রবিবার ৩১ মে ২০২০
Online Edition

খুনি ‘দক্ষ প্রশিক্ষিত’॥ হত্যার দায় স্বীকার ‘আল-কায়েদার’

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : রাজধানীর কলাবাগানে দুইজনকে কুপিয়ে খুনের ঘটনায় যারাই জড়িত ,তারা দক্ষ ও প্রশিক্ষিত। কোথায় আঘাত করলে দ্রুত মৃত্যু হয়, সেই প্রশিক্ষণ নিয়েই খুনিরা তাদেরকে কুপিয়েছে বলে মনে করছেন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক। জোড়া এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনার দায় স্বীকার করে ‘আল-কায়েদা’ নামক একটি জঙ্গি সংগঠন বিবৃতি দিলেও পুলিশ ও পরিবারের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি মামলা হয়েছে সোমবার গভীর রাতে কলাবাগান থানায়। এর মধ্যে নিহত জুলহাস মান্নানের বড় ভাই মিনহাজ মান্নান ইমনের করা হত্যা মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় পাঁচ-ছয়জনকে আসামী করা হয়েছে।

আর কলাবাগান থানার এসআই শমীম আহমেদ অন্য মামলাটি দায়ের করেছেন পুলিশের ওপর হামলা ও আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায়। এ মামলাতেও আসামী সেই অজ্ঞাত পরিচয় ৫-৬ জন।

কলাবাগান থানার এএসআই শ্যামল চন্দ্র হালদার বলেন, “দুটি মামলাই দায়ের করা হয়েছে সোমবার গভীর রাতে। কাউকে এখনো আটক করা যায়নি।”

সোমবার বিকালে কলাবাগানের লেক সার্কাস এলাকায় পার্সেল দেয়ার কথা বলে বাসায় ঢুকে কুপিয়ে খুন করা হয় ইউএসএআইডির কর্মসূচি কর্মকর্তা জুলহাস (৩৫) ও তার বন্ধু নাট্যকর্মী মাহবুব রাব্বী তনয়কে (২৬)।

ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের সাবেক প্রটোকল অ্যাসিসটেন্ট জুলহাস সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক দীপু মনির খালাত ভাই। তিনি সমকামীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সাময়িকী ‘রূপবান’ সম্পাদনায় যুক্ত ছিলেন। আর তনয় ছিলেন লোকনাট্য দলের কর্মী। পিটিএ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে ‘শিশু নাট্য প্রশিক্ষক’ হিসেবেও কাজ করতেন তিনি। হামলাকারীদের অস্ত্রাঘাতে ওই বাড়ির দারোয়ান পারভেজ মোল্লা আহত হয়েছেন। বাধা দিতে গিয়ে আহত হয়েছেন মমতাজ নামে এক এএসআই।

ঘটনার পর ডিএমপির রমনা জোনের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার শিবলী নোমান রাতে জানিয়েছিলেন, এএসআই মমতাজ হামলাকারীদের একজনের কাছ থেকে একটি ব্যাগ ছিনিয়ে রাখেন, সেখানে ‘গুরুত্বপূর্ণ কিছু আলামত’ পাওয়া যায়। পরে পুলিশের দায়ের করা মামলায় বলা হয়, সেই ব্যাগে একটি পিস্তল, গুলী ও মোবাইল ফোন পাওয়া গেছে।

খুনিদের পালিয়ে যেতে দেখেছেন- এমন এক নারী জানিয়েছেন, টি শার্ট ও জিন্স প্যান্ট পরিহিত পাঁচ থেকে সাতজনকে ‘আল্লাহু আকবার’ বলতে বলতে আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলী ছুঁড়ে চলে যায়।

ঢাকার পুলিশ কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, জুলহাসকে হত্যার জন্যই খুনিরা গিয়েছিল বলে ঘটনাপ্রবাহে তাদের মনে হচ্ছে।

র‌্যাবের ইন্টিলিজেন্স ইউনিটের পরিচালক আবুল কালাম আজাদও মনে করছেন, “ঘটনা পরিকল্পিত।”

খুনি ‘দক্ষ, প্রশিক্ষিত’ : কোথায় আঘাত করলে দ্রুত মৃত্যু হয়, সেই প্রশিক্ষণ নিয়েই খুনিরা সমকামী অধিকারকর্মী জুলহাস মান্নান ও তার বন্ধু নাট্যকর্মী মাহবুব রাব্বী তনয়কে কুপিয়েছে বলে মনে করছেন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লাশের ময়নাতদন্ত শেষে ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, “দক্ষ হাতের কাজ, খুনিরা প্রশিক্ষিত। কোথায় আঘাত করলে মারা যাবে, সে ধরনের প্রশিক্ষণ নিয়েই তারা কুপিয়েছে।”

লাশের সুরতহাল করার পর কলাবাগান থানার এস আই মো. আনসার আলী তার প্রতিবেদনে বলেছেন, ঘাড়, চিবুক, মাথার সামনে, পেছনে ও উপরের অংশে বীভৎসভাবে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। দুজনেরই মৃত্যু হয়েছে ঘটনাস্থলে।

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক সোহেল মাহমুদ বলেন, “এ ধরনের আঘাতের পর কারও বেঁচে যাওয়া সম্ভব নয়। একই স্থানে উপর্যুপরি কয়েকটি আঘাত ছিল এবং সেই আঘাত মাথার খুলি কেটে মগজ পর্যন্ত পৌঁছেছে। তনয়ের স্পাইনাল কর্ড ছিঁড়ে গেছে।” তিনি বলেন, “একই স্থানে অন্তত তিনটি আঘাত করলে মগজ স্পর্শ করে। খুনিরা ভালো করেই জানে এবং জেনেই আঘাতগুলো করেছে।”

সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলহাসের মাথার পেছনে ও চিবুকের বাঁ দিকে ছয় ইঞ্চি দৈর্ঘ্যরে ধারালো কোপের চিহ্ন রয়েছে। আঘাত এতোটাই শক্তিশালী ছিল যে খুলি কেটে মগজ বের হয়ে এসেছে।

মাথার পেছনে ডান দিকে কানের উপরের অংশেও পাশবিকভাবে কোপানো হয়েছে ইউএসএআইডির কর্মসূচি কর্মকর্তা জুলহাসকে। তার বাঁ হাতের মধ্যভাগে ধারালো অস্ত্রের কাটা দাগ পাওয়া গেছে, যা থেকে মনে হয়, স্বাভাবিকভাবেই কোপ ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন তিনি। 

ইউএসআইডিতে যোগ দেয়ার আগে জুলহাস ছিলেন ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের প্রটোকল অ্যাসিসটেন্ট। সমকামীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সাময়িকী ‘রূপবান’ সম্পাদনায় যুক্ত ছিলেন তিনি। লেক সার্কাস রোডের যে বাসায় জুলহাস খুন হন, সেখানে মাকে নিয়ে তিনি থাকতেন।

এস আই মো. আনসার সুরতহাল প্রতিবেদনে বলছেন, তনয়ের মাথার পেছনের অংশ থেকে ঘাড় হয়ে প্রায় এক ফুট পরিমাণ জায়গা প্রায় চার ইঞ্চি গভীর হয়ে কেটে গেছে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে। এছাড়া মাথার উপরের অংশেও পাঁচ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যরে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে; কোপের কারণে কেটে গেছে খুলি।

এর আগে ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার, লেখক অভিজিৎ রায়, অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ওয়াশিকুর রহমান বাবু, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয়, প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনসহ বিভিন্ন হত্যার ঘটনায় লাশের সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত করে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা ও চিকিৎসকরা একই ধরনের আঘাতের চিহ্ন পাওয়ার কথা বলেছিলেন। 

প্রতিটি ক্ষেত্রেই পরিকল্পিত ও আকস্মিক হামলায় দক্ষ হাতে চাপাতির কোপে মৃত্যু নিশ্চিত করে দ্রুত পালিয়ে গেছে খুনিরা।

ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, “সিলেটে অনন্ত বিজয় ছাড়া বাকি সবগুলো হত্যাকাণ্ডের ময়নাতদন্ত আমি করেছি। সবগুলো ক্ষেত্রে খুনের ধরন একই।”এসব ঘটনার প্রায় প্রতিটিতেই তদন্তকারীরা ধর্মীয় উগ্রপন্থিদের সংশ্লিষ্টতার কথা বলেছেন।

জুলহাজের চাচা আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, তার ভাতিজাকে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হবে। আর তনয়কে মিরপুর কবরস্থানে দাফন করা হবে বলে হাসপাতালে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন তার চাচা খন্দকার ফজলুর রহমান।

জুলহাসের মায়ের দিকে চেয়ার ছুঁড়ে মারে ঘাতকরা : জুলহাস মান্নানকে চাপাতি দিয়ে একের পর এক কোপ দিচ্ছিল ঘাতকরা। আর্তনাদ শুনে খাট থেকে নেমে আসেন ৯০ বছর বয়সী মা সখিনা খাতুন। নামতে গিয়ে পড়েও যান তিনি। কিন্তু তারপরও ছেলেকে বাঁচাতে বসার ঘরে ছুটে আসেন। ঘাতকদের কাছে জানতে চান, ‘আমাকে বল, আমার ছেলের অপরাধটা কী?’ 

মায়ের এমন প্রশ্নের জবাবে ঘাতকদের একজন তার দিকে চেয়ার ছুঁড়ে মারে। চেয়ারের আঘাতে পড়ে যান তিনি। পায়ে আঘাত পান। এর পরের কোনো কিছুই আর মনে করতে পারছেন না তিনি।

অবসরপ্রাপ্ত এই শিক্ষিকার এখন একটাই জিজ্ঞাস্য ছেলে আছে কোথায়? ছেলের মৃত্যুর সংবাদ শুনলে সেই শোক সহ্য করতে পারবেন কি না, সে কারণে পরিবার থেকে বলা হয়েছে, ছেলেকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গের সামনে গণমাধ্যম কর্মীদেরকে এসব কথা জানালেন জুলহাস মান্নানের চাচা আমিনুল হোসেন। ভাতিজা জুলহাসের লাশ নিতে মর্গে গিয়েছিলেন তিনি। ময়নাতদন্তের পর লাশ নিয়ে প্রথমে কলাবাগানের বাসায় যান।

আমিনুল বলেন, জুলহাসের মায়ের মানসিক অবস্থা ভালো নয়। বয়সও অনেক। সবকিছু মনেও রাখতে পারছেন না তিনি। তাকে জুলহাসের বড় ভাই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের কর্মকর্তা মিনহাজ মান্নানের গুলশানের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, তাদের বাড়ি চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলায়। সখিনা খাতুন চাঁদপুরে ও ঢাকায় রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। জুলহাসের বোন রুমানা যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। তিনি দেশে ফিরছেন।

জুলহাসের বড় ভাই মিনহাজ মান্নান জানান, গতকাল বাদ জোহর কলাবাগানে তাদের বাসা সংলগ্ন তেঁতুলতলা মাঠে জানাযা হয়। এরপর বাদ আছর বনানী কবরস্থানে জুলহাসের লাশ দাফন করা হয়েছে। তিনি বলেন, জুলহাসকে কেউ হুমকি দিয়েছে ,এমন তথ্য তার বা পরিবারের জানা নেই।

একই ঘটনায় নিহত মাহবুব তনয়ের লাশও ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে রাখা আছে। এখনো কোনো স্বজন সেখানে যাননি। তবে শেওড়াপাড়ায় তনয়ের বাসার আশপাশের প্রতিবেশী কয়েকজন ছোট ভাই মর্গে এসেছেন। তারা বলেন, তনয় ভাই এলাকায় সেভাবে কারও সঙ্গে তেমন মিশতেন না। তারা মর্গে লাশ আছে শুনে এসেছেন। তনয় ভাই ঢাকায় মা-বোনের সঙ্গে শেওড়াপাড়ার বাসায় থাকতেন।

হত্যার দায় স্বীকার ‘আল-কায়েদার’ : আল-কায়েদা ভারতীয় উপমহাদেশ (একিউআইএস) শাখা জুলহাস ও তনয় হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে বলে খবর দিয়েছে জঙ্গি তৎপরতা পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ। হত্যাকাণ্ডের একদিনের মাথায় গতকাল মঙ্গলবার বিকালে একিউআইএসের দায় স্বীকারের খবর ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে সাইট।

এর আগেই একিউআইএসের বাংলাদেশ শাখা আনসার আল ইসলামের মুখপাত্র মুফতি আব্দুল্লাহ আশরাফের নামে টুইটারে দেয়া এক বিবৃতিতে ‘তাদের দুঃসাহসী মুজাহিদিনরা এই দুজনকে হত্যা করেছে’ বলে দাবি করা হয়।

বিবৃতিতে জুলহাস মান্নানকে ‘বাংলাদেশে সমকামিতা প্রসারের পথিকৃৎ’ ও ‘সমকামীদের গুপ্ত সংগঠন রূপবানের পরিচালক’ হিসেবে পরিচয় দেয়া হয়েছে। আর ‘সামির মাহবুব তনয়’ হিসেবে তনয়কে জুলহাসের সহযোগী পরিচয় দেওয়া হয়েছে। “ক্রুসেডার আমেরিকা ও তার ভারতীয় মিত্রদের সাহায্য নিয়ে ১৯৯৮ সাল থেকে এই ভূ-খণ্ডের অধিবাসীদের মাঝে সমকামিতার মত জঘন্য অশ্লীলতা ছড়িয়ে দিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছিল এই বেতনভোগী ভৃত্যদ্বয়।”

বাংলাদেশে মুক্তমনা লেখক, ব্লগার, শিক্ষক, অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের সর্বশেষ শিকার জুলহাস।

এর আগে এই ধরনের অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের পর আইএস ও একিউআইএসের নামে দায় স্বীকারের বার্তা এলেও সেই দাবি নাকচ করে দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

সর্বশেষ গত শনিবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক এএফএম রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় একিউআইএসের নামে দায় স্বীকারের খবর দিয়েছে। প্রথম দায় স্বীকার করে গত বছর ফেব্রুয়ারিতে বিজ্ঞান লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যার ঘটনায়।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে বরাবরই বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বাইরের কোনো জঙ্গি গোষ্ঠীর কোনো অস্তিত্ব নেই। কিন্তু এসব হত্যাকাণ্ডের পিছনে কারা রয়েছে তাও বের করতে পারেনি সরকার।

তদন্ত প্রতিবেদন ২৪ মে : জোড়া খুনের ঘটনায় দায়ের করা দুই মামলায় ২৪ মে পুলিশকে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলেছে আদালত। পরিবার ও পুলিশের দায়ের করা এ দুই মামলার এজাহার গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে পাঠানো হলে হাকিম নুরুন্নাহার ইয়াসমিন এই তারিখ ঠিক করে দেন।

দুই মামলাতেই অজ্ঞাতপরিচয় পাঁচ-ছয়জনকে আসামী করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

এর মধ্যে হত্যা মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছেন কলাবাগান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কে এম আশরাফ উদ্দিন। আর এসআই মো. আনসার আলী করবেন অস্ত্র মামলার তদন্ত।

খুনিদের ব্যাগে ‘অপরিচিত’ আগ্নেয়াস্ত্র! : কলাবাগানে দুইজনকে কুপিয়ে হত্যার পর পালিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের সঙ্গে দুর্বৃত্তদের ধস্তাধস্তির সময় কলাবাগান থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শামীম আহমেদ যে ব্যাগ উদ্ধার করেছেন, তার ভেতরে একটি ‘অপরিচিত’ আগ্নেয়াস্ত্র মিলেছে। আগ্নেয়াস্ত্রের নাম পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেনি।

দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের এসআই শামীম আহমেদ একজনের কাছ থেকে একটি ব্যাগ ছিনিয়ে রাখেন। এ ঘটনায় অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা করেছে পুলিশ। ওই মামলায় ব্যাগের ভেতরে থাকা আলামতের বিষয়ে বর্ণনা দেয়া হয়েছে। তাতে উল্লেখ করা হয়েছে ব্যাগের ভেতরে নয় ধরনের আলামত পাওয়া গেছে।

মামলার বাদী কলাবাগান থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শামীম আহমেদ। যিনি নিজেই ওই ব্যাগটি ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। মামলায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামী করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যাগের ভেতর থেকে একটি লোহার তৈরি পিস্তল, যার ফায়ারিং পিন হতে ব্যারেলের মাথা পর্যন্ত লম্বা আনুমানিক সাত ইঞ্চি। একটি লোহার তৈরি ম্যাগাজিন, যার গায়ে ইংরেজিতে অস্পষ্ট লেখা রয়েছে। ম্যাগাজিনের ভেতরে তিন রাউন্ড গুলী।

এরপর এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, একটি গণনাকৃত আগ্নেয়াস্ত্র যা দুটি অংশে বিভক্ত বা সম্মুখ অংশে ব্যারেলের মত দুটি ছিদ্র এবং পেছনে হাতলের অংশে দুটি পিনের সঙ্গে চাবির রিংয়ের মতো, চাবির রিং স্প্রিংয়ের মতো ওঠানামা করে। ব্যারেলের ছিদ্র দুটি দুই রাউন্ড গুলীভর্তি, আগ্নেয়াস্ত্রটি লম্বা আনুমানিক সোয়া ছয় ইঞ্চি, দুই রাউন্ড গুলীর প্রতিটির পেছনে কেএফ ৭.৬৫ ইংরেজিতে লেখা রয়েছে। তবে এই অস্ত্রের কোনও নাম জানাতে পারেনি পুলিশ।

এছাড়া ব্যাগের ভেতর থেকে একটি লোহার তৈরি চাপাতি, যার দৈর্ঘ্য তের ইঞ্চি, চাপাতির বাঁটে চিকন সুতলি দ্বারা মোড়ানো। একটি পুরনো লাল গামছা, যা লম্বায় পাঁচফুট। একটি সাদা নীল ও অ্যাস রংয়ের পুরনো লুঙ্গি। একটি ঘিয়া রঙ্গের পি-ক্যাপ। একটি কালো প্রেসিডেন্ট ব্র্যান্ডের ব্যাগ এবং একটি সাদা কাগজে আরবি ও বাংলা লেখা রয়েছে।

এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ডলফিন গলির ৬০ নম্বর বাসার সামনে জনৈক রাশেদ মোশারফের বাসার সামনে আনুমানিক পৌনে ৬টার দিকে পাঁচ-ছয়জন ব্যক্তি দ্রুত গতিতে আসছিল। যাদের প্রত্যেকের কাঁধে ছিল ব্যাগ। তাদের বয়স ২০ থেকে ২৫ বছর। প্রত্যেকের একই রঙ্গের টি-শার্ট পড়া ছিল। তাদের দেখে সন্দেহ হলে দ্রুত গাড়ি থামাই। গাড়ি থেকে নেমেই দুষ্কৃতকারীদের থামতে বলে সঙ্গীয় অফিসার ও ফোর্সদের ধরতে বলি। সঙ্গীয় অফিসার এএসআই মমতাজ উদ্দিন দ্রুত দুষ্কৃতকারী একজনকে জাপটে ধরেন। তখন অপর একজন দুষ্কৃতকারী আটক দুষ্কৃতকারীকে উদ্ধার করতে ব্যাগ থেকে চাপাতি বের করে মমতাজকে কোপ মারে। চাপাতির কোপটি তার কপালে লাগে। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

দুষ্কৃতকারীরা তাকে পুনরায় কোপাতে গেলে আমি তাদের আমার পিস্তল দিয়ে গুলী করি। কনস্টেবল নুরুল ইসলামও এক রাউন্ড শর্টগানের গুলী ছোঁড়েন। আমরা গুলী করার পর দুষ্কৃতকারীদের মধ্যে একজন আমাকে গুলী করে পালানোর চেষ্টা করে। আমি তাকে পেছন দিক থেকে ধরার চেষ্টা করি। এ সময় তার ব্যাগটি আমি কেড়ে নিতে সক্ষম হই। তারা দৌড়ে জনগণের মধ্যে মিশে যায়।

এসএম তানভীর ও মো. আমিনুল ইসলাম নামে দুই ব্যক্তির উপস্থিতিতে ব্যাগটি হেফাজতে নিই। সাক্ষীদের সামনেই ব্যাগটি তল্লাশি করে জব্দ তালিকায় সাক্ষীদের স্বাক্ষর গ্রহণ করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ