ঢাকা, শুক্রবার 7 August 2020, ২৩ শ্রাবণ ১৪২৭, ১৬ জিলহজ্ব ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড মহাপরিকল্পনা আসলে কী?

অনলাইন ডেস্ক: চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ‘ব্রেন চাইল্ড’ এই ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড মহাপরিকল্পনা। এ মহাপরিকল্পনার আওতায় রয়েছে ৬০টি দেশের সঙ্গে চীনের মূল ভূখণ্ডকে সংযুক্ত করা। মহাপরিকল্পনাটির মূলত দুটো অংশ। এক. সড়কপথে মধ্য এশিয়া ও ইউরোপের সঙ্গে সংযুক্ত হবে চীন। চীন সড়ক পথের সঙ্গে রেলপথ ও তেলের পাইপলাইনও সংযুক্ত করছে। একই সঙ্গে সমুদ্রপথেও, বিশেষ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত হবে চীন। প্রাচীন সিল্ক রুটের আধুনিক সংস্করণ এটি। মূল সিল্ক রোডের অস্তিত্ব ছিল আজ থেকে প্রায় দুই হাজার বছর আগে, এটা ছিল বাণিজ্যের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ। এর মধ্য দিয়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের মধ্যে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিনিময় হয়েছে। চীনের নতুন ‘সিল্ক রোড ইকোনমিক বেল্ট’ ও ‘টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি মেরিটাইম সিল্ক রোডও’ একই কাজ করবে। নতুন নতুন ও উন্নততর অবকাঠামো নির্মাণের মধ্য দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সংস্কৃতি ও চিন্তার প্রসার হবে, ফলে সবারই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে।

সরকারিভাবে ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোডের যে মানচিত্র প্রকাশ করা হয়েছে তাতে দেখা যায় চীনের সিয়ান থেকে উরুমকি, তুরস্কের ইস্তান্বুল এবং ইউরোপের স্পেনের মাদ্রিদ পর্যন্ত সড়কপথ তৈরি হবে, যা কিনা মধ্য এশিয়ার কিরঘিজস্তান, কাজাখস্তান হয়ে মস্কো, পোল্যান্ড, জার্মানির হামবুর্গ, হল্যান্ডের রটারডাম হয়ে মাদ্রিদে গিয়ে শেষ হবে। দুই. একই সঙ্গে চীন একটি মেরিটাইম তথা সামুদ্রিক সিল্ক রোডের মহাপরিকল্পনাও প্রণয়ন করছে। এই সামুদ্রিক সিল্ক রোডের মাধ্যমে একদিকে আফ্রিকার জিবুতি, মোমবাসা (কেনিয়া) বন্দরের সঙ্গে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শ্রীলংকা, সিঙ্গাপুর ও মিয়ানমারকেও চীনের একটি অংশের সঙ্গে সংযুক্ত করতে চায় চীন।

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যখন ২০১৩ সালে ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ উদ্যোগ গ্রহণ করেন, তখনই সেটা অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। এটা সেই প্রাচীন সমুদ্র ও সড়কপথের সিল্ক রোড পুনরুদ্ধারের প্রয়াস, যে রাস্তা পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছিল। প্রায় ৬০টি দেশ ও বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংগঠন এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে, ফলে সংগত কারণেই এই প্রকল্প অভূতপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি করবে, একই সঙ্গে তা চ্যালেঞ্জেরও বটে।আর এই চ্যালেঞ্জকে জয় করতেই এই উদ‌্যোগকে ঘিরেই চলছে দেশটির অর্থনৈতিক কূটনীতি।

এই উদ‌্যোগ শুরুর পর থেকে  বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার এই অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে চীন।

বস্তুত ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড এবং মেরিটাইম সিল্ক রোডের আওতায় চীন দুটো ‘ইকোনমিক করিডোর’ সৃষ্টি করছে। একটি কুনমিং থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সড়ক ও রেলপথ। দ্বিতীয়টি, চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের খাসগর থেকে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের সমুদ্রবন্দর গাওদার পর্যন্ত রেল ও সড়ক পথ। 

ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড মহাপরিকল্পনার ব্যাপারে চীনের বড় আগ্রহ রয়েছে, এটা অস্বীকার করা যাবে না। তবে এই মহাপরিকল্পনার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোও উপকৃত হতে পারে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরে তেলের পাইপলাইন সংযুক্ত হবে। চীনে পারস্য মহাসাগর অঞ্চলের জ্বালানি তেল এ পথে খুব অল্প সময়ে এবং মধ্য এশিয়ার তেল চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। এই জ্বালানি তেলের ওপর চীন নির্ভরশীল। চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিপ্রেক্ষিতে মধ্য এশিয়ার জ্বালানি তেলের ওপর তাদের নির্ভরতা বাড়ছে। একই সঙ্গে চীন এই অর্থনৈতিক করিডোরের সঙ্গে তার ইউনান প্রদেশকেও সংযুক্ত করতে চায়। এটা করতে হলে কুনমিং-কক্সবাজার-কলকাতা সড়কপথ (যা কে-টু-কে নামে পরিচিত) নির্মাণ করতে হবে। এটি নির্মিত হলে বাংলাদেশ সড়কপথে চীনা পণ্য আমদানি করতে পারবে। এতে সময় বাঁচবে ও পণ্যের মূল্য কমে যাবে। দ্বিতীয়ত, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের সঙ্গে বাংলাদেশ সংযুক্ত হতে পারে। এতে করে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ এই অর্থনৈতিক করিডোর ব্যবহার করে মধ্য এশিয়া থেকে জ্বালানি (তেল ও গ্যাস) আমদানি করতে পারবে।সুতরাং ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড কর্মসূচি চীনের স্বার্থে প্রণীত ও বাস্তবায়িত হলেও বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিকেও একেবারে ফেলে দেয়া যাবে না।

ইতিমধ্যে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মধ্য এশিয়া, রাশিয়া ও পাকিস্তান সফর করেছেন তার মহাপরিকল্পনার ব্যাপারে জনমত সৃষ্টি করতে। ঢাকা সফরের পর তিনি ভারতে যাবেন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে। ব্রিকস সম্মেলনের পাশাপাশি ব্রিকস-বিম্সটেক শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই শীর্ষ বৈঠকে যোগ দেবেন। ধারণা করছি, ব্রিকস-বিম্সটেক যৌথ শীর্ষ বৈঠকে চীনা প্রেসিডেন্ট তার ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে বিম্সটেক দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানাবেন।

চীনের ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ উদ‌্যোগে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিল বাংলাদেশ, যা ছিল প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরের মনোযোগের কেন্দ্র।

শুক্রবার প্রেসিডেন্ট শি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠকের পর স্বাক্ষরিত চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকগুলোর মধ‌্যে চীনের এই উদ‌্যোগ নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা বলা হয়েছে ওই বৈঠকের পর আসা যুক্ত বিবৃতিতে।

চীন-বাংলাদেশের ‘সর্বাত্মক অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা’র সম্পর্ককে ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতার’ জায়গায় নিয়ে যেতেও সম্মত হয়েছেন তারা। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সহযোগিতার মতৈক‌্য হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চীনের ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ উদ‌্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছে বাংলাদেশ। ২০২১ সালের মধ‌্যে মধ‌্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছানোর যে লক্ষ‌্য বাংলাদেশের রয়েছে তা অর্জনে এটা ‘গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ’ নিয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ডি.স/আ.হু

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ