শনিবার ১৬ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

ওমর আলীর কাব্যে ছন্দের ব্যবহার

ড. আশরাফ পিন্টু : শুধু ভাববস্তু নয় কবিতার শৈল্পিক ক্ষমতার উপরও নির্ভর করে কাব্যের সার্থকতা। কাব্যের রূপজগৎ নির্মাণ মূলত বিভিন্ন কাব্যিক প্রকরণের সৃষ্টি সমাবেশ ঘটিয়ে-কবিতাকে অখ- রূপরস দান। কবিতার এই প্রকরণগুলো হচ্ছে কবিভাষা, ছন্দ, অলঙ্কার আঙ্গিকতা ও বিভিন্ন বাণীভঙ্গি এ সবেরই সমন্বয়ে কবিতা বাণীমূর্তি লাভ করে। কবিতা এই বাণীদেহ নির্মাণের সার্থকতার উপর নির্ভর করে মহৎ সাহিত্যিকদের বিশিষ্টতা।
ছন্দ ভাষার অন্যতম প্রাণশক্তি। মানুষ যখন কথা বলে তখন স্বাভাবিক ভাবে এক ধরনের ছন্দ সে ব্যবহার করে অনেকটা নিজের অজান্তে। ছন্দবোধ সব মানুষের না থাকলেও মানুষ কথা বলার সময় প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত ছন্দ সে ব্যবহার করে। প্রকৃতিতে ছন্দের অজস্র উদাহরণ আছে-বাতাসের দোলা, নদীর ঢেউ, পাতার দুলুনি ইত্যাদি অনেক কিছুর মধ্যেই ছন্দ লক্ষ্য করা যায়। গতিয়মান সবকিছু মধ্যেই ছন্দ থাকে। ছন্দ মূলত গতির সৌন্দর্য। মূলকথা চলমান যেকোনো কিছুর মধ্যে যে ঐক্যতান লক্ষ্য করা যায়-তাই ছন্দ। গদ্য ভাষায়ও ছন্দ থাকে। তবে কবিতার ছন্দ বেশি শ্রুতিগাহ্য। কবিতার ছন্দ নিয়ে মানুষ যে কাঠামো তৈরী করেছে তাকে অক্ষর, মাত্রা, যতি, পর্ব ইত্যাদি বলে। এছাড়া ছন্দের আরো কিছু শ্রেণিবিভাগ রয়েছে সেগুলো স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত প্রভৃতি ছন্দ নামে পরিচিত।
ওমর আলীর কাব্যে পদ্য এবং গদ্যকবিতা দু’ধরনের লেখাই দেখা যায়। ওমর আলী কিছু সনেট বা সনেট জাতীয় কবিতাও লিখেছেন। তার কবিতায় অলংকার প্রয়োগের কিছুটা সচেতনতা লক্ষ্যকরা গেলেও ছন্দের ব্যাপারে কিছুটা ঔদাসীন্যতা পরিলক্ষিত হয়। আমরা এখন তার কাব্যগ্রন্থগুলো থেকে কিছু কবিতার ছন্দ বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব।
 
স্বরবৃত্ত ছন্দ
            সবাই যদি/ভালো হতো/সবাই হতো/খাঁটি        
       তাহলে তো/স্বর্গ হতো/পৃথিবীর এই/মাটি।   
            নিতো না কেউ/পকেট মেরে/হতো না আর/চুরি   
            থাকতো সবার/দয়ামায়া/মারত না কেউ/ছুরি।   

নাইটকোচ আর/লঞ্চেপুলিশ/এবং আনছার           
প্রহরাতে নিয়োগ করার/হতোনা দর/কার    
পথচারীর/টাকাকড়ি/নিতো না কেউ/কেড়ে       
লুটের জন্য/আসতো না কেউ/অস্ত্রহাতে/তেড়ে       
(সবাই যদি ভালো হতো: উড়ন্ত নারীর হাসি)       
কবিতাংশটি চার পর্বে বিভক্ত। প্রথম তিন পর্ব চারমাত্রার। শেষপর্ব অপূর্ণ; তা কখনো দুইমাত্রার কখনো এক মাত্রার। পঞ্চম ও ষষ্ঠ পঙ্ক্তিতে মাত্রাবিন্যাসের হেরফেরের কারণে ছন্দপতন ঘটেছে। অন্যান্য পঙ্ক্তিতে মোট মাত্রা সংখ্যা ১৪ হলেও পঞ্চম ও ষষ্ঠ পঙ্ক্তিতে মাত্রা সংখ্যা ১২ ও ১৩।
          
মাত্রাবৃত্ত ছন্দ
ওমর আলীর স্বরবৃত্ত ছন্দের কবিতা কম। যেগুলো আছে সেগুলো অধিকাংশ শিশুতোষ কবিতা। তার মাত্রাবৃত্ত ছন্দের কবিতা আরো কম। নিচে মাত্রাবৃত্ত ছন্দের কবিতার উদাহরণ দেওয়া হলো:

    ছোট পাখিটিও/ছড়িয়েছে ডানা/ওপরে আকাশে    
  মাঝে মাঝে গাছে/অথবা মাটিতে/ দ্রুত নেমে আসে।   
  পাখিটিকে আমি/দেখিনা কেমন/দেখি শুধু তার    
  ছোট্ট বুকেও/অসীম সাহস/আকাশে ওড়ার।
    (সাহস: অরণ্যে একটি লোক)

কবিতাটির প্রতিটি পঙ্ক্তি তিন পর্বে বিভক্ত। প্রতিটি পর্বই সম (৬) মাত্রার। প্রতিটি পঙ্ক্তির মোট মাত্রাবিন্যাস (৬+৬+৬)=১৮। কোথাও অপূর্ণতা বা ছন্দ পতন নেই।                     
অক্ষরবৃত্ত ছন্দ
মাত্রাবৃত্ত ছন্দে কবি কিছুটা সফলতা দেখলেও অক্ষরবৃত্ত ছন্দে শোচনীয়তা লক্ষ্য করা যায়। অথচ তার অধিকাংশ কবিতাই অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রচিত। এবার তার বাংলা একাডেমির পুরস্কার প্রাপ্ত কাব্যগ্রন্থের নামকবিতা ‘এদেশে শ্যামল রঙরমণীর সুনাম শুনেছি’- এর ছন্দ বিশ্লেষণ করা যাকÑ
১.    এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি    
আইভিলতার মতো সে নাকি সরল হাসিমাখা    
সে নাকি স্নানের পরে ভিজেচুল শুকায় রোদ্দুরে    
রূপ তার এদেশ মাটি দিয়ে যেন পটে আঁকা।

সে শুধু অবাক হয়ে চেয়ে থাকে হরিণীর মতো    
মায়াবী উচ্ছল দু’টি চোখ তার সমস্ত শরীরে    
এদেশেরই কোন এক নদীর জোয়ার বাঁধ ভাঙা
হালকা লতার মতো শাড়ি তার দেহ থাকে ঘিরে

সে চায় ভালোবা সার উপহার সন্তানের মুখ    
এক হাতে আঁতুড়ে শিশু অন্য হাতে রান্নার উনুন    
সে তার সংসার মনে-প্রাণে পছন্দ করেছে    
ঘরের লোকের মন্দ আশংকায় সে বড় করুণ।    

সাজানো গোছানো আর সারল্যের ছবি রাশি রাশি    
ফোটে তার যতেœ গড়া সংসারের আনাচে কানাচে।
এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর এ ব্যাপারে খ্যাতি    
কর্মঠ পুরুষ সেই সংসারের চতুষ্পার্শে¦ আছে।    

কবিতাটির প্রতিটি পঙ্ক্তি তিন পর্বে বিভক্ত। প্রত্যেক পর্ব ছয় মাত্রা করে মোট ১৮ মাত্রার মিলবিন্যাস। তবে দ্বিতীয় স্তবকের চতুর্থ পংক্তিতে এবং তৃতীয় স্তবকের দ্বিতীয় ও তৃতীয় পঙক্তিতে মাত্রা বিন্যাসের একটু হেরফের আছে।

সনেট
মিমোসা মিমোসা আমি তোমার দু’চোখে চোখ রেখে    
ভুলে গেছি জীবনের সুতীব্র সুতীক্ষè যন্ত্রণার        
দুঃখ ভুলে গেছি আমি তোমাকে গভীর ভাবে দেখে   
ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেই নিরাশার আশংকা আমার।    

সামান্য ভস্মের মত তুমি যেন সমস্ত দিনের        
প্রতীক্ষার শেষে কোন রাত্রির উজ্জ্বল আগন্তুক       
সন্ধ্যার একাকী তারা অথবা রাত্রির বিনিদ্রের        
চোখে ¯¦র্ণ সকালের আশা তার কল্পনার সুখ ।        

মিমোসা জরতি হবে এ কল্পনা আমার হৃদয়ে        
কখনো আঁকে না ছায়া এ কল্পনা পায় নাকো স্থান,    
সুন্দরী মিমোসা থাক পৃথিবীর সমস্ত সময়ে       
দিন মাস বর্ষ ঋতু পরিবর্তনে নে অম্লান।       
স্ন্দুরী মিমোসা তার সৌন্দর্যে গর্বিতা কভু নয়       
এবং পেয়েছি শুধু আমি তার সার্থক প্রণয়।        
(মিমোসা: এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি)
এটি একটি ১৪ পঙ্ক্তির ১৮ মাত্রার (অক্ষরবৃত্তের ছন্দের) সনেট। অষ্টকের প্রথম স্তবকের (চৌপদীর) মিলবিন্যাস কখ কখ দ্বিতীয় চৌপদীর মিলবিন্যাস গঘ গঘ  ষটকের মিলবিন্যাস ঙচ ঙচ ছছ । অষ্টক ও ষটকে মিলবিন্যাসে কিছুটা বৈচিত্র্যতা লক্ষণীয়। মাত্রাবিন্যাসে দেখা যায় প্রতিটি পঙক্তি ১৮ মাত্রা করে ২ পর্বে বিভক্ত। শুধু দ্বাদশ পঙক্তিতে ১৬ মাত্রা বিন্যস্ত, ফলে কিছুটা ছন্দপতন ঘটেছে ।

মুক্তক ছন্দ
ছেদ অনুসারে পর্বগঠন, অন্ত্যনুপ্রাস, প্রবহমানতা, অর্থবিভাগ ভিত্তিক পঙক্তি সৃষ্টি মুক্তকছন্দের বৈশিষ্ট্য। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ ছন্দের প্রর্বতক। মুক্তকছন্দ অন্ত্যমিল যুক্ত এবং এর অসম পর্বগুলি সামঞ্জস্যপূর্ণ। ওমর আলীর কিছু কবিতা মুক্তকছন্দের বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। নিচে কয়েক কবিতার উদাহরণ দেওয়া হলো:
            একটি নদীর দিকে তাকালাম ফিরে
        অমলিন সৌন্দর্যের ঐশ্বর্যে শরীর তার, দৃষ্টি প্রদীপ্ত হীরে।
         সে আমার কাছে এলো লঘুপায়ে পথ হেঁটে ধীরে।
         বললাম, তুমি এই সুচারু, উন্মুক্ত পৃথিবীর
        আনন্দে আমার সঙ্গিনী হবে? আজীবন থাকবে ঘন পাশে?
        তিমির বিলাসে
        উত্তপ্ত নিঃশ্বাসে
        সন্নিহিত হবে?
        তার ভ্রু কুঞ্চিত
        হলো। আর যেমন সে শান্ত, দর্পিত...
         (পূর্বরাগে জিজ্ঞাসা: অরণ্যে একটি লোক)
   
গদ্যছন্দ
মুক্তক ছন্দের সগোত্র কিন্তু অন্ত্যমিল নেই. তাহলো অতিমুক্তক ছন্দ। মূলত অতিমুক্তক ছন্দকেই নতুন রূপ দিয়ে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গদ্যছন্দ প্রবর্তন করেন। আধুনিক যুগে কাব্যের মিলবিন্যাস বা অন্ত্যমিল বর্জনের জন্যে যে সমস্ত পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে গদ্যছন্দ সেগুলির মধ্যে অন্যতম। গদ্যছন্দের যতি থাকে না, থাকে ছেদ। এ ছাড়াও এ ছন্দে যুগ্মচলন, মিত্রাক্ষর, অনুপ্রাস, যমক ইত্যাদি থাকে না। গদ্যছন্দে শব্দের ক্রম অনুসরণ করতে হয়।
পদ্যছন্দ প্রস্ফুট আর গদ্যছন্দ অস্ফুট। অনেকে মনে করেন গদ্য কবিতায় ছন্দ নেই। একে বারেই সরল গদ্য। (পদ্য ভক্তদের মধ্যে গদ্যকবিতাকে কেউ কেউ পাগলের প্রলাপও মনে করেন। তারা অন্ত্যমিলকে ছন্দ মনে করে থাকেন।) কিন্তু কথাটি মোটেও সত্য নয়। গদ্যছন্দ স্পষ্ট করার জন্য একটা উদাহরণ দেওয়া যাক:
স্বাধীনতা তুমি
রবি ঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান
স্বাধীনতা তুমি
কাজী নজরুলের ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো
মহান পরুষ, সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কাঁপা
স্বাধীনতা তুমি
শহীদ মিনারে অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল সভা।...
    (স্বাধীনতা তুমি: শামসুর রাহমান)

কবিতাংশটির কিছু শব্দে বদলিয়ে তার স্থলে সমার্থক শব্দ বসিয়ে দিলে কেমন হয় দেখুন:   (এটি আবৃত্তি করলে গদ্যছন্দের স্বরূপ বা নীরব গতিশীলতা ধরা পড়বে।)

স্বাধীনতা তুমি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরে জরাহীন কবিতা, অক্ষয় গান
স্বাধীনতা তুমি
কাজী নজরুল ইসলামের গুচ্ছময় চুলের বাবরি কাঁপানো
মহৎপুরুষ, সৃষ্টিসুখের আনন্দে কাঁপা-
স্বাধীনতা তুমি
শহীদবেদিতে চিরজীবী আটই ফাল্গুনের দীপ্তিমান সভা।...

এই কৃত্রিম (শব্দ বদলানো) কবিতাংশটি পাঠ বা আবৃত্তি করলে স্পষ্ট বোঝা যায় এর ছন্দপতন ঘটেছে। আর এ থেকেই আমরা অনুভব করতে পারি গদ্য কবিতারও ছন্দ আছে। ওমর আলীর অধিকাংশ কবিতাই গদ্যছন্দে রচিত। তিনি পূর্বেকার কবিদের মতো গদ্যছন্দের এত নিয়ম কানুন মানেননি। ফলে তার কবিতাকে সরল গদ্য বলেও মনে হয় কখনো কখনোÑ
অনেক রাতে বাইরে এসে দেখলাম
একটি নক্ষত্র ঝরে গেল
নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করলাম
কেন নক্ষত্র ঝরে পড়ে
কেন জোনাকি নিভে যায়
একটি নদী তার বেগবান স্রোত হারিয়ে ফেলল
একটি গানের পাখি কণ্ঠ হারিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল
চিরদিনের জন্যে...   
(একটি ফুল রক্তাক্ত: উড়ন্ত নারীর হাসি)

ওমর আলীর সামগ্রিক কাব্য-কবিতা পাঠ করলে দেখা যাবে ছন্দ প্রয়োগে কবি একটু অসচেতন ছিলেন। তাঁর কিছু কবিতায় ছন্দের দুর্বলতা থাকলেও অধিকাংশ কাব্য-কবিতায় ছন্দ-বুননে যথেষ্ট কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ