ঢাকা, বৃহস্পতিবার 2 December 2021, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ২৬ রবিউস সানি ১৪৪৩ হিজরী
Online Edition

সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে বিশ্বসম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

অনলাইন ডেস্ক: সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে বিশ্বসম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেইসাথে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ সংস্থা হিসেবে জাতিসঙ্ঘকে আরো টেকসই ও প্রাসঙ্গিক করে তুলতে বিশ্বনেতাদের নতুন করে শপথ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তন ও শরনার্থী ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ তুলে ধরার পাশাপাশি বিশ্বসম্প্রদায়কে এসব বিষয়ে মতভিন্নতা বাদ দিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিউ ইয়র্কস্থ জাতিসঙ্ঘ সদরদফতরে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের ৭১তম অধিবেশনে দেয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।

বক্তব্যের শুরুতেই বিদায়ী সেক্রেটারি জেনারেল বানকি মুনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব বান কি মুন চলতি বছর তার দায়িত্ব গ্রহণের পূর্ণ মেয়াদশেষ করতে যাচ্ছেন। গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের মধ্যে অনেক বৈঠক এবং আলোচনা হয়েছে। আমি কৃতজ্ঞচিত্তে সেগুলো স্মরণ করছি। তিনি সবসময়ই বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে বাংলাদেশের উন্নয়নের অর্জনগুলোকে বাকি বিশ্বের জন্য ‘রোল মডেল’হিসেবে তুলে ধরেছেন। আমি তার এবং মাদাম বানের অব্যাহত সাফল্য ও সুস্বাস্থ্য কামনা করছি।

এর পরপরই প্রধানমন্ত্রী অভিবাসী ও শরণার্থীদের বিষয়ে তার উদ্বেগের কথা বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরেন। এসময় তিনি বলেন, আমাদের এই বিশ্ব উত্তেজনা এবং ভীতিকর পরিস্থিতি থেকে মুক্ত নয়। বেশ কিছু স্থানে সহিংস-সংঘাতের উন্মত্ততা অব্যাহত রয়েছে। অকারণে অগণিত মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। যারা সংঘাত থেকে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছেন, প্রায়ই বিভিন্ন দেশ তাদের নিরাপত্তা দিতে অস্বীকার করছে। কখনো কখনো অত্যন্ত জরুরি মানবিক চাহিদা অগ্রাহ্য করা হচ্ছে অথবা সেগুলো প্রবেশে বাধার সৃষ্টি করা হচ্ছে।

এসময় তিনি আইলান কুর্দির বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, কী অপরাধ ছিল সাগরে ডুবে যাওয়া সিরিয়ার তিন বছর বয়সী নিষ্পাপ শিশু আইলান কুর্দির? কী দোষ করেছিল পাঁচ বছরের শিশু ওমরান, যে আলেপ্পো শহরে নিজ বাড়িতে বসে বিমান হামলায় মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে? একজন মা হিসেবে আমার পক্ষে এ সকল নিষ্ঠুরতা সহ্য করা কঠিন। বিশ্ববিবেককে কি এসব ঘটনা নাড়া দেবে না?

তিনি আরো বলেন, অভিবাসী ও শরণার্থীদের স্বদেশ এবং গন্তব্য উভয়স্থানের জন্যই সম্ভাবনাময় পরিবর্তনের নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশ নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নিয়মিত অভিবাসন-সংক্রান্ত 'গ্লোবাল কমপেক্ট'-এর রূপরেখা প্রণয়নে সহযোগিতা করতে আগ্রহী।

সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস চরমপন্থাকে বর্তমান সময়ের দু’টি প্রধান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই চ্যালেঞ্জগুলো এখন কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ না থেকে বিশ্বের সকল স্থানেই ছড়িয়ে পড়ছে। কোনো দেশই আপাতদৃষ্টিতে নিরাপদ নয়, কোনো ব্যক্তিই এদের লক্ষ্যবস্তুর বাইরে নয়। আমেরিকা থেকে ইউরোপ, আফ্রিকা থেকে এশিয়ায় অগণিত নিরীহ মানুষ সন্ত্রাসবাদের শিকার হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, সন্ত্রাসীদের কোনো ধর্ম, বর্ণ বা গোত্র নেই। এদেরকে সর্বতোভাবে সমূলে উৎপাটন করার সংকল্পে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। সন্ত্রাস ও সহিংস জঙ্গিবাদের মূল কারণগুলো আমাদের চিহ্নিত করতে হবে। একইসঙ্গে এদের পরামর্শদাতা, মূলপরিকল্পনাকারী, মদদদাতা, পৃষ্ঠপোষক, অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহকারী এবং প্রশিক্ষকদের খুঁজে বের করতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী নিজেকে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, সন্ত্রাস ও সহিংস জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আমি ‘জিরো টলারেন্স’নীতিতে বিশ্বাসী। আমাদের দেশে যেসব সন্ত্রাসী গ্রুপের উদ্ভব হয়েছে, তাদের নিষ্ক্রিয় করা, তাদের নিয়মিত অর্থসরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা এবং বাংলাদেশের ভূখণ্ড থেকে আঞ্চলিক সন্ত্রাসীদের কার্যক্রম নির্মূল করার ক্ষেত্রে আমাদের সরকার সফল হয়েছে। কয়েকটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীচক্রের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় কিছু প্রান্তিক গোষ্ঠী তাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে পুনঃসংগঠনের মাধ্যমে নতুনরূপে আবির্ভূত হয়ে থাকতে পারে।

গুলাসানে হলি আর্টিসানে হামলার বিষয়টি তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১ জুলাই আমরা এক ঘৃণ্য সন্ত্রাসী হামলার শিকার হই। ঢাকার একটি রেস্তোরাঁয় কিছু দেশীয় উগ্রপন্থী সন্ত্রাসী ২০ নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। এসময় ১৩ জন পণবন্দিকে আমরা উদ্ধার করতে সমর্থ হই। এই ভয়ঙ্কর ঘটনা বাংলাদেশের জনগণের মনে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে আমরা এই নতুন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছি। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে জনগণকে সচেতন করতে এবং এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে আমরা ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। এতে সাড়া দেয়ার জন্য আমি সমগ্র জাতির প্রতি আহ্বান জানিয়েছি। আমরা সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছি। আমি আত্মবিশ্বাসী যে, জনগণের দৃঢ়তা ও সহযোগিতায় আমরা বাংলাদেশের মাটি থেকে সন্ত্রাসীদের সমূলে উচ্ছেদ করতে পারব।

একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাসী এবং উগ্রবাদীদের অর্থ ও অস্ত্র-শস্ত্রের যোগান বন্ধ এবং তাদের প্রতি নৈতিক এবং বৈষয়িক সমর্থন না দেয়ার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়কে আহ্বান জানান।

রাজধানী ঢাকায় একটি ‘শান্তি প্রতিষ্ঠা কেন্দ্র’স্থাপনের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।
ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রসঙ্গে সরকারের সাফল্য তুলে ধরে প্রধান মন্ত্রী বলেন, জনগণের দোরগোড়ায় ২০০ ধরনের সেবা পৌঁছে দিতে আমরা দেশব্যাপী প্রায় ৮ হাজার ডিজিটাল কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সারাদেশে ১৬ হাজার ৪৩৮টি কমিউনিটি ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠাকরা হয়েছে। মোবাইল ফোন এবং ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমেও এসব সেবা দেয়া হচ্ছে। আগের তুলনায় আরো বেশিসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ এবং ডিজিটাল ল্যাব ব্যবহৃত হচ্ছে।

আঞ্চলিক কানেকটিভিটির বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৌশলগত অবস্থান বাংলাদেশকে আঞ্চলিক সংযোগ, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক আউটসোর্সিং-এর ক্ষেত্রে একটি উদীয়মান কেন্দ্রস্থলে পরিণত করেছে। আমাদের উন্নয়ন উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সঙ্গতি রাখতে আমরা বেশ কিছু বৃহাদাকার অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণ করেছি। বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত এবং নেপাল (বিবিআইএন)-এর মধ্যে বাণিজ্য এবং নাগরিকদের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য মাল্টি-মোডাল ট্রান্সপোর্ট নেটওয়ার্ক তৈরি করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের রূপরেখা তুলে ধরতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিজস্ব অর্থায়নে আমরা ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা বহুমুখী সেতুনির্মাণ করছি। একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের আলোচনা চলছে। তৃতীয় সমুদ্রবন্দর পায়রার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। রাজধানী ঢাকা শহরে মেট্রোরেলের নির্মাণকাজও শুরু হয়েছে।সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার সুযোগ তৈরি করে দিতে দেশব্যাপী এক শ’টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।

শেখ হাসিনা আরো বলেন, সামষ্টিক এবং আর্থ-সামাজিক সূচকের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আমাদের অব্যাহত উন্নয়ন অভিযাত্রাকেই সমর্থন করে। ২০১৫-’১৬ অর্থ-বছরে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দেশ যেখানে সীমিত সম্পদের সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে দারিদ্র্যের হার দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। দারিদ্র্যের হার ১৯৯১ সালের ৫৬.৭ শতাংশ হতে বর্তমানে ২২.৪ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে ইউএনডিপি’র মানব উন্নয়ন ক্যাটাগরিতে মধ্যম এবং বিশ্বব্যাংকের মান অনুযায়ী নিম্ন মধ্যম-আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছি।

বিশ্ব মন্দা সত্ত্বেও বিগত সাত বছরে আমাদের রপ্তানি আয় প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৩৪.২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হয়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩.৫ বিলিয়ন থেকে সাড়ে আট গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৩১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এ সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণও তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা নির্বিচারে হত্যার ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতা ও বিচার নিশ্চিত করতে জাতীয় বিচারিকপ্রক্রিয়ার ভূমিকাকে গুরুত্ব প্রদানে সোচ্চার থাকব। ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য স্থানীয় অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা বিগত কয়েক দশকের বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি।

তিনি আরো বলেন, মধ্যপ্রাচ্য শান্তিপ্রক্রিয়া পুনরায় চালু ও ভ্রাতৃপ্রতিম ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি বৈরিতা নিরসনের জন্য সাম্প্রতিক প্রচেষ্টাগুলোকে অবশ্যই সঠিক দিকে পরিচালিত করতে হবে।

বিশ্বসম্প্রদায়ের শান্তি ও আস্থার প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতিসঙ্ঘের কার্যক্রম আরো গতিশীল ও কার্যকর করবার প্রতি জোর আরোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। এসময় তিনি বলেন, ‘এক মানবতার’ জন্য কাজ করার উদ্দেশে আমরা সকলে এখানে সমবেত হয়েছি। মতের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও আসুন আমরা মানবতার স্বার্থে সকলে অভিন্ন অবস্থানে উপনীত হই এবং বিশ্ব থেকে সংঘাত দূর করে শান্তির পথে এগিয়ে যাই। এক্ষেত্রে জাতিসংঘ হতে পারে আমাদের জন্য একটি অনন্য প্লাটফর্ম।আসুন আমরা এই সংস্থাকে আরও টেকসই এবং প্রাসঙ্গিক করে তুলতে নতুন করে শপথ গ্রহণ করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ