মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

ভারতের নেপাল অভিজ্ঞতা

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী : প্রতিবেশী ছোট রাষ্ট্রগুলোর ওপর ভারতের খবরদারি সীমাহীন ঔদ্ধত্যের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। কিন্তু ভারতের চরম মৌলবাদী শাসকরা বোধকরি উপলব্ধি করতে পারছেন না যে, এটা ১৯৪৮ সাল বা ১৯৭৫ সাল নয়। সময় অনেক বদলে গেছে। দেশে দেশে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন মেরুকরণের সৃষ্টি হয়েছে। ভেঙে গেছে দুই মেরুর বিশ্বব্যবস্থা। রাষ্ট্র যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন, ভারতের চোখ রাঙানির কাছে নতি স্বীকার করতে কেউ আর প্রস্তুত নয়। নেপাল নয়; এমনকি ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপও নয়। ভারত ১৯৪৮ সালে কার্যত স্বাধীন মণিপুরের রাজাকে বন্দী করে তার এক অনুগতের মাধ্যমে মণিপুর দখল করে নিয়েছিল। কিন্তু মণিপুরীরা ভারতের এই আগ্রাসন এখন পর্যন্ত মেনে নেয়নি। স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের জন্য তারা সেই ১৯৪৮ সাল থেকেই ভারতের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ চালিয়ে আসছে।
একইভাবে ১৯৭৫ সালে ভারত কৌশলে দখল করে নেয় স্বাধীন রাজ্য সিকিম। সিকিম দখলের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। তার বড় শখ ছিল, সিকিমের কায়দায় তিনি দখল করে নেবেন নেপালও। সেজন্য তিনি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’কে নিয়োজিত করেছিলেন। কিন্তু এতো বছরের অক্লান্ত প্রচেষ্টায়ও ‘র’ তার ধারেকাছেও যেতে পারেনি। এমন চক্রান্তেই সেখানকার রাজপরিবারকে সবংশে শেষ করে দেয়া হয়। ভারত ভেবেছিল, এ পথেই তারা মণিপুর-সিকিমের কায়দায় একটি তাঁবেদার রাজনৈতিক গোষ্ঠী গড়ে তুলে তাদের মাধ্যমে নেপাল দখল করে নেবে। কিন্তু সবসময় অতি চালাকি সফল হয় না। কখনও কখনও অতি চালাকের গলায়ও দড়ি পড়তে পারে। এখন নেপালে ভারতের তেমনি অবস্থা।
নেপালের সকল রাজনৈতিক দল থেকে নির্বাচিত সাংবিধানিক পরিষদ মিলে প্রায় সাত বছর ধরে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত একটি সংবিধান রচনা করেছে। সংবিধান প্রণেতারা নেপালকে একটি হিন্দু রাষ্ট্র থেকে প্রজাতন্ত্রে পরিণত করেছে। আর কমিউনিস্টদের অনেক দিনের দাবি অনুযায়ী, নেপালকে সাতটি রাজ্যে বিভক্ত করা হয়েছে। ভারতঘেঁষে নেপালের ২২ শতাংশ সমতল ভূমি এলাকা নিয়ে গঠিত তেরাই অঞ্চল। এলাকাটি অত্যন্ত উর্বর আর নেপালের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই এখানে বসবাস করে। এদের ২০ ভাগ আবার ভারতীয় বংশোদ্ভূত। প্রধানত দারিদ্র্যপীড়িত উত্তরপ্রদেশ আর বিহারের লোকেরা এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছে। এ অঞ্চলে বসবাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের সাধারণত মাধেসি বলে অভিহিত করা হয়। ইন্দিরা গান্ধী সরকার এদের নাগরিকত্ব দিতে নেপালের তৎকালীন কংগ্রেস সরকারকে বাধ্য করেছিল। কিন্তু এবার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে নেপালের সংবিধান গৃহীত হয়েছে। এই সংবিধান যখন গৃহীত হয়, তখন নেপালে ক্ষমতায় আসীন ছিল ভারতের অনুগত রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত নেপালি কংগ্রেস। তারাও একযোগে এই সংবিধান গ্রহণের পক্ষে ভোট দেন।
তেরাই অঞ্চলে মাধেসিদের দাবি হচ্ছে, গোটা অঞ্চলকে পূর্ণাঙ্গ দুটি প্রদেশে বিভক্ত করতে হবে। কিন্তু সংবিধান প্রণেতারা সেখানে একটি প্রদেশ রেখে বাকি জেলাগুলোকে অন্যান্য প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছেন। এদিকে নেপালের সাংবিধানিক পরিষদে তেরাই অঞ্চল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন ১১৬ জন সদস্য। তাদের মধ্যে সংবিধানের বিপক্ষে ভোট দেন মাত্র ১১ জন সদস্য। বাকি ১০৫ জনই এ সংবিধানের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু এখন ভারতের মদদে তারা সেখানে এক রাষ্ট্রঘাতী আন্দোলন শুরু করেছেন। আর এ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানাতে ভারত নেপালের বিরুদ্ধে এক অঘোষিত অবরোধ আরোপ করে বসে আছে চার মাসেরও বেশি সময় ধরে। নেপাল তার প্রয়োজনের সবটুকু জ্বালানি ভারত থেকে আমদানি করে থাকে। তাছাড়া জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, খাদ্যসামগ্রী, শীতবস্ত্র, শাকসবজির প্রায় সবটুকুই আমদানি করে ভারত থেকে। ভারত তার সীমান্তে নেপাল অভিমুখী হাজার হাজার পণ্যবাহী ট্রাক আটকে দিয়েছে। এমনকি ভারতীয় বিমানগুলো ‘ওপরের নির্দেশে’ নেপালে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ পর্যন্ত পরিবহন করতেও অস্বীকার করছে। ফলে নেপালে ৫ বছরের কম বয়সী ৩০ লাখ শিশুর জীবন এখন বিপন্ন। এই আপৎকালে চীন যে জ্বালানি সরবরাহ করছে, তা মোট চাহিদার ২৮ শতাংশের মতো। ফলে নেপালে জ্বালানি সঙ্কট বিপর্যয়কর। ভারতের চরম হিন্দু মৌলবাদী মোদি সরকারের বিশেষ দূত নেপাল সরকারকে গিয়ে বলে এসেছেন, সংবিধান সংশোধন করে মাধেসিদের দাবি মেনে না নিলে বর্তমান সঙ্কটের অবসান ঘটবে না।
দেশ নেপালীদের। তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংবিধান প্রণয়ন করেছেন। সে সংবিধানে কী থাকবে আর কী থাকবে না, সেটা ডিকটেট করবে ভারত? নেপাল তো কারও অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করছে না। তাহলে কেন এই দাদাগিরি? নেপালের সকল দল একযোগে বলেছে, কোনো অবস্থাতেই তারা তাদের সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে আপস করবে না। সেটাই সঙ্গত। গত ২৫ এপ্রিলের ভয়াবহ ভূমিকম্পে নেপালে ১০,০০০ লোকের প্রাণহানি হয়েছে। আহত হয়েছে আরও ১০ হাজার। ঘরবাড়ি হারিয়ে তাঁবুতে আছে প্রায় ১০ লাখ লোক। সে বিপর্যয় সীমাহীন। কিন্তু ভারত অবরোধ আরোপ করে যে বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে, তা ভূমিকম্পের বিপর্যয়কেও ছাড়িয়ে গেছে। তারপরও কোনো নেপালী ভারতের এই দাদাগিরির কাছে আত্মসমর্পণের চিন্তাও করছে না। নোপালী কংগ্রেস এবং সরকারের অন্যান্য প্রতিনিধি জাতিসংঘে গিয়ে ভারতের এই অবরোধের বিরুদ্ধে নালিশ করেছে। এতেও ভারত ক্ষুব্ধ হয়েছে। কিন্তু নেপালীরা তার পরোয়া করেনি। জাতিসংঘ মহাসচিবও বলেছেন, স্থলবেষ্টিত দেশ হিসেবে ভারতের ওপর দিয়ে ট্রানজিট নেপালের আন্তর্জাতিক অধিকার, এ অধিকার ভারতকে মানতে হবে। বিশ্বের অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থাও নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ভারত অবরোধ আরোপ করে লাখ লাখ নেপালীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এক্ষেত্রে মোদি সরকারের লক্ষ্য দুটি। প্রথমত, তারা চাইছে ‘র’-এর মাধ্যমে নেপালের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল করে বর্তমান কোয়ালিশন সরকারের পতন ঘটানো। আর তা সম্ভব না হলে কমপক্ষে তেরাই অঞ্চল দখল করে নেয়া। এর আগেও কথা না শোনার জন্য ভারত নেপালের ওপর কমপক্ষে দুইবার অবরোধ আরোপ করেছিল। কিন্তু তার কোনোটাই এতোটা দীর্ঘ সময়ের জন্য ছিল না। নেপাল আপস করতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু এবারের চিত্র ভিন্ন। তারা কোনো অবস্থাতেই ভারতের খবরদারি মানতে প্রস্তুত নয়। তারওপর চীন নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে। চীন ইতিমধ্যে নেপালকে ১০ হাজার টন জ্বালানি তেল অনুদান হিসেবে দিয়েছে। আর নেপালে তেল সরবরাহের জন্য কাঠমান্ডু ও বেইজিং সরকার এই প্রথমবারের মতো একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। নেপালের ভারতনির্ভরতা এতে বহুলাংশে হ্রাস পাবে। সেটা ভারতের জন্য খুব খুশির খবর নয়।
এ যাত্রা ভারতকে একটি ভিন্ন পরিস্থিতির কথাও মনে রাখতে হবে। ২০ লাখ মাধেসি ২ কোটি ৬০ লাখ নেপালীর ভাগ্য জিম্মি করে রাখবে, আর জনগণ খুব বেশিদিন সেটা চেয়ে চেয়ে দেখে অসহায়ভাবে ভুগবে, এটাও আশা করা সঙ্গত হবে না। সেক্ষেত্রে মাধেসিদের বৃহত্তর নেপালী জনগোষ্ঠীর অবরোধের মুখে পড়ার বিষয়টিও উড়িয়ে দেয়া যায় না। কারণ মাধেসিদের নেপালী নাগরিকত্ব মেনে নিতে হতে হবে। মনে করতে হবে, তারও নেপালী। তারা যদি নিজেদের ভারতীয় নাগরিকই ভাবতে থাকেন, তখন দাবি ওঠা খুবই স্বাভাবিক যে, তা হলে মাধেসিরা নেপাল ছেড়ে ভারতেই চলে যাক। তখন ভারত মাধেসি এলাকা দখল করে নিতে চাইলে কৌশলগত স্বার্থেই এতে চীনের এগিয়ে আসার পথ সুগম হবে। ভারত সে ঝুঁকি নিতে চাইবে বলে মনে হয় না। আর সে প্রেক্ষিত সামনে রেখেই নেপালের প্রধানমন্ত্রী ওলি বলেছেন, তারা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য প্রস্তুত আছেন। কিন্তু সাংবিধানিক পরিষদের অধিবেশন বসলেই কিছু মাধেসি সদস্য হৈচৈ করে সভা স্তগিত করাচ্ছেন। আর তাই নেপালী প্রধানমন্ত্রী ওলি বলেছেন, যদি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি না হয়, তা হলে সরকার সাংবিধানিক, আইনগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে।
সার্বভৌম নেপাল সরকার এটা শুধু কথার কথা হিসেবে বলেনি। মাঝখানে মাধেসিদের সহায়তা করার জন্য ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী অস্ত্র হাতে ঢুকে পড়েছিল নেপালের ভেতরে। নেপাল সরকার তাদের ১৩ জনকে আটকে রেখে ভারত সরকারকে সতর্ক করে দিয়েছে যে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী যেন আর কোনো অবস্থাতেই মাধেসিদের পক্ষ হয়ে নেপালের ভেতরে অস্ত্রবাজি করতে না আসে। তারপর থেকে এ পর্যন্ত আর ভারতীয় বাহিনীর কোনো সশস্ত্র ব্যক্তি পোশাকে নেপালের ভেতরে প্রবেশ করেনি। সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাবান জাতি একেই বলে। ভারত উপলব্ধি করতে পারছে, তাদের আগেকার সেই তাঁবেদার সরকারের নেপাল আর নেই।
ভারতের দীর্ঘকালের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, মন্ত্রী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনি শঙ্কর আয়ার সম্প্রতি দিল্লী-কাঠমান্ডু সম্পর্ক বিষয়ে এক নিবন্ধ লিখে বলেছেন, ‘ভারতের অবস্থান এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, চীন বা পাকিস্তান নয়, নেপাল ভারতের ১৩ অনুপ্রবেশকারী সশস্ত্র সীমান্তরক্ষীকে বন্দী করে রেখেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতিবেশী নীতির অবস্থা এখন এমনই দাঁড়িয়েছে।’ ভারত নেপালে যা করছে তা কূটনীতি নয়, বরং গণহত্যার আয়োজন। এজন্য ভারতকে দীর্ঘকালের জন্য নেপালের কাছে কাফফারা দিয়ে যেত হবে। আর সাধারণ নেপালীরা হয়তো এই গণহত্যা পরিকল্পনার জন্য ভবিষ্যতে আর কোনোদিনই ভারতকে ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখবেন না। ইতিমধ্যে নেপাল প্রথমবারের মতো চীনের সঙ্গে ভারতের অনুরূপ এক চুক্তি স্বাক্ষর করছে। এখন আর ভারত কোনোভাবেই এ চুক্তি রদ করতে পারবে না। নেপাল ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেশ। কিন্তু ভুল নীতির কারণে, নেপালকে দাসানুদাস কল্পনা করায় নেপালকে হারিয়ে ফেললো ভারত।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার সাংবাদিক যুবরাজ গিমরে সম্ভবত সঠিকভাবেই বলেছেন, ‘বর্তমান অচলাবস্থা প্রমাণ করে ভারত জানে না, কোথায় কখন থামতে হবে।’ এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, ভারতকে থামতে জানতে হবে। চাইলে ভারতের কাছে কাছাখোলা বাংলাদেশ সরকার এখন নেপালের কাছ থেকে আত্মমর্যাদার শিক্ষা নিতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ