রবিবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

নদীগুলোর নাম খুব সুন্দর

আহসান হাবিব বুলবুল : (একুশের শহীদদের নিবেদিত)
‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে
পার হয়ে যায় গরু পার হয় গাড়ি
দুই ধার উঁচু তার ঢালু তার পাড়ি
কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কবিতাটি আমাদের নদীমাতৃক বাংলাদেশের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আমাদের দেশের কিছু প্রান্তসীমা ছাড়া মূল ভূখ-ে তেমন পাহাড়-পর্বত নেই। অধিকাংশ অঞ্চলই সমভূমি। ফলে অসংখ্য নদ-নদী আর খাল-বিল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এদেশের বুকজুড়ে। বাংলাদেশের বড় বড় নদীর মূল উৎস দেশের বাইরে ভারত ও নেপালে। নিচু অঞ্চল বলে বাংলাদেশের বুকচিরে নদীগুলো বয়ে চলেছে। মূল নদীগুলো হলো, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, তিস্তা ও করতোয়া। এদের অনেক শাখা নদী বয়ে গেছে চারদিকে। গঙ্গা নদীর পূর্বদিকের ধারা এখন পদ্মা নদী নামে পরিচিত। বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী ব্রহ্মপুত্র। প্রাচীনকালে এর নাম ছিল লৌহিত্য। হিমালয়ের উত্তরে মানস সরোবর থেকে উৎপন্ন এ নদ ময়মনসিংহের ভেতর দিয়ে ঢাকার সোনারগাঁও পর্যন্ত আসে। ব্রহ্মপুত্র নদের অপর শাখা যমুনা নদী নামে প্রবাহিত হয়ে পদ্মা নদীতে মিশেছে। মেঘনা নদীর উৎপত্তি খাসিয়া-জয়ন্তিয়া পাহাড়ে। এর একটি শাখা সুরমা নদী নামে প্রবাহিত হয়েছে। অপর শাখা মেঘনা নাম নিয়ে ভৈরব বাজারের নিকট ব্রহ্মপুত্রের সাথে মিশেছে। এরপর গতি হয়েছে দক্ষিণমুখী। অবশেষে মিশে গেছে বঙ্গোপসাগরের বিশাল বুকে।
করতোয়া নদীটি এখন শুকিয়ে ছোট হয়ে গেছে। প্রাচীনকালে এটি বেশ বড় নদী ছিল। ভুটানের কাছে হিমালয় পাহাড়ে এর জন্ম। প্রথমদিকে তিস্তা নাম নিয়ে নদীটি বাংলাদেশে প্রবেশ করে। পরে এর তিনটি ধারা তিন দিকে চলে যায়। পূর্বদিক থেকে দক্ষিণে বয়ে যাওয়া স্রোতটির নাম হয় করতোয়া, মধ্যের ধারা আত্রাই নদী নামে পরিচিত হয়, আর পশ্চিমের ধারার নাম হয় পুনর্ভবা নদী।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু অন্য অনেক দেশের চেয়েই আলাদা। মানুষ যখন বড় হতে থাকে তখন তার ওপর চারপাশের পরিবেশের প্রভাব পড়ে।
মানুষের জীবনাচরণে ভৌগোলিক, বৈশিষ্ট্যের প্রভাব তীব্র। এ জন্যই পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের জীবনধারা, আচার-আচরণের এত বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়।
ঋতু বৈচিত্র্যের দেশ বাংলাদেশ। প্রকৃতির রং বদলের এমন আয়োজন বিশ্বের আর কোনো দেশে নেই। শীত-প্রধান দেশে ঋতু দু’টি এবং অন্যান্য দেশে ঋতু সর্বোচ্চ তিনটি। আর বাংলাদেশে ছয়টি ঋতুর আনাগোনা। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। এ ছয়টি ঋতুর আবর্তনের প্রভাব পড়েছে এ দেশবাসীর দেহ-মনে, সাহিত্যে-কাব্যে, উৎসব-অনুষ্ঠানে। বাংলাদেশে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ।
ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক এ পরিবেশ দেশবাসীকে কোমল আর শান্ত স্বভাবের করেছে। আবার ঋতু বৈচিত্র্যের কারণে ঝড় জলোচ্ছবাসের সাথেও যুদ্ধ করতে হয় বাংলাদেশের মানুষকে। তাই তারা হয়ে ওঠে সংগ্রামী।
বাংলাদেশের বিশাল সমভূমি আর প্রচুর নদনদী থাকায় একটি বড় সুবিধে হয়েছে। নদী বয়ে এনেছে পলিমাটি। ফলে এদেশের মাটি হয়েছে উর্বর। উর্বর মাটিতে ফলে পর্যাপ্ত ফসল। এভাবেই শস্য-শ্যামলা হয়েছে বাংলাদেশ। স্বাভাবিকভাবেই এদেশের যোগাযোগের একটি বড় মাধ্যম নদীপথ। তাই নৌকা চালনায় দক্ষ হয়ে ওঠে এদেশের মানুষ। মানুষ আর মালামাল পরিবহনে এদেশে নৌ পথের ভুমিকা সবচেয়ে বেশি। নৌকার একটি বড় প্রভাব রয়েছে বাংলার মানুষের সাংস্কৃতিক জীবনে। উপরে বিশাল আকাশ আর নিচে বয়ে চলা নদী। তার ওপর বৈঠা বাইতে গিয়ে মাঝির কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসে মধুর সুর। এভাবেই সৃষ্টি হয় এদেশের ভাটিয়ালি আর সারি গান। নদীর গতি পরিবর্তন মানুষের জীবনধারা ও অর্থনীতির ওপর দারুণ প্রভাব ফেলেছে। নদীর তীরে গড়ে ওঠা পুরনো নগর বন্দর নদীর গতি পরিবর্তনের কারণে ধ্বংস হয়েছে। আবার নতুন গতিপথের পাশে, গড়ে উঠেছে জনবসতি। তাইতো কবি’র কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে, ‘নদীর এ কূল ভাঙে ও কূল গড়ে। এই তো নদীর খেলা ...।’ বাংলাদেশ ভাটির দেশ। উজানের প্রতিবেশী-রাষ্ট্র (ভারত) আমাদের নদীগুলোর উৎসমুখে বাঁধ দিয়ে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে নেয়ায় বাংলাদেশের নদ-নদী নাব্য হারাচ্ছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে এদেশের ভূ-প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর। সেই সাথে বিশ্ব জলবায়ুর পরিবর্তনে আমাদের দেশে পরিবেশগত বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। এর উত্তরণে আমাদের সবাইকে ভাবতে হবে।
সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। মায়ের মতো স্নেহ-মমতার পরশ দিয়ে অগণিত নদ-নদী জড়িয়ে রেখেছে বাংলাদেশকে, সেসব নদীর কয়েকটি নাম:
আঃ আইবুড়ি, আত্রাই, আড়িয়াল খাঁ, আধার মানিক, আশুলিয়া।
ই; এ, ও : ইচলি, ইছামতি, ইলশা, এলাংজানি, ওমানি।
ক : কংস, কর্ণঝরা, কর্ণফুলী, কপোতাক্ষ, করতোয়া, কহুয়া, কাজল, কারখানা, কাঞ্চন, কালিজিরা, কীর্তন খোলা, কীর্তিনাশা, কুমার, কুড়িআনা।
খ : খড়খড়িয়া, খোলপেটুয়া, খোয়াই।
গ : গাবখান, গুগলি, গুড়মানি, গোমতী।
ঘ : ঘাঘট, ঘুমনা।
চ, ছ : চিত্রা, চিকলি, চেতনা, চুনকুড়ি, ছেনা, ছোট যমুনা, ছোট ফেনী।
জ, ঝ : জিনজির, জুড়ি, ঝিংরি, ঝিনাই।
ট : টঙ্কাবতী, টাঙ্গন, টাউন, টিয়াখালী।
ড, ঢ : ডউকি, ডাহুক, ডেরসা, ঢেপা।
ত : তেঁতুলিয়া, তিতাস, ত্রিমোহনী, তুরাগ, তুলসীগঙ্গা, তোয়া।
দ : দাগনভূঞা, দামোদর, দুধ কুমার।
ধ : ধরলা, ধলাই, ধলেশ্বরী, ধানসিঁড়ি।
ন : নবগঙ্গা, নরসুন্দা, নাগর, নাফ, নারদ, নৈহাটি।
প : পদ্মা, পর্বরা, পশুর, পাঁচনদী, পানগুছি, পায়রা, পাহালিয়া, পুংলি।
ফ : ফরিদা, ফুলকুমার, ফুলজোড়।
ব : বড়াল, বংশি, বংশাই, বালাম, বালেশ্বর, বুড়িগঙ্গা, বুকশিলা, ব্রহ্মপুত্র।
ভ : ভদ্রা, ভেরসাভেরং, ভোলা।
ম : মধুমতি, মনু, ময়ূয়, ময়না কাঁটা, মহানন্দা, মানস, মালঞ্চ, মুক্তেশ্বরী।
য : যমুনা, যমুনেশ্বরী।
র : রতœাই, রানী, রায়মঙ্গল, রূপসা।
ল : লক্ষ্যা, লতা, লাউকাঠি, লাঘাটা, লামা, লালগন্ধ, লৌহজং।
শ : শাখামুড়া, শালদা, শিলা, শিলাইদহ, শ্রীমন্ত।
স : সতী, সন্ধ্যা, সংকোস, সাকোয়া, সাঙ্গু, সানজিনা, সোমেশ্বরী, সুন্দরী, সুরুজ, সুতাং, সুগন্ধা।
হ : হরিণঘাটা, হরিহর, হাঙ্গর, হালদা, হাঁড়িভাঙ্গা, হাঁড়িধোয়া, হুরাসাগর।
[আমাদের নদীগুলোর নাম খুব সুন্দর। শ্রুতিমধুর। এসব নদ-নদী বহুকালের ইতিহাস ধারণ করে আছে সগৌরবে। এদের জলধারায় মিশে আছে এ জনপদের মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না আর বিজয়ের গান।]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ