সোমবার ১৮ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

বেসরকারি বিনিয়োগ প্রসঙ্গে

দেশে প্রয়োজনীয় পরিবেশ না থাকায় গত তিন বছরে বেসরকারি খাতে সবচেয়ে কম বিনিয়োগ হয়েছে। বর্তমানে এই হার জিডিপির প্রবৃদ্ধির মাত্র ২১ দশমিক ৮ শতাংশ। গত সোমবার দারিদ্র্য ও অসমতা বিষয়ক রিপোর্ট প্রকাশ উপলক্ষে বিশ্বব্যাংক কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রসঙ্গক্রমে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলেও ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্টে বলা হয়েছে, চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত। কিন্তু রেমিট্যান্স ও বেসরকারি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রবণতাসহ কয়েকটি কারণে আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়াবে ৬ দশমিক ২ শতাংশ। এই হারে প্রবৃদ্ধি হলে ২০১৭ সালে দারিদ্র্য হার হবে ১২ দশমিক ১ শতাংশ। এর পরের বছর দারিদ্র্য হার আরো কমে হবে ১১ দশমিক ৪ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে যথাযথ বিনিয়োগ পরিবেশের অভাব রয়েছে। এছাড়া বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়া, সম্পদ রেজিস্ট্রেশন করা এবং ঠিকাদারের সঙ্গে সমস্যা মেটানোর মতো কিছু বিষয়ে অতিরিক্ত সময় লেগে যাওয়ায় শিল্পের উৎপাদন এবং ব্যবসা শুরু করতে অনেক বেশি সময় লেগে যায়। তাছাড়া নিরাপত্তার অভাব এবং আর্থিক খাতের অস্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ সমস্যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বব্যাংক বলেছে, এমন অবস্থার অবশ্যই উন্নয়ন ঘটানো দরকার। এসব বিষয়ে জরুরিভিত্তিতে ব্যবস্থা না নেয়া হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যেতে পারে। তাছাড়া আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের ব্রেক্সিট এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনসহ বিভিন্ন কারণে এসব দেশের বাণিজ্যে সংরক্ষণবাদীরা প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশের মতো ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর বিপদ বেড়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। এসব দেশের রফতানি কমে যেতে পারে। রফতানির ওপর কর বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টির আশংকা রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের রফতানি কমে যাওয়ার এবং প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশংকা রয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, বর্তমানে যে হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে তার মাধ্যমে শূন্য দারিদ্র্যের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালে দারিদ্র্যের হার দাঁড়াবে ৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ। অন্যদিকে শূন্য দারিদ্র্যের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন।
বিশ্ব ব্যাংকের রিপোর্টে হতদারিদ্র্যের হার এবং মাথাপিছু আয়সহ আরো কিছু বিষয়ে তথ্য-পরিসংখ্যানের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়লেও ব্যক্তি খাতে প্রবৃদ্ধি কমেছে। তিন বছরের মধ্যে বিনিয়োগ হয়েছে সবচেয়ে কম তথা ২১ দশমিক ৮ শতাংশ। সঞ্চয়ের অভাব নয় বরং বিনিয়োগ না হওয়াই এমন অবস্থার প্রকৃত কারণ। রিজার্ভ বাড়লেও রিজার্ভের অর্থ যে পাচার হয়ে যাচ্ছে সে কথারও উল্লেখ রয়েছে রিপোর্টে। একই কারণে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা উন্নত করার তাগিদ দিয়েছে বিশ্ব ব্যাংক।
বলার অপেক্ষা রাখে না, সরকারের পক্ষ থেকে নতুন নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপনসহ বিনিয়োগ বাড়ার এবং কর্মসংস্থান তথা চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার কল্পিত তথ্য-পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলেও বাস্তবে উভয় ক্ষেত্রেই পরিস্থিতির কেবল অবনতি ঘটে চলেছে। সব মিলিয়ে বিনিয়োগ পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে বলেই বিশ্বব্যাংক পর্যন্ত উদ্বেগ প্রকাশ না করে পারেনি। বাস্তবেও পরিস্থিতির এতটাই অবনতি ঘটেছে যে, কিছুদিন আগে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে প্রায় পোনে দুই লাখ কোটি টাকা পড়ে থাকলেও ঋণ নেয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা। অর্থাৎ ব্যক্তিখাতে কেউই নতুন বিনিয়োগ করতে এগিয়ে আসছেন না। ২০১৪ সাল থেকে বিগত প্রায় আড়াই বছরে ব্যাংকগুলোতে ঋণ বেড়েছে মাত্র নয় শতাংশ, যাকে মোটেও উল্লেখযোগ্য বলা যায় না।
বিনিয়োগ না বাড়ার কারণ হিসেবে প্রয়োজনীয় জমির অভাবের পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ না পাওয়ার মতো অবকাঠামোগত কিছু প্রতিবন্ধকতার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টজনেরা। অনেকে শিল্প-কারখানা নির্মাণ করে এবং উৎপাদনের জন্য যন্ত্রপাতি বসিয়েও উৎপাদন শুরু করতে পারছেন না। কারণ, তাদের গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ দেয়া হচ্ছে না। সংযোগ পেলেও সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করার জন্য যথেষ্ট সময় পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। পাওয়া যাচ্ছে না গ্যাসও। মূলত ঘুষ-দুর্নীতির কারণেই এসব ঘটছে বলে খবরে জানা যাচ্ছে। তাছাড়া বিদ্যুতের দ্রুত বেড়ে চলা মূল্যও বিনিয়োগ না বাড়ার একটি প্রধান কারণ। একই কারণে আবার কর্মসংস্থান বা চাকরিরও সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। এভাবে সব মিলিয়েই বিনিয়োগ পরিস্থিতির আশংকাজনক অবনতি ঘটেছে।
উদ্বেগের কারণ হলো, ২০১৪ সালে যখন বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি হঠাৎ ঋণাত্মক বা নেতিবাচক হতে শুরু করেছিল তখন রাজনৈতিক সহিংসতাকে কারণ হিসেবে দায়ী করেছিলেন ক্ষমতাসীনরা। কিন্তু গত প্রায় আড়াই বছরে সে অবস্থায় যথেষ্ট পরিবর্তন ঘটেছে এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত ও স্বাভাবিক রয়েছে। তা সত্ত্বেও যেহেতু বিনিয়োগ বাড়ছে না সেহেতু প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা দরকার। আর তেমন যে কোনো অনুসন্ধানে দেখা যাবে, কারণ আসলে সরকারের নেতিবাচক নীতি এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর দুর্নীতি। এ ব্যাপারে অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, অত্যধিক গুরুত্ব দিয়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ দেয়াসহ অবকাঠামোগত সকল অসুবিধা ও প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। সেই সাথে ব্যাংক ঋণের সুদের হারও যথেষ্ট পরিমাণে কমানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলেই দেশী শুধু নয়, বিদেশী বিনিয়োগও বাড়তে পারে বলে তথ্যাভিজ্ঞরা মনে করেন। আমরা তাই বিনিয়োগ বাড়ার জন্য সহায়ক নীতি ও পদক্ষেপ নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ