বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

অপসংস্কৃতির বেড়াজালে তারুণ্য

মুহাম্মদ আব্দুল বাসেত : প্রযুক্তির নিত্যব্যবহার এমন হয়ে উঠেছে, প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মূল উদ্দেশ্যই সেখানে প্রতিনিয়ত ব্যাহত হচ্ছে। প্রযুক্তির অপব্যবহারই যেন এখন প্রযুক্তির ব্যবহার হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু তরুণ সমাজ নয়, শিশু থেকে বৃদ্ধদের পর্যন্ত যা এখন কৌতূহল ও আকর্ষণের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। এর জন্য অপব্যবহারে সময় নষ্টকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণকে দায়ী না করে প্রযুক্তির কলকব্জা নাড়াচাড়াকারী প্রযুক্তিবিদদেরই দায়ী করবো।
মুষ্টিমেয় যারা প্রযুক্তিকে এমনভাবে সাজিয়েছেন তরুণসমাজ নয় শুধু, যে কোনো বয়সের ব্যক্তিরাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা; এমনকি দিনের পর দিনও অতিক্রম করতে অনেকটা বাধ্য হয়। বিশেষ করে গুগল ও ইউটিউবকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে- ব্যবহারকারীরা ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় অপব্যবহারের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। হয়তো আমরা স্লোগান-লেখনী বা বক্তৃতার মাধ্যমে প্রতিবাদ করে থাকি। প্রায়শ বলা হয়ে থাকে, প্রযুক্তির ব্যবহারগত ভালো-মন্দ দুইটি দিকই রয়েছে। যে যেভাবে গ্রহণ করতে পারে। এর সাথে একমত হলেও শতভাগ নয়। ফসল বিনষ্টকারী পোকমাকড় ক্ষেত থেকে শুধু তাড়িয়ে দিলেই নয়, সমূলে করতে হয় নাশ। নচেৎ কাক্সিক্ষত ফসল ঘরে তোলাও অসম্ভব। যে প্রযুক্তির ব্যবহার দেখে ‘আলবার্ট আইনস্টাইন’ তৎকালে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, প্রযুক্তি আমাদের মানবতাকে অতিক্রম করেছে। বড় বেশি আগ্রহের বিষয় তিনি বর্তমানে জীবিত থাকলে প্রযুক্তি নিয়ে কী মন্তব্য করতেন।
প্রযুক্তির অপব্যবহারের হাওয়া সবার গায়ে যেমন লেগেছে; তেমনি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তরুণরা। তাদের যে সময় ব্যয়ের কথা ছিল নিজেদের গোছানোর- সমাজ ও রাষ্ট্রকে পরিপাটি করতে। নিজেদের যোগ্য রূপে গড়ে তুলতে। অথচ সেটুকু সময় যাচ্ছে প্রযুক্তির অপব্যবহারে। এরূপ অপব্যবহারের উদ্বুদ্ধ ও কারসাজির প্রযুক্তিবিদরা শুধুমাত্র তরুণসমাজের সময়ই নষ্ট করে না, তারা দেশ ও জাতির শত্রুও বটে। এখনই সময় এসেছে আসল রোগ নির্ণয় করে শুধু নিরাময় নয়, প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা।
প্রযুক্তি ক্ষুদ্র কিংবা সংকীর্ণ কোনো বিষয় নয়, বরং মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের সাথে রয়েছে এর সম্পৃক্ততা ও উপকারিতা। কিন্তু মাঝে মাঝে দুঃখ ও আফসোস হয় সন্তানের ব্যাপারে বাবা-মায়ের অভিযোগের মাত্রা দেখে, ‘দরজা-জানালা বন্ধ করে, ইন্টারনেটে পড়ে থাকে।’ অসংখ্য শিক্ষার্থী রয়েছে; বিশেষত শহরাঞ্চলে পরিলক্ষিত। ক্যারিয়ার গড়ার মূল্যবান সময় নষ্ট করে ফেসবুক, গুগল ও ইউটিউবে।
সিনেমার কাহিনী, নাচ-গানে সাজ-সজ্জার দৃশ্য এমনভাবে নির্মিত হয়, তরুণসমাজ বাস্তব জীবনেও এর প্রয়োগ ঘটাতে আগ্রহ দেখায়। ফলে সমাজজীবন হচ্ছে ব্যাহত। বিয়ে-সংসার বেশিদিন টিকছে না। সামান্য অজুহাত, মান-অভিমানে একে-অপরকে আলাদা করে দিচ্ছে। বাড়ছে সন্দেহপ্রবণতা, কমছে বিশ্বস্ততা। ফলশ্রুতিতে বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা। বিবাহ রীতি ভেঙে বেড়েছে লিভ টুগেদার প্রথা।
ভিনদেশী নাটক-সিরিয়াল দেখে নিজেদের চরিত্রে রূপ দিতে গিয়ে সংসারে নিয়ন্ত্রণ এমনভাবে হারিয়ে যায়, সন্তানাদি শোনে না বাবা মায়ের কথা। কেউ মানে না কারো নিয়ন্ত্রণ। ফলে বৃহৎ পরিবারগুলো রূপান্তর হচ্ছে ক্ষুদ্র পরিবারে। হারিয়ে যেতে বসেছে পরিবারের সকলে মিলে একসাথে নাকট-সিনেমা দেখার ঐতিহ্য। অভিনয়ের প্রতিযোগিতা এমনভাবে বেড়েছে- নোংরামি ও বেহায়াপনায় যিনি যত অগ্রসর হচ্ছেন, তিনি তত বেশি জনপ্রিয় হচ্ছেন। অনেকে মিডিয়াজগতে নিজেকে অধিক পরিচিতি করতে মাঝে মাঝে এমন কিছু পদক্ষেপ নেন, যা ভাষায় প্রকাশ করতেও লজ্জাবোধ হয়। পর্নোগ্রাফিতে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীসহ অনেক ধনাঢ্য পরিবারের সন্তানরাও ঝুঁকছে, যা স্বাভাবিক বিবেক-বুদ্ধিকেও হার মানিয়ে বসে। এক সময়ে শুনতাম, অভাব অনটনে অনিচ্ছাকৃতভাবে অনেকে এসব কর্মে জড়িত হতো। তবে হ্যাঁ, অনেকেই এটিকে বিনোদন ছাড়াও অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছে। অশ্লীল ভিডিও তৈরি করে ইন্টারনেটে এমনভাবে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা যুবসমাজ এগুলো দেখে সময় পার করছে। যার প্রভাব পড়েছে সমাজজীবনেও। অশ্লীল প্রভাবে বেড়েছে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ইত্যাদি। স্কুল-কলেজে মেয়েরা যেতে পারছে না নির্দ্বিধায়। এমনকি অভিভাবকদের সর্বদা থাকতে হচ্ছে মানসিক যন্ত্রণায়। মেয়েকে বিদ্যালয়য়ে পাঠিয়ে মা পথ চেয়ে থাকেন, কখন এসে পৌঁছাবে তার সন্তান। এমনকি শিক্ষকদের কুলালসা থেকেও মুক্ত নয় ছাত্রীরা। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিক নম্বর প্রধানের আশ্বাস দিয়ে শিক্ষার্থীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক গড়ে তোলার নজির পত্রপত্রিকায় লক্ষণীয়। আরো লোমহর্ষক বিষয় সরলমনা শিক্ষার্থীর সঙ্গে ধর্ষণের গোপন ভিডিও ধারণ করে একাধিকবার ধর্ষণে বাধ্য করার মতো ঘৃণ্যতা। পত্রপত্রিকার পাতা খুললেই শহর ও গ্রামে পাওয়া যায় তার অহরহ ঘটনা। প্রযুক্তির অপব্যবহার এমনভাবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে, উঠতি বয়সের ছেলে মেয়েদের হাতে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল সেট না থাকলেই যেন আধুনিকতা নয়। দুঃখের বিষয় হলো- যে সময়ে তারা বই-খাতা হাতে নিয়ে ঘুরবে, রাস্তায় চলার পথে দৈনন্দিন পড়ার বিষয় নিয়ে আলোচনায় মেতে ওঠবে। সেখানে মোবাইলে বিভিন্ন সিনেমার নাচ-গানসহ অশ্লীল ভিডিও লোড নিয়ে মত্ত হয়ে উঠেছে। লম্পট ধর্ষণকারীরা মেয়েদের বশে আনার হাতিয়ার হিসেবে বেচে নিয়েছে ধর্ষণের ছবি মোবাইল ও ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয়া। যেটুকু পত্রপত্রিকা বা বিভিন্নভাবে প্রকাশ পায়, কিন্তু তার বাইরেও আরো অসংখ্য ঘটনা গোপন থেকে যায়, যা ভুক্তভোগী ও তার পরিবারকে নিরবে নিস্তব্ধে সহ্য করে যেতে হয়।
ইন্টারনেট গুগলকে এমনভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে, যেখানে যৌনতাই প্রাধান্য পেয়েছে। আশ্চর্যের বিষয়- গুগলে যে কোনো অক্ষরকে সার্চ দিলেই তার সাথে যৌন সম্পৃক্ত যে কোনো পোস্ট অনায়াসেই মনিটরের পর্দায় ভেসে ওঠে। কাহিনী গল্পাকারে এমন কিছুু স্ক্রিপ্ট ছাড় করা হয়, যা সুস্থ বিবেককেও হার মানায়। নির্মমতা লজ্জার এমন নিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে; এমনকি মা-বোনকে নিয়েও বাজে মন্তব্য ও পোস্ট করতে দ্বিধাবোধ হয় না। ধর্মীয় বা সময় অপচয়ের বিষয় বাদই দিলাম। এ সভ্যতাকে রক্ষা করতে এখনই সময় কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করা; নেতিবাচক পোস্ট ও মন্তব্য থেকে গুগলকে রক্ষা করা।
জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তরুণরা এমনভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছে, পকেটে খাবারের পয়সার জোগাড় না থাকলেও এমভি কেনার কাজটি আগে সেরে নেয়। প্রোফাইল পাতায় অন্যের ছবি দিয়ে বিপরীত লিঙ্গকে আকর্ষণ করে সম্পর্কের জাল বুনা থেকে শুরু করে চ্যাটিংয়ের নামে সম্পর্কের এমন গভীরতা ধারণ করে হয়তো উভয়পক্ষই প্রতারণা ও ধোঁকার শিকার হয়। যৌন সুড়সুড়ি ও আবেদনময়ী এমন কিছু ছবি ও লেখা ছাড়া হয়, যা অন্য ফেসবুক বন্ধুদের অনায়াসে দেখতে বাধ্য করে। প্রতারণা অর্থ ও সময় নষ্টের যে মাধ্যম আগে শুধু মোবাইলে সীমাবদ্ধ ছিল। মোবাইল ও কম্পিউটার গেমসে শিশুরা এমনভাবে মত্ত হয়ে উঠেছে, পাঠ্য বিষয়ে এখন আর মজাই পাচ্ছে না। ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারা দিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি’ এরকম শিক্ষণীয় কবিতা ও ছড়ার আবৃত্তির পরিবর্তে শিশুরাও এখন গুনগুন করে গাইছে- ‘ও প্রিয়া তুমি কোথায়।’ আগে দেখতাম, বাবা-মায়ের সামনে উচ্চ আওয়াজে গান-বাজনা শোনা ও গাওয়াকে লজ্জাবোধ করতো। এখন সংস্কৃতি চর্চার নামে বাবা-মা, ছেলেমেয়ে ও ভাই-বোন একে-অপরের নাটক-সিনেমার নোংরা অভিনয় দেখতেও দ্বিধাবোধ করে না। ছোটবেলায় ভাবতাম, যারা অশ্লীল অভিনয় করে, তাদের মনে হয় মা-বাবা, ভাই-বোন বা আপনজন কেউ জীবিত নেই। থাকলে তারা যদি এসব অভিনয় দেখে ফেলেন। অথচ সে মাত্রাটুকুও এখন আর সীমাবদ্ধ নেই। দিন যত যাচ্ছে বেহায়াপনা ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। একটু কি চিন্তা করে দেখেছেন? এভাবে চললে আগামী প্রজন্ম অপসংস্কৃতির কোন পর্যায়ে পৌঁছাবে। বিশ্বময় আলোড়ন সৃষ্টি ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন। তরুণদের মূল্যবান সময় রক্ষা করতে প্রযুক্তির অপব্যবহার এখনই বন্ধ করার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ