শনিবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

না’গঞ্জে শিক্ষক শ্যামল কান্তির লাঞ্ছনার ঘটনায় গণশুনানি

নারায়ণগঞ্জ সংবাদদাতা : নারায়ণগঞ্জে আলোচিত এমপি সেলিম ওসমান কর্তৃক স্কুলের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তের লাঞ্ছনার ঘটনায় গণশুনানি শুরু হয়েছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে শিক্ষককে কান ধরে ওঠবসের ঘটনায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হলে উচ্চ আদালতের নির্দেশে ঘটনার নিরপেক্ষ বিচারে গণশুনানি করা হয়। গতকাল সোমবার বেলা ১১টা থেকে বিকেল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের বন্দরে পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ে এ গণশুনানি শুরু হয়। শুনানিতে স্কুলের সেই ছাত্র রিফাতসহ ১২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।   
ঢাকা সিএমএম কোর্টের বিচারক হাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে একটি টিম বেলা ১১টায় পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ে গণশুনানি শুরু করেন। গণশুনানিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাজহারুল ইসলাম ও গোলাম নবী এবং নারায়ণগঞ্জের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শহীদুল ইসলাম উপস্থিত রয়েছেন।
এর আগে স্কুলের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে কঠোর পুলিশ প্রহরায় স্কুলে আনা হয়। তবে গণশুনানির আগে স্থানীয় লোকজন শ্যামল কান্তির বিরুদ্ধে স্কুলের আশেপাশে ব্যানার ও ফেস্টুন লাগিয়ে রাখে। এতে স্থানীয় সাধারণ জনগণের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। স্থানীয় এমপির নির্দেশে তার পালিত লোকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যানার ফেস্টুন লাগিয়ে থাকে বলে এলাকাবাসী এমনটাই মন্তব্য করেন। 
নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তিকে গত ১৩ মে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে লাঞ্ছিত করার ঘটনা প্রকাশ পেলে দেশজুড়ে নিন্দা-প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যায়। তখন সংবাদ সম্মেলনে সেলিম ওসমান সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, সেদিন ঘটনা শুরু হয়েছিল সকাল ১০টার দিকে। আমি সেখানে গিয়েছি বিকাল ৪টায়। গিয়ে দেখি চার থেকে পাঁচ হাজার লোক সেখানে জড়ো হয়েছে। গিয়ে আমি শুনেছি, ওই শিক্ষক একজন ছাত্রকে মেরেছিল। ছাত্র পরে অসুস্থ হয়ে যায়। শিক্ষক বাজার থেকে ওষুধ এনে ছাত্রকে খাওয়ায়। ওই ছাত্র আরো অসুস্থ হয়ে পড়ে। এর মধ্যেই ওই শিক্ষক ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করেছে বলে এলাকার লোকজন তাকে গণপিটুনি দিয়েছিল। পুলিশ শিক্ষককে একটি ঘরে নিরাপত্তা দিয়ে রাখে। আমি সেখানে যাওয়ামাত্র এলাকার লোকজন আমাকে বলেছে, ঐ শিক্ষককে আমাদের হাতে ছেড়ে দেন। কিন্তু আমি কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চাইনি। সেলিম ওসমান আরো বলেন, আমি তখন শিক্ষকের কাছে যাই। তিনি ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তির কথা স্বীকার করেন। শিক্ষকের কাছে জানতে চাই, তোমার কী শাস্তি হবে? তিনি যেকোনো শাস্তি মাথা পেতে নেবেন বলে জানান। সাংসদকে বলেন, আমার তিন মেয়ে আছে। তাদের বিয়ে হয়নি। সেলিম ওসমান বলেন এ সময় তার মনে হয়, তার নিজেরও তিন মেয়ে আছে। সেলিম ওসমান দাবি করেন, ওই শিক্ষক নিজেই কান ধরে উঠবস করার প্রস্তাব দেন। এতে আমি রাজি হই। শিক্ষক স্বেচ্ছায় কান ধরে উঠবস করেন। আমি যা করেছি একজন মানুষের জীবন রক্ষার জন্য। সেলিম ওসমানের দাবি, ওইদিন তিনিই পুলিশকে বলে ঘটনাস্থল থেকে শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা করেন। হাসপাতালে সব চিকিৎসার খরচ তিনিই বহন করছেন। শ্যামল কান্তি ভক্তের সঙ্গে তার ফোনে যোগাযোগ হচ্ছে। সকালেও শিক্ষকের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। ওই শিক্ষক ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত। বলেছেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি ভারতের ভেলোরে যেতে চান। তিনি তাকে সহায়তা করবেন।
এদিকে ১৮ মে শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নয়, জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মোহাম্মদ ইকবাল কবির লিটনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। রুলে দুই সপ্তাহের মধ্যে স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার (এসপি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া আদেশে শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনা তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে ৩ দিনের মধ্যে তার প্রতিবেদন জমা দিতে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেন আদালত। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের সদস্য নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি সেলিম ওসমানের পক্ষে প্রতিবেদন দেয়ায় আদালত সেই প্রতিবেদন গ্রহণ করেনি।
জানা গেছে, ৭ অগাস্ট আদালতে যে প্রতিবেদন দেয়া তাতে বলা হয়, ওই ঘটনায় এই সংসদ সদস্যের কোনো দোষ তারা পাননি। হাইকোর্ট আদেশে বলেছে, সাধারণ ডাইরির প্রেক্ষিতে করা ওই ঘটনার তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করতে তদন্ত কর্মকর্তা ব্যর্থ হয়েছেন। তদন্ত প্রতিবেদনটি ‘অসম্পূর্ণ ও অসমন্বিত’। তদন্ত কর্মকর্তার দাখিল করা প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে ঘটনার সত্যতা মেলেনি বলে যে বিচারক (নারায়ণগঞ্জ আদালতের) ওই প্রতিবেদন নথিভুক্ত করে রাখেন, তিনি ‘বিচারিক মন প্রয়োগ করেননি’। “আমরা সতর্কতার সাথে সাধারণ ডাইরির সূত্র ধরে পুলিশের করা তদন্ত প্রতিবেদনটি দেখেছি। কান ধরে ওঠ-বসের ঘটনা ঘটেছে, তা প্রতিবেদনে এসেছে। তদন্ত কর্মকর্তার দেওয়া প্রতিবেদনে এসেছে, আন্দোলনরত জনতার হাত থেকে শিক্ষকের জীবন রক্ষায় আকস্মিকভাবে ওই ঘটনা ঘটে।  তদন্ত কর্মকর্তা প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
বিচারক বলেন, “কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। সবাই আইনের অধীন। এটি আইনের শাসনের মর্মবাণী। আইনের শাসনের জন্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের মত ঘটনা এই আদালত এড়িয়ে যেতে পারে না।
আদালত তখন স্কুল শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে লাঞ্ছনার ঘটনায় করা জিডির তদন্তে হলফনামা আকারে ৪ আগস্ট আদালতে দাখিল করতে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার ও বন্দর থানার ওসিকে নির্দেশ দেয়। গত ৭ আগাস্ট পুলিশের সেই প্রতিবেদন হাই কোর্টে পড়ে শোনায় রাষ্ট্রপক্ষ। সেখানে বলা হয়, “শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত ও স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান দু’জনই উদ্ভূত ঘটনায় পরিস্থিতির শিকার। কারও বিরুদ্ধে কোনোরূপ অভিযোগ না থাকায় উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ঘটনার পারিপার্শ্বিকতায় আকস্মিকভাবে ওই ঘটনাটি হয়েছে বলে জানা যায়।” রুলের পর ব্যাখ্যাদানকারী হিসেবে আইন ও শালিস কেন্দ্র এ মামলায় পক্ষভুক্ত হয় ও হলফনামা দেয়। হলফনামায় বলা হয়, জিডির সূত্র ধরে তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা শ্যামল কান্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেননি। মে মাসে ঘটনার পরপরই শিক্ষক শ্যামল কান্তিকে চাকরিচ্যুত করেছিল বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে নিন্দার প্রতিবাদের মধ্যে দুই দিনের মাথায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ওই সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করে। নিয়মবহির্ভূত সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বিদ্যালয় কমিটিও বাতিল করা হয়। দীর্ঘদিন ঢাকায় চিকিৎসা নেওয়ার পর স্কুলে ফিরে যান শ্যামল কান্তি। এছাড়া শ্যামল কান্তির বিরুদ্ধে কথিত নির্যাতিত ছাত্রের মায়ের একটি এবং ধর্ম অবমাননার অভিযোগ করা আরেকটি মামলার আরজি নারায়ণগঞ্জের আদালত খারিজ করে দেয়।
উল্লেখ্য, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে ১৩ মে নারায়ণগঞ্জের পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে লাঞ্ছিত করা হয়। স্থানীয় সংসদ সদস্য এ কে এম সেলিম ওসমান সবার সামনে ওই শিক্ষককে কান ধরে ওঠ-বস করান। এর এক পর্যায়ে শ্যামল কান্তি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে ওই রাতেই তাকে প্রথমে বন্দর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরদিন শহরের খানপুরে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ডা. শফিউল আজমের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ২০ মে পুলিশের প্রহরায় শ্যামল কান্তি ভক্তকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের অধীনেই তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ