বুধবার ১২ আগস্ট ২০২০
Online Edition

জ্বালানি তেলের দাম কমানোর সুফল পাবে না দরিদ্র ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ

* তেল চালিত বাস ও পণ্য পরিবহনের ভাড়া  কমেনি
* আন্তর্জাতিক বাজারের রেশিও অনুপাতে তেলের দাম কমেনি
* ডিজেল ও কেরোসিনের দাম কমানো হয়েছে মাত্র ৪.৪১ শতাংশ
কামাল উদ্দিন সুমন : জ্বালানি তেলের দাম নামেমাত্র দায় মুক্তির জন্য কমানো হল। এই সুবিধা সাধারণ ও দরিদ্র মানুষের ঘরে পৌঁছবে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞারা। তারা বলছেন, তেলের দাম যত সামান্য কমানো হয়েছে, তাতে যারা পরোক্ষভাবে জ্বালানি তেলের সুবিধাভোগী তাদের দোরগোড়ায় সে সুবিধা যাওয়ার ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশে নেই। জ্বালানি হিসেবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ডিজেল ও কেরোসিন ব্যবহার করে থাকে। মাঠের কৃষক  তার সেচ কাজে ব্যবহার করে ডিজেল। অথচ সরকার  ডিজেল ও কেরোসিনের দাম কমিয়েছে মাত্র ৪ দশমিক৪১ শতাংশ। আর তুলনামূলক উচ্চবিত্তদের  ব্যবহার করা পেট্রোল ও অকটেনের দাম কমানো হয়েছে গড়ে ১০ শতাংশেরও বেশি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান বিডি রহমতউল্লাহ বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে যে হারে কমেছে সেই রেশিওতে দেশের বাজারে কমানো হয়নি। আন্তর্জাতিক বাজারের রেশিও অনুপাতে দেশের বাজারে জ্বালানির দাম কমানো উচিত। অর্থাৎ যেমন কম দামে জ্বালানি ক্রয় করা হচ্ছে ততটুকু কমিয়ে দেশের জনগণের জন্য জ্বালানি সরবরাহ করা উচিত। আসলে সরকারের ভিতর থেকে কিছু দুর্নীতিবাজ লোক এ কাজটি করছে। তারা লাভবান হবে। তিনি আরো দাবি করেন, তেলের দাম কমানোর সুফল পাবে না বেশীর ভাগ মানুষ।
সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিনিয়ত দাম কমার ফলে পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেক দেশে জ্বালানি তেলের দাম কমানো হয়েছে। গত দুই বছরের এই নিম্নগতি ব্যারেল প্রতি ১২৫ ডলার থেকে এসে দাঁড়িয়েছিল ২৭/২৮ ডলারে। যখন উচ্চ দামে আমদানি করতে হত তখন একাধিকবার বাড়িয়ে সমন্বয় করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু যখন দাম কমে যেতে থাকলো তখন দেশের বাজারে আর কমানো হয়নি। আর এখন নামেমাত্র দাম কমানো হয়েছে।
সূত্র জানায়, বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমতে থাকার পর বিভিন্ন পক্ষ থেকে জ্বালানি তেলের দাম কমানোর সরকারের প্রতি তাগিদ ছিল । বিশেষজ্ঞ ছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংকও জ্বালানি তেলের দাম কমানোর সুপারিশ করেছিল। বলা হচ্ছিল, জ্বালানি তেলের দাম কমালে প্রবৃদ্ধি হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জ্বালানি তেলের দাম কমার কারণে প্রবৃদ্ধির সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। সুবিধা পাওয়া যাবে না, কারণ নামেমাত্র, শুধু কমানোর জন্য কমানো হয়েছে। ফলে সুবিধা অধরা থেকে যাচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র মানুষের কাছে। তবে জ্বালানি তেলের দাম কমানোর সুবিধা কার ঘরে পৌছালো? সাধারণ ও দরিদ্র মানুষের ঘরে নিশ্চয় নয়। সুবিধা হয়তো কিছুটা হয়েছে রাজনৈতিক মাঠে। আর সুবিধা হয়েছে কিছু অনুৎপাদনশীল ব্যবসায়ীর কাছে। বিশেষ করে যারা যানবাহন ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। যার সংখ্যা খুবই কম।
সূত্র জানায়, আমদানি করা জ্বালানির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় ডিজেল। তারপর কোরোসিন। এরপর অকটেন। ডিজেলে চলছে কৃষি সেচ কাজের গভীর ও অগভীর নলকূপ। এতে সরকার আগে থেকেই ভর্তুকি দিচ্ছে। আর চলছে রাস্তা ও নদী পথের যান। আর এই যানে চলছে মধ্যবিত্ত আর দরিদ্র মানুষ। যোগাযোগ মন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী লিটারে এক টাকা কমলে ভাড়া কমবে এক পয়সা। তার মানে তিন টাকা কমেছে তাতে কিলোমিটারে ভাড়া কমবে তিন পয়সা। যদিও গতকাল পর্যন্ত কোন ভাড়া কমেনি। আর কেরোসিনের ব্যবহার সেখানে, যেখানে বিদ্যুৎ পৌঁছেনি। অথবা বিদ্যুৎ পৌঁছলেও কিছু এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠী আলো জ্বালাতে কেরোসিন ব্যবহার করে। বড় এক জনগোষ্ঠী সরাসরি কেরোসিন কেনে। ফলে তারা অল্প একটু সুবিধা পেতে পারে।
ডিজেল অনেক বেশি ব্যবহার হয়। এতে দাম বেশি কমালে আয় অনেক কমে যাবে। সাথে যানবাহন ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না এই অজুহাতে সরকার ডিজেলের দাম কম করে কমিয়েছে।
সূত্র জানায়, জ্বালানির  দাম কমানোর পরেও প্রতিলিটার ডিজেল ও কোরোসিনে লাভ থাকবে ১৭ টাকা। অকটেনে ২৫ টাকা এবং পেট্রোলে ২০ টাকা। অবশ্য আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ওঠা নামার ওপর এই লাভও কম বেশি হবে। এত বেশি লাভ থাকার পরও সামান্য কমানো হয়েছে তেলের দাম।
এদিকে তেলের দাম কমানোর দুই দিন পার হলেও গতকাল পর্যন্ত কোন ধরনের  পরিবহন ভাড়া কমেনি। বরং তেল চালিত বাস তাদের পরিবহন সিএনজি চালিত  বলে উল্টো যাত্রীদের সাথে ঝড়গায়  লিপ্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পরিবহন ভাড়া কমানো সম্পর্কে  বিডি রহমতুল্লাহ  বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম যখন বাড়ে তখন সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন ভাড়া বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। অথচ জ্বালানি তেলের দাম কমানোর পরও পরিবহন ভাড়া কমানোর কোনো উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। পরিবহন মালিকরা তো আসলে কোনো না কোনো দলের লোক। সুতরাং জ্বালানি তেলের দাম কমলেও জনগণ এর সুফল পাবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
পরিবহন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানিয়েছেন, শুধু জ্বালানি তেলের দামের উপর ভিত্তি করে পরিবহন ভাড়া নির্ধারণ করা হয় না। জ্বালানি তেলের দাম কমলেও যন্ত্রপাতি, টায়ার, টিউব ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির দাম তো কমেনি। বরং এসব যন্ত্রাপাতির দাম বাড়ছেই। তাই জ্বালানি তেল কমালেও পরিবহন ভাড়া কমানোর সম্ভাবনা নেই। এছাড়া জ্বালানি তেলের দাম কমেছে কি না তাও অনেকের জানা নেই!
 হানিফ পরিবহনের চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘জ্বালানির দাম কমেছে কি না বিষয়টি আমার জানা নেই। আর পরিবহন ভাড়া কমানো হবে কি না এ সম্পর্কে এখন কিছুই বলতে পারছি না। তাছাড়া পরিবহন ভাড়াতো শুধু তেলের উপর নির্ভর করে না।’
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘সরকার যদি ভাড়া কমানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে বিআরটিসির ভাড়া কমানো হবে। তাছাড়া সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কম ভাড়া নেয় বিআরটিসি বাসগুলো।
বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির নেতারা বলেন, সরকার নির্ধারিত মূল্যে গত রাত থেকে আমরা জ্বালানি তেল বিক্রি করছি। এখন জ্বালানি তেলের মূল্য কমায় যদি জনগণ এর সুফল না পায় তাহলে অসাধু ব্যবসায়ীরা লাভবান হবে।
পরিবহন ব্যবসায়ীরা বলছেন, তেল ও সিএনজির দাম সমন্বয় হলে পরিবহন ভাড়া কমার সম্ভাবনা রয়েছে। শুধু তেলের দাম কমিয়ে পরিবহন ভাড়াসহ অন্যান্য খাতে জনগণ তেমন একটা সুফল পাবে না। এক ধরনের নৈরাজ্যের সৃষ্টি হবে। কারণ রাজধানীর বেশিরভাগ বাস, মিনি বাসের ইঞ্জিন সিএনজিতে রূপান্তরিত করা হয়েছে। তেলের দাম কমলেও তারা আর ইঞ্জিন পরিবর্তন করবে না। কারণ এটা যথেষ্ট ব্যয়বহুল।   
কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘যখনই তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে তখনই পরিবহন ভাড়া বাড়ানো হয়েছে, তাতে জনগণকে কোনো ধরনের ছাড় দেয়া হয়নি। এবার প্রথম জ্বালানি তেলের দাম কমানো হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা পেট্রোল ডিজেল চালিত যানগুলোতে ভাড়া সমন্বয় করা হোক।
তিনি বলেন, ‘পরিবহন ভাড়া সরকার কর্তৃক নির্ধারিত হয়। তাই সরকারের দায়িত্ব যে, জনস্বার্থে জ্বালানির দাম কমানোর পাশাপাশি সেই জনগণ যেন তার সুফল ভোগ করতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখা। যদি তাতে সরকার ব্যর্থ হয় তাহলে জনগণ যেমন এর সুফল থেকে বঞ্চিত হবে, ঠিক তেমনি সরকারেরও কোনো লাভ হবে ন। বরং মাঝপথে ব্যবসায়ীদের পোয়াবারো।
উল্লেখ্য, জ্বালানি তেলের দাম কমিয়ে রোববার সন্ধ্যায়  গেজেট প্রকাশ করে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ