রবিবার ২০ জুন ২০২১
Online Edition

নারী ও শিশু নির্যাতন 

নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতা কেবল বেড়েই চলেছে। বিভিন্ন বয়সের নারীরা তো বটেই, এমনকি মেয়ে শিশুরাও ভয়ংকর যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। শারীরিক নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের একই সাথে নির্মমভাবে হত্যাও করা হচ্ছে। এই তা-ব চলছে রাজধানী থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত দেশের সবখানেই। দৈনিক সংগ্রামের এক অনুসন্ধানী রিপোর্টে জানানো হয়েছে, গত নয় মাসে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৭৫৪ জন শিশু। অন্যদিকে শুধু ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৬৬ জন নারী। এই হিসাব শুধু থানায় দায়ের করার মামলার ভিত্তিতে করা হয়েছে। বাস্তবে সংখ্যা অনেক বেশি।

সব মিলিয়ে অবস্থা এতটাই ভয়াবহ হয়ে পড়েছে যে, দেশের প্রতিটি পরিবারই আজকাল প্রচ- আতংকের মধ্যে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। কবে কখন কোথায় কার প্রিয় সন্তান স্কুল, কলেজ বা কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে বখাটে দুর্বৃত্তদের কবলে পড়বে এবং সম্ভ্রম হারানোর পাশাপাশি জীবনও হারাবে সে কথা জানা নেই কোনো পিতা-মাতারই। পরিস্থিতির এতটাই অবনতি ঘটে চলেছে যে, অনেক ক্ষেত্রে পিতা-মাতা বা বড় কেউ সঙ্গে থাকলেও বখাটে দুর্বৃত্তদের হাত থেকে নিস্তার পাওয়া যায় না। তাদের ওপরও হামলা চালানো হয় এবং তাদের চোখের সামনে থেকেই ছিনিয়ে নেয়া হয় টার্গেট করা নারী ও শিশুদের। ভাগ্য ভালো থাকলে কয়েক ঘণ্টা কিংবা দু’-চারদিন পর ওই নারী ও শিশুদের খোঁজ পাওয়া যায়। পথের ধারে কিংবা বনে-জঙ্গলে পড়ে থাকে তারা। আর ভাগ্য খারাপ হলে পাওয়া যায় তাদের লাশ। 

আইন ও সালিশ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য-পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার ৭৫৪ জন শিশুর মধ্যে ৩৩০ জনকেই নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। শুধু তা-ই নয়, বেঁচে থাকা ৩৬ জন শিশু আত্মহত্যাও করেছে। নারীদের ক্ষেত্রেও ঘটেছে ভয়াবহ ঘটনা। ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৬৬ জন নারী। দুর্বৃত্তরা শুধু ধর্ষণ করেই থেমে যায়নি, ধর্ষণের পর ২৬ জন নারীকে হত্যাও করেছে। তাছাড়া ধর্ষিতাদের মধ্যে ৭ জন লজ্জায় ও অপমানে আত্মহত্যা করেছে। ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে ৪৬ জন নারীর ওপর। 

এভাবেই অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে চলেছে নারী ও শিশু নির্যাতনের ভয়ংকর কর্মকাণ্ড। শুধু ধর্ষণ নয়, অন্যকিছু পন্থায়ও পা বাড়াচ্ছে বখাটে দুর্বৃত্তরা। মাত্র কিছুদিন আগে, অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে সিলেটের এক কলেজ প্রাঙ্গণে ওই কলেজের ছাত্রী খাদিজা বেগমকে প্রকাশ্যে চাপাতি দিয়ে কুপিয়েছে বদরুল নামের ছাত্রলীগের এক সন্ত্রাসী। তার অভিযোগ, খাদিজা নাকি তার প্রেম প্রত্যাখ্যান করেছে! চাপাতির এলোপাতাড়ি কোপে গুরুতর আহত খাদিজা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এসে গিয়েছিল। হামলাকারীর বিরুদ্ধে কিছু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে সত্য কিন্তু এখনো, প্রায় মাস পেরিয়ে গেলেও পরিপূর্ণরূপে সুস্থ হয়ে উঠতে পারেনি খাদিজা। বিষয়টি সারা দেশে আলোড়ন তুলেছিল। প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন এমনকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও। 

খাদিজার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ঝিনাইদহে এক স্কুল ছাত্রীকে ছুরি দিয়ে কুপিয়েছে এক বখাটে যুবক। এর পরপর গত সোমবার প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া না দেয়ায় গাজীপুরের কুতুবদিয়ায় মুন্নি আক্তার নামের এক স্কুলছাত্রীকে তার নিজের বাসায় শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে এক বখাটে। এরও পাঁচদিন আগে দিনাজপুরে পাঁচ বছরের এক শিশুকে অপহরণের পর ধর্ষণ করা হয়েছে। গত রোববার রাজধানীর দক্ষিণ খানে বাসায় ঢুকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে স্বজনদের সামনেই এক কিশোরীকে ধর্ষণ করেছে একদল দুর্বৃত্ত। এর পরের রাতে পুরনো ঢাকার লালবাগে নিজের বাসায় এক নারীকে ধর্ষণ করেছে তিন বখাটে যুবক। একই দিন ধামরাইয়ের কাতর বাইল্যা গ্রামে বাসায় ঢুকে ষষ্ঠ শ্রেণীর এক ছাত্রীকে ধর্ষণ করেছে স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তি। 

ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির পাশাপাশি পথে-ঘাটে নারীদের উত্ত্যক্ত করার কর্মকাণ্ডও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যানে জানা গেছে, ২০১০ থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যথাক্রমে ৮৩১ জন, ১০১৪ জন, ৬৪৫ জন, ৪৭০ জন, ৪৪৪ জন এবং ৩২৮ জন নারী ও শিশু উত্ত্যক্তের শিকার হয়েছে। উত্ত্যক্ত হওয়ার কারণে লজ্জায় আত্মহত্যা করেছে আটজন। ধর্ষণের পর অন্য একজন নারীকে হত্যাও করা হয়েছে।  

এসব ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে অনেক স্থানে। যেমন ধামরাইয়ের ঘটনার পর স্থানীয় জনগণ ওই ব্যক্তিকে পাকড়াও করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। কিন্তু সব প্রতিরোধই সফল হয়নি। এজন্য প্রাণও দিতে হয়েছে অনেককে। দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, যৌন নির্যাতনের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে দুর্বৃত্তদের আক্রমণে মারা গেছেন ৫ জন নারী ও ৬ জন পুরুষ। এ ছাড়া ১৭৬ জন নারী ও পুরুষ লাঞ্ছনা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। 

যৌন নির্যাতন কেন বেড়ে চলেছে তার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সমাজবিজ্ঞানী ও মানবাধিকার কর্মীসহ বিশেষজ্ঞরা প্রধানত আইনের শাসন না থাকার কথা উল্লেখ করেছেন। তারা বলেছেন, সুশাসন না থাকায় কোনো অপরাধীকেই বিচারের মুখোমুখি করা যায় না। আইনের ফাঁক গলিয়ে তারা সহজেই পার পেয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীদেরে রাজনৈতিক পরিচয়কে ব্যবহার করা হয়। তারা ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকায় পুলিশ সহজে মামলা নিতে চায় না। মামলা নিলেও এমনভাবেই অভিযোগপত্র দাখিল করে যাতে হাতেনাতে ধরা পড়া অপরাধীরাও জামিন নিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে। বাস্তবেও তারা বেরিয়ে আসে এবং এসেই নতুন নতুন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এভাবে সব মিলিয়ে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যখন বখাটে-দুর্বৃত্তরা ধরেই নিয়েছে যে, অপরাধ যতো মারাত্মকই হোক না কেন, তার জন্য কখনো শাস্তি পেতে হবে না। কথা শুধু এটুকুই নয়। এমন অভিযোগও সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, ভিক্টিম তথা যৌন নির্যাতনের শিকার নারী ও তার অভিভাবকদের ভয়-ভীতি দেখিয়েও মামলা দায়ের বা পুলিশের কাছে যাওয়া থেকে নিবৃত্ত করা হয়। জীবনের ভয়ে এবং নতুন করে আবারও আক্রান্ত হওয়ার আশংকার কারণে বেশির ভাগ ক্ষতিগ্রস্ত ও তাদের স্বজনরা নীরব থাকাকেই নিরাপদ মনে করে। এই নীরবতাকেও সমাজবিজ্ঞানীরা অপরাধ বেড়ে যাওয়ার একটি বড় কারণ বলে মনে করেন।

আমরা মনে করি, এভাবে একটি সভ্য দেশ এগিয়ে যেতে পারে না। বিশ্বের কোনো দেশেই এ ধরনের যথেচ্ছ যৌন নির্যাতন চলতে দেয়া হয় না। সব দেশে বরং আইনানুযায়ী বিচারের মাধ্যমে কঠোর শাস্তি দেয়া হয়। আমরা চাই, বাংলাদেশেও নারী ও শিশুদের অধিকার ও সম্মান রক্ষার লক্ষ্যে দ্রুত বিচারের মাধ্যমে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নেয়া হোক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ