বুধবার ২৭ মে ২০২০
Online Edition

রিজার্ভ থেকে ঋণ আর্থিক খাতকে আরো ঝুঁকিতে ফেলবে

স্টাফ রিপোর্টার : বিকল্প খাত থেকে অর্থের সংস্থান করতে না পেরেই সরকার এখন বাধ্য হয়ে রিজার্ভ থেকে ঋণ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশেষ করে রিজার্ভ থেকে ঋণ নিয়ে অন্য খাতে বিনিয়োগ করার বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর ঘোষণাকে সরকারের বড় ধরনের অর্থনৈতিক ব্যর্থতা বলে মন্তব্য করেছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা। এছাড়া দেশে এখন সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) নেই, শিল্প কারখানার উৎপাদন বন্ধ, অবকাঠামোগত উন্নয়নেও বড় বিনিয়োগ শূন্যের কোঠায়। এই অবস্থায় রিজার্ভ ভেংগে সরকার ঋণ নিলে তা হবে অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি এবং চ্যালেঞ্জ। সরকারের এই উদ্যোগ দেশের আর্থিক খাতকে আরো বেশি ঝুঁকিতে ফেলবে বলেও মন্তব্য করেছেন সাবেক গবর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ। 

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন ডিপার্টমেন্ট আয়োজিত বাংলাদেশ ব্যাংক রেমিট্যান্স অ্যাওয়ার্ড ২০১৫ প্রদান অনুষ্ঠানে রিজার্ভ ভাংগার ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী। ঐ অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ফলে আজ আমাদের রিজার্ভের পরিমাণ ৩১ বিলিয়ন ছাড়িয়েছে। এখন এই অর্থের সদ্ব্যবহারের সময় এসেছে। তাই আমরা ভাবছি এটাকে কিভাবে বিনিয়োগে নিয়ে আসা যায়। তিনি বলেন, আমরা চিন্তা করছি রিজার্ভ থেকে ঋণ নেবে সরকার।

এদিকে অর্থমন্ত্রীর এই ঘোষণার পর সরকারকে আরো বেশি সতর্ক থেকে রিজার্ভ ভাংগার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অর্থনীতিবিদদের বিবেচনায় রিজার্ভের অর্থে সরকারের হাত দেয়া উচিত হবে না। এটা জনগণের টাকা। স্বল্প মেয়াদে যদিও রিজার্ভ থেকে ঋণ দেয়া যায় কিন্তু সেই অর্থ কিভাবে সরকার ফেরত দেবে তা আগেই নির্ধারণ করতে হয়। 

অর্থমন্ত্রীর এই ঘোষণার প্রেক্ষিতে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গবর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ দৈনিক সংগ্রামকে জানান, রিজার্ভের টাকা প্রকৃত অর্থে সরকারের টাকা নয়। এটা জনগণের টাকা। দেশের প্রয়োজনে বড় ধরনের কোনো ডিজাস্টার হলে সরকার হয়তো রিজার্ভ থেকে তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে ঋণ নিতে পারে। কিন্তু স্বাভাবিক উন্নয়নের কাজে রিজার্ভ এর অর্থ ব্যবহার সরকারের জন্য একটি বড় ধরনের ঝুঁকি। তিনি আরো জানান, সরকার যদি চায় রিজার্ভ থেকে সীমিত পরিসরে কিছু টাকা নিয়ে সাময়িক প্রযোজন মেটাতে পারে। একটি বিষয়ে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে সেটি হলো, দীর্ঘ মেয়াদে রিজার্ভ থেকে অর্থ নিয়ে ব্যয় করা কোনোক্রমেই উচিত হবে না। 

অবশ্য রিজার্ভের অর্থ থেকে ঋণ নিয়ে সেই টাকা ব্যবহার প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, সরকার ঋণ নিলেও রিজার্ভের অর্থ জনগণের। এই টাকা আপনাদেরই থাকবে। আমরা শুধু জনগণের কাছ থেকে নির্দিষ্ট হারে নির্দিষ্ট পরিমাণে ঋণ নেব। সে অর্থ দেশের উন্নয়নে মেগা প্রকল্পে তা ব্যবহার করবো। এসব প্রকল্পের সাফল্য বা ব্যর্থতার বিষয়ে দায়-দায়িত্ব আমাদের। আপনাদের টাকার কোনো ক্ষতি হবে না।

এদিকে অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক মাস থেকেই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ণের প্রধান প্রধান সূচকে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে গত তিন মাসের প্রাপ্ত সূচকগুলো বিশ্লেষণে দেখা গেছে রেমিট্যান্স, রফতানি আয় এবং দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের ধারায় অব্যাহত ভাটা চলছে। অবশ্য বিশ্ব ব্যাংক এবং আইএমএফ’র মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো আগামীতে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকটের আভাস দিয়েছে। এ অবস্থায় সরকার এখন বাধ্য হয়েই রিজার্ভের অর্থ থেকে ঋণ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। 

সূত্র জানায়, দেশে বিদ্যুৎ এবং গ্যাস সংকটের কারণে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ বা এফডিআই আসছে না। এমনকি কয়েক বছর আগে যেসব শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে অনেকে উৎপাদনে যেতে পারছে না। ফলে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকরা সুদ পরিশোধ তো দূরের কথা তারা এখন খেলাপীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন। অন্যদিকে রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো’র দেয়া তথ্যমতে, গত তিন মাসের হিসেবে রফতানি আয় কমেছে শতকরা ৯ ভাগ। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে শ্রমিক প্রেরণ বন্ধ থাকায় রেমিট্যান্স প্রভাবে ভাটা পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এর দেয়া সর্বশেষ তথ্যমতে দেশে বিদেশী বিনিয়োগ বা এফডিআই শতকরা হিসেবে ২১ ভাগ কমেছে। 

দেশের চলমান বিদ্যুৎ এবং গ্যাস সংকটের কারণে দেশে এখন আর উল্লেখযোগ্য হারে বিদেশী বিনিয়োগ আসছে না। চলতি অর্থ বছরের প্রথম তিন মাস এবং গত অর্থ বছরের শেষে তিন মাস মিলে মোট ছয় মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিদেশী বিনিয়োগের নীট প্রবাহ ২১ শতাংশ কমেছে। 

এদিকে দেশে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বিনিয়োগকারী বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো যে অর্থ দেশে নিয়ে আসে, তার ওপর জরিপের ভিত্তিতে বিদেশী বিনিয়োগ প্রবাহের পরিসংখ্যান ও গতি-প্রকৃতিসংবলিত তথ্য প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। নিট নিজস্ব মূলধন বা ইকুইটি, আয়ের পুনর্বিনিয়োগ বা রিইনভেস্টেড আর্নিং ও আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ বা ইন্ট্রা কোম্পানি লোন এ তিন ভাগে এফডিআই প্রবাহ হিসাব করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চলতি বছরের ছয় মাসে এ তিন ভাগে আসা এফডিআই নিটপ্রবাহের সঙ্গে ২০১৫ সালের একই সময়ের তুলনামূলক বিচারে দেখা যায়, দেশে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগের নিটপ্রবাহ ২১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে বিদেশে শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ার বিষয়টি ক্রমেই আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। গত বছরের তুলনায় গত তিন মাসেই রেমিট্যান্স কমেছে ৭০ কোটি ১৫ লাখ ডলার, টাকা অংকে যা দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, মধ্যপ্রাচ্যসহ মালয়েশিয়াতে দক্ষ অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর গতি এখন উল্টোপথে। অনেক চেষ্টা তদবির করেও মালয়েশিয়াতে শ্রমিক পাঠানোর কোনো পথই খোলা যায়নি। অন্যদিকে সৌদি আরবেও শ্রমিক পাঠানোর পথ বন্ধ। ফলে এই দুটি দেশ থেকে প্রতিবছর যে পরিমাণ রেমিট্যান্স আসে গেলো দু’বছর যাবৎ সেটিও বন্ধ। সব মিলিয়ে প্রবাসী আয়ের খাতে সরকার যে সাফল্যের কথা প্রচার করছে তা গত তিন মাসের হিসেব মিথ্যা প্রমাণ করেছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের শিল্পঋণ পর্যালোচনা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৫-১৬ অর্থবছরে শিল্পখাতে ঋণ বিতরণ ২০ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু একই সময়ে আদায় বেড়েছে ১৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ। বিগত অর্থবছরে শিল্পঋণের মেয়াদোত্তীর্ণ স্থিতি ২৮ দশমিক ২৮ শতাংশ ও বকেয়া স্থিতি ২২ দশমিক ৮২ শতাংশ বেড়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে রফতানি আয়ের খাতে। বিশেষ করে বিদেশীদের উপর হামলা ও দেশে উগ্রবাদী তৎপরতায় রফতানি আয়ে চরমভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো’র (ইপিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত তিন মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৯০ কোটি মার্কিন ডলার রফতানি কম হয়েছে। শতকরা হিসেবে রফতানি আয় ৯ দশমিক ৬৯ ভাগ কম হয়েছে। 

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রথম ৩ মাসে রফতানিতে আয় হয়েছে ৮০৭ কোটি ৮৮ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার। অথচ এই সময়ে লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ৮৯৪ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার। এই হিসাবে দেখা যায়, আলোচ্য সময়ে লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রফতানি আয় কমেছে ৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এদিকে ইপিবি’র প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরের একই সময় আয় হয় ৭৭৫ কোটি ৯০ লাখ ডলার। যা আলোচ্য সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ১২ শতাংশ কম। ইপিবি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ মাসের সেপ্টেম্বর মাসে রফতানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৭৩ কোটি ৫০ লাখ ডলারের। তবে এই লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রফতানি আয় হয়েছে ২২৪ কোটি ১০ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলার। তবে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কমেছে ১৮ দশমিক ০৬ শতাংশ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ