বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

মাতৃভাষা বাংলা ভাষা খোদার সেরা দান

সাদেকুর রহমান : বার বার ফিরে আসে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবাহী ফেব্রুয়ারি মাস। আমাদেরকে শেখায় ভাষাপ্রেম, দেশপ্রেম, স্বজাত্যবোধ আরও কত কী! অমর ‘একুশের' বদৌলতেই বাংলা ভাষাকেই আমরা আপন করে পেয়েছি এ কথা অস্বীকার করার কোন জোঁ নেই। যাই হোক, বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠা কেবল বায়ান্ন কিংবা একুশের ওপর ভিত্তি করে নয়। জাতীয় চেতনার সৌধ বিনির্মাণের নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘ পরিক্রমা, অযুত-নিযুত মানুষের আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ত অংশীদারিত্ব। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১৯৪৭ সাল থেকেই মূলত জনপদে বাংলা ভাষা আন্দোলন শুরু হয়। সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক উপায়ে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল এ অঞ্চলের প্রায় চার কোটি বাংলা ভাষাভাষী। উনিশশ' সাতচল্লিশের জুন থেকে ডিসেম্বর মাস ছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে টালমাটাল। ঐ বছরই ১৪ আগস্ট পাকিস্তান বিভক্তির পরপরই কেন্দ্রীয় সরকারের স্বেচ্ছাচারিতা বর্তমান বাংলাদেশের মানুষের কাছে অসহনীয় মনে হয়। ১৭ মে দাক্ষিণাত্যের হায়দরাবাদে অনুষ্ঠিত উর্দুভাষা সম্মেলনে ঘোষণা করা হয়- ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।' এর মাত্র মাস দুয়েক পরেই আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. জিয়া উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, উর্দুকেই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।' এ ধরনের বক্তব্যের প্রতিবাদে সারাদেশে ঝড় ওঠে। নবেম্বর মাসের প্রথমে বাংলাকে বাদ দিয়ে ডাক বিভাগের খাম, পোস্টকার্ড, ডাকটিকিট। রেলটিকিট, মানিঅর্ডার ফরম ইত্যাদি উর্দুর পাশাপাশি ইংরেজিতে ছাপা হয়। এর প্রতিবাদে সরকারি কর্মচারীদের একটি অংশ এবং ছাত্ররা মিছিল নিয়ে রাস্তায় নামে। সভার মাধ্যমে প্রতিবাদ জানায়। আর বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার জোরালো দাবি ওঠে। মিছিলের শ্লোগান ছিল- ‘বাংলাকে সবকিছুতে স্থান দিতে হবে', ‘বাংলা ভাষা ও বাঙ্গালীর সাথে বেঈমানী চলবে না', ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই', ‘উর্দুর সাথে বিরোধ নাই', ‘উর্দু-বাংলা ভাই ভাই' ইত্যাদি। ১২ নবেম্বর ঢাকায় বুদ্ধিজীবীগণ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি পেশ করেন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের কাছে। ২৭ নবেম্বর করাচিতে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান শিক্ষা সম্মেলনে পূর্ববাংলার ভাষা প্রশ্নে বিতর্ক ও অসন্তোষ দেখা দেয়। এ থেকেই মানুষ ফুঁসতে থাকে তীব্র ক্ষোভে। এদিকে ৪ ও ৫ ডিসেম্বরে করাচিতে ‘পবায়ে উর্দু' আব্দুল হকের সভাপতিত্বে উর্দুভাষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান। এই সম্মেলনেই উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করার প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং প্রস্তাবটি অবিলম্বে কার্যকর করার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানানো হয়। এই খবর ঢাকায় পৌঁছলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সঞ্চার হয়। ৫ ডিসেম্বর ছাত্র-শিক্ষকের এক যৌথ সমাবেশে মাওলানা আকরম খাঁ ঘোষণা করেন, ‘বাংলা ছাড়া আর কোন ভাষাকে পূর্ববঙ্গের রাষ্ট্রভাষা করার চেষ্টা করা হলে পূর্ববাংলা বিদ্রোহ করবে এবং তিনিই সে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিবেন। ৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্ররা প্রতিবাদ সভার পর মিছিল করে কৃষিমন্ত্রী সৈয়দ আফজাল হোসেন, সিভিল সাপ্লাই মন্ত্রী নূরুল আমীন ও মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সাথে সাক্ষাৎ করে। তারা প্রত্যেকেই গণপরিষদে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিকে সমর্থন করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। এতে নেতৃত্ব দেন অধ্যাপক (পরে প্রিন্সিপাল) আবুল কাসেম, মুনীর চৌধুরী, কল্যাণ দাসগুপ্ত, একেএম আহসান প্রমুখ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ