ঢাকা, মঙ্গলবার 30 November 2021, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ২৪ রবিউস সানি ১৪৪৩ হিজরী
Online Edition

বন্যায় ৯ জনের মৃত্যু, নিম্নাঞ্চলে আরও প্লাবনের শঙ্কা

অনলাইন ডেস্ক: চলতি মৌসুমের বর্ষায় দেশের বিভিন্ন স্থানে নদ-নদীর পানি বেড়ে বিপদ সীমার উপরে যাওয়ার পর বানের জলে চার জেলায় অন্তত নয়জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর।

আর আগামী ৪৮ ঘণ্টায় বিভিন্ন স্থানে নতুন নতুন এলাকার প্লাবিত হয়ে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কার প্রকাশ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

বৃহস্পতিবার পর্যন্ত গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, শরীয়তপুর, কুড়িগ্রাম ও সুনামগঞ্জসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্যা বিরাজ করছে।

নদীর পানি বাড়তে থাকায় দেশের অন্তত আট জেলায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর জানায়, লাখো পরিবার পানিবন্দির পাশাপাশি ফসলি জমি, রাস্তাঘাট, বাঁধ, ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

অধিদপ্তরের জরুরি সাড়াদান কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছালেহ উদ্দিন জানান, বন্যায় নিহত নয়জনের মধ্যে জামালপুরে বানের পানিতে ডুবে দুই শিশুসহ তিনজন মারা যায়। এছাড়া কুড়িগ্রামে দুই শিশু, রংপুরে এক শিশু এবং গাইবান্ধায় মারা যায় তিনজন।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, বুড়িগঙ্গা, বালু, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যা পানি বাড়ায় ঢাকার আশপাশের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

বৃহস্পতিবার নদ-নদীগুলোর ৯০টি পয়েন্টের মধ্যে ৫৮টিতে পানি বেড়েছে; এর মধ্যে ১৭টিতে পানি বিপদসীমার ওপরে বইছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী রিপন কর্মকার জানান, বহ্মপুত্র-যমুনা এলাকায় আগামী ৪৮ ঘণ্টায়ও বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। ধরলা ও সুরমা নদীতে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।

তিনি বলেন, “শীতলক্ষ্যার নারায়ণগঞ্জ পয়েন্টে পানি বাড়ছে, বিপদসীমার নিচে রয়েছে। এরইমধ্যে কিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।”

তবে উজানে ভারতে বৃষ্টি কমার সম্ভাবনা থাকায় দুই থেকে তিন দিন পরে দেশের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে আশা করছেন বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের এই প্রকৌশলী।

উপদ্রুত এলাকায় বানভাসীদের প্রয়োজনীয় সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়ছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে

অধিদপ্তরের তথ্য মতে, জামালপুরে বন্যার পানিতে জামালপুর জেলার ছয়টি উপজেলার মোট ৪৮টি ইউনিয়ন বন্যার পানিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে ৭৯ হাজার ৭১১টি পরিবারের মধ্যে ৯২টি ঘর-বাড়ি সম্পূর্ণ এবং ৩,১৫৫ টি ঘর-বাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এছাড়া ৪,০৯০ হেক্টর জমির ফসল নিমজ্জিত হওয়ার পাশাপাশি কাঁচা রাস্তা ৩৬ কিলোমিটার (সম্পূর্ণ), আংশিক ৫২৬ কিলোমিটার, পাকা রাস্তা তিন কিলোমিটার (সম্পূর্ণ), আংশিক সাড়ে ছয় কিলোমিটার, বাঁধ (সম্পূর্ণ) চার কিলোমিটার ও আংশিক ১.৯০ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বন্যায় এসব এলাকার ২০৬ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আংশিক এবং ২৮টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর বানের পানিতে ডুবে মারা গেছে দুই শিশুসহ তিনজন।

কুড়িগ্রামের বন্যা উপদ্রুত এলাকা

কুড়িগ্রামে নয়টি উপজেলার ৫৬টি ইউনিয়নের ৭১৬টি গ্রামের  এক ২৩ হাজার ৭৪ টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নদী ভাঙনে ছয় হাজার ৪৯০টি ঘর-বাড়ি সম্পূর্ণ নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ ২০টি ও আংশিক ২২৮টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যার পানিতে দুই শিশু ও ৭৭ টি গবাদি পশু মারা যায়।

নীলফামারীর দুইটি উপজেলার আটটি ইউনিয়নের ১৬টি গ্রামের তিন হাজার ৮৪০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে ঘর বাড়ি এক হাজার ১৫০টি সম্পূর্ণ ও চার হাজার ৪০০টি আংশিক, দুইটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ ও সাতটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ফরিদপুরের নয়টি উপজেলার মধ্যে চারটি উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে দুই হাজার ২৮১টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৩৪টি পরিবার নদী গর্ভে বিলীন হয়ে অন্যত্র চলে যায়।

রংপুর জেলার আটটি উপজেলার মধ্যে তিনটি উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের ৫৩টি গ্রামের ছয় হাজার ৮৫৯টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বানের জলে ডুবে মারা যায় এক শিশু।

মানিকগঞ্জ জেলার একটি উপজেলার দুইটি ইউনিয়নের ৪০০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বানের জলে।

রাজবাড়ীতে পদ্ম নদীর পানি ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। তবে কোনো ক্ষয়ক্ষতির হয় নি।

সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর তীরের পাঁচটি উপজেলার ৩৭টি ইউনিয়নের ২২৫টি গ্রামের ছয় হাজার ৫২৪টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সম্পূর্ণ ৬৬০ টি, আংশিক ৪,৭৮৬ টি ঘর-বাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ ৪টি ও আংশিক ৩৫ টি ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

সুনামগঞ্জের ১১টি উপজেলার মধ্যে সাতটির ৪০টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ১০ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

টাঙ্গাইলের দুইটি উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের ১২,১৮৫ টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৪ টি ইউনিয়নের মধ্যে ৪টি সম্পূর্ণ ও ১০টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া ২,১৪৪.৮৫ হেক্টর জমির ফসল পানি নিচে নিমজ্জিত রয়েছে।

কুড়িগ্রামের বন্যা উপদ্রুত এলাকা

বগুড়ার ১২টি উপজেলার মধ্যে তিনটি উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নের ১২৯টি গ্রামে নিম্নাঞ্চল বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়ে ২৩ হাজার ৯০০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় ৮৫টি, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১৪টি ও ৪টি মাদ্রাসা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

লালমনিরহাটের পাঁচটি উপজেলার ২৬টি ইউনিয়নের ৪৯,৮৬০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া মোট ৭৯০টি পরিবার নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, সদর, সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলার ৩৩টি ইউনিয়নের ২২৩টি গ্রামের ৪৫ হাজার ৩১৫টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৩৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পাঠদান হতে বিরত রয়েছে। বন্যার পানিতে ডুবে তিনজন নিহত হয়।

পাউবোর সহকারী প্রকৌশলী রিপন কর্মকার জানান, উজানে টানা সপ্তাখানেকের ভারিবৃষ্টিতে ইতোমধ্যে অন্তত ১২টি জেলার নিচু এলাকা এখন বন্যাকবলিত। এর আয়তন বাংলাদেশের মোট আয়তনের ২০ থেকে ২২ শতাংশ।

এই বন্যাকে স্বাভাবিক বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা। সামনে কিছুটা অবনতি ঘটলেও গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র একসঙ্গে ফুঁসে না উঠায় বন্যা ভয়াবহ রূপ নেবে না বলে মনে করছেন তারা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ