বুধবার ২৭ মে ২০২০
Online Edition

অরক্ষিত রেললাইন দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাঁটছে হাজার হাজার মানুষ

ইবরাহীম খলিল : আইনগত বিধি নিষেধ থাকলেও অরক্ষিত রেললাইন দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হেঁটে গন্তব্যে যান হাজার হাজার মানুষ। অসাবধানতাবশত হাঁটার কারণে ট্রেনের নিচে পড়ে হতাহত হচ্ছে শত শত মানুষ। বিশেষ করে মোবাইল কানে নিয়ে রেললাইন দিয়ে হাঁটার কারণে সবচেয়ে বেশি হতাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। 

রেলওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী গত নয় মাসে সারা দেশে রেললাইন থেকে ৭শ’২৯টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। অসতকর্তা, হত্যা ও আত্মহত্যার পাশাপাশি মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রেললাইন পার হওয়া এসব মৃত্যুর বড় কারণ। তবে ২৪ থানা এলাকায় শুধু মোবাইলফোন কানে দিয়ে হাঁটার কারণে বেশির ভাগ মৃত্যু হয়েছে। 

তবে রেলওয়ে থানা ঢাকার হিসেব অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত চলতি বছরের ৯ মাসে ২শ’ ৩০টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। এদের মধ্যে ১শ’ ৬ জন মারা যায় মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রেললাইন পার হওয়ার সময়।

আর নারায়ণগঞ্জ থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত ১শ’ ৪২ কিলোমিটার পথে গত সেপ্টেম্বরে এক মাসেই ট্রেন দুর্ঘটনায় ২৮ জন নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে ২৫ জনেরই মৃত্যু হয়েছে মোবাইলফোনে কথা বলতে বলতে রেললাইন পার হওয়ার সময়। আর নয় মাসে লাশ উদ্ধার হয়েছে ২শ’৩০টি। এদের মধ্যে পাঁচজনকে হত্যার পর রেলপথে ফেলে যাওয়া হয়েছিল। অন্যদের মৃত্যু হয়েছে অসতর্কতা, আত্মহত্যাসহ বিভিন্ন কারণে।

ঢাকা রেলওয়ে থানার তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে ট্রেনে কাটা পড়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটনা ঘটে মহাখালী রেলগেট ও খিলক্ষেত এলাকায়। এর কারণ, কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় রেললাইন বাঁকা। তাই দূর থেকে ট্রেন এলে দেখা যায় না। আবার বনানী থেকে কারওয়ান বাজার এলাকার রেললাইনের পাশে গড়ে উঠেছে বস্তি। এসব এলাকায় অবৈধ ক্রসিং দুর্ঘটনার কারণ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেললাইন দিয়ে মানুষের অবাধে চলাফেরা, অবৈধ বাজার আর বস্তির কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। এতে বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। দিন যতই যাচ্ছে বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফোনে কথা বলার সময় তার অন্য কিছু খেয়াল থাকে না। আবার তরুণদের অনেকেরই মোবাইলফোনের প্রতি আসক্তি রয়েছে। মোবাইল ফোনে কথা বলতে গিয়ে ট্রেনের নিচে পড়ে মারা যাওয়াকে দু:খজনক আখ্যা দিয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক জিল্লুর রহমান খান বলেন, মানুষ পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে একসঙ্গে দুটি কাজ করতে পারে না। তাই তাঁদের মধ্যে মোবাইলের ব্যবহার অপব্যবহারের পর্যায়ে চলে গেছে।

এদিকে রেললাইনেরও উপর এবং কাছাকাছি বিপজ্জনক এলাকায় গড়ে ওঠেছে ছোট ছোট অনেক অবৈধ হাট বাজার। এসব বাজারেরর কারণেও ট্রেনের নিচে পড়ে হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। 

কমলাপুর রেলওয়েস্টেশন এলাকা থেকে বের হওয়ার মুখেই রেললাইনের ওপর বাজার পড়ে খিলগাঁও ফ্লাইওভারের নিচে। এখানে শাক সবজি থেকে শুরু করে মাছের বাজার পর্যন্ত বসে রেললাইনের ওপর। এর একটু সামনেই মালিবাগ রেললাইনের ওপর এবং পাশে বসছে বাজার। এমনিভাবে কিছু দূর গিয়ে গিয়ে অনেক অবৈধ বাজার রয়েছে রেললাইনের ওপর। এসব বাজার মাঝে মধ্যে উচ্ছেদ করা হলেও কিছু সময় পরেই আবার বসে যায়। একই অবস্থা কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ রেললাইনের ওপর। 

এলাকাবাসীর অভিযোগ, বহুবার উচ্ছেদ করা সত্ত্বেও নিয়মিত তদারকির অভাবে জুরাইন রেলগেট এলাকায় রেললাইন ঘেঁষে বার বার বসে যায় বাজার। ট্রেন চলার সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসে থাকেন দোকানিরা। রাজধানীর গেন্ডারিয়া থেকে নারায়ণগঞ্জের পাগলা পর্যন্ত রেললাইনের গা ঘেঁষে তিনটি কাঁচাবাজার গড়ে উঠেছে। এগুলো জুরাইন রেলগেট বাজার, শ্যামপুর ও পাগলার রেলগেট বাজার নামে পরিচিত। রেললাইনের ওপরে রাখা হয়েছে পেঁয়াজ, আলুসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি। ট্রেনের শব্দ শোনামাত্রই বাজারে আসা লোকজন দৌড় দিয়ে রেললাইনের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।

বৃহস্পতিবার মালিবাগ রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, শত শত লোক রেললাইনের ওপর দিয়ে হেটে হেটে গন্তব্যে যাচ্ছেন। এর মধ্যে বেশির ভাগ মানুষের কানে মোবাইল ফোন। কথা হয় মজিবুর রহমান নামের এক চাকুরী জীবীর সঙ্গে তিনি জানান, প্রতিদিন মালিবাগের বাসা থেকে তেজগাঁও বিজি প্রেসে অফিস করেন এই রেললাইনের ওপর দিয়ে হেটে। তার মতো অনেকে একাজটি করে থাকেন। কারণ রেললাইন দিয়ে হেঁটে গেলে রাস্তা কমে যায়। সেইসঙ্গে সময়েরও সাশ্রয় হয়। 

গতকাল শুক্রবার ছুটির দিনেও বিকেলে মালিবাগ রেললাইন দিয়ে শত শত মানুষকে হেঁটে যেতে দেখা গেছে। কথা হয় পথচারী রবিউল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, রাস্তায় যে জ্যাম তাতে রেললাইন দিয়ে হাঁটলে অনেক সময় সাশ্রয় হয়। 

মালিবাগ রেলগেইটের গেইটম্যানরা জানান, মগবাজার থেকে মালিবাগ এলাকায় প্রায়ই ট্রেনের নিচে পড়ে মানুষ মারা যায়। দুর্ঘটনার মূল কারণ মোবাইল ফোন উল্লেখ করে তিনি বলেন, কথা বলতে বলতে মানুষ রেললাইন দিয়ে হাটে, ডাকলেও শোনে না। অনেক সময় নিষেধ করলে খারাপ ব্যবহার করে।

নির্ধারিত রেলক্রসিং ছাড়া রেললাইন ধরে হাঁটা ও বসা নিষিদ্ধ উল্লেখ করে ঢাকা রেলওয়ে থানার ওসি ইয়াসিন ফারুক বলেন, রেললাইনের দুই পাশে ১০ ফুট করে ২০ ফুটের মধ্যে সব সময় ১৪৪ ধারা জারি থাকে। এই সীমানার ভেতর কোনো ব্যক্তিকে পাওয়া গেলে তাঁকে গ্রেফতার করা যাবে। 

বুয়েটের গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ট্রেনের ইঞ্জিনের শব্দ কম, দ্রুতগতিতে চলে এবং অল্প দূরত্বে থামতে পারে না। এ জন্য দুর্ঘটনা ঘটে। আর মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকলে এ দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। এ ধরনের দুর্ঘটনা কমাতে তাঁর সুপারিশ, জনবহুল জায়গায় লোহার বেড়া দিতে হবে। সম্ভব না হলে রেললাইনজুড়ে সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আইনের কঠোর প্রয়োগ ও ব্যাপক জনসচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান জানান তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ