বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

‘ইসলাম’ জনগণ নিপীড়ন নয়, নিরাপদ ও শান্তির ধর্ম

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : আল্লাহ তাআলাই এই বিশ্ব জাহানের সব কিছুর মালিক সৃষ্টিকর্তা, পালন কর্তা, নিয়ন্ত্রক। তিনি এ সব কিছু উদ্দেশ্যহীন সৃষ্টি করেননি। আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ তাআলা এই বিশ্ব জগতের সব কিছু (খেলার ছলে নহে, বরং) স্পষ্ট উদ্দেশ্য সম্পন্ন করে সৃষ্টি করেছেন। আল-কুরআন, সূরা ইউনূস: ৫। ‘আমার আসমান ও জমিনকে এবং দুয়ের মাঝখানে যা কিছু আছে অনর্থক সৃষ্টি করিনি। আল-কুরআন, সূরা রাদ; ২৭। উপরোক্ত আয়াত থেকে পরিষ্কার প্রতীয়মান হয় যে আল্লাহ অনর্থক বা উদ্দেশ্যহীন এই বিশ্ব জগতের কিছুই সৃষ্টি করেননি। এখন প্রশ্ন: কি উদ্দেশ্যে আল্লাহ তাআলা এই বিশ্ব জগত সৃষ্টি করেছেন। এই প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আসমান সমূহ ও যমিনে (যেখানে) যা কিছু আছে তারা সবাই ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক, আল্লাহ তাআলাকে সেজদা করে চলেছে, (এমন কি) সকাল সন্ধ্যায় তাদের ছায়াগুলোও (তাদের মালিকের সামনে সেজদা করছে)।” আল-কুরআন, সূরা আর রা’দ: ১৫। এখানে ‘সেজদা’ অর্থ আল্লাহর কাছে আনুগত্য প্রদর্শন, যা দাসত্বের বা আনুগত্যের সর্বোচ্চ বহি:প্রকাশ। এ ক্ষেত্রে ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক অভিব্যক্তি দ্বারা বাধ্যতামূলকভাবে আনুগত্যকে নির্দেশ করা হয়েছে। অর্থাৎ সকল সৃষ্টিই বাধ্যতামূলকভাবে আল্লাহর আনুগত্য করে চলেছে। তাদের আনুগত্যের ক্ষেত্রে কোনই ব্যত্যয় বিচ্যুতি বা বিরোধ নেই। সৃষ্টিক্ষণ থেকে প্রলয় দিবস পর্যন্ত তারা আল্লাহর দেয়া নির্ধারিত বিধান মোতাবেক আনুগত্য করে চলবে।
আল্লাহ তাঁর আনুগত্যের ক্ষেত্রে অন্যান্য সৃষ্টি থেকে মানব জাতির বেলায় একটু ভিন্ন নীতি ও কৌশল অবলম্বন করেছেন। মানুষকে তাঁর আনুগত্যের বিষয়ে পরীক্ষা করতে চান। আল্লাহ বলেন- “আমি জিন ও মানুষকে কেবল এই জন্য সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমার বন্দেগী করবে।” আল-কুরআন, সূরা যাবিয়াহ: ৫৬। ‘সেই আল্লাহ তোমাদেরকে (মানবজাতি) প্রতিনিধি বানিয়েছেন এবং তোমাদের ভেতর থেকে কাউকে কারোর চাইতে উঁচু মর্যাদা দিয়েছেন। যেন তিনি তোমাদেরকে যা কিছু দান করেছেন তার ভেতর তোমাদের পরীক্ষা করতে পারেন।’ আল-কুরআন, সূরা আনয়াম: ১৬৫। ‘আমি তাকে (এই দুনিয়ায় চলার) পথ দেখিয়েছি, তখন সে চাইলে হেদায়েতের পথে চলে আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হতে পারে। আবার চাইলে (বিরোধীতার পথ চলে অকৃতজ্ঞ) কাফের হয়ে যেতে পারে।’ আল-কুরআন, সূরা আদ দাহর: ২। উপরোক্ত আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ মানব জাতিকে অন্যান্য সৃষ্টির মতোই আনুগত্যের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তবে অন্যান্য সৃষ্টির আনুগত্যের বিষয়ে পরীক্ষা এবং প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি একটু ভিন্ন প্রকৃতির। আর তা হলো আনুগত্যের বিষয়ে পরীক্ষা এবং প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব। মানুষ এই পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে স্বেচ্ছায় আল্লাহর দেয়া আনুগত্যের বিধান মোতাকেব আনুগত্য তথা এবাদত করবে। তদপ্রেক্ষিতেই মানুষকে যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে তা অর্জিত হবে।
আল্লাহ তাআলা তাঁর সকল সৃষ্টির উদ্দেশ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অবলম্বন তথা প্রবর্তন করেছেন। একে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা Safety system বলা যেতে পারে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা অর্থ সৃষ্টির উদ্দেশ্য অর্জনে ফলপ্রসূ ভাবে যে সব উপায় উপাদান প্রয়োজন তার যথাযথ যোগান পূর্বক তা সুষ্ঠুভাবে ব্যবহারের বিধানবলী প্রদান। মানুষ ছাড়া সকল সৃষ্টির নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা Safety system অর্থাৎ আনুগত্যের উপায় উপাদান ও তা ব্যবস্থাপনার বিধান স্বয়ংসম্পূর্ণ বিধায় তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় কোন বিচ্যুতি ঘটে না।
কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ব্যত্যয় তথা বিচ্যুতি মারাত্মক ভাবে পরিদৃষ্ট হয়। মানুষকে আল্লাহ আনুগত্যের জন্য নিরাপত্তার প্রয়োজনীয় সকল উপায়উপাদান ও তা ব্যবহারে বিধানাবলী যথাযথভাবে যোগান দিয়েছেন। আনুগত্যের পরীক্ষা জনিত কারণে প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা প্রদান করায় মানুষ আনুগত্যের উপায় উপাদান সমূহ আল্লাহর দেয়া বিধান মোতাবেক ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া অবলম্বন না করায় নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়ে থাকে। সুতরাং এ থেকে বলা যায় যে, আল্লাহর আনুগত্যের জন্য আল্লাহর দেয়া উপায়-উপাদান বিধান আল্লাহর মোতাবেক ব্যবহার না করার কারণে মানুষের নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি হয়। আল্লাহ বলেন- “জলে-স্থলে যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে তা মানুষের হাতের কামাই।” সূরা আর রুম: ৪১।
ইসলামী আইনে জনসমাজের নিরাপত্তা বিষয়ে নিম্নে আমরা আলোচনার প্রয়াস পাব- ইনশাআল্লাহ। ১। ইসলামী আইন কি? ২। নিরাপত্তা কি? ৩। ইসলামী আইনে জন সমাজের নিরাপত্তার বিধান কি?
ইসলামী আইন কি : ইসলামী আইন কি? তা জানার আগে আইন বলতে সাধারণত: কি বুঝায় তা জেনে নেয়া সমীচীন। আভিধানিক অর্থে আইন হলো আনুষ্ঠানিক বা প্রথাগত কতিপয় বিধি বিধান যা রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত এবং ইহার নাগরিকদের উপর বাধ্যকর। অন্যভাবে বলতে গেলে; The word law refer to the rules that men have enacted to govern the community and to regulate personal, national and International relations. অর্থাৎ কোন জনসমষ্টির আচরণ পরিচালনা এবং ব্যক্তিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কে নিয়ন্ত্রণ বিধি বিধানকে আইন বলে। এক কথায় মানব আচরণকে সামষ্টিক কল্যাণার্থে পরিচালনার জন্য প্রণীত নিয়ন্ত্রণ বিধি-বিধানই আইন। ইসলামী আইন কি? মানব রচিত আইন থেকে ইসলামী আইনের অভিব্যক্তি অধিক বিস্তৃত, সামঞ্জস্যপূর্ণ ও প্রায়োগিক প্রকৃতির। সার্বিক অর্থে ইসলামী আইনকে শরীয়ত (Sharia) বলা হয়। ‘শরীয়ত’ শব্দটি আভিধানিক অর্থে সেই পানি বোঝায়, যেখানে পিপাসার্তরা একত্রিত হয় এবং তা পান করে পিপাসা নিবারণ করে। ব্যবহারিক অর্থে শরীয়ত অর্থ: এক সুদৃঢ় ঋজু পথ, যদ্বারা তার অবলম্বনকারী লোকেরা হেদায়াত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মপথ লাভ করতে পারে। এ দুটি জিনিসই (হেদায়াত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মপথ) মানুষের পিপাসা নিবৃত করে বলে এ দুয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সাদৃশ্য স্পষ্ট।
ফিকহ্বিদদের দৃষ্টিতে ‘শরীয়ত’ বলতে বুঝায় সে সব আদেশ নিষেধ ও পথ নির্দেশ যা আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রতি আনুগত্যের বিধান হিসেবে জারী বা প্রর্বতন করেছেন। এটি এ জন্য করেছেন যাতে লোকেরা তার প্রতি ঈমান এনে তদনুযায়ী আমল করে এবং তদনুরূপ জীবন যাপন করে। এই আদেশ নিষেধ ও নির্দেশ হতে পারে আকীদা বিশ্বাস পর্যায়ের, চরিত্র ও নৈতিকতা পর্যায়ের এবং কর্ম পর্যায়ের, যার মাধ্যমে সকল মানুষের নিরাপত্তা সুদৃঢ় ও নিশ্চিত হয়। আল্লাহর এ আদেশ নিষেধ নির্দেশ সমন্বিত বিধান (শরীয়ত) অত্যন্ত দৃঢ় ও সুষ্ঠু। মানুষের হৃদয়, মত জীবন ও বিবেক বুদ্ধির পরিচর্যা ও চরিতার্থতার এই হচ্ছে একমাত্র পথ। একে দ্বীনও বলা হয়ে থাকে।
শরীয়ত আল্লাহর নিকট হতে অবতীর্ণ। এর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হলো: বিশ্ব-মানব সমাজকে যথেচ্ছাচার ভুল-ভ্রান্তি ও কাম লালসার হাতছানি থেকে মুক্ত করে সত্য, সুবিচার ও ন্যায়ের দিকে নিয়ে আসা, যেন পৃথিবীতে আল্লাহর খিলাফত বা প্রতিনিধিত্বের দায়িত্বপূর্ণ কাজটি সঠিক ও সুষ্ঠু নিয়মে কার্যকর ও বাস্তবায়িত হতে পারে। কেননা এ বিধান অত্যন্ত সুদৃঢ়, সুষ্ঠু ও ঋজু। এতে বক্রতা বলতে কিছু নেই, শরীয়তের নির্দেশনা মতো চললে কারো বিভ্রান্ত ও পথ ভ্রষ্ট হবার কোনই আশংকা থাকে না। স্বাধীন, সুদৃঢ় জীবন যাপনের এটাই একমাত্র পথ। মানব জাতির প্রকৃতি বৈশিষ্ট্যের সকল প্রকার নিরাপত্তা বিধান এতে নিহিত। আল্লাহ তাআলা এই শরীয়াহর বিধান দিয়েই তাঁর নবী ও রাসূলগণকে এই দুনিয়ায় মানুষের নিকট প্রেরণ করেছেন।
ইসলামী শরীয়ত তথা আইনের বহুবিধ বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান; তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কতিপয় বৈশিষ্ট্য সংক্ষেপে নিম্নে বর্ণিত হলো: ইসলামী আইন সম্পূর্ণ আল্লাহর আনুগত্যের ইনসাফ পূর্ণ নির্দেশ। এতে ন্যূনতম জুলুমের চিহ্ন নেই। মানব রচিত আইনে যে আনুগত্যের নির্দেশ দেয়া হয় তাতে কোন না কোন প্রকার জুলুম থাকে বলে তা ইনসাফপূর্ণ হয় না হতে পারে না। আর এ কারণেই মানব রচিত আইন প্রকৃত জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। মানব প্রকৃতির বৈশিষ্ট্যের কারণে জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে যে আইন আবশ্যক তাহলে ‘ইনসাফ’ (Justice)। ইনসাফ এবং আইন এক নয়। আইনের মাধ্যমে ইনসাফ কার্যকরী হয়ে থাকে। ইনসাফ (Justice) শব্দটি ল্যাটিন ‘Justifia’ শব্দ থেকে নির্গত। শব্দটি মানুষের ব্যক্তিক ও সামাজিক সম্পর্কের নেটওয়ার্কের প্রেক্ষিতে নির্দেশক। একজন ব্যক্তির সাথে অপর একজন ব্যক্তি পরস্পর কিভাবে সম্পর্কিত হয় তা নির্দেশ করে। একজন ব্যক্তিকে তখনই ইনসাফ বাদী বলে অভিহিত করা ইনসাফ হয়, যখন সে ব্যক্তি অপর ব্যক্তির সাথে সঠিক সম্পর্ক স্থাপনে নিদর্শন স্থাপন করে। অর্থাৎ সেই ব্যক্তি তার সাথে সম্পর্কিত ব্যক্তিকে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান পূর্বক তার অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে সক্ষম হয়। অন্যভাবে বলতে গেলে প্রত্যেককে তার ন্যায্য পাওনা প্রদান করাই হলো ইনসাফ।
(A person is said to be just when he/she stands in right relationship with others, that is, when he/she recognizes others as persons and respect their rights. In other words, to be just means to give each one what is due to him (her as person). ইসলামী আইনে ইনসাফের নিকটবর্তী শব্দ আদল, ইহসান ও ছেলায়ে রেহমী। এই শব্দ তিনটির মধ্য দিয়েই ইনসাফের পূর্ণাঙ্গ রূপ বিকশিত হয়।
আদল: ‘আদল’ শব্দটি মূলত দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয়। একটি হলো সৃষ্টি জগতের পারস্পরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ভারসাম্য ও সামঞ্জস্য রক্ষা এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে প্রত্যেককে তার ন্যায্য অধিকার যথাযথভাবে আদায় করে দেয়ার ব্যবস্থা করা। সত্যি কথা বলতে কি, একেই প্রকৃত ইনসাফ বলে। সমাজবদ্ধ মানুষের জীবনে প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন ইনসাফপূর্ণ আইন অপরিহার্য পূর্বশর্ত।
ইহসান: ‘ইহসান’ অর্থ হলো ভাল ব্যবহার। সহানুভূতিপূর্ণ আচরণ, উদারতা, কাউকে ন্যায্য অধিকার প্রদানে অগ্রাধিকার প্রদান। এক জনের প্রতি অপরজনের দায় ও শ্রদ্ধাবোধ। ‘আদল’ থেকে ইহসানের অনুশীলন অতিরিক্ত বিষয় নিদের্শক। তাই সামাজিক জীবনে আদল থেকে ইহসানের গুরুত্ব বেশি। আদল হলো সমাজের ভিত, আর ইহসান হলো উদার সৌন্দর্য্য এর পূর্ণতা। আদল যদি হয় সমাজের অসন্তোষ ও তিক্ততা হতে রক্ষা করা, তাহলে ইহসান হবে শুভ্রতা, সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ও পবিত্র ভাব ধারার প্রবাহ। যদি কোন সমাজে আদল অনুশীলন হয় তাহলে কাটায় কাটায় অধিকার প্রতিষ্ঠিত থাকবে। আন্তরিকতা, বৈরিতা অকল্যাণ কামনা থাকবে না। এ জন্য আদলের সাথে সাথে ইহসানও থাকতে হবে। আদল ছাড়া সমাজে, শান্তি, সম্প্রীতি, ভালবাসা থাকে না। আর এ জন্যই কোন সমাজে প্রকৃত নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সম্প্রীতি, আন্তরিকতা, বদান্যতা, কল্যাণ কামনার ন্যায় ইহসানের অনুশীলন জরুরী।
ছেলায়ে রেহমী : এর অর্থ নিকট সম্পর্কের প্রতিদরদী সাহায্যকারী ও দায়িত্বশীল হওয়া। কোন সৃষ্টির অস্তিত্ব রক্ষায় এর ভূমিকা অপরিসীম। ইসলামী আইনে এ তিনটি বিষয় সম গুরুত্ব সহকারে স্থান লাভ করেছে, যা মানব রচিত আইনে চিন্তাও করা যায় না। মানব রচিত আইনের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য আদল, ইহসান ও ছেলায় রেহমীর প্রয়োজন, তা মূলত: ইসলাম থেকেই গ্রহণ করতে হবে।
ইসলামী আইন একটি সমন্বিত নৈতিক বিধান। মানব রচিত আইনের মতো ইসলামী আইন নৈতিকতার মধ্যে পার্থক্য করে না এবং তা নৈতিকতা বর্জিতও নয়। কেননা নৈতিকতা মানব চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মানব রচিত আইনে চরিত্রের কোন স্বীকৃতি নেই। চরিত্রের বিষয় বিবেচনা ছাড়া তা উত্তম চরিত্রের প্রত্যাশা করে। আল্লাহ পাক মানব জাতিকে তাদের উত্তম চরিত্র গঠনের মাধ্যমে মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধকে সুদৃঢ় ও মজবুত করতে চেয়েছেন বলেই শরীয়তের মধ্যে এ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে স্থান পেয়েছে।
ইসলামী আইন পূর্ণাঙ্গ ও সর্বজনীন। মানুষের জন্ম হতে মৃত্যু পর্যন্ত এই পৃথিবীর জীবনে যা যতটুকু আইন প্রয়োজন তা সর্বকালের সকল মানুষের জন্য তিনি অবতীর্ণ করেছেন।
ইসলামী আইন অর্থ বাস্তবমুখী বিধান। এই পৃথিবীর জীবনে মানুষেরন বাস্তবসম্মত যা যা প্রয়োজন, তা কি ভাবে পূরণ সম্ভব তা এতে উল্লেখিত হয়েছে। ইসলামী আইনের বাস্তব অনুশীলন নবী মুহাম্মদ সা. এর সমগ্র জীবনে পরিদৃষ্ট হয়। আর এজন্যই নবী সা. এর জীবন মানেই ইসলামী আইনের বাস্তব নিদর্শন। পৃথিবীর মানুষের তৈরি আইনের ক্ষেত্রে এর কোনই তুলনা হয় না। মানুষের তৈরি আইন অধিকাংশই অনুমান নির্ভর। তাই না বাস্তবায়নে পদে নানাবিধ প্রতিকূলতা, প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়।
ইসলামী আইন সংহতি ও সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং উপযোজনমূলক। এটি পরস্পর নির্ভরশীল সমাজবদ্ধ মানুষের সংহতিপূর্ণ সহাবস্থান, সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ এবং পরস্পরের সহযোগিতার ক্ষেত্রে সুন্দর উপযোজন ব্যবস্থাপূর্ণ বিধান। এতে একজন মুসলিমের সাথে একজন অমুসলিমের লেনদেন, কারবার কিভাবে সম্পাদিত হবে তা বলে দেয়া হয়েছে। মানুষের স্বভাবজাত কারণে কোন অধিকার আদান প্রদানের ক্ষেত্রে কখনো সাংঘর্ষিক অবস্থার অবতারণা হলে সৌহার্দ্যপূর্ণ উপায়ে তা সুরাহার ব্যবস্থা ইসলামী আইনে রয়েছে।
ইসলামী আইনের মৌলিক বিষয়াবলী কেবলমাত্র অপরিবর্তনীয় আর অবশিষ্ট সকল বিধানই অবস্থার প্রেক্ষিতে পরিবর্তনযোগ্য। ইসলামী আইনের যে সব বিধানে কোন পরিবর্তন ও পরিবিধান বা সংকোচন নেই, যেগুলো স্থির ও দৃঢ়বদ্ধ। স্থান-কাল পরিবর্তনে তাতে কোন পরিবর্তন ঘটে না। ইমাম ইবনে কাইয়েম তাঁর ‘ইগাছাতুল লাহকান’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ফরজ, ওয়াজিব, হারাম, শরীয়ত নির্ধারিত অপরাধের দন্ডবিধি এবং এ জাতীয় অন্যান্য যে সব বিষয় সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে, তা ইজতেহাদ দ্বারা পরিবর্তন করা যায় না। অন্যদিকে স্থান-কাল ও অবস্থার পরিবর্তনে মানবতার কল্যাণের স্বার্থে যার পরিবর্তন প্রয়োজন হয়ে পড়ে তা পরিবর্তন করা যায়। যেমন- অনুমানভিত্তিক পরিমাণ ও তার গুণাবলী। এ প্রসঙ্গে তাযিরের আওতায় শাস্তির কথা বলা যেতে পারে। নতুন ঘটনাকে ইসলামী আইনের সাথে খাপ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে তার পরিবর্তনশীল বৈশিষ্ট্য সত্যিই সংঘাতপূর্ণ। অথচ মানব রচিত আইনের ভিত্তি অত্যন্ত ভঙুর। তাতে কোন স্থায়ী নীতির নির্দেশনা নেই। অথচ মানুষের অনেক অবস্থায়ই অপরিবর্তনীয়। মানুষের এ স্বভাব জন্ম হতে মৃত্যু পর্যন্ত অভিন্ন থাকে। মানুষের আচরণ অবস্থার পরিবর্তনের দরুন যতটুকু পরিবর্তনশীল, ইসলাম সে ক্ষেত্রে পরিবর্তনের অবকাশ দিয়ে আইনকে যুগোপযোগি করার জন্য ইজতিহাদ বা গবেষণার অবকাশ রেখেছে।
ইসলামী আইনের আর একটি বৈশিষ্ট্য হলো, এটি সীরাতুল মুস্তাকীম যা ইহকার ও পরকালের মুক্তি ও কল্যাণের পথ নির্দেশক। এর প্রধানতম উৎস ওহী এবং এর সংরক্ষক স্বয়ং আল্লাহ পাক। সমগ্র বিশ্বের মানুষ একযোগে চেষ্টা করেও এর বিনাশ সাধন করতে পারবে না। ইসলামী আইন অনুসরণে মানবজাতির নিরাপত্তা ও শান্তি এবং এর বিরোধীতায় মানব জাতির অশান্তি ও নিরাপত্তাহীনতা। মানব রচিত আইনে এরূপ কোনই বৈশিষ্ট্য নেই। মানব রচিত আইন সর্বদা বক্র পথে চলে বলে একটি অকল্যাণকর অবস্থার অবসান ঘটানোর জন্য অপ্রতুল আইন প্রণয়ন করে আর একটি অকল্যাণকর অবস্থার অবতারণার ঘটায়। বস্তুত একারণেই মহান আল্লাহ মানব রচিত আইনের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে যথার্থই বলেছেন, “এরা বিভ্রান্তির ধুম্রজালে আবর্তিত হয়।”
জন নিরাপত্তা কি? ‘জন নিরাপত্তা’ প্রত্যয়টি খুবই বিস্তৃত এবং তাৎপর্য মন্ডিত। জন নিরাপত্তা বিষয়টি মূলত: দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। জন+নিরাপত্তা। শব্দ দুটি পৃথক ভাবে বিশ্লেষণ করলে এর প্রতিপাদ্য বিষয় সহজে অনুমেয় হবে। নিম্নে শব্দ দুটি বিশ্লেষিত হলো:
প্রথমত: ‘জন’ : সহজ অর্থে কোন সমাজে বসবাসকারী জনসাধারণকে জন বা পাবলিক বলে। আভিধানিক অর্থে কোন রাষ্ট্রীয় সমাজে বসবাসকারী জন সমষ্টি যারা সরকারের সেবা সুবিধাদি (সার্ভিসেস) ভোগ  করে। জন বলতে এখানে সাধারণে প্রচলিত অর্থে ব্যবহৃত হয়। সমাজ বিজ্ঞানে জনসাধারণ (পাবলিক) বলতে কোন সমাজে বসবাসকারী বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য মন্ডিত জনগণকে নির্দেশ করে। যেমন বিভিন্ন পেশার, বিভিন্ন বয়সের, বিভিন্ন লিঙ্গের, বিভিন্ন ধর্মের, বিভিন্ন বংশের, বিভিন্ন শিক্ষার সমষ্টিকে বুঝায়। The term ‘Public’ refers to great mass of persons living in a community or area having different features and interests. ‘পাবলিক’ শব্দটি দ্বারা নির্দেশিত জনসমষ্টিকে তাদের বৈচিত্র্য বৈশিষ্ট্যের দরুনস কোনরূপ প্রভেদ করা হয় না। কেননা তদ্বারা পাবলিক এর প্রকৃত Spirit রহিত হয়।
দ্বিতীয়ত: নিরাপত্তা : ‘নিরাপত্তা’ শব্দটির অর্থ বিস্তৃত। সহজ অর্থে নিরাপত্তা অর্থ সম্ভাব্য বিপদ থেকে রক্ষা করা বা নিবারিত করা। To protect from danger or harm. It means a measure taken against any harm or danger of the mankind. এখানে নিরাপত্তা বলতে মানুষের জীবন ও অধিকার সংরক্ষণের জন্য গৃহীত কার্যকর ব্যবস্থাকে বুঝানো হয়েছে। সমাজে বসবাসকারী বৈচিত্র্য স্বভাব ও বৈশিষ্ট্যমন্ডিত মানুষের সংরক্ষণ, শৃঙ্খলা ও বিকাশ ধারা সমুন্নত করণের মাধ্যমে উদ্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ ও উপায় নিশ্চিত করণ ব্যবস্থাপনাই হলো নিরাপত্তা, যাতে সমাজের কোন মানুষ তার সুষ্ঠু জীবন ধারায় কোনরূপ হুমকি, ভীতি, ক্ষতিকর কোন পরিস্থিতির শিকার না হয়।
সহজ অর্থে সমাজের মানুষের সকল প্রকার অধিকারের নিশ্চিত ব্যবস্থাকরণকেই নিরাপত্তা বলে। জননিরাপত্তা হলো একটি রাষ্ট্রীয় সমাজে বসবাসকারী সকল মানুষের সকল অধিকার নিশ্চিত করণের যাবতীয় ব্যবস্থা অবলম্বনপূর্বক তাদের স্বাভাবিক প্রাত্যহিক জীবন প্রবাহের সুষ্ঠু সংরক্ষণ, শৃঙ্খলা ও বিকাশ ধারা (Protection, discipline and development) সমুন্নত করণ। জননিরাপত্তার আঙ্গিক ও ক্ষেত্র বহুবিধ। তবে তা মানুষের অধিকার সুনির্দিষ্টকরণ ও তার পুরোপুরি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ইনসাফ সুবিচার ও ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সুবিচার প্রতিষ্ঠিত না হলে জননিরাপত্তা মারাত্মক ভাবে বিঘ্নিত হয়।  মানব সমাজ তাদের কৃষ্টি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত আইন ব্যবস্থার মাধ্যমে নিরাপত্তার ব্যবস্থা অবলম্বন করেছে। আইন ব্যবস্থার প্রকৃতি ও পরিধি প্রেক্ষিতে সমাজের বসবাসকারীগণ মানুষের নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়।
জন নিরাপত্তা বলয়ভুক্ত বিষয়াবলী : কোন রাষ্ট্রীয় সমাজে জননিরাপত্তার বলয়ভুক্ত বিষয়গুলো জনগণের স্বার্থে তথা অধিকার রক্ষা ও সংরক্ষণ। (To protect and maintain the interests of human beings in the society).
জনগণের স্বার্থ ও অধিকার বলয়ের মধ্যে বহুবিধ বিষয় সম্পৃক্ত। পন্ডিতগণ একে বিভিন্ন প্রেক্ষিতে বিশ্লেষণে প্রয়াস পেয়েছেন। তবে নিরাপত্তা প্রদানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো:  ক. জীবন (Life)  খ. সম্পদ  (Property)   গ. স্বাধীনতা (freedom)  ঘ. বিশ্বাস ও আদর্শ (faith and ideology) ঙ. বংশধারা (family) চ. মান-সম্মান (honour) ইত্যাদি।
জননিরাপত্তার বিবেচ্য কার্যধারা : পন্ডিত ব্যক্তিদের মতে জননিরাপত্তার বিবেচ্য কার্যধারা প্রধানত: দুটি।
প্রথমত: জননিরাপত্তাভুক্ত বিষয়াবলীর যথাযথ সংরক্ষণ ও
দ্বিতীয়ত: সমাজের বসবাসকারী বৈচিত্র্য বৈশিষ্ট্য মন্ডিত মানুষের বৈচিত্র্য চাহিদা পূরণের মাধ্যমে স্বাভাবিক বিকাশ ধারা সমুন্নত করণে সম্পদের সুষম বন্টন প্রক্রিয়া অবলম্বন।
একে সংক্ষেপে Protective and supportive activities বলা যেতে পারে।
Protective activity এর মাধ্যমে অপরাধীদের থেকে জনগণের নিরাপত্তার বলয়ভুক্ত বিষয়গুলোকে রক্ষা করা হয় এবং Supportive activity এর মাধ্যমে সমাজে বসবাসকারী বিচিত্র মানুষের মধ্যে অক্ষম, অচল, দরিদ্র জনসাধারণকে তাদের চাহিদা পূরণে বিভিন্ন সহায়তা প্রদান করা।
ইসলামী আইনে জননিরাপত্তার বিধান : ক. পূর্ব কথা: জননিরাপত্তা তথা মানুষের নিরাপত্তা মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্যানুগ কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনে নিহিত। এই কর্মকান্ডের প্রকৃতি ও পরিধি মানুষের দেহ-মন, তার বসবাস পরিবেশ ও সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সাথে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত। আল্লাহ পাক মানুষ জাতিকে একমাত্র তাঁরই আনুগত্য তথা ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর এই আনুগত্য বা ইবাদতে মানব জাতির নিরাপত্তা এবং আল্লাহর আনুগত্যের বিপরীতে মানুষের নিরাপত্তাহীনতা নিহিত। আল্লাহ পাক মানুষ জাতিকে আনুগত্যের পরীক্ষার জন্য সৃষ্টি করে, তাকে আনুগত্য করা বা না করার স্বাধীনতা দিয়েছেন। এ কারণেই কোন কোন মানুষ স্বেচ্ছায় আনুগত্য করে এবং কিছু কিছু মানুষ আনুগত্য না করে তার বিপরীত পাপ করে থাকে। মানুষের এই পাপমূলক কর্মকান্ডের ফলশ্রুতিতেই মানুষ জীবনে নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়।
মহান দয়ালু আল্লাহ মানবজাতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করণ এবং নিরাপত্তাহীনতা প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থা হিসেবে ইসলামী বিধি বিধানকে এমনভাবে বিন্যাস করেছেন, যাতে মানব সমাজের পাপ মূলক কর্মকান্ড কার্যকর ভাবে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মানুষের হই জীবন সহ পরকালীন জীবনে পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করণ সম্ভব।  জনজীবন তথা মানুষের জীবনের নিরাপত্তার অধিক্ষেত্র কেবল এই জগতেই পরিব্যাপ্ত নয়। এই পৃথিবীর জীবনকাল সমাপ্তির পর পরকালীন জীবনে এই পৃথিবীর জীবনে অনুসৃত পরিশীলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার ফলাফল মারাত্মক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। পৃথিবীর জীবনে আল্লাহর অনুমোদিত নিরাপত্তার বিধান অনুসরণে এখানে যেমন শান্তি ও নিরাপত্তা সুষ্ঠুভাবে কার্যকর হয়, তেমনি পরকালীন জীবনে আল্লাহর শান্তি ও নিরাপত্তার নিয়ামক হিসেবে ভুমিকা রাখে। এর ব্যত্যয়ে অর্থাৎ এই পৃথিবীর জীবনে আল্লাহর অনুমোদিত নিরাপত্তার বিধান প্রত্যাখ্যানে মারাত্মক ভাবে অশান্তি ও চরম নিরাপত্তাহীনতার শিকার হতে হয়।
ইসলামী আইনে জননিরাপত্তা বিধানের নীতি ও কৌশল : মহান আল্লাহ জননিরাপত্তা তথা মানুষের নিরাপত্তা বিধানকল্পে কেবল ইসলামী বিধানই অবতীর্ণ করেননি, কিভাবে তা বাস্তবায়ন করে মানুষের জীবনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় তাও বলে দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন-“বস্তুত আমি পাঠিয়েছি আমার নবী-রাসূলগণকে এবং তাদের সাথে নাযিল করেছি কিতাব ও মানদন্ড যেন লোকেরা ইনসাফের উপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে আরো নাযিল করেছি লৌহ। এর মধ্যে রয়েছে বিযুক্ত অনমনীয় শক্তি এবং জনগণের জন্য অশেষ কল্যাণ। আরো এ জন্য যে কে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আগোচরে তাদের সাহায্য এগিয়ে আসে তাকে যেন আল্লাহ জানতে পারেন।” আল-কুরআন সূরা আল হাদীদ: ২৫। এখানে লৌহ অর্থ রাজশক্তি, যে লোক কুরআনের হেদায়েত পেয়ে দীনের অনুসারী হবে না, রাষ্ট্রশক্তি তাকে গোমরাহী ও বিপর্যয় সৃষ্টির পথ থেকে বিরত রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। নৌকার আরোহীরা ডুবে মারা যাক এ উদ্দেশ্যে নৌকায় ছিদ্র করার অধিকার যেমন কাউকে দেয়া যেতে পারে না, ঠিক তেমনি সমাজে কোন ব্যক্তি তথা শক্তি বিপর্যয় ও পথভ্রষ্টতার পরিবেশ সৃষ্টি করুক, তার হাত থেকে সমাজকে রক্ষা করার জন্যই প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র শক্তি তথা রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা। কোন সমাজ তথা রাষ্ট্রে ইসলামী আইন প্রবর্তনের মাধ্যমেই সেই সমাজ তথা রাষ্ট্রের জনগণের পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা বিধান করা সম্ভব। অন্য কোন ভাবে নয়। কি ভাবে একটি রাষ্ট্র ইসলামী আইন প্রবর্তনের মাধ্যমে জনগণের নিরাপত্তা বিধান করতে পারে বিষয়টি খুবই বিস্তৃত। এ পরিসরে তা সে ভাবে আলোচনা করা সম্ভব নয়। তাই আমরা দুটি শিরোনামে আলোচনার প্রয়াস পাব:
প্রথমত: মানুষকে সকল প্রকার পাপ কাজ অর্থাৎ অপরাধ থেকে মুক্ত রাখার কর্মপন্থা অবলম্বন; এবং
দ্বিতীয়ত: সমাজের মানুষের প্রয়োজন পূরণের নিরাপত্তা বিধানের পদক্ষেপ গ্রহণ। ইসলাম মানব জাতির সর্বাঙ্গীন নিরাপত্তা বিধানের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। ইসলাম মানব সমাজকে আল্লাহর আনুগত্যের পরিপন্থী কর্মকান্ড, যাকে পাপ বা অপরাধ বলা হয়, তা থেকে মুক্তকরণের প্রধানত: দু ধরনের পন্থা অবলম্বন করেছে: ১। মানুষের মন মানসিকতার সংশোধন ও পরিশুদ্ধকরণ, এবং  ২। বাহ্যিক সংশোধন ও নিয়ন্ত্রণ।
প্রথমটি ইসলামী জীবন ব্যবস্থা সম্পর্কে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচী প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে মানুষ তাঁর জীবনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য এবং তার অর্জনের নীতি ও কৌশল সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ শিক্ষা দান প্রক্রিয়া অবলম্বনের মাধ্যমে অর্জিত হয়।
দ্বিতীয়টি রাষ্ট্র শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধ নির্মূলের ব্যবস্থা অবলম্বন।
মানুষের মন মানসিকতার সংশোধন ও পরিশুদ্ধকরণ : পাপ মানুষের শাস্তি ডেকে আনে। আর এই শাস্তিরই একটি নিরাপত্তাহীনতা। তাই মানুষের নিরাপত্তা, পাপ থেকে মুক্ত থাকার মধ্যে নিহিত। রাষ্ট্র মানুষকে পাপ থেকে মুক্ত রাখার জন্য যে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার আয়োজন করবে; তাতে নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ অবশ্যই গুরুত্ব সহকারে সম্পৃক্ত হবে।
ক) আল্লাহ সম্পর্কিত পাপ :
এক. আল্লাহর সাথে শরীক করার কারণে সৃষ্টপাপ। এ পাপ থেকে রক্ষার জন্য আল্লাহর গুণাবলী ও একত্ববাদ সম্পর্কে জ্ঞান দান করা আবশ্যক। সকল পাপের মধ্যে এটি সব থেকে বড় পাপ।
দুই. আল্লাহর সাথে কুফরী করার কারণে সৃষ্ট পাপ। এ পাপ সৃষ্টি হয় আল্লাহকে অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে। আল্লাহর দেয়া নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতার মধ্যেও এ পাপ নিহিত।
তিন. আল্লাহকে ভুলে থাকা একটি পাপ। বলা হয়েছে আল্লাহর স্মরণ শূন্য অন্তর মৃত্যুতুল্য। এ পাপ মানুষকে ধ্বংস সাধন করে।
চার. নিফাকের পাপ অর্থাৎ বিশ্বাস ও কর্মে বৈপরীত্য। এটি দু’ধরনের হতে পারে। বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বৈপরীত্য একটি নিফাক যা কিনা মারাত্মক ও জঘন্য ধরনের পাপ।
অপরটি হলো কথা ও কাজের বৈপরীত্য। এ বিষয়ে কুরআনে সূরা বাকারার ৮-১২ আয়াতে বলা হয়েছে।
পাঁচ. রিয়া বা মানুষ দেখানো মনোভাব। আল্লাহকে সন্তুষ্টির জন্য নয় মানুষকে দেখানোর জন্য কোন ভাল কাজ করা। যেমন মানুষকে দেখানোর জন্য নামায পড়া, হজ্ব করা, দান ইত্যাদি। সূরা মাউন এর ৪-৬ আয়াতে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে।
খ) পারিবারিক জীবনে পাপ :
মানব জাতির পারিবারিক জীবনে নিরাপত্তা বিধানকল্পে আল্লাহ পাক যে বিধান দিয়েছেন, তা লংঘন বা অমান্য করাতে পাপ বা অপরাধ সাধিত হয়। এ বিষয়ে জনগণকে যথাযথ শিক্ষা দান রাষ্ট্রের আবশ্যিক কর্তব্য। নিম্নে কতিপয় পারিবারিক পাপ সম্পর্কে উল্লেখ করা হলো:
পিতা-মাতার সাথে অসদ্ব্যবহার বড় গুনাহ। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন- নিজের পিতা-মাতাকে গালি দেয়া সর্বাপেক্ষা বড় গুনাহ। পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি আর পিতা-মাতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি নিহিত। আল-হাদীস। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ