শুক্রবার ০৭ মে ২০২১
Online Edition

স্তন ক্যানসারের প্রতিকার সম্ভব

স্তন ক্যানসার এক নীরব ঘাতক। তবে সঠিক সময়ে শনাক্ত হলে যার প্রতিকার সম্ভব। সচেতন থাকুন, সুস্থ থাকুন।
স্তন ক্যানসার কী
শরীরের অন্যান্য স্থানের মতো স্তনে অস্বাভাবিক কোষ বাড়ার কারণে কোনো চাকা বা পিণ্ডের সৃষ্টি হলে তাকে টিউমার বলে। শরীরের বিনা প্রয়োজনে অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজন থেকে এর সৃষ্টি। প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী স্তনের টিউমার দুই ধরনের। এক, বিনাইন টিউমার-এটা অক্ষতিকারক। উৎপত্তিস্থলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। দূরের বা কাছের অন্য কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আক্রান্ত করে না। দুই, ম্যালিগন্যান্ট টিউমার-আগ্রাসী, ক্ষতিকর। উৎপত্তিস্থলের সীমানা ছাড়িয়ে আশপাশের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কিংবা গ্রন্থি আক্রান্ত করে। এমনকি রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে দূরের কোনো অঙ্গেও আঘাত হানতে পারে।
ম্যালিগন্যান্টই স্তন ক্যানসার
স্তন ক্যানসার সাধারণত স্তনের দুধবাহী নালিতে হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে অন্যান্য টিস্যু থেকেও শুরু হতে পারে। একটি পিণ্ড বা চাকা হিসেবেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটি প্রথম ধরা পড়ে। ধীরে ধীরে বড় হয়ে শরীরের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। স্তনের সঙ্গে কাছাকাছি বগলতলার লসিকাগ্রন্থি বা গ্ল্যান্ডগুলোর খুবই ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকায় এগুলোতে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা সবার আগে এবং সবচেয়ে বেশি।
স্তন ক্যানসারের ব্যাপ্তি
সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের নারীদের মধ্যেও স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। নারী-পুরুষ মিলিয়ে হিসাব করলেও স্তন ক্যানসারের স্থান শীর্ষে, প্রতিবছর নতুন করে আক্রান্তের হার এবং মৃত্যুর হার উভয় ক্ষেত্রেই। প্রতিবছর বাংলাদেশে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন ১৪ হাজার ৮২২ জন, মারা যান ৭ হাজার ১৩৫ জন। নারী ক্যানসার রোগীদের মধ্যে আক্রান্তের ও মৃত্যুর হার যথাক্রমে ২৩ দশমিক ৯ ও ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ।
এই হিসাব গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ক্যানসার গবেষণার দায়িত্বপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আইএআরসি’র (ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার) প্রতিবেদন থেকে পাওয়া। আমাদের দেশে জনসংখ্যাভিত্তিক কোনো গবেষণা না থাকায় এই প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করতে হয়। দেশের জনসংখ্যা ১৫ কোটি ২৪ লাখ ৮ হাজার ধরে তাদের এই অনুমিত হিসাব। সেই হিসাবে প্রতিবছর সব মিলিয়ে মোট ১ লাখ ২২ হাজার ৭১৫ জন নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হন, মারা যান ৯১ হাজার ৩৩৯ ক্যানসার রোগী।
বাংলাদেশের জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ২০১৪ সালের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নারী ক্যানসার রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি (২৭.৪%) স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত, নারী-পুরুষনির্বিশেষে এই ক্যানসারের স্থান দ্বিতীয় (১২.৫), এখানে শীর্ষে অবস্থান ফুসফুসের ক্যানসারের (১৭.৯)। স্তন ক্যানসারের রোগীদের গড় বয়স প্রায় ৪৩ বছর।
আমাদের দেশে এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতার অভাবের কারণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ধরা পড়ে অনেক দেরিতে। এই রোগের বিভিন্ন ঝুঁকি বা রিস্ক ফ্যাক্টর সম্পর্কে মানুষ সচেতন হলে প্রাথমিক প্রতিরোধ কিছু ক্ষেত্রে সম্ভব। তবে সবচেয়ে বেশি দরকার প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত করা।
ঝুঁকি বা রিস্ক ফ্যাক্টর অপরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকি
জেন্ডার বা লিঙ্গ: পুরুষেরও স্তন ক্যানসার হতে পারে। তবে নারীদের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা ১০০ গুণ বেশি।
বয়স: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। পশ্চিমা বিশ্বে সাধারণত ৫০ বছর বয়সের পর ঝুঁকি বেশি বাড়ে। তবে অজানা কারণে আমাদের দেশে চল্লিশের পরেই বেশি দেখা যায়।
জিনগত: বিআরসিএ-১ ও ২ নামের জিনের মিউটেশন ৫ থেকে ১০ শতাংশ দায়ী স্তন ক্যানসারের জন্য।
বংশগত: কারও পরিবারের কোনো নারী যেমন- মা, খালা, বড় বোন বা মেয়ে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে থাকলে তাঁর স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি থাকে।
পিরিয়ড: যেসব নারীর ১২ বছর বয়সের আগে পিরিয়ড শুরু এবং ৫০ বছর বয়সের পর পিরিয়ড বন্ধ হয়, তাঁদের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকি
সন্তান সংখ্যা: নিঃসন্তান নারীদের স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি থাকে।
বেশি বয়সে সন্তান: ৩০ বছর বয়সের পর বিয়ে ও প্রথম সন্তানের মা হওয়া স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।
ব্রেস্টফিডিং না করানো: সন্তানকে বুকের দুধ না খাওয়ানোর অভ্যাস স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।
খাদ্যাভ্যাস: শাকসবজি ও ফলমূল কম খেয়ে, চর্বি ও প্রাণিজ আমিষ জাতীয় খাবার বেশি খেলে ব্রেস্ট ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে।
ওজন: অতিরিক্ত ওজন ও শারীরিক পরিশ্রমের অনভ্যাস ঝুঁকি বাড়ায়।
অন্যান্য কারণের মধ্যে আছে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ, স্তনে সাধারণ কোনো চাকা বা পিণ্ড থাকা ইত্যাদি।
গোড়ায় নির্ণয়
দু’টি উপায়ে প্রাথমিক অবস্থায় স্তন ক্যানসার নির্ণয় করা যায়। কোনো লক্ষণ টের পেলে জরুরিভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো উচিত। আবার যাঁদের মধ্যে লক্ষণ নেই, কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছেন, ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে তাঁদের মধ্য থেকে রোগী শনাক্ত করা।
স্তন ক্যানসারের লক্ষণ
* স্তনে চাকা বা পিণ্ড
* নিপল ভেতরে ঢুকে যাওয়া, অসমান বা বাঁকা হয়ে যাওয়া
* নিপল দিয়ে অস্বাভাবিক রস বা রক্তক্ষরণ হওয়া
* চামড়ার রং বা চেহারায় পরিবর্তন
* বগলতায় পি- বা চাকা
স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিং
যাঁদের লক্ষণ দেখা দেয়নি, কিন্তু ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বেশি, সহজ কোনো পদ্ধতির মাধ্যমে তাঁদের মধ্য থেকে রোগী খুঁজে বের করার নাম ক্যানসার স্ক্রিনিং। স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিং করার প্রধান তিনটি পদ্ধতি হলো
* ম্যামোগ্রাম বা বিশেষ ধরনের এক্স-রের সাহায্যে স্তনে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ধরা পড়ে।
* ক্লিনিক্যাল ব্রেস্ট এক্সামিনেশন বা চিকিৎসক দিয়ে স্তন পরীক্ষা।
* ব্রেস্ট সেলফ এক্সামিনেশন
(BSE) বা নিজে নিজের স্তন পরীক্ষা
ম্যামোগ্রাম
উন্নত দেশগুলোতে স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের প্রধানত ম্যামোগ্রাম বেছে নেওয়া হয়। সাধারণত ৫০ বছরের বেশি বয়সী নারীদের এক, দুই বা তিন বছর পরপর নিয়মিতভাবে ম্যামোগ্রাম করা হয়। এটি একটি বিশেষ ধরনের এক্স-রে, যার মাধ্যমে স্তনে খুব ছোট চাকা বা অন্যান্য অস্বাভাবিক পরিবর্তন ধরা পড়ে। এই পদ্ধতি তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল এবং খুব সহজলভ্য নয় বলে উন্নয়নশীল দেশে অন্য পদ্ধতিগুলোর ওপর জোর দেওয়া হয়।
স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ে সুপারিশ
* ২০ বছর বয়স থেকে সারা জীবন প্রতি মাসে একবার নিজের স্তন পরীক্ষা করুন।
* অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন আপনার কাছে ধরা পড়লে চিকিৎসক অথবা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী দিয়ে স্তন পরীক্ষা করুন।
* চিকিৎসক যদি কোনো চাকা বা পিণ্ড অথবা অন্য কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন শনাক্ত করেন, তবে পরামর্শমতো ম্যামোগ্রাম, স্তনের আলট্রাসনোগ্রাম অথবা অন্যান্য পরীক্ষা করান।
মনে রাখবেন, প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে স্তন ক্যানসার নিরাময়ের সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ।
সব ক্যানসারই টিউমার সব টিউমার ক্যানসার নয়
স্তনে পিণ্ড বা চাকা হলে যেমন ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তেমনি সব চাকাই যে ক্যানসার, তা-ও নয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দেখা গেছে, স্তনের চাকার ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ শেষ পর্যন্ত ক্যানসার হিসেবে চিহ্নিত হয়, বাকি ৯০ শতাংশ বিনাইন টিউমার বা অন্য কোনো সাধারণ রোগ, যা সহজেই নিরাময় করা সম্ভব। সুতরাং সঠিক পরীক্ষার মাধ্যমে রোগের ধরন জানা অত্যন্ত জরুরি।
-ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ক্যানসার ইপিডেমিওলজি, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ