বুধবার ১২ আগস্ট ২০২০
Online Edition

হাজারীবাগ ট্যানারি কারখানা স্থানান্তরে সরকারই মারাত্মক গড়িমসি করছে

স্টাফ রিপোর্টার : ‘হাজারীবাগ ট্যানারি কারখানা সাভারে স্থানান্তর পরিস্থিতি, সমস্যাদি ও করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করে বলেছেন, হাজারীবাগ ট্যানারি কারখানা সাভারে স্থানান্তরে সরকারের গড়িমসি মারাত্মক। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলেও বাস্তবে কারখানা সরিয়ে নেয়ার মত প্রয়োজনীয় সুবিধাদি সেখানে এখনও তৈরী হয়নি। প্রয়োজনীয় অনেক সুযোগ সুবিধাই সেখানে অপ্রতুল, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নেই। সরকার ঘোষিত অনেকগুলো কার্যক্রম বাস্তবে এখনও সম্পন্ন হয়নি অথচ সেগুলো ছাড়া সেখানে গেলেও কারখানা চালু করা সম্ভব হবে না।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর উদ্যোগে গতকাল মঙ্গলবার  সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাপা’র সহসভাপতি গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদের সভাপতিত্বে ও বাপা’র সাধারণ সম্পাদক ডাঃ মোঃ আব্দুল মতিনের সঞ্চালনায় এতে মূল বক্তব্য রাখেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের “ট্যানারি শিল্প নগরী ঢাকা”র প্রকল্প পরিচালক মোঃ আব্দুল কাইয়ুম। দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ২৫ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী মোঃ দেলোয়ার হোসেন, ২৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোঃ হুমায়ুন কবির, ট্যানারি ওনার্স এসোসিয়েশনের কারিগরি বিশেষজ্ঞ সঞ্জয় কুমার ঠাকুর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক এম শহীদুল ইসলাম, কামরুল ইসলাম চৌধুরী, এ্যানেসথ্যাটিস্ট চিকিৎসক ও হাজারীবাগের স্থানীয় বাসিন্দা ডা. মাহবুবুল ইসলাম, হাজারীবাগ ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ ও বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলনের সদস্য সচিব মিহির বিশ্বাস।
সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ৭০ বছরের ঐতিহ্যবাহী শিল্প যাতে আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হয় সেটিই আমরা চাই। এক এলাকা বিপদমুক্ত করতে গিয়ে, অন্য এলাকা যাতে আবারও ঝুঁকির মধ্যে না পড়ে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। একটি গ্রহণযোগ্য আলোচনার মাধ্যমে যুক্তিযুক্ত সময়ের মধ্যে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরিয়ে নেয়ার আহ্বান জানান তিনি। ট্যানারি শ্রমিক ও পরিবেশের প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কারখানা স্থানান্তর নিশ্চিত করতে হবে’।
সঞ্জয় কুমার ঠাকুর বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলেও বাস্তবে কারখানা সরিয়ে নেয়ার মত প্রয়োজনীয় সুবিধাদি সেখানে তৈরী হয় নি। প্রয়োজনীয় অনেক সুযোগ সুবিধাই সেখানে অপ্রতুল, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নেই। সরকার ঘোষিত অনেকগুলো কার্যক্রম বাস্তবে এখনও সম্পূর্ণ হয়নি, অথচ সেগুলো ছাড়া সেখানে গেলেও কারখানা চালু করা সম্ভব হবে না। তিনি বলেন: ‘সাভারে স্থানান্তরে ট্যানারি মালিকদের প্রয়োজন হবে ৫ হাজার কোটি টাকা অথচ সরকার প্রদান করছে মাত্র ২৫০ কোটি টাকা।  অন্যান্য এই অবস্থায় কারখানা সেখানে সরিয়ে নিতে গেলে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে’।
আব্দুল কাইয়ুম বলেন, একটি আধুনিক সিইটিপি নির্মাণসহ চামড়া শিল্পনগরী স্থাপনের মাধ্যমে হাজারীবাগসহ দেশের বিভিন্নস্থানে অবস্থিত ট্যানারি শিল্পসমূহ এই শিল্পনগরীতে স্থানান্তর করে পরিবেশসম্মত উৎপাদন নিশ্চিত করতে আমরা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সেই লক্ষ্যে প্রায় ২০০ একর জমির উপর ১৫৫টি শিল্প ইউনিটের জন্য ২০৫টি প্লট নির্মাণ করা হচ্ছে। এজন্য প্রয়োজনীয় পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থাসহ আনুষঙ্গিক অন্যান্য সুবিধাদিও নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কার্যক্রম চলছে। ইতিমধ্যে হাজারীবাগের ট্যানারি মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেয়াও শুরু হয়েছে। সরকারের পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী নির্মাণাধীন সিইটিপির ২টি মডিউলের নির্মাণ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
আবুল কালাম আজাদ বলেন, সাভারে স্থানান্তরিত জায়গায় এই শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত শ্রমিকদের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হয়নি। তাদের বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা সেবার বিষয়টি একেবারেই  অবহেলিত রয়েছে, তাদের জন্য কিছুই করা হয়নি। শ্রমিকদের এই সমস্যাগুলো সর্বাগ্রে বিবেচনায় আনার জন্য তিনি কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান’।
দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘শুধুমাত্র আল্টিমেটাম না দিয়ে, প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা ও স্থান সংকুলান নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। পরিকল্পিতভাবে সিদ্ধান্ত না নিতে পারলে বংশী নদীও কয়েকমাসের মধ্যে বুড়িগঙ্গার পরিস্থিতি হবে। আমরা চাই একটি সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে হাজারীবাগ ট্যানারিকে সাভারে স্থানান্তর করা হোক।
হুমায়ন কবির বলেন, ট্যানারির বর্জ্য বুড়িগঙ্গার পানিকে দূষিত করার ফলে এখানকার নদী ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। ঢাকার প্রাণ এই দৃষ্টিনন্দন সুন্দর নদীটি এখন মারাত্মক দূষণ, ভরাট ও দখলের শিকার। আমরা চাই সরকার ট্যানারি মালিকদের যথাসম্ভব প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করে সকল কারখানা সরিয়ে নেয়া নিশ্চিত করবে।
অধ্যাপক এম শহীদুল ইসলাম বলেন, বুড়িগঙ্গা যেভাবে দূষিত হয়েছে, এটি যেন সাভারের নদীতে না ঘটে, সেই বিষয়টিকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। স্থানান্তর প্রক্রিয়াটি যাতে অপরিকল্পিতভাবে না হয়ে, বিজ্ঞানসম্মত হয়, মালিকদের ইচ্ছেকৃত ঢিলেমীর ফাঁদে না পড়ে তা নিশ্চিত করতে হবে।
মিহির বিশ্বাস বলেন, আমরা মালিকপক্ষ অথবা সরকারের আর কোন অজুহাত বা গাফিলতি শুনতে চাই না। মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ধৈর্য ধরেছেন, যাদের জন্যই কারখানা স্থানান্তরে এখন অহেতুক বিলম্ব হচ্ছে তাদেরকে আইনী বিচারের মুখোমুখি করা উচিত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ