রবিবার ৩১ মে ২০২০
Online Edition

চতুর্থ দিনেও কোনো ‘ক্লু’ উদ্ধার হয়নি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ

তারেক হোসাইন টুটুল, রাবি : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের প্রফেসর রেজাউল করিম সিদ্দিকী’র হত্যার চারদিন অতিবাহিত হলেও গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লিখা পর্যন্ত আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কোনো ‘ক্লু’ উদ্ধার করতে পারেনি। এখন পর্যন্ত এ হত্যাকাণ্ডের কোনো তথ্য উৎঘাটন না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং সচেতন মহলের মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত এ বিচার কোন পর্যায়ে পৌঁছবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে অনেকের মধ্যে। হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত সন্দেহে আরো দু’জনকে আটক করেছে পুলিশ। এদিকে শিক্ষক সমিতির কর্মসূচি হঠাৎ করে স্থগিত করায় অনেকে এটাকে ভাল চোখে দেখছে না।

জানা যায়, গত শনিবার সকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের প্রফেসর রেজাউল করিম সিদ্দিকী দৃর্বত্তদের হাতে নিহত হন। কে বা কারা খুন করেছে তা যেমন পরিবার থেকে ষ্পষ্ট নয় ঠিক তেমনি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাছে এখনো পরিষ্কার নয়। তবে পরিবার এবং সহকর্র্মীদের কাছ থেকে জানা যায়, তিনি ছিলেন একজন ধর্মে বিশ^াসী এবং নিরীহ প্রকৃতির লোক। তিনি একজন সেতার বাজক ছিলেন, নাস্তিক ছিলেন না।

শিক্ষক হত্যার বিচারের দাবিতে শিক্ষক সমিতির ব্যানারে গত সোমবার এক শিক্ষক বক্তৃতার সময় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এক যুগে আমরা ৪ জন সহকর্মীকে হারিয়েছে। আমরা বিচারের জন্য অনেক আন্দোলন করেছি। কোনো সুষ্ঠু বিচার পাইনি। তাই আমি আমার পরিবারকে জানিয়েছি, ‘আমাকে যদি হত্যা করা হয় তাহলে যেন বিচারের জন্য কোথাও না যায়।’ তিনি আরো বলেন, কেমন আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থা যে হত্যা হয় তার বিচার হয় না। এসব হত্যা-কাণ্ডের সুষ্ঠ বিচার ও শাস্তি না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সচেতন মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করছে।

একাধিক শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে জানা যায়, ‘আজকে যারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, তাদেরকে হত্যা করা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে জাতি একদিন ভেঙ্গে পড়বে। এমন হত্যাকাণ্ড কোনোদিনই কাম্য নয়। আমরা রেজাউল করিম স্যারের হত্যাকারীদের সুষ্ঠ বিচার ও এ ঘটনার সাথে জড়িতদের দ্রুত শাস্তি প্রদান করা হোক তার জোর দাবি জানাই।’ শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি প্রফেসর আনন্দ কুমার সাহা বলেন, হঠাৎ করেই আন্দোলন স্থগিত কোনোভাবেই কাম্য নয়। অধিকাংশই শিক্ষক সমিতির সিদ্ধান্তে হতাশ হয়েছে, এটা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।

এদিকে শিক্ষক সমিতির আন্দোলন হঠাৎ করে স্থগিত করা অনেকেই সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগ ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে লিখেছেন- ‘অষ্টম জাতীয় পে-স্কেলে বেতন বৈষম্যের প্রতিবাদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনে যত শিক্ষক মাঠে ছিলেন, রাজনীতি ভুলে সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন; অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীর হত্যাকারীদের গ্রেফতারের দাবিতে তাদের সেরকম চোখে পড়ছে না...’ আরেকজন লিখেছেন- শিক্ষকরা বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করতে পারে, বিচারের দাবিতে আন্দোলন করতে পারে না। তাছাড়া আগামী ৭ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের গরমের ছুটি শুরু হবে। ক্যাম্পাস ছুটির এক সপ্তাহ আগে থেকে অনেকেই বাসায় চলে যাবে। এতে করে আন্দোলন নতুন করে দাঁড় করানো কঠিন হবে। এ বিষয়ে শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রফেসর শহীদুল্লাহ বলেন, আামাদের উচিৎ ছিল প্রতিদিনি কর্মসূচি চালু রাখা। কিন্তু সরকারকে সময় দেয়ার উদ্দ্যেশে এক সপ্তাহের কর্মবিরতি গ্রহণ করেছি। এরপরও যদি কোনো পদক্ষেপ লক্ষ্য না করি, সেক্ষেত্রে আবারো কঠোর কমূসূচি দেয়া হবে বলে জানান তিনি।

 এদিকে শিক্ষক হত্যার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে গতকাল মঙ্গলবার ভোরে বাগমারায় অভিযান চালিয়ে নিজ গ্রামের মসজিদের ইমাম রায়হান আলী ও মাদ্রাসা শিক্ষক মুনসুর রহমানকে আটক করে পুলিশ। এর আগে হত্যার ঘটনায় ঐদিন রাতেই নগরীতে অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজন লোক প্রশাসন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ও শিবির কর্মী হাফিজুর রহমানকে আটক করা হয়। গতকাল সোমবার খায়রুল নামের এক শিবির কর্মীকে নগরীর ললিতাহার এলাকা থেকে আটক করা হয়। এ বিষয়ে নগরীর পুলিশ কমিশনার মো. শামসুদ্দিন বলেন, ‘এখনো কোন ‘ক্লু’ উদ্ধার হয়নি। আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’

শিক্ষক হত্যার আন্দোলনের চতুর্থ দিনেও বিচারের দাবিতে প্রধান ফটক অবরোধ করে আন্দোলন করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগ, প্রগতিশীল ছাত্র জোট, কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোট এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদী র‌্যালী বের করে ক্যাম্পাসের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক এ অবরোধ করে। এসময় ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। একই দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি মানব বন্ধন করে।

প্রতিবাদ র‌্যালীতে শিক্ষার্থীদের হাতে হাতে প্লাকার্ড ও বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়। ‘আমার শিক্ষক হত্যা কেন, প্রশাসন জবাব চাই’, ‘শিক্ষা, সন্ত্রাস-এক সাথে চলে না’, ‘শিক্ষক হত্যার বিচার চাই’ ইত্যাদি। র‌্যালী শেষে শিক্ষার্থীরা বেলা সাড়ে ১১টা থেকে পৌনে ১টা পর্যন্ত প্রধান ফটক অবরোধ করে রাখে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১২টার বাস ছেড়ে যায়নি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ