মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

উপকূলীয় জনগণের অধিকার ও প্রত্যাশা : প্রেক্ষিত মহেশখালী-কুতুবদিয়া

এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ : বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ব-দ্বীপ। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশটি স্বতঃই দুর্যোগপ্রবণ। প্রতি বছরই বাংলাদেশে হানা দেয় কোন না কোন দুর্যোগ। দুর্যোগের লাগাতার আঘাতে কোটি কোটি মানুষের জীবন, সম্পদ, অধিকার মর্যাদা তথা বেঁচে থাকার মানবিক অধিকারটুকু পর্যন্ত বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। নোবেল বিজয়ী Intergovernment Panel on Climate Change (IPCC)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী উষ্ণায়ন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি, আবহাওয়ার উপাদানসমূহ পরিবর্তন, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় বিশ্বের যে কটি দেশের পরিবেশ বিপর্যয়সহ জনমানুষের জীবন ও জীবিকা বিপন্ন হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে, তন্মধ্যে বাংলাদেশ, বিশেষ করে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল অন্যতম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০০১ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ১৯টি উপকূলীয় জেলা। এ ১৯টি জেলার ১৪৭টি উপজেলায় দেশের মোট জনসংখ্যা এক-চতুর্থাংশের বেশি মানুষ বসবাস করে। ইতোমধ্যেই উপকূলীয় অঞ্চলসহ বাংলাদেশের সর্বত্র জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব লক্ষণীয়। ঘন ঘন ভূমিকম্প, আকস্মিক বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের প্রবণতা বৃদ্ধি, জোয়ারের দীর্ঘস্থায়িত্ব, মাটি ও পানিতে লবণাক্ততা, সুন্দরবনে সুন্দরী গাছের মড়ক ইত্যাদি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত লক্ষণই বটে।
বিজ্ঞানীরা আশংকা করছেন যে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ুর পরিবর্তনে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার জনগণ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সমুদ্রপৃষ্ঠ এক মিটার স্ফীত হলে তাদের ওপর নেমে আসবে চরম বিপর্যয়। শত শত বর্গকিলোমিটার উপকূলীয় ও অন্যান্য নিম্নাঞ্চল অধিক মাত্রায় প্লাবিত হবে। উপকূলীয় কৃষি জমি, প্রতিরক্ষা বাঁধ আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো ও বিনোদন সুবিধা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সেই সাথে উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসরত প্রায় ৪ কোটি মানুষ বাস্তুভিটাহীন হয়ে পড়বে। এ বিরাট জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন আমাদের মত জনবহুল দেশের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে, যা জাতীয় উৎপাদন ও অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। ফলে মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়বে জাতীয় জীবন। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নেতিবাচক ভয়াবহ প্রভাব ও বিপর্যয় মোকাবেলার জন্য উপকূলীয় জনগণকে জলবায়ু সংক্রান্ত প্রভাবের সাথে খাপ-খাওয়ানো এবং ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করার জন্য সরকারকে উপকূলীয় অঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। কারণ এর সাথে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের টিকে থাকার প্রশ্ন জড়িত। এ লক্ষ্যে সরকারকে অনতিবিলম্বে স্বল্প মেয়াদী, মধ্য মেয়াদী ও দীর্ঘ মেয়াদী কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সেই সাথে জনগণকেও তাদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে সজাগ ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
উপকূলবাসীর জীবন প্রবাহ : বাংলাদেশের এক দশমাংশ এলাকা উপকূল। এখানে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে বসবাস করে গড়ে ৭৪৩ জন মানুষ। পরিসংখ্যানে দেখা যায় ২০০ বছরে অন্তত ৬৪ বার মনে রাখার মত বড় ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হেনেছে। ফলে কুতুবদিয়া-মহেশখালীসহ সমুদ্র উপকূলে জনগণকে প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক প্রতিকূল পরিবেশের সাথে সংগ্রাম করে জীবন যাপান করতে হচ্ছে। বর্তমান আধুনিক যুগে সেখানে কাক্সিক্ষত উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। জনগণ পাচ্ছে না উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা,পাচ্ছে না বিদ্যুৎ সুবিধা। এখানে নেই পর্যাপ্ত ভাল মানের কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নেই কোন ভাল চিকিৎসার সুযোগ। উপকূল রক্ষার বেড়ীবাঁধের বেহাল অবস্থার কারণে প্রতিনিয়ত সমুদ্রের জোয়ারের পানি ভিতরে প্রবেশ করে প্রতি বছরই জনগণের আর্থ-সামাজিক কাঠামো লণ্ডভণ্ড করে দেয়। সাইক্লোনের আগাম সতর্কতায় কখনো কখনো নিজেরাই সব গুটিয়ে নতুন আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার নতুনভাবে জীবন যুদ্ধে নামে। অবহেলিত উপকূলের জনগোষ্ঠী চিংড়ি, লবণ ও পান চাষ, শুঁটকি, সামুদ্রিক মাছ, নৌকা তৈরী, পর্যটনসহ নানা পেশায় জড়িত। তাদের মধ্যে রয়েছে অধম্য সাহস ও কর্মস্পৃহা। অধিকাংশ মানুষ কঠোর পরিশ্রম ও ঝুঁকি নিয়ে জীবন যাত্রার উপায় উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। তাদের জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন ও সম্পদ বৃদ্ধিতে প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার, বায়ু বিদ্যুৎ ও পর্যটন শিল্পের বিকাশের বিশাল সুযোগ রয়েছে।
উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ নিজেদের জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি দেশের উৎপাদন ও অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যের অভাবে অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নীচে অবস্থান করছে। শিক্ষার হারও কম, স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভাল নয়, নারীদের অর্থনৈতিক অবস্থা আরো বেশী খারাপ, ধনী-দরিদ্রের অবস্থান সুস্পষ্ট। তাদের মধ্যে রয়েছে বেকারত্ব, নিরক্ষরতা, পুষ্টিহীনতা, নিরাপদ পানি, পুঁিজর তীব্র অভাব ও কৃষি পণ্যের বাজারজাতকরণসহ নানা ধরনের সমস্যা। কিন্তু তাদের জীবনের গতি থেমে থাকে না, বাঁচার তাগিদে উপার্জনের পিছনে ছুটে চলে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে অনেকেই  দেশী-বিদেশী জলদস্যুদের আক্রমণে সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। শুধু তাই নয় ক্ষমতাবান ভূমিদস্যু ও প্রভাবশালী মহল কর্তৃক প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ও ম্যানগ্রোভ ধ্বংস করে অপরিকল্পিত চিংড়ি ও লবণ চাষের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হওয়ায় দেশে দুর্যোগের ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার জন্য যে ধরনের সচেতনতা ও প্রস্তুতিমূলক কর্মসূচি থাকা প্রয়োজন তা পর্যাপ্ত ও যথাযথ পরিমানে না থাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতিবারই তাদের জান-মালের বিশাল ক্ষতি সাধিত হয়ে থাকে। একেকটি দুর্যোগে হাজার হাজার পরিবার একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। প্রতিনিয়ত এ ভাঙ্গা-গড়া তাদের জন্য খুবই যন্ত্রণাদায়ক।
তবুও উপকূলের লড়াকু মানুষেরা প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মোকাবিলা করেই সাহসের সাথে বেঁচে আছে এবং যুগ যুগ ধরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করে আসছে। এসব প্রতিকূলতা ও কষ্ট নিয়ে তারা বাঁচতে চায় এ সুন্দর পৃথিবীতে। যতদিন সূর্যের আলো আছে, যতদিন নদীর স্রোত থাকবে ততদিন সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে তারা এগিয়ে যেতে চায় অনেক দূর।
উপকূলীয় অঞ্চলের সম্পদ-সম্ভাবনা : বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল তেল-গ্যাস, গন্ধকসহ ইত্যাদি প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদে ভরপুর। জাতীয় নীতিমালা ও পরিকল্পনার অভাবে এ সম্পদ আহরণ ও ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ থাকে না। ফলে এ সম্পদ গোটা দেশের এবং বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের কোন কাজেই আসছে না। এ সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত সরকারি বাজেট বরাদ্দ প্রদান করা হলে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন জীবিকার মানোন্নয়নের সাথে সাথে জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে উপকূলীয় অঞ্চল ব্যাপক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে এ অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগনোর লক্ষ্যে উপকূলীয় এলাকার যে সমস্ত সম্পদ ভূমিকা রাখবে তার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিম্নে তুলে ধরা হলো :
১. সমুদ্র উপকূল এলাকার লবণ একটি অন্যতম শিল্প। হাজার হাজার পরিবার এ শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা ও নীতিমালার অভাবে এ শিল্প আজ ধ্বংসের মুখে। লবণ চাষীরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত। লাভ তো দূরের বিষয় উৎপাদন খরচও তারা পায় না। তাছাড়া লবণ চাষীরা পুঁজির জন্য স্থানীয় দাদন ব্যবসায়ী ও মহাজনদের কাছে বন্দী। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে চাষীরা লবণ উপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হলে আমাদের লবণের জন্য সম্পূর্ণভাবে বিদেশের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হবে। তখন কিন্তু লবণ নিয়ে সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হবে এবং দেশে লবণের সংকট সৃষ্টি হতে পারে। তাই লবণ শিল্পকে রক্ষার জন্য শক্তিশালী লবণ বোর্ড গঠন এবং লবণ আমদানি ও চোরাচালানি বন্ধ করতে হবে। 
২. পর্যটন শিল্প উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য একটি আকর্ষণীয় ও অর্থকরী কর্মকাণ্ড। এ শিল্পে বিপুল কর্মসংস্থান হতে পারে। প্রচুর পরিমাণ রাজস্ব আয় হতে পারে এ শিল্প থেকে। কক্সবাজারের মত বিশ্বের সর্ববৃহৎ সমুদ্র সৈকত বলতে গেলে আমরা নামকাওয়াস্তে ব্যবহার করি। অথচ কক্সবাজার দেশী-বিদেশী ভ্রমণ পিপাসু মানুষের কাছে সমাদৃত স্থান। কক্সবাজারের কলাতলী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত জুড়ে এক দিকে সাগর, অন্য দিকে পাহাড় আর বন। প্রাকৃতিক এই নৈসর্গিক সৌন্দর্যই কাছে টানে মানুষকে। মাস্টার প্লানের আওতায় কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন হিসাবে গড়ে তোলা গেলে এবং দীর্ঘ ৮৪ কি.মি. মেরিন ড্রাইভ সড়ক সহ প্রতিশ্রুত রেলপথ ও এশিয়ান হাইওয়ে নির্মিত হলে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে বৈপ্লবিক ধারা সূচিত হবে।  এছাড়া পতেঙ্গা, কূয়াকাটা, সুন্দরবন, হীরণ পয়েন্টসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত উপকূলীয় এলাকাকে পরিকল্পিত উপায়ে  উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের পর্যটন শিল্প বিকাশের উপযোগী করে গড়ে তোলতে পারলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ভাবে আরো এগিয়ে যাবে।
৩. মৎস্য উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য আরেকটি অর্থকারী সম্পদ দেশের মাছের চাহিদা পূরণের জন্য সামদ্রিক মাছের কোন বিকল্প নেই। চিংড়ি দেশের রফতানি আয়ের দ্বিতীয় উৎস। হোয়াইট গোল্ড নামে খ্যাত চিংড়ি- চাষ ও রফতানিতে সরকারের সুষ্ঠু পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। চিংড়ি চাষ উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা ব্যবস্থাসহ চিংড়ির খাদ্য হিসেবে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় আরটিমিয়া আমদানির বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে স্থানীয়ভাবে লবণ মাঠগুলোতে তা চাষ করার জন্য গবেষণা কার্যক্রম হাতে নেয়া যেতে পারে। এ বিষয়ে সরকারের পৃষ্ঠাপোষকতা আবশ্যক।
৪. উপকূলীয় অঞ্চলে শুঁটকি, পান, ধান, বৃক্ষসহ অসংখ্য অর্থকারী ফসল ও সম্পদ রয়েছে; যার উন্নয়নের জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট সকলের উদ্যোগসহ বাস্তবমুখী পদক্ষেপ প্রয়োজন। বঙ্গোপসাগরের আহরিত মাছের প্রায় ৩০% শুঁটকিতে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশে শুঁটকি রফতানি করে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা হচ্ছে। এছাড়া মহেশখালীর মিষ্টি পান খুবই জনপ্রিয়। বিদেশে এ মিষ্টি পান রফতানি করেও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। তাছাড়া ধান, আলু ও শাক-সবজি সহ নানা প্রজাতির ফসল দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির যোগান দিয়ে থাকে। আমরা চাই কৃষক ও তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের উন্নয়ন। তাঁদের বিভিন্ন সামগ্রী উৎপাদনে সহযোগিতা প্রদানের পাশাপাশি ন্যায্য মূল্যের জন্য বাজারজাতকরণের সুবিধা প্রদানের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য বলে এখানকার জনগণ মনে করে।
৫. বিদ্যুৎ হচ্ছে উন্নয়নের চালিকা শক্তি। উপকূলীয় অঞ্চল বিশেষ করে দ্বীপ অঞ্চলের মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা হতে বঞ্চিত। বিশাল সম্ভাবনাময় বায়ু বিদ্যুৎ দেশে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে পারে। ডেইলী স্টার (২০ এপ্রিল ২০০৮) সূত্রে  জানা যায় ভারতে ৮ হাজার মেগাওয়াট বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে যা বাংলাদেশে সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় কাছাকাছি পরিমাণ। বিদেশী বিনিয়োগের মাধ্যমে ইতোমধ্যে এর কয়েক গুণ বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে ভারত। এমনিভাবেই বাংলাদেশের পুরো উপকূলে বিপুল পরিমাণ বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদান সম্ভব। বায়ু বিদ্যুতের পাশাপাশি মহেশখালী-কুতুবদিয়াসহ উপকূলীয় অঞ্চলে টাইডাল বিদ্যুৎ, বায়ু গ্যাস বিদ্যুৎ এবং সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। 
৬. ভোলা, মহেশখালী ও কুতুবদিয়াসহ বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে তেল-গ্যাস সহ বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ রয়েছে। যেমন- ১৯৭৭ সালে কুতুবদিয়া একটি গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়, যার মজুদের পরিমাণ ১০০০ ট্রিলিয়ন ঘন ফুট বলে এক জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে। কুতুবদিয়া ও মহেশখালীর সোনাদিয়া দ্বীপের পশ্চিমে সৈকত বালিতে জিরকন, ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট, কয়নাইট, মোনাজাইট, এর মত মূল্যবান খনিজ পদার্থ আছে। তাছাড়া বাংলাদেশে কুতুবদিয়া দ্বীপে গন্ধকের খনি পাওয়া গেছে। এই গন্ধকসহ প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে উত্তোলন করা হলে দেশের অর্থনীতি আরো সমৃদ্ধি লাভ করবে।
৭. বাংলাদেশের সুন্দরবন ও মহেশখালী-কুতুবদিয়াসহ সমগ্র উপকূলব্যাপী বিস্তৃত এলাকা জুড়ে যে প্যারাবন (Mangrove) রয়েছে তা উপকূল রক্ষা ও পরিবেশ সংরক্ষণে বড় ধরনের অবদান রাখছে। এছাড়া জ্বালানি,  গৃহ নির্মাণ, উপকূলীয় বাঁধ রক্ষা, Sedimentation, Cyclone protection- সহ প্রভৃতি কাজে উক্ত বনের ভূমিকা অপরিসীম।
৮. বাংলাদেশের সমুদ্রে মৎস্য ও নানা প্রজাতির প্রাণিসম্পদ ছাড়াও সমুদ্রের তলদেশে রয়েছে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ। এ সব সম্পদ বিশেষ করে গ্যাস ও তেল নিয়ে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আমরা এ সম্পদ সমুদ্রের নিচে রেখে দিতে চাই না এটা ঠিক, তবে নানা কৌশালে এবং জনগণকে অন্ধকারে রেখে কেউ নামমাত্র বিনিময়ে জাতীয় সম্পদ বহুমাত্রিক কোম্পানীর হাতে তুলে দিয়ে যাবে, তা কিন্তু উপকূলের সংগ্রামী জনগণ কখনো মেনে নেবে না।
দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি  হ্রাসে যা করা প্রয়োজন : বিশেষজ্ঞদের অভিমত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্ধ করা সম্ভব না হলেও দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব। তা করতে হলে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচির চেয়ে প্রস্তুতিমূলক কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। আপনাদের হয়তো স্মরণ আছে ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ১,৩৮,০০০ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিল এবং ফসল, গাছপালা, পশুপাখিসহ সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। লক্ষ লক্ষ পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ১৯৯৮ সালে প্রায় অনুরূপ ঝড়ে ক্ষতির পরিমাণ ছিল খুবই কম। কারণ ১৯৯১ সালের  ঘূর্ণিঝড়ের পর কিছু সংখ্যক আশ্রয় কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল, যেখানে মানুষ আশ্রয় নিতে পেরেছিল এবং তারা অনেক বেশি সচেতন হয়েছিল। সতর্ক সংকেত প্রচারে সরকারের এবং স্থানীয় জনগণের ব্যাপক ভূমিকা ছিল। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষও সহজে সতর্ক সংকেত বিশ্বাস করেছিল। সাম্প্রতিক উপকূলীয় দক্ষিণ অঞ্চলে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ সিডরের গতিবেগ ছিল ঘায় ২২০ কি.মি.। সুন্দরবনের বাধার কারণে তা কমে ঘণ্টায় ১২০ কি.মি. দাঁড়িয়েছিল। যদি সিডর ঘণ্টায় ২২০ কি. মি. গতিবেগে ভূখণ্ডে আঘাত হানতো তাহলে ক্ষতির পরিমাণ কি দাঁড়াতো আমরা সকলেই তা অনুমান করতে পারি। এ বর্ণনার অর্থ এই যে, দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার জন্য দুর্যোগ প্রস্তুতিমূলক কর্মসূচির (Disaster Preparedness) কোন বিকল্প নেই। সেই সাথে বাংলাদেশের সুন্দরবন (World Heritage) রক্ষা করা জাতীয় দায়িত্ব। এ লক্ষ্যে অন্তত ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে ক্ষতিকর কোন প্রকল্প বাস্তবায়ন থেকে সরকারকে বিরত থাকতে হবে। বৈশ্বিক উষ্ণতা (Global Warming) কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য সরকারকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরো সোচ্চার হতে হবে। কার্বন নিঃসরণকারী শিল্পোন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে। তাছাড়াও দুর্যোগের ক্ষতিক্ষতি কমিয়ে আনার জন্য নতুন প্যারাবন সৃষ্টি, সামাজিক বনায়নের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রচার প্রচারণা বাড়াতে হবে। দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দরিদ্র পরিবার, বিশেষ করে মহিলা এবং শিশুরা। দুর্যোগে দরিদ্রদের সামান্য সম্পদও ধ্বংস হয়। ফলে তারা একেবারেই নিঃস্ব হয়ে পড়ে। তাদের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে না পারলে বারে বারে সংঘটিত দুর্যোগের ক্ষতি সামলানো তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। বিষয়টি সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে আরো বেশি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। তাদের আয় বৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত ও সময়োপযোগী বাস্তবভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
উল্লেখ্য, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি শুধু কোন দেশ বা অঞ্চলের সমস্যা নয়। এটি গোটা বিশ্বে পরিবেশ বিপর্যয় ও মহাবিপদ ডেকে আনবে। সম্ভাব্য এ ক্ষতি বা মহাবিপদ বিশে^র সব দেশকে এক যুগে ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করতে হবে। তাই বিশ্ব নেতারা প্যারিসের জলবায়ু সম্মেলনে  কার্বন নিঃসরণ গ্রহণযোগ্য মাত্রায় নামিয়ে আনা এবং পৃথিবীর নি¤œাঞ্চলের দ্বীপগুলোর সম্ভাব্য ক্ষতি কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এ লক্ষ্যে ১২ ডিসেম্বর বিশ্ব জলবায়ু নিয়ে বহুল আলোচিত ও প্রত্যাশিত ‘প্যারিস চুক্তি’ প্রণীত হয়েছে। চুক্তিটি করা হয়েছে মূলত গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন হ্রাসের মাধ্যমে এ শতাব্দীর শেষ নাগাদ বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির বর্তমান গতি কমিয়ে কমপক্ষে প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে সর্বোচ্চ ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার উদ্দেশ্যে। একই সাথে এ লক্ষ্যকে আরো প্রসারিত করে বিশ্বের তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ। এই প্রথম বিশ্ব নেতারা জীবাশ্ম জ্বালানি যুগের সমাপ্তির সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন। এ চুক্তির আওতায় বিশ্ব একটি কার্বনমুক্ত উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে। তাই বাংলাদেশের মতো দেশের কার্বননির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেশি গুরুত্বারোপ কোনোভাবেই টেকসই হতে পারে না। বরং এখন সময় এসেছে কার্বননির্ভর জ্বালানিকে ধারাবাহিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া। এ ছাড়া অভিযোজনের জন্য কোনো ঋণ না নেয়ার যে অঙ্গীকার সরকারের ছিল ঐ ব্যাপারে আরো কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ