মঙ্গলবার ২৯ নবেম্বর ২০২২
Online Edition

তথ্য সন্ত্রাস ও মিডিয়া জগৎ

আবুল কালাম আজাদ : গণমাধ্যমে বহুল প্রচলিত একটি বিষয় জেঁকে বসেছে যার নাম তথ্য সন্ত্রাস। তথ্য সন্ত্রাস মানে মিথ্যা তথ্যের দ্বারা জনগণকে বিভ্রান্ত করে সন্ত্রাস সৃষ্টি বা সন্ত্রাসের উস্কানি দেয়া। কোনো কায়েমী গোষ্ঠীর দ্বারা সাম্প্রদায়িক বা অন্য যে কোনো হীন স্বার্থে মিথ্যা, বানোয়াট, অতিরঞ্জিত ও উদ্দেশ্যমূলক তথ্য বা মিডিয়া প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে হিংসা, বিদ্বেষ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছড়িয়ে, শ্রেণী সম্প্রদায় বা জাতিগত হানাহানি ও রক্তক্ষম সৃষ্টির মাধ্যমে ধর্মীয় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মাধ্যমে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল তথ্য সন্ত্রাসের পর্যায়ভুক্ত। বিশেষ করে সংবাদপত্র এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে এ সন্ত্রাস ছড়ানো হলেও পুস্তক-পুস্তিকা, লিফলেট-পোস্টার, ভাষণ-বিবৃতি, মোটিভেশন-গুজব, ইন্টারনেট, ওয়েবসাইট, এনজিও এবং চলচ্চিত্রে প্রদর্শিত গল্প, নাটক, একাঙ্কিকা ও সিনেমা ইত্যাদির মাধ্যমেও তা ছড়াচ্ছে সংক্রামক ব্যাধির মতোই। তথ্য সন্ত্রাস ও ইয়েলো জার্নালিজম প্রায় একে অপরের সমার্থক। 

ইয়েলো জার্নালিজম : আধুনিক বিশ্বে তথ্য সন্ত্রাসের আরেক নতুন রূপ ‘ইয়েলো জার্নালিজম’ বা হলুদ সাংবাদিকতা। তথ্য পরিবেশনের চেয়ে উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে মিথ্যা তথ্য প্রচারের দুরভিসন্ধি চরিতার্থ করাই হলো এ ইয়েলো জার্নালিজমের মূল লক্ষ্য। আমেরিকার এক শ্রেণীর সাংবাদিক নিউইয়র্ক জার্নাল প্রভৃতি পত্রিকাকে কেন্দ্র করে ইয়েলো জার্নালিজমের নামে যে নিকৃষ্ট এবং কুৎসিত সাংবাদিকতার প্রচলন শুরু করেছিলো তা ছিল মূলত ক্রাইম রিপোর্ট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, চাঞ্চল্যকর কেলেঙ্কারির ঘটনা, সরকারি-বেসরকারি ট্রেড এন্ড কমার্সের দুর্নীতি সংক্রান্ত খবরের প্রচার। স্যামুয়েল হপকিন্স, এ্যাডামস, লিংকন স্টিমন্স এবং এ্যাডাম টারবেল প্রমুখ ইহুদী সাংবাদিকরা হলেন ইয়েলো জার্নালিজমের জন্মদাতা। এই সাংবাদিকতাকে তখন আমেরিকার সুধীজনেরা বলতেন ‘Journalism of Muckworm’’ অর্থাৎ ‘গোবরে পোকাদের সাংবাদিকতা।’ যারা এ সাংবাদিকতা করতেন, তাদের বলা হতো Muckrackers অর্থাৎ ‘যারা নোংরামি ছড়ায়।’ বর্তমানে ইয়েলো জার্নালিজমের উপর ভর করে রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রধান টার্গেটই হলো ‘ইসলাম-বিদ্বেষ।’ বর্তমান বিশ্বে তা আজ ব্যবহৃত হচ্ছে মুলমানদের দমনের হাতিয়ার হিসেবে। বলতে গেলে তথ্য সন্ত্রাস ও ইয়েলো জার্নালিজম মিডিয়া জগতে একটি কালো ছোবল।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাবল নিউজ নেটওয়ার্ক (CNN), আমেরিকান ব্রডকাস্টিং কোম্পানি (ABC), ন্যাশনাল ব্রডকাস্টিং সিস্টেম (NBS), কলম্বিয়া ব্রডকাস্টিং কোম্পানি (CBC), পাবলিক ব্রডকাস্টিং কোম্পানি (PBC), কেনিন এবং ইটিভি নামক এসব স্যাটেলাইট টিভি কোম্পানিগুলো ইয়েলো জার্নালিজমের মাধ্যমে সারা বিশ্বে ইসলাম ও মুসলমানের বিরুদ্ধে বিষোদগারসহ ইহুদী অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অভিনীত হলিউডের অশ্লীল চলচ্চিত্র প্রচারের মাধ্যমে বর্তমান যুব সমাজের মগজ ধোলাই করে তাদেরকে ধ্বংসের অতল গহ্বরে ঠেলে দিচ্ছে। 

তথ্য সন্ত্রাসের ইতিবৃত্ত : একার্থে তথ্য সন্ত্রাসের প্রচলন ছিল আদিকাল থেকেই। তথ্য সন্ত্রাসের মূল হোতা হলো ইবলিস। আর তার হাতিয়ার হলো মিথ্যা, ধোঁকা ও প্রতারণা। “এ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করলে তোমরা আজীবন বেহেস্তে অবস্থান করতে পারবে”- এ মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে ইবলিস আদম (আ:)কে প্রতারণা করে বা ধোঁকা দিয়ে আল্লাহর তথ্য “অলা তাক্বরাবা হাযিহিশ শাজারাতা ফাতা কূনা মিনাজ্ জোয়ালিমীন”-এর মতো ঐশী বাণীর তথ্য ভুলিয়ে বিভ্রান্ত করে নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণে উদ্বুদ্ধ করেছিল। আদম (আ:)-এর সন্তান হাবিলের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করে কাবিলকে দিয়ে হাবিলকে খুন করিয়ে মানবতার কবর রচনার সূত্রপাত করেছিল ঐ ইবলিসই। বর্তমান বিশ্বেও ইবলিসের অনুসারীরাই ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে তথ্য সন্ত্রাস ও ইয়েলো জার্নালিজমের মাধ্যমে মানবতাকে ধ্বংসের নিত্য নতুন ফন্দি আঁটছে। তবে দুঃখের বিষয় হলো, বুঝে হোক আর না বুঝে হোক, বিশ্ব মুসলিমের বিরাট এক অংশ তথ্য সন্ত্রাসীদের পক্ষ হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাজ করছে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শে স্বয়ং ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির “অশত্থামা হত, ইতি গজ” এই উদ্দেশ্যমূলক মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রতিপক্ষের অপ্রতিরোধ্য দ্রোনাচার্যকে হত্যা করিয়েছিলেন। গোঁড়া প্রতিপক্ষীয়দের তথ্য সন্ত্রাসই ছিলো সক্রেটিস থেকে গ্যালিলিও পর্যন্ত বহু দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক প্রমুখের মৃত্যুদ-ের কারণ। প্রায় এমনি পরিস্থিতিতেই ঘটেছিলো ওমর খৈয়ামের সমাজচ্যুতি। ইসলামের প্রতি নিষ্ঠার কারণে অগণিত মন্দিরের পৃষ্ঠপোষক উদারচেতা বাদশাহ আওরঙ্গজেবকে চিত্রিত করে এসেছে একজন সন্ত্রাসী মৌলবাদী হিসেবে। ইতিহাসে এমন উদাহরণ অসংখ্য।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে কম্যুনিস্ট আন্দোলনের সূচনাকালে কম্যুনিস্টরা সমাজতন্ত্র কায়েম হলে শোষিত মানুষের অফুরন্ত সুখ-শান্তির অতিরঞ্জিত বক্তব্য দিয়ে, শ্রমিক শ্রেণীকে ক্ষেপিয়ে তুলতো মালিক বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াইয়ের জন্য। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরও সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহে লক্ষ লক্ষ মানুষকে শোষক বুর্জোয়াদের দালাল, সাম্রাজ্যবাদের পা-চাটা কুকুর, প্রতিক্রিয়াশীল, মেহনতি মানুষের দুশমন ইত্যাদি বিশেষণে বিশেষিত করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

বিংশ শতাব্দীতে তথ্য সন্ত্রাসের ব্যক্তিকরণ ঘটেছিলো হিটলারের প্রচারমন্ত্রী গোয়েবল্স্-এর মাধ্যমে। তিনি বিশ্বব্যাপী নাৎসী হামলা ছড়িয়ে ইহুদীদের পাইকারিভাবে হত্যা করাটাকে যথার্থ (Justified) প্রমাণের উদ্দেশ্যে লাগাতার মিথ্যা প্রচারের কৌশল হিসেবে অবলম্বন করেন। তার মতে, একটা মিথ্যা কথা লাগাতার বলতে থাকলে জনগণ এক পর্যায়ে সেই মিথ্যাটাকেই সত্য বলে মেনে নেয়। মেকিয়াভ্যালি প্রমুখ রাজনীতিবিদদের মতে রাজনীতিতে মিথ্যা, ধোঁকা ও প্রতারণা নিষিদ্ধ তো নয়ই বরং অপরিহার্য (ফরয)। মূলত হিটলারের প্রচারমন্ত্রী গোয়েবল্সই ছিল তথ্য সন্ত্রাসের ঐতিহাসিক পথিকৃৎ। গোয়েবল্সের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আজ বিশ্ব মিডিয়াতে মুসলমান নিধনের জন্য তথ্য সন্ত্রাসের ব্যাপক প্রচার চালানো হচ্ছে। 

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক থেকে ষষ্ঠ দশক পর্যন্ত সময়ে কম্যুনিস্টবিশ্ব মোটামুটি শক্তিশালী আকার ধারণ করে। এতে ভীতসন্ত্রস্ত মুক্তবিশ্ব বা সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব তাদের বিরুদ্ধে শুরু করে তথ্য সন্ত্রাস, যাতে অন্য কোনো দেশের মানুষ সমাজতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট না হয় এবং সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহের অভ্যন্তরেও অন্তর্ঘাতের সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে কম্যুনিস্ট দেশের কর্ণধাররা তাদের জনগণের কাছে মুক্তসংবাদ প্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়ে একতরফা ও একঘেয়ে তথ্য দিয়ে নিকৃষ্টতর তথ্য সন্ত্রাসের বিকাশ ঘটায়। কম্যুনিস্ট অধ্যুষিত দেশের জনগণকে জানতেই দেয়া হয় না বিশ্বের অন্যান্য দেশে কোথায় কি ঘটছে?

কিন্তু সময়ের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় আশির দশকের গোড়া থেকে শুরু হয় কম্যুনিজমের পতন। ১০ বছরের মধ্যেই ধ্রুপদী কম্যুনিজম প্রায় পুরোপুরিই উৎখাত হয়ে যায় এবং কম্যুনিস্ট বিশ্বও গ্রহণ করে পুঁজিবাদ বা মুক্তবাজার অর্থনীতির পথ। ফলে সাবেক কম্যুনিস্ট বিশ্ব এবং পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বের আদর্শিক শত্রুতা ক্রমে হ্রাস পায়। 

কিন্তু ইতোমধ্যে ইরানে কায়েম হয়ে যায় ইস্না আশারিয়াভিত্তিক রাষ্ট্র। সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে ভেঙে এসে উদ্ভব ঘটে ৬টি নতুন মুসলিম রাষ্ট্রের। ইউরোপের বসনিয়ায়ও মুসলিম রাষ্ট্রের পত্তন ঘটে। আলবেনিয়ায় শুরু হয় ইসলামী জাগরণ। ইসলামী নবজাগরণের সূচনা ঘটে আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রেও। এতে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব তথা ইহুদী খ্রিস্টান বিশ্ব প্রমাদ গোনে এবং ইসলামকেই তাদের বর্তমান আদর্শিক প্রতিপক্ষ ও জাগতিক বিপদ হিসেবে চিহ্নিত করে। এ লক্ষ্যে ইহুদী চিন্তাবিদ ও দার্শনিক হার্টজেলের নেতৃত্বে তৎকালীন বিশ্বের ৩০টি ইহুদী সংগঠনের সবচেয়ে মেধাবী ও প্রভাবশালী ৩০০ ইহুদী বুদ্ধিজীবীর উদ্যোগে ১৯৯৭ সালের ২৯ ও ৩০ আগস্ট সুইজারল্যান্ডের বাজিল নগরীতে অনুষ্ঠিত হয় একটি সম্মেলন। ঐ সম্মেলনের ১২নং প্রটোকলের সিদ্ধান্ত ছিলো : “আন্তর্জাতিক প্রচার মিডিয়াকে নিজেদের হাতের মুঠোয় এনে বিশ্ববাসীর মগজ ধোলাইয়ের মাধ্যমে বিশ্বের সমস্ত পুঁজি ও স্বর্ণভা-ারকে নিজেদের হাতের মুঠোয় কুক্ষিগত করার নিমিত্তে শত্রুদের (মুসলমানদের) পক্ষ হতে এমন কোনো সংবাদপত্র প্রকাশ হতে দেবো না, যার দ্বারা তারা তাদের স্বাধীন ও সঠিক মতামত জনগণের কাছে তুলে ধরতে সক্ষম হয়।” তীব্রতর হয় ইসলাম ও মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে তাদের সশস্ত্র হামলা, অর্থনৈতিক আগ্রাসন ও তথ্য সন্ত্রাস। ইহুদী-খ্রিস্টানদের পাশাপাশি ইসলাম বিরোধী সন্ত্রাস জোরদার করে ভারতের হিন্দুত্ববাদীরাও। বলাবাহুল্য, ইহুদী খ্রিস্টানরা প্রথম থেকেই মুসলমানদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস চালিয়ে আসছে। কম্যুনিস্ট বিশ্বের পতন ও ইসলামী নবজাগরণের পটভূমিতে সেটা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে মাত্র। 

ইংরেজিতে একটা কথা আছে, To kill a dog, give it a bad name. এই তত্ত্বানুযায়ী পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদীবিশ্ব তথা ইহুদী-খ্রিস্টান জগৎ এবং হিন্দুত্ববাদী ভারত ইসলাম ও মুসলমানদের ধ্বংসের অজুহাত হিসেবে তাদের সকল মিডিয়ার মাধ্যমে লাগাতার প্রচার করে যে, মুসলমান মাত্রই মৌলবাদী(Fundamentalist), মুসলমান মাত্রই সাম্প্রদায়িক (Communal) ও অমুসলমানদের ওপর নিপীড়নকারী এবং মুসলমান মাত্রই বর্বর সন্ত্রাসী (Terrorist)। তারা বদ্ধপরিকর ইসলামী নবজাগরণ ও মুসলমানদের দাবিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে মুসলমানদের অস্ত্রশক্তি, এমনকি আত্মরক্ষার শক্তিকে পর্যন্ত ধ্বংস করে দিতে, মুসলমানদের ওপর অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সশস্ত্র আগ্রাসন চালাতে এবং মুসলমানদের নৈতিক ও আদর্শিক ভিত্তিকে ধ্বংস করে দিতে। এখন বিশ্বব্যাপী চলছে এরই তাণ্ডব। ইহুদীরা হামলা চালাচ্ছে প্যালেস্টাইনীদের ওপর, হিন্দুত্ববাদীরা হত্যা ধর্ষণ চাপিয়ে দিয়েছে ভারতীয় মুসলমান ও কাশ্মীরী জনগণের ওপর। রাশিয়া হামলা করেছে চেচনিয়ার মুসলমানদের ওপর। গত কয়েক দশকে ইহুদী-খ্রিস্টানদের বিভিন্ন প্রকারের আগ্রাসন ও সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে আফগানিস্তান, ইরান, ইরাক, লিবিয়া, আলজিরিয়া, সুদান, সোমালিয়া, বসনিয়া, চেচনিয়া, প্যালেস্টাইন মিসরসহ বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশ। তথ্য সন্ত্রাস তীব্রতর করা হচ্ছে প্রতিটি মুসলিম দেশের অভ্যন্তরেও। এ জন্য তারা প্রতিটি মুসলিম দেশের অভ্যন্তরেই গড়ে তুলছে তাদের দালাল বশংবদ শ্রেণী, বিশেষ করে দালাল রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবী। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ার ধ্বংস ও পেন্টাগনে অজ্ঞাত শক্তির হামলা মার্কিনীদের অজেয় শক্তির ভিত ভেঙ্গে দিয়েছে এবং প্রমাণ করেছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও অভেদ্য (invincible) নয়। ভিত ভেঙ্গে পড়ায় এখন তারা একেবারেই ক্ষিপ্ত ও উন্মত্ত। 

তথ্য সন্ত্রাসের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত পশ্চিমা বিশ্বের কিছু গণমাধ্যম : ১৮১৬ সালে ‘জুলিয়াস রয়টার’ নামক জার্মানীর এক ইহুদী ব্যাংক কর্মচারীর প্রতিষ্ঠিত ‘রয়টার’ই হলো বর্তমান বিশ্বের বহুল প্রচারিত এবং প্রভাবশালী সংবাদ সংস্থা। বিবিসি, ভোয়া, সিএনএনসহ এমন কোনো সংবাদ সংস্থা নেই যারা রয়টার থেকে সংবাদ ক্রয় করে না। বৃটেনের ইহুদী প্রধানমন্ত্রী ‘বেঞ্জামিন ডেজরেইলি’র আমলে সেনাবাহিনীসহ বৃটেনের সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদ ইহুদীরা দখলের সুযোগে জনৈক ইহুদী ‘বৃটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন (BBC)’র প্রধান হন। ‘ভয়েস অব আমেরিকা (VOA)’ নামক আন্তর্জাতিক এ মিডিয়াটিও একই বৈশিষ্ট্যের হওয়ায় এক সময় মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মুহাম্মদ বিবিসি ও ভোয়াকে বিশ্ব বেঈমান আখ্যায়িত করেছিলেন। ১৯৪৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি বড় বড় দৈনিক পত্রিকা মিলে ‘এসোসিয়েটেড প্রেস (UP)’ নামক এ সংবাদ সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করে। ১৯০০ সালে এ সংস্থাটি খ্যাতির শীর্ষে আরোহণ করে। এ কোম্পানির ৯০ ভাগ পুঁজিই ইহুদী পুঁজিপতিদের। ১৯০৭ সালে ‘স্ক্র্ইাপস’ ও ‘হাওয়ার্ড’ নামের দু’জন ইহুদী পুঁজিপতি ‘ইউনাইটেড প্রেস (AP)’ নামক এ সংবাদ এজেন্সিটি প্রতিষ্ঠা করে। এর দু’বছর পর ১৯০৯ সালে ‘হিয়ার্সট’ নামক এক খ্রিস্টান ‘ইন্টারন্যাশনাল নিউজ সার্ভিস’ নামের একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে। উইলিয়াম হিয়ার্সট নিজে খ্রিস্টান হয়েও গণমাধ্যমে তথ্য সন্ত্রাসের উদ্দেশ্যে এক ইহুদী পুঁজিপতির মেয়েকে বিয়ে করেছিল। বিয়ের পর ডেভিট হিয়ার্সট ও প্রোটেশিয়া হিয়ার্সট-এর গোটা পরিবার ইহুদী হওয়ার পর ১৯৫৮ সালে ‘ইউনাইটেড প্রেস’ ও ‘ইন্টারন্যাশনাল নিউজ সার্ভিস’কে একীভূত করে ‘নিউইয়র্ক টাইমস’এর মালিকানা প্রতিষ্ঠা করে। 

খ্রিস্টান মালিকানাধীন ‘লন্ডন টাইম্স’ পত্রিকাটি ১৭৮০ সাল থেকে ‘থমসন ইন্টারন্যাশনালে’র তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত হচ্ছিলো। পরবর্তীতে ইহুদী পুঁজিপতি ‘রুটশ্লেড’ পত্রিকাটিকে বিজ্ঞাপনের ফাঁদে ফেলে এর ২০ ভাগ কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দেয় ইহুদী। এ ইহুদী কর্মচারীরা সংঘবদ্ধ হয়ে পত্রিকাটিকে প্রতারণামূলকভাবে অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের শিকারে পরিণত করে তাদের বেতন-ভাতা শতকরা ২০ ভাগ বৃদ্ধির অযৌক্তিক দাবি তুললে নিরুপায় হয়ে ‘থমসন ইন্টারন্যাশনাল’ পত্রিকাটি বন্ধের ঘোষণা দেয়। এ সুযোগে অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত ইহুদী পুঁজিপতি ‘রবার্ট মর্দোখ’ ৪৫ মিলিয়ন ডলারে পত্রিকাটি কিনে নেন। এভাবেই ‘সানডে টাইমস’, ‘সাপ্তাহিক সান’, ‘নিউজ অব দি ওয়ার্ল্ড’, ‘সিটি ম্যাগাজিন’ ও ‘উইক এন্ড’ প্রভৃতি সাময়িকী ছাড়াও বৃটেনের ‘ডেইলি এক্সপ্রেস’, ‘নিউজ ক্রনিকেল’, ‘ডেইলি মেইল, ‘ডেইলি রোড’, ‘ম্যাঞ্চেস্টার’, ‘গার্ডিয়ান’, ‘ইয়র্কশায়ার পোস্ট’, ‘ইভিনিং স্ট্যান্ডার্ড’, ‘ইভিনিং নিউজ’, ‘অবজারভার’, ‘সানডে রেডিও’, ‘সানডে স্কট’, ‘দি জিওগ্রাফি’ প্রভৃতি পত্রিকা ইহুদী মালিকানাধীনে প্রকাশিত হয়। ১৯৮১ সালের প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী বৃটেনের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিকের মধ্যে ১ম থেকে ১৫তম দৈনিকগুলোর মালিক ইহুদী।

সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী গোটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় দুই হাজার দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। আমেরিকার এমন ৫০-৬০টি সাপ্তাহিক রয়েছে যেগুলোর প্রচার বিশ্বময়। ১ লাখ থেকে ১০ লাখ পর্যন্ত প্রচার সংখ্যার পত্রিকা রয়েছে প্রায় ৯০টি। আমেরিকার মাসিক ‘রিডার্স ডাইজেস্ট’ পত্রিকার প্রচার সংখ্যা প্রায় ২ কোটি। মাসিক ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফি’-এর প্রচার সংখ্যা প্রায় ১ কোটি। সাপ্তাহিক ‘টাইমস-এর প্রচার সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ ৭৪ হাজার। সাপ্তাহিক ‘নিউজ ইক’-এর প্রচার সংখ্যা প্রায় ৩২ লাখ ২৫ হাজার। সাপ্তাহিক ‘ইউএস নিউজ এন্ড ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট’-এর প্রচার সংখ্যা প্রায় ২২ লাখ ৩৭ হাজার। এ পত্র-পত্রিকাগুলোর অধিকাংশই ইহুদী পুঁজিপতিদের দ্বারা পরিচালিত বা প্রভাবিত। মোটকথা, তথ্য প্রবাহের সিংহভাগই এখন সেই ইহুদীদেরই হাতে, যারা গোড়া থেকেই মুসলমানদের এক নম্বর শত্রু এবং মুসলমানদের নিশ্চিহ্নকরণই যাদের প্রধানতম মিশন।

বাংলাদেশে তথ্য সন্ত্রাস : বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তর মুসলিম দেশ। এ দেশের ক্ষমতাসীনরা বিভিন্ন সময় আন্তর্জাতিক তথ্য সন্ত্রাসীদের সাথে হাত মিলিয়ে দেশের ৮৫% মুসলমানদের ধর্ম ইসলাম নিয়ে নানা ঠাট্টা বিদ্রƒপ করছে। এ দেশে দু’শ বছরের ঔপনিবেশিক বৃটিশ শাসনের সময় মুসলমানদের ওপর দ্বৈত শিক্ষা ব্যবস্থা (জেনারেল শিক্ষা ও মাদরাসা শিক্ষা) চাপিয়ে দেয়া হয়। ইসলামের নামে প্রতিষ্ঠিত কুরআন-হাদীস শিক্ষার প্রথম শিক্ষা পাদপীঠ ঢাকা আলিয়ার শিক্ষা কারিকুলাম প্রণীত হয় ইহুদী-খ্রিস্টানদের দ্বারাই। এখানেই শেষ নয়, ঢাকা আলিয়ার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ২৬ জন প্রিন্সিপাল ছিলেন খ্রিস্টান। কিন্তু আমাদের দেশের ধর্মপ্রাণ সরলমনা মুসলিম পিতা-মাতা এ ইতিহাস না জেনেই তাদের সন্তানকে দ্বীনি শিক্ষার নিয়তে মাদরাসায় পড়ানোর নিয়ত করেন। এর ফলশ্রুতিতেই বাবু গিরিশ চন্দ্র সেন ছাড়া আমাদের ধর্মগ্রন্থ আল-কুরআন পূর্ণাঙ্গ সর্বপ্রথম আরবি থেকে বাংলায় অনুবাদ করার সৌভাগ্য কোনো মুসলিম গবেষকের ভাগে জোটেনি। 

এ দেশের অধিকাংশ গণমাধ্যম তথ্য সন্ত্রাসীরূপী ক্ষমতাসীনদের দ্বারা পরিচালিত বা প্রভাবিত। এখানে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা তথা ভিন্নমত ভূলুণ্ঠিত। সাংবাদিক বন্ধুরা নিরাপত্তাহীনতায় সঠিক তথ্য লেখার সাহস পান না। যারা তথ্য সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন তাদের গুঁড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। নন্দিত সাংবাদিক নেতা বিএফইউজের সভাপতি শওকত মাহমুদ গাড়ি ভাংচুরের মিথ্যা মামলায় কারাভোগ করছেন। প্রায় চার বছর যাবত দৈনিক আমার দেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান জেলে। ইটিভির চেয়ারম্যান আবদুস সালামকে কারান্তরীণ করে নিলামের নামে পত্রিকাটির মালিকানা দখল করা হয়েছে। ক্ষমতাসীনদের দ্বারা জাতীয় প্রেস ক্লাব এবং ডিইউজের অফিস দখল করা হয়েছে। হত্যা-নির্যাতন এবং মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন অসংখ্য সাংবাদিক। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার বিচার আজো হয়নি। দৈনিক আমার দেশ, দিগন্ত টেলিভিশন, ইসলামিক টেলিভিশন এবং চ্যানেল ওয়ান বন্ধ। টিকে থাকার স্বার্থে অধিকাংশ গণমাধ্যম তথ্য সন্ত্রাসীদের তাঁবেদারি করতে বাধ্য হচ্ছে। ছিটেফোঁটা দু’একটি পত্রিকা যারা সত্যকথা লিখে তাদের বিজ্ঞাপন ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা সরকারিভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এদেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নামে চলছে সীমাহীন পক্ষপাতদুষ্টতা। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আদর্শের বিরুদ্ধে যেমনি চলছে নোংরা প্রচারণা, তেমনি চলছে সত্যনিষ্ঠ সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করার হীন প্রচেষ্টা। 

আন্তর্জাতিক মুসলিম-বিরোধী সন্ত্রাসীদের বাংলাদেশী দোসররা অপ্রতিহত গতিতে তাদের তৎপরতা চালিয়ে যেতে পারছে এজন্য যে, এখানকার যথার্থ দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহ মিডিয়ার দিক থেকে অতিশয় দুর্বল, তাদের আন্তর্জাতিক সংযোগ বা লিয়াজোঁ নেটওয়ার্কও খুবই অপ্রতুল এবং তারা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের মতো ঐক্যবদ্ধ, কমিটেড ও মারমুখীও নয়। বিশেষ করে এ দেশের মুসলমানদের অনেকেই এ সমস্ত তথ্য সন্ত্রাস ও মিডিয়া আগ্রাসন থেকে বেখবর হওয়ায় বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্তই শুধু নয় তারা অনেকেই নিজেদের অজান্তে ইহুদীদের হয়েই হয়তো কাজ করেন।

তবে বাংলাদেশকে অমুসলিম বিশ্ব হয়তো এখনই তাদের আঘাতের লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করতো না। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারী বাংলাদেশেরই একটি রাজনৈতিক মহল এবং তাদের অনুগত বুদ্ধিজীবীরাই ইহুদী, খ্রিস্টান ও হিন্দুত্ববাদীদের প্রতিনিয়ত উস্কে দিচ্ছে বাংলাদেশের ওপর আঘাত হানার জন্য। তারা লাগাতার প্রচার করছে যে, বাংলাদেশ জুড়ে চলছে মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের তাণ্ডব, তালেবান, হরকাতুল জেহাদ প্রভৃতির অনুসারীতে দেশ ছেয়ে গেছে। দেশব্যাপি চলছে তাদের সশস্ত্র ট্রেনিং। কাশ্মীর ও আফগানিস্তানের জঙ্গি মৌলবাদীরা দলে দলে এসে বাংলাদেশে ঘাঁটি গাড়ছে। মৌলবাদীরা প্রতিনিয়ত হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর মানব ইতিহাসের নজিরবিহীন হত্যাযজ্ঞ ও ধর্ষণ চাপিয়ে দিয়েছে। তবে এটাও এখন দিবালোকের মতোই প্রমাণিত সত্য যে, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা নিজেরাই একের পর এক বোমাবাজির ঘটনা ঘটিয়ে, হিন্দুদের মন্দির-প্রতিমা ইত্যাদির ওপর হামলা চালায় এবং হিন্দুদের ভূ-সম্পত্তি দখল করে, তারই দায় ইসলামপন্থীদের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছে। এ উদ্দেশ্যে ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীরা তাদের এখতিয়ারাধীন মিডিয়ার মাধ্যমে ব্যাপক অপপ্রচারণা চালাচ্ছে। তাদের নাট্য প্রতিভা দিয়ে মৌলবাদী তাণ্ডব ও হিন্দু নির্যাতনের ভিডিওচিত্র বানাচ্ছে।

তদুপরি অধিক বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য উক্ত মহল বিদেশী সাংবাদিকদের দিয়েও তারা লেখাচ্ছে (Tutored) প্রতিবেদন। Far Eastern Economic Review’র ৪ঠা এপ্রিল ২০০২ সংখ্যায় প্রকাশিত বার্টিল লিন্টনার লিখিত প্রতিবেদন Beware of Bangladesh : A Cocoon of Terror’. একই লেখক কর্তৃক Wall Street Journal-এ লিখিত In Bangladesh  as in Pakistan a worrisome wise in Islamic extremismএবং ২১ অক্টোবর ২০০২ তারিখে টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত অ্যালেক্স পেরী লিখিত Deadly Cargo’ বাংলাদেশের ওপর তথ্য সন্ত্রাসের এ তিনটি ভয়ংকর উদাহরণ। বার্টিল লিন্টনার বাংলাদেশকে ‘A Potential Political Time Bomb’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন যে, বাংলাদেশে একটি মৌলবাদী বিপ্লব ঘটানোর আয়োজন চলছে এবং এখনি এটাকে ঠেকানো না গেলে এই বিপদ বাংলাদেশের সীমানার বাইরের বিভিন্ন দেশেও ছড়িয়ে পড়বে। তার মতে, বাংলাদেশে কি ধরনের পরিবর্তন সংঘটিত হচ্ছে, তার প্রমাণ বিএনপির সংগে মৌলবাদী জামায়াত-ই-ইসলামীর গাটছড়া বাঁধা। তিনি আরো বলেছেন (ক) চট্টগ্রাম-কক্সবাজার এলাকা ইসলামী জঙ্গি রিক্রুট করার এক উর্বর ক্ষেত্র (খ) এই অঞ্চলে রয়েছে বিশাল আগ্নেয়াস্ত্রের সম্ভার ও অসংখ্য ধর্মীয় উগ্রপন্থী (গ) এসব জঙ্গিদের অধিকাংশই কাশ্মীর, চেচনিয়া ও আফগানিস্তানে যুদ্ধ করা যোদ্ধা (ঘ) ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ৬৪০০০ মাদরাসা হচ্ছে টাইম বোমা স্বরূপ। কারণ এগুলো থেকে দলে দলে বেরুচ্ছে মৌলবাদী জঙ্গি (ঙ) পাকিস্তানে তালেবান উৎপাদনকারী মাদরাসার মতো এসব মাদরাসারও অর্থ জোগায় আরব দেশসমূহ এবং (চ) এসব মাদরাসা দেশে দেশে ইসলামী বিপ্লব রফতানি করতে পারে। তাছাড়া বাংলাদেশের হিন্দু ও মধ্যপন্থী মুসলমানরা (ধর্মনিরপেক্ষরা?) প্রতিনিয়ত মৌলবাদীদের হামলার শিকার হয় বলেও লিন্টনার উল্লেখ করেছেন। অবশ্য তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, ‘There is still time for Counter-Revolution’ অর্থাৎ ইসলাম বিরোধী প্রতিবিপ্লব ঘটানোর এখনো সময় আছে।

তথ্য সন্ত্রাসের কারণ : বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষই যেহেতু ইসলামের প্রতি ঐকান্তিকভাবে নিষ্ঠাবান তাই স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশও হয়েছে আন্তর্জাতিক তথ্য সন্ত্রাসীদের অন্যতম টার্গেট। ইহুদী-খ্রিস্টান এবং হিন্দুত্ববাদী বিশ্ব একতরফা ও অপ্রতিরোধ্যভাবেই ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে তথ্য সন্ত্রাসসহ তাবৎ সন্ত্রাস চালিয়ে যেতে পারছে প্রধানত নিম্নলিখিত কারণে :

১. মুসলিম রাষ্ট্র ও সম্প্রদায়সমূহের মধ্যে কোনো কার্যকর ঐক্য নেই। ঐক্যের ব্যাপারে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ঘোষণা “তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো, কখনো বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” আল্লাহর ঐশী বাণীর প্রতি বেখবর হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে মুসলমানদেরই এক একটি সম্প্রদায় ইহুদী-খ্রিস্টান বা হিন্দুত্ববাদীদের বদলে অপর মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে প্রাণান্ত লড়াই করতেই যেন অধিকতর আগ্রহী।

২. সামরিক শক্তিতে মুসলমানরা অমুসলমানদের তুলনায় একেবারেই দুর্বল। মুসলমান এবং অমুসলমানদের সামরিক শক্তি বা ক্ষমতার অনুপাত ৩ : ৯৭ মাত্র।

৩. আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কালামে পাকের একাধিক জায়গায় বলেছেন, ‘ওয়া আাতুয যাকাত’ অর্থাৎ যাকাত প্রদান করো। অর্থাৎ ধনসম্পদে স্বাবলম্বী হও। যাকাত গ্রহণের কথা কোথাও বলা হয়নি। পরাশক্তির অদৃশ্য ইশারায় মাদরাসা শিক্ষিত তথা আলেম ওলামাদেরকে রেখেছে পরমুখাপেক্ষী করে। বর্তমান বিশ্বের অন্যতম নিয়ন্ত্রক অর্থনীতি। সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতির ওপর মুসলিম বিশ্বের নিয়ন্ত্রণ ৫% এর অধিক নয়। 

৪. মানব সভ্যতার অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তিই হলো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি। বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে মুসলিম বিশ্ব শুধু অনুন্নতই নয়, প্রায় সর্বক্ষেত্রে ইহুদী-খ্রিস্টান বিশ্বের ওপর নির্ভরশীল ও মুখাপেক্ষীও বটে। মুসলমানরা যদি তথ্যপ্রযুক্তিতে অগ্রণী হতো তাহলে তথ্য সন্ত্রাস কিভাবে হচ্ছে এবং তা প্রতিহত এবং প্রতিরোধের একটি চিন্তা অন্তত তাদের মাথায় আসতো।

৫. মুখে ইসলামের কথা বললেও দু’একটি রাষ্ট্র ব্যতীত গোটা মুসলিম বিশ্ব কার্যত কুরআন সুন্নাহর অনুসরণ থেকে অনেক দূরে। অনেক ক্ষেত্রেই মুসলমানরা স্ববিরোধিতা ও আত্ম-প্রবঞ্চনায় লিপ্ত। 

৬. বাংলাদেশে গণমাধ্যমের জগতে ছিটেফোঁটা দু’একটি ছাড়া বাকি সমস্ত গণমাধ্যমই যে তথ্য সন্ত্রাসের পক্ষে সে সত্যটুকু বোঝার ক্ষমতা অধিকাংশ মুসলমানের নেই। থাকলে তথ্য সন্ত্রাসের বিপক্ষে সঠিক তথ্য প্রকাশের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমকে সহযোগিতা করার জন্য বিশেষ করে প্রিন্টিং মিডিয়ার এ শ্রেণীর পত্রিকা পড়ার জন্য, ক্রয়ের জন্য এ দেশের মুসলমানরা অস্থির হয়ে যেতো। কিন্তু বাস্তবতা তার উল্টা। সর্বোপরি বর্তমান বিশ্বের তথ্য প্রবাহের ওপর মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণ নেই বললেই চলে। প্রিন্টেড ও ইলেক্ট্রনিক উভয় মিডিয়ার ওপরই অমুসলমানদের নিয়ন্ত্রণ একচেটিয়া। এ ব্যাপারে বিশ্ব মুসলিমের কোনোরূপ চেতনা বা উপলব্ধিও আছে বলেও মনে হয় না। 

তথ্য সন্ত্রাস থেকে বাঁচার উপায় : পৃথিবীতে সন্ত্রাস চিরকালই ছিলো, এখনো আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। তথ্য প্রযুক্তির যতোই বিকাশ ঘটবে, তথ্য সন্ত্রাসও ততোই শাণিত ও সূক্ষ্মতর হয়ে উঠবে। শুধু পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বদলাবে সন্ত্রাসকারী ও সন্ত্রাস-আক্রান্তদের অবস্থান ও আইডেনটিটি। এর থেকে রক্ষা পেতে হলে আক্রান্তকারীদেরও অর্জন করতে হবে যথার্থ প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ শক্তি। এর কোনো বিকল্প আছে বলে মনে হয় না। এ জন্যে প্রয়োজন -

১. প্রতিপক্ষরা যে ধরনের শক্তিশালী মিডিয়া নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তথ্য সন্ত্রাস চালাচ্ছে, অনুরূপ বা তার চাইতেও শক্তিশালী মিডিয়া নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।

২. বেশি বেশি গণমাধ্যম তৈরির মাধ্যমে সত্য ও বাস্তব তথ্য প্রবাহের জোয়ার সৃষ্টি করে তথ্য সন্ত্রাসকে প্রতিরোধ করা।

৩. এ উদ্দেশ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মুসলিম বিশ্বের জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

বস্তুত, বর্তমান বিশ্বে রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, সমরনীতি, সংস্কৃতি ও তথ্যপ্রবাহ একে অপরের সংগে ওতপ্রোতভাবেই গ্রথিত এবং একটিকে অন্যটি থেকে আলাদা করার কোনোই সুযোগ নেই। অতএব, অমুসলিম বিশ্ব যে কারণে মুসলিম বিশ্বের ওপর অর্থনৈতিক, সামাজিক বা সামরিক আগ্রাসন চালাতে পারছে, সেই একই কারণেই তারা চালাতে পারছে তথ্য সন্ত্রাসও। 

উপসংহার : বর্তমান গ্লোবাল বিশ্ব তথ্য বিপ্লবের অবাধ ক্ষেত্র। ফলে তথ্য তথা মিডিয়া সন্ত্রাসই হলো সবচেয়ে প্রবল ও কার্যকর হাতিয়ার। তথ্য সন্ত্রাসের মাধ্যমেই এখন ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয় সশস্ত্র ও অর্থনৈতিক সন্ত্রাসের। বর্তমানে অস্ত্র, অর্থ ও তথ্য শক্তির সবক’টিই যেহেতু মূলত ইহুদী-খ্রিস্টানদেরই কব্জায়, সেহেতু তাদের সন্ত্রাসী ঔদ্ধত্যও এখন আকাশচুম্বী। ইহুদী খ্রিস্টান ও হিন্দুত্ববাদীদের সন্ত্রাস ও আঘাতের মূল লক্ষ্যই এখন মুসলমানরা। এর প্রধান কারণ দুটি : ১. ইহুদী খ্রিস্টান হিন্দুত্ববাদীদের প্রতিপক্ষ হিসেবে মুসলমানদের উত্থানকে ঠেকানো এবং বিকল্প আদর্শ হিসেবে ইসলামকে প্রতিহত করা এবং ২. ইসলামী দেশসমূহের সম্পদ, বিশেষত তৈল সম্পদ কুক্ষিগত করা। যতোদিন পর্যন্ত বিশ্বের মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ না হবে, আত্মনির্ভরশীল না হবে, না ছাড়বে ইহুদী খ্রিস্টানদের মুখাপেক্ষিতা এবং না পারবে বিশ্বব্যাপী শক্তিশালী তথ্য নেটওয়ার্ক গড়তে, ততোদিন পর্যন্ত তাদেরকে ইহুদী-খ্রিস্টান আর হিন্দুত্ববাদীদের মার তো কমবেশি খেয়েই যেতে হবে, যেমন এখন খেতে হচ্ছে; এটা শুনতে যতোই অপ্রীতিকর মনে হোক না কেন।

দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা একটি জাতির স্বপ্ন-দর্পণস্বরূপ। বলিষ্ঠ ও সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতাই হওয়া উচিত একটি শোষণহীন, সুশৃঙ্খল সমাজ গঠনে জাতীয় জীবনের সকল অন্ধকার, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। জাতিকে সঠিক এবং আলোর পথ প্রদর্শনের নিয়ামক শক্তি হচ্ছেন সাংবাদিকরা। তারাই স্বদেশ এবং স্বজাতিকে দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং হানাহানির চরম অনিশ্চয়তার চরম অন্ধকার গহ্বর থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসতে যথার্থ কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারেন। তাই সমাজের দাবি সাংবাদিকতার নামে হানাহানি আর দলবাজি নয়- নতুন প্রজন্মকে তথ্য সন্ত্রাসের মোকাবিলায় সঠিক পথের সন্ধান দিতে হবে। বিশ্বের বুকে গর্বিত জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর দৃপ্তশপথ গ্রহণ করতে হবে সকলে মিলে। আমরা যেনো সাংবাদিকতার এ মহান পেশার আদর্শ-নিষ্ঠাকে জলাঞ্জলি দিয়ে কোনো অবস্থায়ই ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবনের অর্থ-সম্পদ আর ক্ষমতার মোহে হলুদ সাংবাদিকতা ও তথ্য সন্ত্রাসের মাধ্যমে অশুভ শক্তির দাবার গুটিতে পরিণত না হই। আমরা যে ধর্মাবলম্বীই হই না কেনো, দেশ এবং জাতির স্বার্থে আমরা যদি এ সত্যটুকুন উপলব্ধি করতে পারি, আমরা যা-ই লিখি তা দ্বারা জনসমাজকে প্রভাবিত করা যাবে। কিন্তু তা সত্য না হলে সৃষ্টির যে ক্ষতি হবে তার কারণে স্রষ্টার নিকট আমাদেরকে দায়বদ্ধ থাকতে হবে। একদিন এর কড়ায়-গণ্ডায় হিসাব আমাদেরকেই দিতে হবে। তা হলে সাংবাদিকতার মাধ্যমে সাংবাদিকতার আসল লক্ষ্য হাসিলের দ্বারা স্রষ্টার মনোরঞ্জনের মাধ্যমে সৃষ্টির কল্যাণ আমরা করতে পারবো। স্রষ্টা কারো একার নন। বৃষ্টির পানি ও আলো-বাতাসের মতো অফুরন্ত নেয়ামত দিয়ে স্রষ্টা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল সৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রাখেন। সাংবাদিকতার এটিই হোক মূল ব্রত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ