্ড সৃষ্টি হয়। সেই সংসদ নির্বাচনকে কোন কোন ভাষ্যকার ‘শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ তামাশা’ বলে আখ্যায়িত করেন। কোন নির্বাচন ছাড়াই ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতিয়ে দেয়া হয় ভাগবাটোয়ারার হিসেব অনুযায়ী। এসব আসনে কাউকে ভোট দেয়ার জন্য ভোট কেন্দ্রে যেতে হয়নি। বাকি ১৪৭ আসনে কেবল নির্বাচনের মহড়া দেয়া হয় ৫ জানুয়ারী। এগুলো শুধু পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের জোটের শরীকদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়া হয়। একজন বিশ্লেষকের মতে, একদিকে ১৫৩টি আসনের জন্য ৪ কোটি ৬৮ লক্ষ ৬৯ হাজার ভোটারকে ভোট দেয়া তো দূরের কথা, ভোট কেন্দ্রে যেতেও হয়নি। আর বাকি ১৪৩টিতে ভোটের নামে কী করা হয়েছিলো দেশবাসী তা প্রত্যক্ষ করেছে। এই নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যাও ছিল ইতিহাসের সর্বনি¤œতম। অন্যদিকে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনকে অপব্যবহারের ক্ষেত্রে এবার এক নয়া রেকর্ডও স্থাপিত হয়। নির্বাচন কমিশন কার্যত সরকারের আজ্ঞাবহ একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বলা হচ্ছে, বিরোধী দলবিহীন এই নির্বাচনে সরকারের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে গিয়ে নির্বাচন কমিশন অনেক ক্ষেত্রেই অনিয়মকে নিয়ম হিসেবে চালিয়ে দিয়েছে। ‘নির্বাচন কমিশন’ নামক সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি ও জন-আস্থা ধূলিস্মাৎ হয়ে গেছে বলেও অভিমত দিয়েছেন পর্যবেক্ষকরা। এমতাবস্থায় দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়াকে পুনর্ববহাল ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার কোন বিকল্প দেখছেন না বিশ্লেষকগণ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ