বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

খাঁচায় পোষা বাঘের মতোই বোধহয় স্বাভাবিক ক্ষিপ্রতা ভুলে গেছে বিডিআর

শহীদুল ইসলাম : গত বছরের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বিডিআর বিদ্রোহের পর শুধু ৫৭ জন চৌকস সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনের মৃত্যু ঘটাই আসল ক্ষতি নয়। আসল ক্ষতি হয়েছে ঐতিহ্যবাহী সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী বিডিআর নামক একটি বাহিনীই যেন শেষ হয়ে গেছে। সিলেটের জৈন্তাপুর সীমান্তে গত ৪ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত ঘটনার আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ করলে সেটাই যেন প্রমাণিত হচ্ছে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে মাত্র এক বছরেই বিডিআর কি খাঁচা বন্দি বাঘের মত তার ক্ষিপ্রতা, ঐতিহ্য, জন্ম-পরিচয় সবই ভুলে গেছে! বিষধর সাপের বিষ না থাকলে তা ধোড়া সাপের চেয়েও গুরুত্বহীন। আমাদের সীমান্ত কি তাহলে আগামীতে অরক্ষিতই থাকবে? এ প্রশ্ন যেমন দানা বেঁধে উঠেছে তেমনি রাজনৈতিক মহলে এ প্রশ্নও দেখা দিয়েছে যে, এটা ভারতের কাছে আস্থা অর্জনের জন্য বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবেই প্রতিরোধের পথ পরিহার করেছে বিডিআর। সিলেট সীমান্তের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, গত ৪ ফেব্রুয়ারি এই সীমান্তে বিডিআর ও বিএসএফের মধ্যে যা ঘটেছে তাতে বিডিআরকে লড়াই করতে বাস্তবে দেখা যায়নি। ২০০১ সালে এই সীমান্তেই বিডিআর পাদুয়া পুনরুদ্ধার করেছিল বিএসএফের কাছ থেকে। সিলেটবাসী ২০০১ সালে যে বিডিআরকে পাদুয়া অভিযানে দেখেছে সেই অভিযান দেখেনি গত ৪ ফেব্রুয়ারি। সূত্র জানায়, ৪ ফেব্রুয়ারি সকালে ৪ বিডিআর জওয়ান নিয়মিত টহলে ছিল জৈন্তাপুর সীমান্তে। জৈন্তাপুর ফাঁড়ির এই জওয়ানদের লক্ষ্য করে ওপারের বিএসএফের মুক্তারপুর ফাঁড়ির সদস্যরা তাদের লক্ষ্য করে গুলী ছোঁড়ে। বেলা তখন ১১টা। এই গুলীতে বিডিআরের নায়েক সুবেদার মুহিবুর রহমান মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। সহকর্মী সহযোদ্ধা সিনিয়র ওস্তাদকে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখে তারই অধীনস্ত সহকর্মীরা লেজ গুটিয়ে চলে এসেছে তাদের ফাঁড়িতে। সূত্রমতে, সহকর্মীর গুলীবিদ্ধ হওয়ার সময় অপর তিন বিডিআর সদস্য বিএসএফকে লক্ষ্য করে একটি গুলীও ছোঁড়েনি। সীমান্তের ৫০ গজ ভিতরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে পোশাকধারী বিএসএফ আহত বিডিআর নায়েকের দেহ টেনে হেঁচড়ে নিয়ে গেছে তাদের নিয়ন্ত্রণে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ মতে এমন শিয়ালের মত লেজ গুটিয়ে পালানোর কোন ঐতিহ্য বিডিআরের নেই। অনেকেই প্রশ্ন করেছে তাহলে কি ওপরের কোন নির্দেশ ছিল এমন যে বিএসএফ যাই করুক বিডিআর গুলী ছুঁড়তে পারবে না। তাদের কি গুলী ছোঁড়ার জন্য আগে থেকেই নিষেধাজ্ঞা দেয়া ছিল? বিডিআরের তথ্যমতে বেলা ১১টায় এ ঘটনার পর বিএসএফকে পতাকা বৈঠকে বসার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বেলা ১২টায় প্রথমে একবার আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাতে সাড়া দেয়নি বিএসএফ। পরে বেলা ২টায়ও আবার চেষ্টা করা হয়। তাতেও সাড়া মেলেনি। উল্টো বিএসএফ শুধু এক বিডিআর সদস্যকে গুলী করেই ক্ষান্ত হয়নি। তারা তাকে নিজেদের আয়ত্বে তো নিয়েছেই উপরন্তু সীমান্তবাসী সারাদিনই বিএসএফকে একতরফা গুলী ছুঁড়তে দেখেছে। তাদের উপর্যুপরি গুলীবর্ষণে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ৫টি গ্রামের মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে জীবন রক্ষায় অন্যত্র সরে যায়। বিকেল ৪টা পর্যন্ত একটানা একতরফা গুলীবর্ষণ হয়েছে বিএসএফের পক্ষ থেকে। আর তার বিপরীতে বিডিআর শুধু পতাকা বৈঠকেই আহবান করেছে। ৪টার পরে বিডিআর গুলী ছুঁড়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে জানা গেছে। ৪টার পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গুলী এবং পাল্টা গুলী চলার পর বিএসএফ পতাকা বৈঠকে বসতে রাজি হয়েছে। রাত ৮টায় পতাকা বৈঠক বসে তামাবিল সীমান্তে। এই বৈঠকের পর আহত বিডিআর সদস্যকে ফেরত দেয়া হয়। এরপর গোলাগুলী বন্ধ হয়েছে। তবে ঐ সীমান্তে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসতে সময় লেগেছে পরের দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত। সর্বশেষ তথ্য মতে সীমান্তের ঐ গ্রামের মানুষ তাদের বাড়িঘরে ফিরে এসেছে। তবে পরিস্থিতি গতকাল পর্যন্ত ছিল থমথমে। গত বছর পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের সাথে সাথে ঢাকার বাইরেও ঘটে বিদ্রোহ। তবে ঢাকার মত এতো হত্যাকান্ড কোথায়ও ঘটেনি। ঐ ঘটনার পর বিভিন্ন সীমান্তে বিডিআরকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সীমান্ত হয়ে যায় অরক্ষিত। অনেক দিন ধরেই বিডিআরকে পোশাক এবং অস্ত্র, বুট ছাড়াই সীমান্ত পাহারা দিতে দেখা গেছে। বিডিআর অস্ত্র ও পোশাক পেয়েছে অতি সম্প্রতি। ইতোমধ্যে বিডিআরের নাম পরিবর্তন করে বিজিবি রাখা হয়েছে। বিডিআরই যেন শেষ হয়ে গেছে। এক বছর সীমান্ত রয়েছে বাস্তবে বিএসএফের দয়ার ওপর। তবে সেই দয়ার প্রমাণ দিয়েছে তারা এক বছরে প্রায় ১শ নিরীহ বাংলাদেশীকে গুলী করে হত্যার মাধ্যমে। তবে সরাসরি বিডিআরকে গুলী করার ঘটনা এটাই প্রথম। আর তাতেই অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করতে হলো বিডিআরের অসহায়ত্ব। তবে অভিজ্ঞ মহলের অনেকেই বলছেন, বিডিআর খাঁচার বন্দি বাঘের মতো তার থাবা, হাঁক, ডাক ভুলে যাওয়ার কথা নয়। উপরের নির্দেশই হয়তো রয়েছে এমন যে বিএসএফকে গুলী ছোঁড়া যাবে না। তাহলে বন্ধুত্ব (!) নষ্ট হবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী ভারতের কাছে যে আস্থা অর্জন করে এসেছেন দিল্লী সফরের মাধ্যমে সেই আস্থার হয়তো সংকট দেখা দেবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ