রবিবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

ক্যান্সার : মানসিক চাপ মোকাবিলা

অধ্যাপক ডা. জিএম ফারুক : প্রাথমিক স্তরে ক্যান্সার নির্ণয় হলে তা আরোগ্য যোগ্য। এজন্য ক্যান্সার নির্ণয় স্তর বিন্যাস (Staging) একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্তর বিন্যাস নির্ভর করে প্রাথমিক স্থান থেকে তার আশপাশের এলাকা এবং দূরবর্তী এলাকার ছড়িয়ে পড়েছে কিনা তার উপর। যেমন, ব্রেস্ট ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়তে পারে ফুসফুস, লিভার এবং হাড়ে। এমনিভাবে ঝুঁকিপূর্ণ লক্ষণ চিহ্নিতকরণ, প্রাথমিক স্তরে রোগ নির্ণয় এবং স্তর বিন্যাস রোগীর চিকিৎসায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যায়ের রোগীদের জন্য উপশমগত (Palliative care) দেয়াই চিকিৎসকের লক্ষ্য থাকে।
ক্যান্সার ধরা পড়লে রোগী হতাশায় নিমজ্জিত হয়। রোগীর আতীয় স্বজনকে চিকিৎসক সরাসরি ক্যান্সার নির্ণয়ের কথা জানলেও অনেক সময় রোগীকে তা জানতে দেয়া হয় না। তবে রোগী ভাবতে থাকে তার কোন কঠিন রোগ হয়েছে। মনের অজান্তে সে নিজেকে ক্যান্সার রোগী হিসেবেই মনে করে। এজন্য সে কাছের লোকদের বার বার জিজ্ঞেস করে, ডাক্তার তার রোগ সম্পর্কে কি বলেছে। শিক্ষিত এবং সচেতন রোগীরা সহজেই ডাক্তারের চিকিৎসা কৌশল বুঝে ফেলেন যে, তার ক্যান্সার হয়েছে। রোগীর স্বজনরা অনেক সময় চিকিৎসককেই আগেভাগেই বলে রাখেন যে, রোগী যাতে তার রোগের কথা না জানেন। এটা এক ধরনের মানসিক ব্যবস্থাপনা হলেও আধুনিক চিকিৎসা কৌশল হিসেবে রোগীকে রোগ সম্পর্কে জানিয়ে দেয়াই ভাল। রোগী তার রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারলে চিকিৎসককে সে ভালভাবে সহযোগিতা করতে পারে। রোগ সম্পর্কে তার একটি মানসিক প্রস্তুতিও গড়ে উঠে। বলা যায়, রোগীর মনে ইতিবাচক ভাবনার সৃষ্টি হয়।
ক্যান্সার চিকিৎসার মাল্টিমডেল পদ্ধতিতে গ্রুপে একজন মানসিক চিকিৎসক থাকা জরুরি। টিউমার বোর্ডের সভায় মানসিক চিকিসকের পরামর্শ গ্রহণকে এখন গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। কারণ, ক্যান্সার নির্ণয় মানে রোগীর হাতে মৃত্যুর পরোয়ানা। তাই ক্যান্সার রোগীর মনে অতি সহজেই হতাশার জন্ম হয়। হতাশা, বিষণ্নতা, মনমরা ভাব, রোগীর রোগকে আরো বাড়িয়ে দেয়। রোগীর বিষণ্নতার (Depression) লক্ষণে পাওয়া যায় ওজন কমতে থাকে। কোন কাজে শক্তি পায় না। কোন কাজেই আনন্দ উৎসাহ থাকেনা। সবসময় মৃত্যুচিন্তা তাকে ঘিরে রাখে। কখনো কখনো আত্মহত্যার ভাবনা জাগে। এছাড়া ক্যান্সার রোগীর অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তাও থাকে। ব্যয়বহুল ক্যান্সার চিকিৎসায় অনেক রোগীরই অর্থনৈতিক সমস্যা দেখা দেয়। ফলে চিকিৎসা খরচ বহন করতে যেয়েও রোগীর মধ্যে হতাশা দেখা দেয়। ক্যান্সার রোগীর হতাশা, বিষণ্নতা কাটাতে সাইকোথেরাপির প্রয়োজন হয়। এজন্য ক্যান্সার রোগীর জন্য মানসিক চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ জরুরি বিষয়। ক্যান্সার রোগীর মানসিক প্রশান্তি, চিকিৎসা সুবিধা, ধর্মীয় অনুভূতি জাগ্রত রাখার জন্য হসপিস (Hospice care) কেয়ার সেন্টার অথবা সোশ্যাল সাপোর্ট গ্রপ (social support group) এর প্রয়োজন। উন্নত দেশে ক্যান্সার হাসপাতালগুলোর সাথে এ ধরনের সাপোর্ট গ্রুপ কাজ করে থাকে। এ ধরনের গ্রুপগুলো ক্যান্সার রোগীদের কাউন্সিলিং প্রোগ্রাম দিয়ে থাকেন। অর্থনৈতিক সমস্যাগ্রস্ত রোগীদের জন্য সাপোর্ট গ্রুপগুলো তাদের তহবিল থেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। ধর্মীয় উপসনালয়ে ক্যান্সার রোগীদের নিয়ে সম্মিলিত প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। ইসলাম ধর্ম এ প্রার্থনাকে আরো গুরুত্ব দেয়। কারণ, রোগ আরোগ্যের মালিক একমাত্র আল্লাহ্তায়ালা। রোগীর সেবা দানকে মহানবী (সাঃ) অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। এ জন্য ক্যান্সার রোগীর চিকিৎসায় তার মানসিক শক্তি অটুট রাখার জন্য মুসলিম সমাজে মসজিদগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। মসজিদের ইমামদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ক্যান্সার রোগীদের কাউন্সিলিং এ নিয়োজিত করা গেলে বহু রোগী উপকৃত হতে পারেন। সমাজের সামজিক সংস্থারগুলো এ ধরনের কর্মসূচী গ্রহণ করতে পারেন। মনে রাখতে হবে, ক্যান্সার রোগীর জন্য মেডিকেল চিকিৎসার পাশাপাশি সামজিক ও মানসিক চিকিৎসারও প্রয়োজন রয়েছে। এখানে একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ, বিষেশত ব্রেস্ট ক্যান্সার রোগীদের জন্য। যাখন কোনো স্ত্রী লোকের ব্রেস্ট সার্জারী করা হয় (আংশিক বা সম্পূর্ণ), তখন তার মনের অবস্থাটা ভেবে দেখুন। হয়ত সার্জারীর মাধ্যমে তার চিকিৎসা সফলতা পাওয়া গেল, কিন্তু তার মানসিক অবস্থা সমাজের সুশিক্ষিত আলোকিত স্বামীরা এক্ষেত্রে স্ত্রীর প্রতি সদয় ব্যবহার করবেন এটাই স্বাভাবিক। সার্জারীকৃত স্ত্রীলোক ভাবতে থাকেন, তার স্বামী হয়ত তার প্রতি আকর্ষণ হারাচ্ছেন।
এ রোগীদের জন্য তার স্বামীই হচ্ছে প্রধান চিকিৎসক। স্বামী তার স্ত্রীকে সহায়তা করতে পারেন, যদি তিনি কিছু কথা, কিছু কাজ, নিয়মিত করেন। যেমন স্বামীর তার স্ত্রীকে প্রায় বলতে পারেন ‘তুমি ভাল, তুমি দেখতে সুন্দর, আমি শুধু তোমাকেই ভালবাসি’। এছাড়া স্ত্রীকে নিয়ে মাঝে মধ্যে বেড়াতে যাওয়া, তার ওষুধ পত্রের ব্যবস্থা করা, নিয়মিত মেডিকেল চেকআপের জন্য নিয়ে যাওয়া, ইত্যাদি। হ্যাঁ ক্যান্সার রোগীর চিকিৎসায় অবশ্যই মানসিক বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। রোগীর বাসার পরিবেশ এমন হতে হবে, যাতে তিনি নিজেকে মানসিক বিষয়েকে গুরুত্ব দিতে হবে। রোগীর বাসার পরিবেশ এমন হতে হবে, যাতে তিনি নিজেকে রোগী ভাবতে না পারেন। স্বজনরা দেখা করে কখনই কান্নার পরিবেশ তৈরী করবেন না। রোগীকে ধর্মীয় পরিবেশে রাখা ভাল। রোগীর মনে যাতে সবসময় ধর্মীয় আবেগ তৈরী হয় সে ব্যবস্থা করা জরুরী। যেমন, নিয়মিত নামায, তাসবীহ্, রোআন অধ্যয়ন বা তিলাওয়াতের ব্যাপারে উৎসাহ দান, এবং কোরআনের ক্যাসেট শুনার ব্যবস্থ করা। বন্ধু বান্ধব এবং আত্মীয়-স্বজনরা সব সময় ইতিবাচক কথা বার্তার মাধ্যমে রোগীর মানসিক প্রশান্তি দিতে পারেন। এখানে মনে রাখা দরকার যে, মহানবী (সাঃ) রোগী দেখতে যেতেন, রোগীর জন্য দোয়া করতেন এবং রোগীর কাছে দোয়া চাইতেন। আমরাও এ সংস্কৃতিটি সমাজে বজায় রাখতে পারি। আর রোগ আরোগ্য সব সময় আল্লাহর সাহায্য কামনা করতে হবে।
লেখক- নির্বাহী পরিচালক
বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক ক্যান্সার সোসাইটি
রোড-১১, বাড়ি-৩৮, নিকুঞ্জ-২, খিলক্ষেত, ঢাকা-১২২৯
ফোন: ০১৭১২-৮১৭১৪৪, ০১৫৫৬-৬৩১৯৬৫

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ